ঢাকা, শনিবার 12 May 2018, ২৯ বৈশাখ ১৪২৫, ২৫ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সিন্ডিকেটের কবলে পেয়াঁজ-চিনি রমযানের আগেই বাজারে অস্থিরতা

মিয়া হোসেন : মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি ও মেয়রের আশ্বাস কিছুই কাজে আসছে না। একের পর এক বেড়েই যাচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজার। পবিত্র রমযান মাস শুরু হওয়ার আগেই কয়েকটি পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করছে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যার প্রভাব পড়ছে গোটা দেশে। ইতোমধ্যে পেয়াঁজ ও চিনির বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। যার ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে পেয়াঁজ ও চিনির মূল্য কেজি প্রতি বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। অবিলম্বে এ অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রমযানের শুরুতে আরো কয়েকটি পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর চিনির দামও বেড়েছে কেজি প্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা। বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা কেজি। আর আমদানি করা পেয়াঁজ বিক্রি হচ্ছে ৩৮-৪০ টাকা। চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৪-৬৬ টাকা। আদা-রসুনের দামও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও বেশকিছু সবজির দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমযানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে পেঁয়াজ ও চিনির দাম বাড়ছে একরকম পাল্লা দিয়েই। আর মাত্র চার-পাঁচ দিন পরই শুরু হবে পবিত্র রমযান। এখনই এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফার আশায় সিন্ডিকেট করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। অথচ বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, রমযানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না। যারা অসাধুভাবে সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধি করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। আর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে দ্রব্যমূল্য না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন। তবু তারা সে প্রতিশ্রুতি মানছেন না। রমযান শুরুর আগেই বাড়ছে দ্রব্যমূল্য।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সেগুনবাগিচার কাঁচা বাজারে দেখা গেছে সিটি কর্পোরেশন একটি মূল্য তালিকা টানিয়ে রেখেছে। সেখানে চক দিয়ে জিনিসপত্রের মূল্য লেখা। কিন্তু টানানো এ মূল্যে কিছুই বিক্রি হচ্ছে না মার্কেটটিতে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিটি কর্পোরেশনের লোকেরা প্রতিদিনই এ মূল্য লিখে রাখছে। কিন্তু এ মূল্যে জিনিসপত্র কিনেও আনা যায় না।
বাজার করতে আসা সাব্বির নামে এক চাকরিজীবি জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি সম্পর্কে বলেন, আগের তুলনায় পেঁয়াজের দাম অনেকটাই বেড়েছে। শুধু পেঁয়াজ নয়, পাশাপাশি রসুন ও আদাসহ সবকিছুরই বাজারই চড়া। ব্যবসায়ী এবং মজুতদারদের কারসাজিতে প্রতিবছর রমযান মাসের আগে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। সে কারণে আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতাদের বিপাকে পড়তে হয়। এটা যেন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।
মানিক নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, রমযান মাসকে সামনে রেখে জনগণ কেনাকাটা বেশি করছে। কিন্তু রমযান শুরু হয়ে যাওয়ার পর এই চাহিদাটা অনেকাংশে কমে আসবে। ফলে দামও কমে যাবে পেঁয়াজসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের। তবে রমযান মাসের ১৫ দিন পর পণ্যগুলোর দাম আবারও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও বিভিন্ন মহলের চাঁদাবাজির কারণে পেঁয়াজ, চিনিসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় চিনি, পেঁয়াজ, তেল, খেঁজুর, ছোলা, ডালসহ রমযানের প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা সবাই বলছেন এবার মজুদ পর্যাপ্ত আছে। দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই। তাহলে হঠাৎ করে চিনি, পেঁয়াজের দাম কেন বাড়ছে। এর মূল কারণ সিন্ডিকেট।
তিনি বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম কঙ্কট তৈরি করে বাজারকে অস্থির করছে। অন্যদিকে যানজট, জাহাজজট, চাঁদাবাজিসহ নানা অব্যবস্থপনার কারণে এ দাম বাড়ছে।
পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় গোলাম রহমান বলেন, গত সপ্তাহে সাত-৯দিন সরকারি ছুটি ছিল। এতে পেঁয়াজ আমদানি কম হয়েছে এমন অজুহাতে দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু চিনির দাম বাড়াচ্ছে পুরাই সিন্ডিকেট করে। একটি পণ্য ১ থেকে ২ টাকা বাড়তে পারে। কিন্তু এক দু’দিনের ব্যবধানে ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়া অস্বাভাবিক। এখন সরকারে উচিত বাজার মনিটনিং বাড়ানো। একই সঙ্গে যারা অনৈতিকভাবে দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।
দোকান মালিক সমিতির চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসা এখন ব্যবসায়ীরা করছে না। এটা রাজনৈতিক দলের কাছে চলে গেছে। সব ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির পরিমাণ বেড়ে গেছে। আগে একটি দোকানের জন্য ভাড়া দিতে হতো ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ টাকা। এখন ৩০ হাজার টাকার বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপরে। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্যাকেটজাত পণ্য সরাসরি মিল থেকে খুচরা বিক্রতাদের কাছে যায়। ফলে এর দাম কম বাড়ে। কিন্তু খোলা পণ্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে তিন চার হাত বদল হয় ফলে এর দাম বেশি বাড়ে।
বাজারে দেখা গেছে, রমযানে প্রতিদিন ইফতারে ব্যবহৃত ছোলার দামও বাড়তে শুরু করেছে। ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি। তবে ভোজ্য তেল ও ডালের দাম আগের মতোই বহাল রয়েছে। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, ১ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা আর ৫ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৪৮৫ থেকে ৫৩০ টাকা। মশুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, মুগ ডাল ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি। আদা ১০০ থেকে ১২০ টাকা ও রসুন ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে বৃদ্ধি পাওয়া চালের দাম এখনো কমেনি। তবে নতুন করে দাম বাড়েনি। গুটি স্বর্ণা ৪২ টাকা, মিনিকেট মানভেদে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, নাজিরশাইল মানভেদে ৫০ থেকে ৭৪ টাকা এবং পোলাও চাল ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে সবজির বাজারও চড়া। বেশকিছু সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দু’সপ্তাহ ধরেই বিভিন্ন সবজির দাম বাড়ছে। আর রমযানকে সামনে রেখে বেগুন ও শশার দাম বাড়ছে একটু বেশি। বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা, কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, পেঁপে ৬০ টাকা, পটল ৫০ টাকা, ঢেরস ৪০ টাকা, করলা ৫০ টাকা, কাকরোল ৮০ টাকা, দেশি টমেটো ৫০ টাকা, গাজর ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শসা ৫০ টাকা, খিরা ৯০ টাকা, আলু ২০ টাকা, প্রতি পিস বাঁধাকপি ৪০ টাকা, প্রতি পিস ফুলকপি ৪৫ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, পেঁয়াজ পাতা এক আঁটি ৪০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া এক আঁটি লাল শাক ২০ থেকে ২৫ টাকা ও ধনিয়াপাতা ১৪০ টাকা কেজি, কাচ কলা হালি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৬০ টাকা। এছাড়া কচু ৪০ টাকা, লেবু হালি ৩০ টাকা।
এদিকে অপরিবর্তিত রয়েছে গরু, খাসি, এবং মুরগির গোশতের দাম। প্রতি কেজি গরুর গোশত ৫০০ টাকা, খাসির গোশত ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৪০ টাকা, দেশি মুরগি ২৪০ টাকা কেজি, লেয়ার মুরগি প্রতি পিস আকারভেদে ১৫০ থেকে ২২০ টাকা ও পাকিস্তানি মুরগি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে মাছের দাম স্বাভাবিক রয়েছে। ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। চিংড়ি মাছ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়। রুই ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, কাতল ২২০ থেকে ৩০০ টাকা, চাষ করা শিং মাছ ২২০ টাকা ৩৫০ টাকা কেজি, তেলাপিয়া ১৪০-১৬০ টাকা, কই ১৬০-১৮০ টাকা, পাঙাশ ১৩০-১৫০ টাকা, পাবদা ৫০০-৫৫০ টাকা, এবং মাগুর মাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ