ঢাকা, শুক্রবার 11 May 2018, ২৮ বৈশাখ ১৪২৫, ২৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর হিসাবে বিগত মাত্র পাঁচ বছরেই তাদের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় দেড় লাখে। সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়ার অভিযোগে লাঠিপেটাসহ শারীরিক নির্যাতন ও গ্রেফতার, বাসাবাড়িতে দফায় দফায় পুলিশের তল্লাশি, মাসের পর মাস বিনাবিচারে কারাবাস, মামলার জন্য হাজিরার নামে দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় অসহনীয় অবস্থায় বসে থাকার মতো নানা কারণে উদ্বিগ্ন ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করছেন। আবেদন করারও আগে তারা বৈধ ও অবৈধ পন্থায় ওইসব দেশে গিয়ে হাজির হচ্ছেন। দেশগুলোতে যেহেতু নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে সেহেতু আদালতে নিষ্পত্তি বা সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে কোনো বাংলাদেশিকেই সরাসরি বহিষ্কার করা হচ্ছে না। 

গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশিরা বেশি সংখ্যায় যাচ্ছেন ইউরোপ ও আমেরিকার ৩০টি দেশে। এসব দেশের মধ্যে আবার বেশি আশ্রয় পাচ্ছেন ব্রিটেন ও ইতালিতে। ইউএনএইচসিআর-এর পাশাপাশি ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যার দিক থেকে ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তান এবং সোমালিয়ার পরই বাংলাদেশের অবস্থান। যারা গেছেন ও যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সংখ্যাই অনেক বেশি। রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার যুক্তি হিসেবে তারা সরকারের প্রচন্ড দমন-নির্যাতনের মুখে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার কথাটাই প্রধানত উল্লেখ করছেন। আবেদনপত্রে অনেকে নিজেদের ভীতিকর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও সবিস্তারে জানাচ্ছেন। বর্তমান সরকারের আমলে দেশে ফিরলে তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে বলেই তারা মানবিক কারণে রাজনৈতিক আশ্রয় বা ‘পলিটিক্যাল আসাইলাম’ চাচ্ছেন। 

ইউএনএইচসিআর এবং পিউ রিসার্চ সেন্টারের রিপোর্ট ও পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, কয়েক বছর ধরে আশ্রয় চাওয়া শুরু হলেও বিগত পাঁচ বছরে আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বেড়ে গেছে। শুধু এই পাঁচ বছরে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন এক লাখ ৩৭ হাজার বাংলাদেশি। অথচ ২০১৩ ও ২০১৪ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছিলেন যথাক্রমে মাত্র সাত ও দশ হাজার বাংলাদেশি। তাছাড়া ব্রিটেন, ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ফ্রান্সে তো বটেই, দক্ষিণ অফ্রিকায় পর্যন্ত ২৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি দেশের বাইরে নরওয়ে ও সুইডেনেও অনেক বাংলাদেশির আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ওপরে উল্লেখিত সংস্থা দুটি আরো জানিয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদনকারীদের মধ্যে ৭৩ শতাংশই তরুণ এবং কম বয়সী। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন সংক্রান্ত খবর এবং তথ্য-পরিসংখ্যান অত্যন্ত আশংকাজনক। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার পাশাপাশি ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থাও যেহেতু অভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করেছে, সেহেতু বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কিংবা হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ থাকতে পারে না। উভয় সংস্থার রিপোর্টেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের বিষয়টি প্রাধান্যে থাকায় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এই সত্য প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় নিষ্ঠুর দমন-নির্যাতন চালাচ্ছে বলে শুধু নয়, গুম ও গুপ্তহত্যার মতো ভয়ংকর বিভিন্ন কারণেও  বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা দেশে থাকার সাহস পাচ্ছেন না। প্রতিটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আদালতে তথ্য-প্রমাণ ও উদাহরণ তো উপস্থাপন করা হচ্ছেই, একই সঙ্গে ওই সব দেশের পক্ষ থেকেও নানা পন্থায় খোঁজ-খবর করা এবং অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে ভীষণভাবে। বিশ্বের দেশে দেশে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনস্থ হয়ে পড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্রের লেশমাত্রও উপস্থিত নেই। কোনো দেশের জন্য এমন পরিচিতি নিঃসন্দেহে লজ্জাকর এবং অগ্রহণযোগ্য। 

আমরা তাই মনে করি, সরকারের উচিত গণতন্ত্রসম্মত অবস্থানে ফিরে আসা এবং দমন-নির্যাতন, গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলার অভিযান বন্ধ করা। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা দরকার, যাতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ কোনো দলের নেতা-কর্মী-সমর্থককেই দেশ ছেড়ে পালাতে এবং ভিনদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন জানাতে না হয়। এরই মধ্যে যারা জীবনের ভয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন তাদের সকলকেও দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনরা পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করবেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে সকল বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ