ঢাকা, রোববার 13 May 2018, ৩০ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অপরাধে জড়িয়ে পড়া কাম্য নয়

সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে যে, দেশের পেশাদার অপরাধীদের মতোই বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের নানা অপরাধমূলক কর্মকা- নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এতে বলা হয়েছে, অপরাধের ধরন অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না তাদের অপরাধ। অপর এক প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, পুলিশের সাজার ৯৪ শতাংশই লঘু। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই জমা পড়ছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী কেলেংকারি, অবৈধ মাদকের কারবার, গ্রেফতার বাণিজ্য, নারী কেলেংকারী, গ্রেফতার বাণিজ্য, ঘুষ, নির্যাতন, প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ। এসব অভিযোগের তদন্ত করে পুলিশ সদর দপ্তর। কনস্টেবল থেকে এএসআই ও এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সাজা প্রদান করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার। পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সাজা প্রদান করে পুলিশ মহাপরিদর্শক। সহকারী পুলিশ সুপার থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাজার বিষয়টি দেখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়াও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করতে পারে পুলিশ সদর দফতর। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হচ্ছে যে, পুলিশ যখন কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তখন শীর্ষ কর্মকর্তারা কিভাবে কোন যুক্তিতে বলে থাকেন (অপরাধী পুলিশ) ব্যক্তির অপরাধের দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না। অথচ অভিযুক্ত পুলিশ ‘ব্যক্তির’ অপরাধের তদন্ত কাজ পুলিশ বাহিনীই করে থাকে। বরাবরই অভিযোগ রয়েছে, সেই তদন্ত কাজ পুলিশের হাতে থাকার ফলে নানাভাবে চাপ দিয়ে, নানা ফাঁকফোঁকর আবিষ্কার করে শেষ পর্যন্ত তদন্ত পুলিশের পক্ষেই নিয়ে যাওয়া হয়।
কেতাবেই লিপিবদ্ধ আছে ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন’ পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলেও বাংলাদেশে এর ব্যত্যয় ঘটছে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে যেসব গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ করছে তার সাথে পুলিশের একশ্রেণির অতি উৎসাহী অসাধু সদস্যদের সম্পৃক্ততা কোনভাবেই কী এড়িয়ে যাওয়া যাবে? এর বাইরেও সারাদেশে সামাজিক অপরাধের সাথেও পুলিশের একশ্রেণির অপরাধপ্রবণ সদস্যদের সম্পৃক্ততা প্রায় সংবাদপত্রসমূহে প্রকাশিত হচ্ছে। চাঁদা না পেয়ে ক্রসফায়ারে দেয়ার অভিযোগে কিছুদিন আগে কু্িষ্টয়ার আদালত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। চাঁদা না দেয়ায় দাবি করা টাকা আদায়ে অস্বীকার করায় ব্যবসায়ীদের গুরুতর অভিযোগে যুক্ত করার ভয় দেখিয়ে ঘুষ গ্রহণের সচিত্র প্রতিবেদনও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পাড়া-মহল্লা, বাসাবাড়িতে বসবাসকারী যুবকদের আচমকা ধরে গাড়িতে উঠিয়ে থানায় ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে রাস্তায় ছেড়ে দেয়ার দৃশ্য প্রতিদিনকার। রাজপথ থেকে তুলে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। পরকীয়ার কারণে স্বামী হত্যার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকা মহানগরীর সোনারগাঁও হোটেল মোড়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা ছিনতাই করে নেয়ার সময় এক কনস্টেবলকে হাতেনাতে ধরা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। ছিনতাইয়ে জড়িত থাকায় আরেক কনস্টেবলকে উত্তরা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৬ বছরে ৭৬ হাজার ৪২৬ জন পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন অপরাধে বিভিন্ন ধরনের সাজা দেয়া হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এতেও পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। পুলিশের এক শ্রেণির ওই গুরুতর অপরাধপ্রবণতা নিয়ে জাতীয় দৈনিকসমূহে ব্যাপক লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও অনেক পুলিশ সদস্যকে বেপরোয়া অপরাধ প্রবণতা থেকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, আওয়ামী একদলীয় অটো সরকার বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বানচালে নেতা-কর্মীদের দমন-পীড়নে পুলিশকে আওয়ামী ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী হিসেবে ব্যবহারের ফলে পুলিশকে যে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, এক শ্রেণির পুলিশ তারই অপব্যবহার করছে। অন্যদিকে পুলিশ আওয়ামীকরণের বিষয়টিকেও দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণের কারণ হিসেবে মনে করেন আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা নতুন কিছু নয়। তবে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানÑ পুলিশ প্রশাসনে যে ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে নাগরিক হিসেবে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, প্রকৃত অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত অথবা ন্যায়বিচার না হওয়া বা হতে না পারার কারণেই অপরাধ দমনে কার্যকর উন্নতি হচ্ছে না। পুলিশের অপরাধ পুলিশই তদন্ত করার প্রেক্ষিতে এক ধরনের দুর্বলতা থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইতোপূর্বে পুলিশের অপরাধ তদন্তের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথা আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মহল থেকে বলা হয়েছে। আলোচ্য প্রেক্ষিতে বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি, পুলিশের এ অপরাধপ্রবণতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া বড় বেশি প্রয়োজন। পুলিশের মধ্যে চেইন অফ কমান্ড বজায় রেখে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। পুলিশ রাষ্ট্রের সংবিধান লংঘন করে প্রচলিত বিধিবদ্ধ আইন হাতে তুলে নিয়ে অপরাধ করলে তাকে অপরাধী হিসেবে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোন ধরনের ছাড় দেখানো উচিৎ হবে না। প্রকৃত কথা হচ্ছে, যারা জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানকল্পে অপরাধ দমন করবেন, তাদেরই অপরাধে জড়িয়ে পড়া আদৌ কাম্য হতে পারে কী?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ