ঢাকা, রোববার 13 May 2018, ৩০ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদের পর রাজপথে নামার চিন্তা-ভাবনা করছে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল

দেশের বুকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়  একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। সেই সব ঘটনার বলি হচ্ছে বিরোধী দল। এই সব ঘটনা ঠেকাবার জন্য যে ধরনের পাল্টা রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার সেগুলি করা হচ্ছে না। আমি সক্রিয় রাজনীতি করি না। কিন্তু যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন থেকেই অবিভক্ত পাকিস্তানের এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। খুব কাঁচা বয়স থেকেই কবিতা এবং রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখে যাচ্ছি। শুরুতে সেগুলোতে পরিপক্কতার দারুণ অভাব ছিল। আজও যে পরিপক্কতা অর্জন করেছি তেমন দাবি করবো না। তবে  কোন ঘটনার পর কি পরিণতি ঘটতে পারে সে সম্পর্কে যেসব ধারণা করেছি  তার অনেকগুলোই সত্য হয়েছে। এখন  যে সব ঘটনা ঘটছে সেসব ঘটনার পরিণতি সম্পর্কেও আমি একটি আইডিয়া করেছি। সেই আইডিয়াগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে ভয়াবহ রকম টালবাহানা চলছে। আগের ইতিহাসগুলো আপনারা জানেন। সবশেষে আপিল বিভাগ দেড় মাসের সময় নিলেন এবং গত ৮ই মে এ সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে বলে জানান। ৮ই মে চেম্বার জজ শুনানি ঠিকই করলেন, কিন্তু কোনো আদেশ না দিয়ে ফুল বেঞ্চে পাঠালেন। ৯ই মে ফুল বেঞ্চ শুনানি করলেন , কিন্তু আদেশ দিলেন না। বললেন যে, ১৫ই মে আদেশ দেওয়া হবে। জামিন সম্পর্কে এই শম্বুক গতির ফলে বেগম জিয়া ইতোমধ্যেই ৩ মাসের ওপর জেল খাটলেন। তার কপালে আরো কতদিন কারাভোগ রয়েছে সেটি একমাত্র আল্লাহ পাক জানেন।
আমার স্থির বিশ্বাস, ইলেকশনের আগে বেগম জিয়াকে জেল থেকে ছাড়া হবে না।  ইলেকশনের পরেও তার কারামুক্ত হওয়ার কোনই সম্ভাবনা নাই। আমার এই কথাগুলো জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ভাই বোনদের মনে আঘাত দিতে পারে।  কিন্তু আমার ধারণা এবং বিশ্বাস নিয়ে আপনাদের সাথে  ধোঁকাবাজি করতে পারবো না।
    আমার ধারণা, ১৫ই মে বেগম জিয়াকে আপিল বিভাগ বেল দেবেন। কিন্তু বেগম জিয়া তারপরেও জেল থেকে বের হতে পারবেন না।  কারণ এর মধ্যে অন্যান্য মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ঐসব গ্রেফতারের খবর (অনেক সংবাদ পত্রই Shown Arrest বলে) তখন  একটার পর একটা তার কারা মুক্তির পথে  বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং এত তাড়াতাড়ি তিনি বেল পাচ্ছেন না।
এই ফাঁকে দুদক ও সরকার পক্ষ  তার কারাদন্ডের  আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগে দ্রুত উত্থাপন করবেন। অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে রকেটের গতিতে আপিলের শুনানি হবে। প্রথমে হাইকোর্ট এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।   সরকার প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে নি¤œ আদালতের রায় কনফার্মড হবে। এই কৌশল সফল হলে সরকার পক্ষ এক ঢিলে অনেকগুলে পাখি মারবে।
 (১).  খালেদা জিয়ার কারামুক্তির পথ ৫ বছরের জন্য রুদ্ধ হবে।
 (২).  তারেক জিয়া ১০ বছরের জন্য লন্ডন থেকে দেশে ফিরতে পারবেন না।
 (৩).  আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম জিয়া এবং তারেক রহমান অংশ গ্রহণ করতে পারবেন না।
 (৪).  ৫ বছর পর বেগম জিয়ার বয়স হবে ৭৮। ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করা তার জন্য কঠিন হবে।
 (৫).  অথচ, দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ  বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে। তারপরেও জনমতের তোয়াক্কা না করে তারা আগামী ৫ বছরের জন্য পুনরায় ক্ষমতায় আসবেন।এভাবে  রাশিয়া ও চীনের প্রেসিডেন্ট  পুতিন  ও শি জিন পিং এর মতো ৪র্থ মেয়াদে  শেখ  হাসিনা ক্ষমতায় যাবেন।
এই পটভূমিকায় বিএনপির সামনে একটি মাত্রই বিকল্প আছে। আর সেটি হলো Do or die. অর্থাৎ , হয় কিছু করো নাহলে রাজনৈতিক মৃত্যু বরণ করো।  এক্ষেত্রে বিএনপি তথা বিরোধী দল সমূহ  কি করতে পারে? আমার মতে বাংলাদেশের জনগণ ছাড়া বিরোধী দল সমূহের আর কোন বন্ধু নাই এবং আর কোন শক্তিও নাই।  আমার কাছে অনেক দলিল আছে, অনেক ডকুমেন্ট আছে। আছে অনেক উদাহরণ।  আমার সেই সব ডকুমেন্ট ও অভিজ্ঞতা বলে যে, রাজনীতিতে কেউ কাউকে দস্তরখান বিছিয়ে মনোরম তশতরীতে ক্ষমতার শিরনি উপহার দেয়না। সুতরাং আমেরিকা তথা পশ্চিমা  বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো লাভ নাই। ভারতের মুখপানে চেয়ে থাকার কোনই অর্থ হয়না। কারণ এইতো সেদিন যখন আওয়ামী লীগের একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিনিধি দল দিল্লিতে যায় তখন মিসেস সোনিয়া গান্ধী স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, আওয়ামী লীগের সাথে কংগ্রেসের সম্পর্ক অনেক পুরাতন এবং ঐতিহাসিক। তারপর আওয়ামী লীগের অন্য একটি প্রতিনিধি দলের কাছে বিজেপির অন্যতম সেক্রেটারি রাম মাধব  ঘোষণা করেন যে, বিজেপি আওয়ামী লীগের সাথে আছে।
॥দুই॥
আর একটি কথা। বিদেশী শক্তিসমূহ দুর্বল বা নরমের সাথে থাকে না। তারা শক্তের ভক্ত। বিএনপি তথা বিরোধী দল বিগত ৯ বছর ধরে এমন কোনো শক্তি দেখাতে পারেনি যার ফলে তাদেরকে সরকারের প্রতি হুমকি হিসাবে ধরা যায়।
শেখ মুজিব কিন্তু ধীরে ধীরে সাংগঠনিক ভাবে বিপুল শক্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি যখন কারাগারে তখন  শ্লোগান উঠে ছিল, জেলের তালা ভাঙবো/ শেখ মুজিবকে আনবো। আগর তলা মামলার কি পরিণতি হয়েছিল, কোন প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব মুক্তি পেয়েছিলেন, সেগুলো জানার আবশ্যকাতা আছে।  শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগ যদি তাদের ডাকে লক্ষ জনতাকে রাজপথে নামাতে না পারতেন ,যদি সেদিন কারফিউ ভঙ্গ না হতো তাহলে আগরতলা ট্রাইব্যুনালের সভাপতি জাস্টিস এস.এ রহমানকে ঐভাবে বিদায় নিতে হতো না। ৯০ সালে জনতা যদি রাস্তায় না নামতেন তাহলে এরশাদকে তিন দিনের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়তে হতো না।
এখানে একটি প্লাস পয়েন্ট হলো এই যে বাংলাদেশের জনগণের ৮৫ শতাংশ এখন সরকারের বিপক্ষে। এই নেতিবাচক সমর্থন এখন বিএনপি তথা বিরোধী দলের পক্ষে রয়েছে। জনতার  সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুলে বিএনপি যদি তাকে রাস্তায় নামাতে পারে তাহলে  অন্যেরা তো দুরের কথা, প্রতিবেশি পাশের দেশও সরকারের পতন ঠেকাতে পারবেনা। 
৩/৪ দিন আগে  বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্পর্কে বিএনিপর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন একটি উক্তি করেছেন যেটি রাজনীতি সচেতন মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কারণ তিনি রাজনীতিতে  একজন সৎ, সজ্জন এবং মৃদু ভাষী ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত। তিনি সাধারণত কড়া কথা বলেন না এবং কঠোর ভাষায়  রাজনৈতিক প্রতি পক্ষ অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা সরকারকে হুমকি ধামকিও দেননা।  সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পর্যন্ত  এবার বেগম জিয়ার মুক্তি সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেছেন। গত ১১ মে শুক্রবার দৈনিক যুগান্তরের অনলাইন (১-এর কলামে দেখুন)
অন্যান্য বিরোধী দল
(৮-এর কলামের পর)
সংস্করণে প্রকাশিত সংবাদ মোতাবেক মির্জা ফখরুল বলেছেন, জনতার ঐক্য সৃষ্টি করে কারাগারের শৃঙ্খল ভেঙে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে। ঐ দিন সকালে রাজধানীর নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে ‘দেশনেত্রীর রাজনীতি, সংগ্রাম ও সফলতার ৩৪ বছর’ উপলক্ষে এক আলোকচিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন শেষে তিনি এ হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা অবিলম্বে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই এবং মুক্তি দাবি করছি। আর জনতার ঐক্য সৃষ্টি করে কারাগারের শৃঙ্খল ভেঙে তাকে আমরা নিয়ে আসবো, ইনশাআল্লাহ। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আসুন আমরা সবাই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করি। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করেই এ ভয়াবহ দানব, যে আমাদের সব কিছু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে ,তাকে পরাজিত করে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত করি। এটাই হোক আমাদের লক্ষ্য। সেই কারণে আমরা আহ্বান করেছি সকল দল, মত ও নেতৃত্বকে। দেশনেত্রী যে আন্দোলন চালাচ্ছেন এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন আসুন আমরা সবাই সেই আন্দোলনে শরীক হয়ে আমাদের দেশ ও গণতন্ত্রকে মুক্ত করি। জনগণের ঐক্য সৃষ্টি করেই বর্তমান এই ভয়াবহ দু:শাসন ও পাথরকে আমরা সরাতে পারবো বলে আশা প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল।
॥তিন॥
‘কারাগারের শৃঙ্খল ভেঙ্গে’ নেতার বা নেত্রীকে মুক্ত করে আনার সাহসী উচ্চারণ এই প্রথম অনেক দিন পর শুনলাম।  জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী  দল এবং নেতারা এই ধরণের রাজনৈতিক পরিভাষা কদাচ ব্যবহার করেন। তবে আওয়ামী  লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীরা কারাগারের শৃঙ্খল ভেঙ্গে পরিভাষাটি ডাল ভাতের মতো ব্যবহার করে। “জেলের তালা ভাঙবো/অমুক নেতাকে আনবো” এই ধরণের শ্লোগান আওয়ামী লীগ অসংখ্য জনসভায় দিয়েছে, মিছিলে এই শ্লোগান উচ্চারিত হয়েছে এমনকি সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত  এলাকায় হানা দিয়ে নেতাকে মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। শুধু মাত্র প্রত্যয় ব্যক্ত হওয়ার কথা  বলবো কেন, সেই প্রত্যয়কে বাস্তবায়িত করার জন্য  বিরাট মিছিলকে কিছুদুর এগিয়ে যেতেও দেখা গেছে।
এরপর ৩/৪ দশক হয়ে গেল, এই ধরণের পরিভাষা শোনা যায়নি। কিন্তু যেদিন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি তাদের মিলনায়তনে একটি মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠান করলো এবং যেখানে ড. কামাল হোসেনকে প্রধান অতিথি করা হয়, সেখানেও  একজন বক্তা এই ধরণের বক্তব্য রাখেন। তিনি হলেন টেলিভিশিন টক শোর আলোচক মাহফুজুল্লাহ। তিনি বলেন , ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে একটি গান আছে। ঐ গানের প্রথম লাইন হলো, ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে।’ খালেদা জিয়ার কারা মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন আর গোল টেবিল বা সেমিনার করে হবে না।  সিনেমার ঐ গানের মতো খাঁচা ভাঙার বিষয়টি চিন্তা করতে হবে।
একটি বিষয় শিক্ষিত ও রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেটি হলো, শুধুমাত্র বিএনপিই নয়, অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যেও এই সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ক্ষোভ ক্রমশ পুঞ্জিভূত হচ্ছে। এখন সেটি বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। তাই দেখা যাচ্ছে যে, ইসলামী মূল্যবোধ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করেন না, কিন্তু বিরোধী দলে আছেন, তারাও এখন সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়া করছেন। ড. কামাল হোসেন আইনের মানুষ । সাধারণত আইন কানুন হিসেব করেই তিনি রাজনীতিতে কথা বলেন। তিনিও এখন সরকার এবং সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলছেন। সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তিনি বাংলাদেশের জেলা শহর গুলোতে জনসভা  অনুষ্ঠান ও বিক্ষোভ সমাবেশ করার  প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।  গত ১১ মে শুক্রবার একটি আলোচনা সভায় যুক্তফ্রন্ট নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী  বলেন, যেভাবে ব্যপক দুর্নীতি ও লুটপাট চলছে সেটি জনগণ আর বেশি দিন সহ্য করবে না। সেদিন সুদূর নয় , যেদিন আমরা সকলে গর্জে উঠবো।  আমরা আর চুপ করে থাকবো না। চুপ করে থাকবে না মান্না । চুপ করে থাকবে রব। সকলেই গর্জে উঠবে। সেদিন এই সরকারের পালাবার পথ থাকবে না।
asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ