ঢাকা, শনিবার 12 May 2018, ২৯ বৈশাখ ১৪২৫, ২৫ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল -শেখ হাসিনা

গতকাল শুক্রবার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় কাউন্সিলে প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -বাসস

* প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্রলীগের অবদান রয়েছে
* আদর্শহীন রাজনীতি করে মানুষকে কিছু দেওয়া যায় না
* কিছু ছাত্রলীগ নেতা বিপথে চলে গেছে এরা বেঈমান
* অবশ্যই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ হবে
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯ তম জাতীয় সম্মেলন শুরু হয়েছে। পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গতকাল শুক্রবার বিকেলে এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইনসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। আজ শনিবার সমঝোতার মাধ্যম্যে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা হবে।
গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছানোর পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সম্মেলনস্থল। এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সমবেত হন। সকাল থেকেই সম্মেলনস্থলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
দুপুরের পর থেকেই লাল-সবুজের সাজে সজ্জিত হয়ে ছাত্রলীগ নেত্রীরা সম্মেলনস্থলে প্রবেশ করতে শুরু করেন। এছাড়াও মাথায় ব্যান্ড বেঁধে, পাতাকা উড়িয়ে বাদ্যের তালে তালে উৎসবমুখর পরিবেশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সামনে সমবেত হয় সারাদেশ থেকে আসা বিভিন্ন ইউনিটের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।
সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'নিজের ভাগ্য গড়ার জন্য ক্ষমতা নয়, ক্ষমতা মানুষের ভাগ্য গড়ার জন্য।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা চাই দেশের মানুষ যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের এই উন্নতি দেখে বিশ্ববাসী আজকে অবাক হয়।'
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আদর্শের রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'আদর্শহীন রাজনীতি রাজনীতি নয়, এই রাজনীতি করে মানুষকে কিছু দেওয়া যায় না।'
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ সকল ছাত্র-ছাত্রীকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকাশক্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকাশক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। কেউ ধরা পড়লে তাকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলে দিয়েছি এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে।'
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের মূলনীতি হচ্ছে শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতি। তাই শিক্ষার মশাল জ্বেলে শান্তির বাণী নিয়ে প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে হবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণে দেরি হওয়ায় মন খারাপ না করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, অবশ্যই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ হবে, আমরা মহাকাশ জয় করব, ইনশা-আল্লাহ।
তিনি বলেন, উৎক্ষেপণের মাত্র ৪৬ সেকেন্ড আগে উৎক্ষেপণ বন্ধ হয়ে গেল। এটি খুব সেনসেটিভ বিষয়।‘আমি জয়কে বলেছিলাম, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের আগ মুহূর্তে আমাকে ফোন দিবা। ও উৎক্ষেপণের ১৫ মিনিট আগে আমাকে ফোন দেয়। কাউন্ট-ডাউন শুরু হয়। কিন্তু ঠিক ৪৬ সেকেন্ড আগে বন্ধ হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, আপনারা জানেন, যারা বিজ্ঞানের ছাত্র তারা জানবেন, যান্ত্রিক ত্রুটি হতেই পারে। এভাবে অনেক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আকাশে যদি মেঘ জমে থাকে স্যাটেলাইট যাবে না, বায়ু পরিবর্তন থাকলেও যাবে না। আজ আবারও উৎক্ষেপণের চেষ্টা করা হবে। আগের ঠিক একই সময়ে এটি উৎক্ষেপণ করা হবে। নির্ধারিত সময়ের পরে আরও দুই ঘণ্টা সময় আমরা পাব। আজও যদি সম্ভব না হয় তাহলে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আমাদের আরও একটি স্লট দেবে’- বলেও জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগের অবদান আছে। বাঙালির অর্জনের সঙ্গে ছাত্রলীগ ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। শেখ হাসিনা বলেন, দুর্ভাগ্য কিছু কিছু ছাত্রলীগ নেতা বিপথে চলে গেছে। এখনও দুই-একজন বিএনপিতে পাওয়া যাবে। এরা বেঈমান, মুনাফেক, আদর্শহীন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগের অবদান আছে। বাঙালির অর্জনের সঙ্গে ছাত্রলীগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাঙালির ইতিহাস ছাত্রলীগের ইতিহাস। প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্রলীগের অবদান রয়েছে। দেশের সব আন্দোলন সংগ্রামে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ছাত্রলীগও ছিল। আন্দোলন গড়ে তোলায় আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সেই সংগ্রামেও ছাত্রলীগ ছিল। ‘৬৯ এর গণঅভ্যত্থানে ছাত্রলীগের ভূমিকা আছে। আমিও ছাত্রলীগের একজন কর্মী ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধেও এ সংগঠনের অবদান আছে। আমাদের বহু সহকর্মী প্রাণ দিয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সেই সংগ্রামেও ছাত্রলীগ ছিল। ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রলীগের ভূমিকা আছে। আমিও ছাত্রলীগের একজন কর্মী ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধেও এ সংগঠনের অবদান আছে। আমাদের বহু সহকর্মী প্রাণ দিয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে।’
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ‘যে সময় দেশের ক্ষমতায় খুনিরা, সেই অবস্থায় আমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলাম। ‘৭৫-এর পর বাংলার যে গৌরব হারিয়ে গিয়েছিল, সেই গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া, দেশকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে দেশে ফেরত আসি।’
তিনি বলেন, ‘জাতির পিতার হত্যার প্রতিবাদ এবং গণতন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার সংগ্রামও করেছিল ছাত্রলীগ। স্বৈরতন্ত্রকে হটিয়ে বাংলাদেশের মানুষের হাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রামে ছাত্রলীগের অবদান রয়েছে।’
 শেখ হাসিনা বলেন, ‘আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আমরা ক্ষমতায় আসি। ক্ষমতায় এসে যারা ছাত্রসমাজের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল, মেধাবীদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছিল, যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেশন জট তৈরি করেছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। ২০০১ সালে চক্রান্ত করে আমাদের ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপির ক্ষমতায় এসে সারাদেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অস্ত্রপাচার, অর্থপাচারসহ যত ধরনের অপকর্ম করা হয় তারা তা করেছে। তাদের অত্যাচারে দেশে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আমি ক্ষমতায় না থাকার পরও আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ প্রতিবাদ করেছিল। এমন কোনও দিন নেই যে তারা কারাগারের সামনে যেতেন না, কোর্টের সামনে যেতেন না।
শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি চাই ছাত্রলীগের আগামী দিনের নেতৃত্ব আসুক সমঝোতার মাধ্যমে। কারণ যোগ্যরাই বরাবর বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। আগামী দিনেও সেটিই হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্রলীগের আগামী দিনের নেতা নির্বাচন করতে একে অপরকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। কারণ ত্যাগের মানসিকতা না থাকলে কোনো কিছু অর্জন করা যায় না। তাই আমি চাই, সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি আসুক।’
ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বয়সের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে বয়সের একটি বিষয় আছে। বর্তমান কমিটির নেতাদের যখন নির্বাচিত করা হয়েছিলো তখন বয়সসীমা ছিলো ২৭ বছর। এবার যেহেতু মেয়াদের নয় মাস পর সম্মেলন হচ্ছে, তাই আমি চাই না কেউ বঞ্চিত হোক। এবারের কমিটি হবে ২৮ বছরের মধ্যে।’
ছাত্রলীগকে ফার্স্ট টাইম (প্রথমবার) ভোটারদের সংগঠিত করার দায়িত্ব নিতে বলেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে ফার্স্ট টাইম তরুণ ভোটাররা হবে আওয়ামী লীগের বিজয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। সেই ফার্স্ট টাইম ভোটারদের সংগঠিত করার কাজ পড়বে ছাত্রলীগের উপর। এই দায়িত্ব তোমাদের পালন করতে হবে।
ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে গেছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে ছাত্রলীগ পাশে ছিলো। মাদক ও জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করার জন্য কাজ করেছি। পাশাপাশি ছাত্রলীগের কর্মীদের সচেতন করার জন্য চেষ্টা করেছি।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে সভাপতি বলেন, রাজনীতি শেখার পাঠশালা হচ্ছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তিনটি কাজ করতে হবে- বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা। এই তিনটি কাজ করলে আপনারা পরাজিত হবেন না। ভালো ছাত্র হয়ে ছাত্রলীগ পরিচালনা করতে হবে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন নিজের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর শোকের মাস আসে। আমরা সেই শোক দিবস সঠিকভাবে পালন করি। আমরা ৯ মাসের মধ্যে ১০৯টি শাখার কমিটি গঠন করি। আমরা প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলায় কমিটি গঠন করেছি। নতুন করে ৭০২টি পৌরসভার কমিটি দেই।
এর আগে ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৬ ও ২৭ জুলাই। সম্মেলনে প্রত্যক্ষ ভোটে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসেন সাইফুর রহমান সোহাগ ও এস এম জাকির হোসাইন। দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পর প্রধানমন্ত্রীসহ দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের নির্দেশে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পরবর্তী জাতীয় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেই দফায় সম্মেলন স্থগিত করা হয়। পরে ৩১ মার্চ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রমজানের আগেই ছাত্রলীগের সম্মেলন করার নির্দেশ দিলে ১১ ও ১২ মে তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ