ঢাকা, শুক্রবার 11 May 2018, ২৮ বৈশাখ ১৪২৫, ২৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ওয়াগাহ বর্ডারের কুচকাওয়াজ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সহযোগিতার প্রতীকও

 

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, পাকিস্তান থেকে ফিরে : [ কিস্তি-৩ ] এরশাদ সাদিক। পেশায় একজন ব্যবসায়ী। এক ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে লাহোরেই বসবাস করেন। সময় পেলেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে বের হন। তবে স্ত্রী ও তার পছন্দ ‘ওয়াগাহ’ বর্ডার। সময় পেলেই নাকি এখানে আসেন তিনি। গত ২৪ মার্চ এই প্রতিবেদকের সাথে ওয়াগাহ বর্ডারে কথাা হয় এই পরিবারের সাথে। কেন এই ওয়াগাহ বর্ডারে আসা এবং এর এতো জনপ্রিয়তা কেন জানতে চাইলে এরশাদ সাদিকের স্ত্রী জানান, দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার এই ওয়াগাহ সীমান্ত এলাকাটি ব্যাপক পরিচিত একটি জায়গা। প্রতিদিন এখানে অন্তত চার থেকে পাঁচ হাজার দর্শনার্থী এসে থাকেন। কয়েক মাস পরপর তারাও এখানে আসেন। তিনি বলেন, এখানে আসলে শরীর ও মনে যেন শক্তি অনেক বেড়ে যায়। আমরা যে একটি স্বাধীন দেশে বসবাস করছি তার একটি নমুনা এখানে পাওয়া যায়। যখনই ‘নারায়ে তাকবীর, পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেয়া হয় তখনই নিজের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি  কাজ করে। আর যখন পাকিস্তান বলে সবাই চিৎকার করে উঠে তখন শরীরের সমস্ত শক্তি যেন এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। এছাড়া দুই দেশের সৈন্যদের শারীরিক কসরত ও কুচকাওয়াজের দৃশ্য আসলেই অসাধারণ। এখানে আসলেই মনে হয় দেশ দুটির জনগণ এককাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানকার সৈন্যদের পারফরমেন্সে কিছুটা উত্তেজনা থাকলেও এটি আসলে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার সহযোগীতার প্রতীকও বটে। 

ওয়াগাহ সীমান্ত নিয়ে এমন বক্তব্য পাকিস্তান এবং ভারতের দুই অংশের লোকদেরই। দুই দেশের জনগণই ওয়াগাহ সীমান্তে অনুষ্ঠিত প্রতিদিনকার কর্মযজ্ঞ দেখে যেমন একদিকে আনন্দ পান তেমনী নিজেদের মধ্যে দেশের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যটাও যেন অনেকগুণ বেড়ে যায়। আলিফ ও সাইমান, স্কুল পড়–য়া দুই ছেলেকে নিয়ে আসেন বাবা রাফাত খান। আলাপকালে তিনি জানান, দেশের প্রতি যেন দায়িত্ববোধ বাড়ে সে জন্যই সন্তানদের সময় পেলেই এখানে নিয়ে আসি।    

ওয়াগাহ সীমান্ত পাকিস্তানের লাহোর থেকে ২৯ কিলোমিটার এবং ভারতের অমৃতসর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।  ভারতীয় অংশ থেকে ওয়াগাহর নিকটতম উল্লেখযোগ্য শহর অমৃতসর ও পাঞ্জাব । এই বর্ডার দিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের জনগণ সীমানা অতিক্রম একে অপরের মাঝে নিজেদের ভাবের আদানপ্রদান করে থাকেন। এই সীমান্তটি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে একমাত্র ক্রসিং পয়েন্ট, যা নিয়মিত বিদেশীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পূর্ব থেকে অনুমতি নিয়ে এই সীমান্তে অনুষ্ঠিত পরিবেশনা উপভোগ করা যায়।  জানা যায়, ট্রেন এবং বাস উভয় মাধ্যমেই ওয়াগাহ বর্ডারে যাওয়া যায়। বাস যোগে ইসলামাবাদ থেকে ৫/৬ ঘন্টায় ওয়াগাহ সীমান্তে আসা যায়। দিল্লি থেকে লাহোরের সংহা এক্সপ্রেস ওয়াগাহের মধ্য দিয়ে যায় বলে জানা গেছে।  ভারতীয় পক্ষের শেষ স্টেশনটি হচ্ছে আততারী । 

ওয়াগাহ সীমান্তে দৈনিক দুই দেশের পতাকা উত্থাপন এবং নিজ নিজ সৈন্যদের পারফরমেন্স প্রদর্শনই হচ্ছে এখানকার প্রধান ঘটনা। সেইসাথে চলে দেশ দুটির সংস্কৃতিক কিছু আয়োজন। এখানে প্রতিদিনই দুই দেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য উপস্থিত করে। এইসব সৈন্যরা বিশেষভাবে ট্রেনিং প্রাপ্ত। বিশেষ করে এদের একে অপরের প্রতি ভাবের আদানপ্রদানের দৃশ্যটা খুবই উত্তেজনাকর। বাজনা এবং গানের তালেতালে এখানকরার সৈন্যরা তাদের নিয়মিত কর্মযজ্ঞ প্রদর্শন করে থাকেন। ভারতীয় ও পাকিস্তানী সীমান্তরক্ষী বাহিনী উভয়ই এই কাজ করে এবং এটি উভয় পক্ষের মানুষদের একত্রিত করে। ওয়াগাহ বর্ডারে অনুষ্ঠিত এই দৃশ্যটি দেখা এখন দেশদুটির মধ্যে একটি ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। এতে করে উভয় পক্ষ তাদের সীমান্ত এলাকাকে সুসংগত করে তোলার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলে। দুই ঘন্টারও অধিক সময় ধরে চলমান অনুষ্ঠানটি জনসাধারণের মধ্যে একটি অনুভূতিপূর্ণ সেইসাথে দেশপ্রেমমূলক জাগরণ সৃষ্টি করতে বোঝায়। এটিকে স্থানীয়ভাবে পিপা রিট্টিট অনুষ্ঠান বলা হয়।

জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান এবং ভারত পৃথক হবার পর থেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ওয়াগাহ বর্ডারে দুই দেশের মধ্যকার সৈন্যদের এই পারফরমেন্স শুরু হয়। তবে ১৯৫২ সালে ভারত (সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী, বিএসএফ) এবং পাকিস্তান (পাকিস্তান রেঞ্জার্স) এর নিরাপত্তা বাহিনী যৌথভাবে এই সামরিক মহড়া তথা কুচকাওয়াজের আয়োজন শুরু করে। এই অনুষ্ঠানের সৈনিকগণ বিশেষভাবে নিযুক্ত এবং এই এরা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। এটা উভয় দেশের প্রতিদ্বন্দ্বীতার পাশাপাশি ভ্রাতৃত্ব এবং দেশ দুটির মধ্যে সহযোগিতার প্রতীকও।  যদিও হামলা ও রাজনৈতিক টানাপোড়নের কারণে কয়েকবার এই অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল। তবে দেশ দুটির জনগণই চায়, ওয়াগাহ বর্ডারের এই নান্দনিক কর্মযজ্ঞ অব্যাহত থাকুক। 

আলাপচারিতায় জানা গেছে, প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ওয়াগাহ বর্ডারের এই আনুষ্ঠানিকতা চলে। তবে এই সময়টার পরিবর্তনও হয়ে থাকে। মূলত: সুর্যাস্তের দুই ঘন্টা আগে এই সামরিক মহড়ার কার্যক্রম শেষ করা হয়ে তাকে। যারা এখানে আসার জন্য অনুমতি নেন তাদের জন্য অনুষ্ঠান শুরুর কয়েক ঘন্টা আগে থেকে সেখানে যাবার জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়। ওয়াগাহ বর্ডারে প্রতিদিন পতাকা নামানোর আগে সৈন্যদের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু স্বেচ্ছাসেবক যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করে সেটিও পর্যটকদের জন্য প্রধান ঘটনা হয়ে উঠেছে। সীমান্তের উভয় দিকের সমবেত জনতার গোলমাল, চিৎকার-চেচামেচি একটি ক্রীড়া ম্যাচের অনুরূপ এবং তা দেখতে খুব আনন্দদায়ক। ওয়াগাহ বর্ডারের এই সীমান্ত ফটকে দুই দেশের দর্শনীয়  গ্যালারী রয়েছে। মূলত সীমানা এলাকার চারপাশে স্টেডিয়ামের ন্যায় বসার ধাপগুলি বানানো হয়েছে। জানা গেছে, ওয়াগাহ বর্ডারে পাকিস্তানের পতাকা বিশ্বের সবচেয়ে উচুঁতে দেখা যায়। 

সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপচারিতায় জানা গেছে, ওয়াগাহ বর্ডারের এই নান্দনিক কর্মযজ্ঞ দেখার জন্য যারা গ্যালারীর আসেন তাদের আসন বিন্নাসও দারুণ। এখানে রয়েছে ভিআইপি আসন।  দরজার নিকটতম স্থানে অিআইপিদের জন্য রাখা থাকে। বিদেশী নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত ভিআইপি এলাকার পর একটি বিভাগ রয়েছে। সেলফোন, ক্যামেরা (যেকোন প্রকার) নিয়ে এখানে প্রবেশ করা যায়। ভেতরে প্রবেশের আগে সবাইকে একাধিকবার তল্লাশি করা হয়। অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরুত্বে যানবাহন রেখে আসতে হয়। যারা পাকিস্তান সফরে আসেন তাদের জন্য এই ওয়াগাহ বর্ডার প্রত্যক্ষ করাটা অন্যতম আকর্ষণই বলা যায়। এখানকার নান্দনিক দৃশ্য পর্যটকদের কাছে অনেকদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।  

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার ওয়াগাহ সীমান্তে দুই দেশই তাদের তারকাদের জড়ো করে থাকেন। বিশেষ করে দেশ দুটির স্পেশাল দিনে অনেক তারকাই এখানে আসেন নিজ দেশের পক্ষে প্রচারণা চালাতে। সম্প্রতি অনুষ্ঠান দেখতে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এখানে। খবরে প্রকাশ, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ এবং পাকিস্তান রেঞ্জার্সের কুচকাওয়াজ চলাকালে হঠাৎই দর্শকের আসন থেকে উঠে যান পাকিস্তানের ক্রিকেট দলের মিডিয়াম পেসার হাসান আলী। এরপর তিনি বিএসএফ’কে লক্ষ্য করে নাচতে থাকেন। এসময় পাকিস্তান পক্ষের সমর্থকরা শ্লোগান দিতে থাকে। কিছুদিন আগে ভারত তাদেরও দেশের জনপ্রিয় কমেডিয়ান কপিল শর্মাকে নিয়ে আসেন ওয়াগাহ সীমান্তে। তিনিও নিজ দেশের পক্ষে নেচে গেয়ে আনন্দ শেয়ার করেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী পতাকা নামানো বা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে শুধু দু’দেশের সেনাবাহিনীই অংশ নিতে পারে। তখন দর্শকের আসন থেকে কেউ নাচানাচি বা অঙ্গভঙ্গি করতে পারলেও অনুষ্ঠানের মাঝে তারকাদের ঢোকার অনুমতি নেই। তারকারা যা করবেন তা পতাকা নামানো এবং উঠানোর মাঝখানেই সীমবিদ্ধ রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ