ঢাকা, রোববার 13 May 2018, ৩০ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে আলোচনায় বসুন -মির্জা ফখরুল

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডক্টর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মালিকানা দুই ব্যক্তির কাছে চলে গেছে
স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মহাকাশে উৎক্ষেপিত বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মালিকানা দুই ব্যক্তির কাছে চলে গেছে। সেখান থেকে আপনাদেরকে কিনে নিতে হবে। তিনি বলেন, এটা আগে ঘুরুক, আবর্তন করুক পৃথিবী, পরিক্রমা করুক, তখন দেখা যাবে। আলোচনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের অন্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফখরুল। এসময় তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে তার সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে আয়োজিত আলোচনা সভায় ফখরুল এসব কথা বলেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার মূল পরামর্শদাতা ভারত। তাদের বাইরে এক রূপ ভেতরে আরেক রূপ। তাই তাদের ভেতরের রূপটা দেখতে হবে।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা-নিঃশর্ত মুক্তি এবং ডা. শামীউল আলম সুহানের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতিবাদ সভাটির আয়োজন করে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।
ভারতের সঙ্গে পাঁচটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের খবর গণমাধ্যমে দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই চুক্তি করার অধিকারটা প্রধানমন্ত্রীকে কে দিয়েছে? কারণ এই পার্লামেন্ট তো নির্বাচিত নয়। জনগণের পক্ষে যত চুক্তি করেন আপনি, সেই চুক্তি তো জনগণের চুক্তি নয়। ফখরুল বলেন, সব চুক্তি আমরা দেখব। যেমন মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করেছে, একটা লোকও (রোহিঙ্গা) যেতে পারেনি। যেটা আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই তিস্তার পানি চুক্তি এখন পর্যন্ত হয়নি।
 বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিন। তার সঙ্গে আলোচনা করুন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন দিন। তাহলেই দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইবে, মানুষ স্বস্তি ফিরে পাবে।
তিনি বলেন, জনগণই এই দেশের মালিক। সেই মালিকদের যে চাহিদা, আশা আকাঙক্ষা তা পূরণ করার ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় এই দেশের মানুষ আপনাদের ক্ষমা করবে না। আলোচনা করুন, দেশনেত্রীকে মুক্তি দিন, তার সঙ্গে কথা বলুন এবং নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করুন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গুন্ডাদের ঠেকানোর জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করুন, যাতে মানুষ নির্ভয়ে নিরাপদে ভোট দিতে যেতে পারে এবং সঠিক রায়টা পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থাগুলো করুন। তাহলে অবশ্যই এই দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইবে, মানুষ স্বস্তি ফিরে পাবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ওটা আগে ঘুরুক, পৃথিবী পরিক্রম করুক, তারপর দেখা যাবে। যাই হোক এটারও মালিকানা চলে গেছে জানেন তো। স্যাটেলাইটের মালিকানাও চলে গেছে দুজন লোকের হাতে এবং সেখান থেকে আপনাকেও কিনে নিতে হবে। চুক্তি হচ্ছে অনেক। এই চুক্তি করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? যে চুক্তিই করেন না কেন আপনি, সেই চুক্তি তো জনগণের চুক্তি নয়। আমি এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু বলব না। কারণ এ বিষয়টি ভালো করে দেখিনি। আগে দেখি চুক্তিগুলো কী হয়েছে?
রোহিঙ্গার বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করেছে। কিন্তু চুক্তি করেও এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরৎ পাঠানো গেছে? কেউ তার নিজ দেশে যেতে পারে নাই। যেটা সবচেয়ে আমাদের বেশি দরকার তিস্তা চুক্তি সেটিও হয় নাই।
এ সময় বিএনপি নেতা বলেন, জাতীয় ঐক্য ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। গোটা দেশের মানুষকে এক করতে হবে। এক করে এই ভয়াবহ দানবকে সরাতে আমাদের কাজ করতে হবে। অবশ্যই অন্যন্য রাজনৈতিক দল, ধর্ম, বর্ণ সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এই দানবকে সরাতে হবে। মালয়েশিয়ায়ও দেখা গেল এই ধরনের ঐক্য না হলে এটা খুব ডিফিকাল্ট। সেজন্য আমাদের জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করার মধ্য দিয়েই এদের পরাজিত করতে হবে।
মালয়েশিয়ার কাছে থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে বলে মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, ‘মালয়েশিয়ার কাছ থেকে আমাদের অনেক শিক্ষা নেওয়ার আছে। আনোয়ার ইব্রাহীম, মাহাথির মোহাম্মাদের ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন। তিনিই তাঁর দল থেকে বের করে জেলে দেন বিভিন্ন রকম মিথ্যা অপবাদ, মামলা দিয়ে। সেই আনোয়ার ইব্রাহীমের পার্টি, আজকে সবচেয়ে বড় পার্টিতে পরিণত হয়েছে। মাহাথির মোহাম্মাদকে তারাই নিয়ে এসেছে, যে দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে, যখন দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, বলেছে আপনিই এসে আমাদের নেতৃত্ব দিন। মাহাথির মেনে নিয়েছেন তাঁর শেষ বয়সে এসে। একমত হয়ে নির্বাচন করেছেন, সর্বোচ্চ ভোটে জয়লাভ করেছেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, তিনি নির্বাচিত হয়েই দুটি কথা বলেছেন, এক আমি প্রতিহিংসার রাজনীতি করব না, দুই আমি আনোয়ার ইব্রাহীমকে অতি দ্রুত মুক্তি দিয়ে তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেব। বলেছেন, তাঁকে যে সাজা দিয়েছিলাম, আমি ভুল করেছি। ১১ বছর সাজা দিয়েছিলেন, এখনো জেলে আছেন। আজকে সেখান থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার মূল পরামর্শদাতা ভারত এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। আমাদেরকে তাই বাইরের জিনিসটা না দেখে ভেতরটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠাচ্ছে। তারা চাচ্ছে সুষ্ঠু ভোট। এই সমস্যাটা আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছে। তাই তারা বিএনপিকে পেছনে ফেলে দিতে খালেদা জিয়াকে বিচারের নামে কারাগারে আটকিয়ে রেখে দিয়েছে। টাকা চুরি হয়নি কিন্তু অভিযোগ করেছে। মূল মামলাটি ছিল দুদকের ৫/২ ধারায় সেটা বিন্দুমাত্র প্রমাণিত হয়নি। তাই মামলাকে পাল্টিয়ে নেয়া এবং তার অপব্যবহার করা হচ্ছে আর যদি ক্ষমতার অপব্যবহারে খালেদার জেল হয় তাহলে হাসিনার কত হাজার বছর জেল হবে এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি।
 ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, গতবছর শেখ হাসিনা ভারতে গিয়েছিলেন মোদির সাথে দেখা করতে সেখানে আমলাতান্ত্রিক স্বাক্ষর করেছেন। এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে ৭৫ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক সংস্থা বলেছে এটা বাংলাদেশের জন্য মোটেও ঠিক হয়নি। এটা তাদের কথা, বিএনপির কথা নয়।
আলোচনা সভায় উপস্থিত বিএনপি মহাসচিবের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জনগণ বলছে আপনারা ক্ষমতায় আসলে এই যে বিনা টেন্ডারে মাল দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করা রামপালের বিচার করবেন। এটা আমরা পরিষ্কার ভাবে জানতে চাই আজকে জনগণ আপনাদেরকে ক্ষমতায় আনতে চায় তবে এটাও জানতে চায় আপনারা ক্ষমতায় আসলে আমাদের জন্য কি করবেন, সাধারণ মানুষের কি লাভ হবে সেটাও পরিষ্কারভাবে আপনাদের বলা উচিত।
 ডা. জাফরুল্লাাহ চৌধুরী আরও বলেন, আপনি বলেছেন কত লক্ষ হাজার কোটি টাকা এই সরকার লুটপাট করেছে এগুলো কিভাবে উদ্ধার করবেন কি শাস্তি দিবেন সেটাও আপনার বলা উচিৎ ছিল। দেশের বিশিষ্ট এই নাগরিক বলেন, বিচার বিভাগের বিবেক ঘুমিয়ে আছে। বিচারপতিগণ আপনারা মনে করবেন না চোখ বুজে মরিচ ঢুকালে কেউ দেখতে পাবে না। বাংলাদেশের জনগণ এত বোকা না। ভারতের পরামর্শে আপনারা যা করছেন তার প্রত্যেকটা আপনাদের ঐশী বাণী হতে লেখা হয়ে যাচ্ছে সুতরাং আপনারাও বিচারের জন্য তৈরি হোন।
 তিনি বলেন, সরকার যে ভয় পেয়েছে বর্তমানের কিছু ঘটনা দেখলে তা বোঝা যায়। তা হলো গত শুক্রবার ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের বদলে সিলেকশনে নেতা বানাবেন এবং যাদেরকে বানাবেন তাদের পরিবারের সবাইকে আওয়ামী লীগ করতে হবে কোন আত্মীয়স্বজন এদিক-ওদিক হতে পারবে না। আর একটি হচ্ছে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলনের কোনো সম্পৃক্ততা থাকা যাবে না। এগুলো ত্রিশের দশকে হিটলার দিয়েছিলেন। তিনি কি টিকে আছেন? হিটলার যে অন্যায় করেছিল ঠিক একইভাবে ওনারা অন্যায় করে ওনাদের বিদায়ের ঘণ্টা বাজাচ্ছেন।
 বিএনপির উদ্দেশে বিশিষ্ট এই নাগরিক বলেন, আগামী সরকার গঠন করার জন্য সব বিরোধীদলকে সংগঠিত করে আন্দোলন করতে হবে এবং সরকার গঠন করার পর যাতে কেউ আইন হাতে নিতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে এবং বেসরকারি দলের কারো ওপর কোনোকিছু চাপিয়ে দেয়া যাবে না এবং যতজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে সরকারি তহবিল থেকে।
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর সঞ্চালনায় এবং বিএসএমএমইউর সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল কুদ্দুস, গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ