ঢাকা, শনিবার 12 May 2018, ২৯ বৈশাখ ১৪২৫, ২৫ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ দেখার অপেক্ষায় পাকিস্তানীরা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, পাকিস্তান থেকে ফিরে : [ কিস্তি-৪ ]
মিসেস উজমা আর্জমান্দ। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সাংবাদিক প্রতিনিধি দলকে ইসলামাবাদে তিনিই রিসিভ করেন। দায়িত্বের প্রতি খুবই সজাগ। প্রতিদিন সকাল ৮টার আগেই হোটেলে এসে উপস্থিত হতেন। তার ফোনেই অনেকের ঘুম ভাঙ্গতো। মিডিয়া টিমের সব কিছুর তদারকি তিনিই করতেন। তার স্বামীও তথ্যমন্ত্রণালয়ে চাকরী করেন। দু’জনই একইবছর তথ্য ক্যাডারে যোগ দেন। সদা হাস্যজ্জ্বল এই কর্মকর্তার এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে সংসার। আলাপচারিতায় তিনি জানান, চাকরীর বাইরে যেটুকু সময় পান তার পুরোটাই তিনি পরিবারকে দিয়ে থাকেন। বাসায় সময় কাটে টিভি দেখে। তবে যদি ক্রিকেট ম্যাচ থাকে তাহলে তো কথাই নেই। স্বামী ও দুই সন্তানও ক্রিকেট পাগল। তার পছন্দের ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদি। এছাড়া পাকিস্তানের খেলা থাকলে সেদিন অন্যকোন চ্যানেল তেমন দেখা হয়না। ইসলামাবাদের হোটেল ডি পাপায়ে’র লবিতে কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন তার মধ্যে খুব আক্ষেপ, অনেকদিন নিজ দেশে ইন্টারন্যাশানাল ম্যাচ দেখছেন না। যদিও বিভিন্ন দেশের তারকা ক্রিকেটাররা পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) এখন নিয়মিত খেলছেন। তিনি বলেন, সব পাকিস্তানী মুখিয়ে আছেন নিজ দেশে আবারো আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার জন্য। তিনি বলেন, মাঝখানে জিম্বাবুয়ে এসেছে, বিশ্ব একাদশ খেলে গেছে। কিন্তু আমরা চাই, পাকিস্তানে নিয়মিত আগের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হোক। সেই সাথে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার ম্যাচগুলোও দেখতে চান তিনি।
প্রবাদ আছে, পাকিস্তানী বাবা-মায়েরা নাকি স্কুল জীবনের প্রথম দিনেই সন্তানের হাতে বইয়ের পাশাপাশি ব্যাট-বল তুলে দেন। এশিয়ায় ক্রিকেটপাগল জাতির মধ্যে দেশটির অবস্থান ওপরের দিকে। শিশু-বৃদ্ধ, ধনি-গরিব সবাই ক্রিকেট বলতে অজ্ঞান। তাইতো ক্রিকেট বলতেই আনন্দে মাতোয়ারা সবাই। অথচ উগ্রপন্থীদের বন্দুকের গুলি আর গ্রেনেডের আঘাতে যেন পাকিস্তান থেকেই উড়ে গেলে ক্রিকেট। যে খেলাটি পুরো দেশকে এক সুতোয় আবদ্ধ করে ফেলতে পারতো। যে খেলাটি যুদ্ধ পর্যন্ত থামিয়ে দিতে পেরেছিল, সেটিই কি না পরাজিত হলো উগ্র জঙ্গিদের সন্ত্রাসের সামনে। সেই ঘটনার পর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড চেষ্টা করেছে, নিজেদের দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরাতে। মাঝে বাংলাদেশসহ অনেকগুলো দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তারা। কিন্তু সে আহ্বানে সাড়া মেলেনি। আফগানিস্তান আর জিম্বাবুয়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থেকে সংক্ষিপ্ত সফর করে এসেছিল পাকিস্তানে। যদিও সে সফরগুলোকে আইসিসি অনুমোদন দেয়নি। ম্যাচ অফিসিয়াল পাঠায়নি। তবে ২০১৭ সালের শেষের দিকে বিশ্বএকাদশ পাকিস্তানে খেলে এসেছে। যেটির আয়োজক ছিল আইসিসি।
গেল মার্চে দেশটিতে হয়ে গেল এই সময়েই সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেট লীগ পিএসএল। সেখানে বিশ্বের নামিদামি তারকা খেলোয়াড়রা অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের তামিম ইকবাল, এনামুল হক বিজয়রা খেলেছেন সেখানে। দেশটিতে যখন পিএসএল চলছিল তখন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মিডিয়া টিমের সদস্যরা পাকিস্তান সফররত। সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্রিকেট পাকিস্তানের জনগণের কাছে খুব জনপ্রিয়। পিসিএল চলাকালীন সময়ে বিমাবন্দর, হোটেল, দোকানসহ বিপনী বিতানগুলোর টিভি পর্দায় শুধুই খেলা দেখাচ্ছিল। শহরে বড় পর্দায়ও দেখানো হচ্ছে ক্রিকেট ম্যাচগুলো। এছাড়া মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হতো। বড়বড় শহরে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ক্রিকেটারদের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড, পোস্টার লাগানো ছিল। পাকিস্তানের তারকা খেলোয়াড়দের ছবিও দেখা গেছে।  
আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত না হলেও গেল বছর বিশ্ব একাদশের একটি ম্যাচ দিয়ে দীর্ঘ একদশক পর পাকিস্তানে শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসর। ঘরের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এমন আয়োজনে আনন্দে মাতোয়ারা ছিল গোটা পাকিস্তান। ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কান টিম বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে সেই পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ হয়ে আছে। নিজ দেশে ক্রিকেট ফেরাতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জয়ের পর অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ আকুতি জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক সাফল্যের পর অনুষ্ঠিত হলো সেই আয়োজন। ১২ সেপ্টম্বর ঐতিহাসিক গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে বসেছিল বিশ্ব তারার মেলা। পাকিস্তান ও বিশ্ব একাদশের মধ্যে তিনটি টি২০ সিরিজ অনুষ্ঠিত হলো। দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ। তাই দেশটির চারিদিকে ছিল সাজ সাজ রব, পাকিস্তান জুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। উচ্ছ্বসিত জাতীয় ক্রিকেটার, সাবেক গ্রেট থেকে সাধারণ সবাই।
পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনে কতটা অপেক্ষায় আছে সেটি দেশটির তিন ভার্সনের অধিনায়ক সরফরাজের কথাতেই ফুটে উঠেছে। বিশ্ব একাদশের খেলা আগে বলেছিলেন, ‘আমার তো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিজয়ের চেয়েও বেশি আনন্দ হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় আট বছর ঘরের মাটিতে খেলতে পারিনি। পাকিস্তানের অগণিত ভক্ত বঞ্চিত হয়েছে। আমার এই দলের অনেকে এখন পর্যন্ত তার জন্মভূমিতে ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে নামতে পারেনি। ওরা সবাই রোমাঞ্চিত। বিশ্ব একাদশ পাঠানোয় প্রথমেই আইসিসিকে (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল) ধন্যবাদ। পিসিবিরও (পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড) চেষ্টার কমতি ছিল না। লাহোরে স্মরণীয় কয়েকটা দিনের অপেক্ষায় আছি।’ পিসিবি প্রধান নাজাম শেঠী বলেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস এই সিরিজ পাকিস্তানে বিদেশী দলগুলোর দরজা খুলে দেবে। আইসিসির চীফ এক্সিকিউটিভ ডেভিড রিচার্ডসনও আশাবাদী, ‘আমরা প্রতিটি দেশেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন করতে চাই। এটা পিসিবি ও পাকিস্তান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল। তাদের জন্য একধাপ এগিয়ে যাওয়া। আশা করছি সবকিছু সুন্দর ভাবে শেষ হবে।’
বিশ্ব একাদশের খেলার পর প্রায় এক বছর অতিবাহিত হতে যাচ্ছে। এখনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরু হয়নি দেশটিতে। তবে ফ্রাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট পিএসএল (পাকিস্তান সুপার লিগ) দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত পিএসএলের ফাইনালটি নানান বাধা আর হুমকির মুখেও করাচিতে আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছিল পাকিস্তান। এতে দেশের বাইরের অনেক তারকা খেলোয়াড় অংশ নিয়েছিলেন।
আলাপচারিতায় জানা যায়, পাকিস্তান তাদের দেশে ক্রিকেট আয়োজনে সব ধরণের নিরাপত্তার আয়োজন করছে। তাদের আয়োজনের যে কমতি নেই সেটি দেশটিতে খেলতে আসরা ক্রিকেটার ফাফ ডু প্লেসিসের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, সত্যি সত্যি যে নিরাপত্তার এত কঠোরতা থাকতে পারে সেটা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি বিশ্ব একাদশের অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিস। লাহোরে যখন বিমান থেকে নামলেন তিনি এবং তার দল- সবাই দেখলো, একজন প্রেসিডেন্টের জন্য যে কঠোর নিরাপত্তা নেয়া হয়, সেটাই নেয়া হয়েছে তাদের জন্য। বিমান বন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত রাস্তায় কোনো জনমানব দেখতে পাননি বিশ্ব একাদশের ক্রিকেটাররা। পুরো রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মানুষের চলাচলও সীমিত করে দেয়া হয়েছে। এত কঠোর নিরাপত্তা দেখে বিশ্ব একাদশের অধিনায়ক বলেন, ‘এত কঠোর নিরাপত্তা দেখে মনে হচ্ছে আমরা একটা সিনেমার জগতে বসবাস করছি।’ এই সিরিজটিকে বলা হয়েছিল পাকিস্তানের একটি মুক্তির বার্তা। এ কারণে পাকিস্তান এই সিরিজের নাম দিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ।
এদিকে আস্তে আস্তে করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। তারই অংশ হিসেবে এবার টেস্ট খেলুড়ে দেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দেশটিতে সফর করেছে। এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের টি২০তে অতিথিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন জেসন মোহাম্মদ। তবু খুশি পাকিস্তান অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। যদিও এই সফরেও ক্রিস গেইল ছিলনা, ছিলেন না ওয়ানডে ও টেস্ট অধিনায়ক জেসন হোল্ডার। এমনকি টি২০ অধিনায়ক কার্লোস ব্রেথওয়েটও আসেননি। অনেকটা উৎসবের আমেজে পূর্ণশক্তির দল নিয়ে নিজেদের সামর্থের জানান দিয়েছে পাকিস্তান। আসলে তাদের কাছে ছিল এটা একটা বড় উৎসব। ২০১৫ সালে লাহোরে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজ আয়োজনের পর এটি ছিল দেশটিতে দ্বিতীয় বড় কোন আয়োজন। ২০০৯ সালে লাহোরের ওই ঘটনার পর করাচীতে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। তৃতীয় সারির দল পেয়েও তাই খুশি পাকিস্তান। এসবই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। ২০২০ সালের মধ্যেই তারা নিজেদের মাটিতে টেস্ট খেলুড়ে বড় কোন দেশের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ (টেস্ট, ওয়ানডে, টি২০) আয়োজন করতে চায়।
২০১১ সালে শ্রীলঙ্কা দল পাকিস্তান সফরে রাজি হয়েছিল। তবে করাচীতে নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে জঙ্গী হামলার পর সে আশা ভেস্তে যায়। এরপর ২০১৪ সালে সফরের জন্য আয়ারল্যান্ডকে সম্মত করেছিল পিসিবি। তবে করাচী বিমানবন্দরে জঙ্গী হামলার পর আইরিশরা সফর বাতিল করে। এছাড়া প্রাথমিকভাবে রাজি হওয়ার পরও নিরাপত্তার কারণে ২০১২ সালে দুইবার পাকিস্তান সফরে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। তবে ২০০৯ সালের পর প্রথম আন্তর্জাতিক দল হিসেবে দুর্বল জিম্বাবুইয়ে সফরে আসলে ২০১৫ সালে সেই লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামেই পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত বাজে। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেন।
ক্রিকেট প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র সচিব তাহমিনা জানজুয়া বলেন, পাকিস্তানে ক্রিকেট সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়। সেটি যদি হয় আন্তর্জাতিক অথবা পাক-ভারত ম্যাচ। তাহলে তো কথাই নেই। তিনি বলেন, পাকিস্তান সুপার লীগে অনেক বেদিশেী তারকা ক্রিকেটার খেলছেন। এগুলো ভবিষ্যতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে। ডিইএমপি,র ডিজি আবদুল ওয়াহিদ খান নিজেকে ক্রিকেটের বড় ভক্ত মন্তব্য করে বলেন, আগামী বছর পিএসএলের আরও বেশি ম্যাচ আমরা পাকিস্তানে আয়োজন করব এবং সে সময় শীর্ষ ক্রিকেটীয় দেশগুলোর প্রায় সব আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় খেলতে আসবে। এরপর ২০২০ সালে তাদের দেশের বোর্ডগুলোকে পাকিস্তানে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে জাতীয় দল পাঠাতে রাজি করাতে পারব বলে আশাবাদী আমরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ