ঢাকা, রোববার 13 May 2018, ৩০ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিভিন্নভাবে দেশের অর্থ পাচার হচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার : ব্যাংকিং খাতে এখনো পুরোপুরি সুশাসন আসেনি উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. আখতারুজ্জামান বলেন, বিভিন্নভাবে দেশের অর্থ পাচার হচ্ছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপয় নেই। তবে এর সাথে উন্নয়নের সম্পৃক্ততা আছে বলে আমরা কিছুটা রেহাই পাই। অসততা বিদেশে অর্থপাচারের অন্যতম কারণ। এ জন্য ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এসোসিয়েশন অব ব্যাংক অফিসার্স বাংলাদেশ আয়োজিত ‘অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ: স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে ব্যাংকারদের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন কালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এসোসিয়েশনের সভাপতি মুহা. মহিউদ্দিন হাওলাদারের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন, কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল, যুগ্ম-সচিব রেজাউল ইসলাম, সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম গোলাম মোস্তফা, অগ্রণী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাসার সেরনিয়াবাদ প্রমুখ।
ড. আখতারুজ্জামান বলেন, তিন দশক আগের তুলনায় এখন আমদানির পরিমাণ ৬ থেকে ৭ গুণ বেড়েছে। তিন দশক আগে দেশে খাদ্যশস্য আমদানি হতো ৯ মিলিয়ন ডলারের মতো। বর্তমানে তা বেড়ে ৩৮-৩৯ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। দেশের মানুষের পুষ্টিহীনতা দূর করতেই আমদানির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।
তবে এ আমদানির আড়ালে কিছু অর্থ যে পাচার হচ্ছে না তা নয়। এ বিষয়ে বিশ্বের ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা বিদেশি সংস্থাগুলো আমাদের প্রশ্নবানে জর্জরিত করেন। আমরাও তাদের প্রশ্নের জবাব কৌশলে দিতে বাধ্য হই। কেননা তারাও বিষয়টি জানে। আমরা তাদের বুঝাই যে আমাদের দেশের মানুষের পুষ্টিহীনতা দূর করতে বিদেশ থেকে অনেক খাদ্য আমদানি করতে হয়। এছাড়া ভাগ্যলক্ষীর উৎস রেডিমেড গার্মেন্টস খাতের (আরএমজি) কাঁচামাল, মেশিনারিজ আমদানি করতে হয়। কেননা তৈরি পোশাক খাত আমাদের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার অন্যতম একটি খাত। এ কারণেই ব্যাংকের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা এলসি খুলে মালামাল আমদানি করে। এ সব বুঝিয়ে আমরা তাদের প্রশ্ন থেকে রেহাই পাই। 
কিন্তু যারা এলসি খোলেন তারা প্রয়োজনের তুলনায় এলসির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে খোলেন সে ক্ষেত্রে অর্থপাচারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এ জন্য ব্যাংক তথা আমদানির সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যে পণের জন্য এলসি খোলা তা সঠিকভাবে দেশে পৌঁছাচ্ছে কি-না। এ কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে পারলে অর্থ পাচার কমে আসবে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে ঋণ খেলাপি একটি বড় বাধা। ঋণ খেলাপি হওয়ার আট দশটি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় যে কারণ তা হলো মনিটরিং ব্যবস্থার দূর্বলতা। সঠিক পলিসি গ্রহণ করে মনিটরিং ব্যবস্থা বাড়িয়ে দিলে খেলাপি ঋণ কমে আসবে।
তবে খেলাপি হলেও দেশের অর্থনীতিতে ও বেকারত্ব দূরিকরণে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা যথেষ্ট। এ খাতে এখন ব্যাংকার আড়াই লাখ। যা প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে শিক্ষিত যুবকদের এখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অতএব খেলাপি ঋণের কিছুটা ভর্তুকী হিসাবেও ধরা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এতো কিছুর পরেও ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে ঋণ দিতে হবে যাচাই করে। এখনো ৮৫ শতাংশ ব্যাংকিং অটোমেশনের বাইরে রয়েছে। এ গুলোকে অটোমেশনের আওতায় আনতে পারলে ব্যাংকিং খাতে বিপ্লব ঘটবে।
ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, দশটি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু। তারপর ৪৭ বছরে অনেক দূর আমরা পাড়ি দিয়েছি। আমাদের ব্যাংকিং অনেক ম্যাচিউরড (বিকশিত) হয়েছে। একটা সময় দেশের অর্থনীতির এমন দুরবস্থা হয়েছিল-বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট-ঋণপত্র) রিফিউজড (প্রত্যাখাত) হত। সেখান থেকে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। জিএসপিতে (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা) কিছু সমস্যা হবে। ২০০৮-০৯ সালে আমাদের রফতানি ছিল ১৪ বিলিয়ন মর্কিন ডলার, এখন ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কাজেই এই যে শক্তি, এভাবে যদি আমরা চলতে থাকি, তবে সামান্য অসুবিধা এখানে-সেখানে হলেও আমাদের তেমন ক্ষতি হবে না। আমরা ৬ বিলিয়ন ডলারের বস্ত্র আমদানি করি, এই বস্ত্রের ওপর আরএমজি (তৈরি পোশাক শিল্প) নির্ভর করে। আমি যদি দেশের ভেতর বড় বড় কাপড়ের কল স্থাপন করতে পারি, তাদের নানান সুবিধা দিতে হবে। আমরা দেশেই কাপড় তৈরি করব। আমাদের বড় ধরনের অর্থ সাশ্রয় হবে।
মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, বর্তমানে ব্যাংকে যে তারল্য সংকট রয়েছে আমানতের সুদ হার বাড়িয়ে দিলে এ তারল্য সংকট আর থাকবে না। উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কাজে লাগায় না। ফলে তারা সুদ দিতে না পারায় খেলাপি হয়ে যায়। অথচ তারা যদি এ টাকা ব্যবহার করতো তা হলো আরও বেশি সুদ ধরলেও তারা দিতে পারতো। ঋণ দিলে সে টাকা ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট পাঁচজন ব্যাংকারকে ন্যাশনাল ব্যাংকার্স এ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ