ঢাকা, রোববার 13 May 2018, ৩০ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে রাসূল (সা.) এর ভবিষ্যদ্বাণী

ড.এ এইচ এম সোলায়মান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
এ হচ্ছে পাশ্চাত্য সমাজের কিঞ্চিত প্রতিচ্ছবি। যার মূল কারণ ধর্মহীন সমাজ, বিকৃত যৌনাচারের অবাধ সুযোগ, নারীকে পুরুষের যৌনযন্ত্র মনে করা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতি। তাই উগ্র যৌন স্বাধীনতাকামীদের কাছে WIFE হচ্ছে “Wonderful Instrument for Enjoyment.”
অর্থাৎ উপভোগের এক বিস্ময়কর যন্ত্র বিশেষ। আজ ওদের প্রাসাদ থেকেও গৃহ নেই। বুদ্ধি থেকেও বিবেক নেই। মানুষের আকৃতি থেকেও মনুষ্যত্ব নেই। তাই কুকুর ঘোড়ার সাথে যৌন মিলনে ও আপত্তি নেই। এই বিকৃত ও অবাধ যৌনাচারের সংস্কৃতিকে জাতিসংঘ সমগ্র বিশ্বের উপর চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
আধুনিক বিশ্বের আরেকটির বাস্তবতা হচ্ছে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হিংসা বিদ্বেষ, মারামারি, খুন-খারাবি ও অরাজকতা বেড়ে গেছে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) এর ভবিষ্যদ্বাণী পাওয়া যায়, যেমন আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন-“ক্বিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে আমল কমে যাবে এবং লোভ বেড়ে যাবে, ফিৎনা প্রকাশ পাবে ও হার্জ বেড়ে যাবে। তাঁরা প্রশ্ন করলেন হার্জ কি হে আল্লাহর রাসূল (সা.) জবাবে তিনি বলেন এটা হলো প্রাণী হত্যা, যুদ্ধ বিগ্রহ।” (এটা হলো খুন-খারাবি, গুম)
অপর ভবিষ্যদ্বাণী বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন-“যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম যতদিন পর্যন্ত সার্বজনীন গণহত্যা ও রক্তপাত নেমে না আসবে ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর শেষ দিন আসবে না। হত্যাকারী কি কারণে খুন করেছে তা সে বুঝবে না। যাকে খুন করা হলো সেও বুঝবে না যে কি কারণে তাকে খুন করা হলো।”
গত ১৪শ বছরকে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, বিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ অঞ্চল বিশেষে সীমায়িত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে গত দুটি মহাযুদ্ধে সারাপৃথিবী সম্পৃক্ত হয়েছে। ফলে গোটা বিশ্বের রাজনীতি অর্থব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো প্রভাবিত হয়েছে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে দুই কোটি লোক প্রাণ হারায়। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে এ সংখ্যা পাঁচ কোটি ছাড়িয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, ধবংসাত্মক ও হিং¯্র তান্ডব হিসেবে পরিগণিত। আধুনিক সামরিক প্রকৌশল যুদ্ধের ধবংসক্ষমতা অপরিমেয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে। আণবিক, জৈবিক ও রাসায়নিক বলে আখ্যায়িত গণবিধ্বংসী অস্ত্র-সস্ত্রই এ জন্য দায়ী। অবস্থা দৃষ্টে ধারণা করা হয় যে, পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবদাহে প্রবেশ করবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সংঘাত সমূহ ঠান্ডা লড়াই, কোরিয়ার যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আরব ইসরাঈল বিরোধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক, ইরান, মিশর, লিবিয়া, লেবানন ও ইয়ামেনে গৃহযুদ্ধ সমূহে লাখো বনী আদমের জীবনলীলা অবসান হয়েছে।
আজ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইরাক আজ একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। যুদ্ধোত্তর জনগণ সেখানে মানবেতর-জীবন-যাপন করছে। শিশুরা পুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুযাত্রী। লিবিয়া, মিশর, ফিলিস্তিন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কাশ্মীর সহ মুসলিম বিশ্বে আমেরিকা ও ভারত সর্বদা যুদ্ধ বাঁধিয়ে রেখেছে। তাছাড়া গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সারা পৃথিবীতে হিংসা-বিদ্বেষ, খুন, লুন্ঠন, মারামারি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, নিকটতম-দূরতম এককথায় সকল পর্যায়ে মারামারি খুন খারাবী, সুখ ইত্যাদি জঘন্য মহড়া চলছে। পরিশেষে রাসূল (সা.) এর যে ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে আলোচ্য বিষয়ের সমাপ্তি টানতে চাই তা হলো মুহাম্মদ ইবনে সিনান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন-“যখন ক্ষমতা অযোগ্য লোকের হাতে চলে আসবে, তখন শেষ সময় বা কেয়ামতের অপেক্ষা কর।”
অন্য হাদীসে আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন- “যখন আমার উম্মতের মাঝে পনের ধরনের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হবে তখন তাদের ওপর প্রাকৃতিক বিপর্যয় নাযিল হবে। রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! এ বৈশিষ্ট্যসমূহ কি? তিনি বলেন, যখন গনীমতের সম্পদকে রাষ্টীয়করণ করা হবে, রাষ্ট্রীয় আমানতকে গনীমত মনে করা হবে, যাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে, ব্যক্তিরা তাদের স্ত্রীদের আনুগত্য করতে শুরু করবে, ব্যক্তি তার মায়ের অবাধ্য হবে, বন্ধুর সাথে সদাচরণ করবে এবং পিতামাতার সাথে অসদাচরণ করবে, মসজিদে উচ্চ স্বরে কথা বলা হবে, সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোকেরা নেতা হবে, ব্যক্তিকে তার অপকর্মের ভয়ে সম্মান করা হবে, মদ্য পান করা হবে ও রেশমী পোশাক পরিধান করা হবে, গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র গ্রহণ করা হবে এবং শেষের লোকেরা প্রথম যুগের লোকদেরকে অভিশম্পাত করবে, তখন তারা যেন গরম বাতাস প্রবাহিত হওয়া বা ভূমি ধস সংঘটিত হওয়া অথবা চেহারায় বিকৃতি সংঘটিত হওয়ার অপেক্ষা করে।”
আলোচ্য ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রমাণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে গুলিকে পৃথিবীবাসীরা সুনামী, সিডব, আইলা, কেটরিনা, সড়ক দুর্ঘটনা ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছাস, হারিকেন টর্নেডো ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করে। মুসলমানরা আল্লাহর দ্বীন যথাযথভাবে পালন না করার কারণে তাদের বিভিন্ন দেশ ও দলে বিভক্ত হওয়াও এ ভবিষ্যদ্বাণীর জলন্ত প্রমাণ। তাদের মধ্যে ধর্মহীনতা পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে অমুসলিম দেশের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ও এর বাস্তব উদাহরণ।
আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে আমাদের করণীয় : আধুনিক বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ৯/১১ ঘটনার পর বিশ্ব মুসলিমের উপর কঠিন আঘাত এসেছে। আফগানিস্তানের উপর প্রলয়ংকারী ঝড় বইয়ে গেছে। ইরাকের উপর ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা আঘাত হেনেছে। সভ্যতার সূতিকাগার বিশ্বের অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ ইরাকে মানবতার নিষ্ঠুর পরিহাস সংঘটিত হয়েছে। পাশ্চাত্যের আশীর্বাদ পুষ্ট একনায়ক সাদ্দামকে শায়েস্তা করতে গিয়ে নিরীহ জনতার উপর নেমে এসেছে অন্ধকার বর্বরতা। পাশ্চাত্যের ইন্ধনে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়ে ও সাদ্দামের পরিত্রাণ মিলেনি। অতঃপর পাশ্চাত্য বন্ধুদের ইশারায় কুয়েতে আগ্রাসন চালিয়ে ইরাক আরেকটি ভুল করলো। এ সুযোগে পাশ্চাত্য কুয়েত ও আরব দেশসমূহ রক্ষার ইজারাদারী নিয়ে উপসাগরীয় এলাকায় তাদের সৈন্য বাহিনী, যুদ্ধ জাহাজ, যুদ্ধ বিমান ও অসংখ্য মারণাস্ত্র মোতায়েন করে এবং ইরাকে আগ্রাসন চালায়। উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যতম ইরাক আজ ভূতুড়ে জনপদে পরিণত হয়েছে। সেখানকার তেল-গ্যাস লুন্ঠিত হলো। অসংখ্য নিরীহ মানুষের  উপর বর্বরোচিত নির্যাতন হলো। মা-বোনদের ইজ্জত নষ্ট হলো। এ সবই করেছে সভ্যতার দাবীদার পাশ্চাত্য বিশ্ব।
পাশ্চাত্য বিশ্ব কখন ও মুসলমানদের বন্ধু নয়। তাদের দুধকলায় পুষ্ট ইসরাঈলের স্বার্থে তারা যেকোন ধ্বংস বর্বরতা চালাতে কুন্ঠাবোধ করে না। ৯/১১ ঘটনায় যেন সমস্ত দায়দায়িত্ব লাদেনের উপর চাপিয়ে দিয়ে আফগানিস্তানকে মাটিতে মিশিয়ে দিলো। অথচ আজ পর্যন্ত এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।
লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্ণেল মুয়ামমার আল গাদ্দাফীকে তারা উত্থান ঘটিয়ে আবার হত্যা করেছে। পাকিস্তানে ও তারা চালাচ্ছে হত্যাযোগ্য।
মুসলিম বিশ্বের উদীয়মান কয়েকটি শক্তির মধ্যে মিশর, ইরাক, ইরান, পাকিস্তান ও তুরষ্ক উল্লেখযোগ্য।  এর মধ্যে ইরাক তাদের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। মিশর আজ্ঞাবহ ভূমিকায় রয়েছে। পাকিস্তান তাদের ক্রিড়নকে পরিণত হয়েছে। তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের অক্টোপাশে আবদ্ধ রয়েছে। ইরান বিশ্বের পরাশক্তি-সমূহের প্রচন্ড চাপের মুখে কোন রকম টিকে আছে। বাংলাদেশ ও টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
এই অবস্থায় মুসলিম উম্মাকে ইহুদী, নাসারার ও খপ্পর থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দুনিয়ার কোন শক্তি-মুসলমানদের বন্ধু নয় এক আল্লাহই মুসলমানদের অভিভাবক। সুতরাং মুসলিম উম্মাহকে নিজস্ব শক্তিতে বলিয়ান হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন-“তোমাদের মধ্যে থেকে যদি কেউ কোন অপরাধ দেখে তাহলে সে যেন ইহাকে হাত অর্থাৎ সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করে। যদি এতে প্রতিকূল অবস্থা থাকে তাহলে ভাষা তথা বক্তব্য বা কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়ে প্রতিহত করবে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দিয়ে পরিবর্তনের পরিকল্পনা করবে। আর ইহা হলো অতি দূর্বল ইমানের পরিচয়।”
এ ক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধক শক্তিগুলোর অবস্থার আলোকে যথোচিত সিদ্ধান্ত নেয়া বা উদ্যোগ গ্রহণ করা।
আধুনিক বিশ্বে মুসলিম অমুসলিম সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে যে বিষয়টি সেটা হলো নিরাপত্তার অভাব। সামান্য লোভ-লালসা, স্বার্থ, হিংসার কারণে একজন অন্যজনকে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করেনা। তাই নিরাপত্তার অভাবে মানুষ দিশেহারা। আপন ঘরে, শহরে-গ্রামে, রাস্তাঘাটে কোথাও নিরাপত্তা নেই, সর্বদা আতঙ্ক, আর এ আতঙ্ক কোন হিং¯্র প্রাণীর কারণে নয়। বরং মানুষ নামের সৃষ্টির সেরা প্রাণীর কারণে। পাখি আকাশে চড়ে প্রাণ রক্ষা করতে পারে, মাছ জলের গভীরে গিয়ে নিরাপত্তা লাভ করে, হরিণ ঝোঁপের মধ্যে নির্বিঘ্নে রাত্রি যাপন করে, ইদুর মাটির নিচে আনন্দে বসবাস করে, কিন্তু হায়। মানুষের নিরাপত্তা নেই। মানুষ আজ পিপীলিকার চেয়ে ও মূল্যহীন। আফসোস। যে পিতা-মাতার কোন সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সেই পিতা-মাতা তার সন্তানকে হত্যা করে। যে সন্তান পিতার-মাতার সবচেয়ে আদরের সে সন্তান তার পিতা-মাতাকে হত্যা করে। যে স্বামী তার স্ত্রীর সবচেয়ে আপনজন সে স্বামী তার স্ত্রীকে হত্যা করে। যে বন্ধু সবচেয়ে বিশ্বস্ত সে বন্ধু তার বন্ধুকে হত্যা করে। এমনকি একটা মানবসন্তানকে ঠান্ডা মাথায় টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেয় বা মাটির নিচে পুঁতে রাখে। রাস্তা থেকে একটা পশুর মত ধরে নিয়ে অজানা স্থানে আটকে রাখে অতঃপর ইচ্ছানুযায়ী খুন করে ইহা কি হায়েনার হিংস্রতা থেকে ও আরো নিষ্ঠুরতা নয়? এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন-“যে ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যার বিনিময়ে বা হত্যারযোগ্য কোন অপরাধ ছাড়া হত্যা করল সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করল।”
রাসূল (সা.) হত্যাকারীর ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন সে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার যাবতীয় রহমত থেকে নিরাশ হবে যেমন আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন- “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে হত্যার ব্যাপারে সামান্যতম সহযোগিতা করবে, কিয়ামতের দিন তার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যখানে লিখা থাকবে “আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ”।
অতএব আমাদের উচিত উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস থেকে শিক্ষা নেয়া নতুবা আমরা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
বর্তমান বিশ্বে ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে প্রচন্ড আঘাত হেনেছে পাশ্চাত্যের আকাশ সংস্কৃতি, এ সংস্কৃতি মুসলমানদের ঈমানের শক্তিকে ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত করছে। মুসলমানদের স্বাতন্ত্র, ঈমান-আকীদা ধবংস করতে এ সংস্কৃতি পারমানবিক বোমার চেয়ে ও মারাত্মক ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। নগ্নতা অশ্লীলতা ও যৌনতার সয়লাবে ভেসে যাচ্ছে মুসলিম উম্মাহর ঈমান ও আকীদা। তাই আমাদের উচিত অপসংস্কৃতির মোকাবেলায় ইসলামী সুস্থ সংস্কৃতির ব্যাপক রচনা ও প্রচার প্রসার।
আধুনিক বিশ্বের মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলোতে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে রাসূল (সা.) এর আদর্শ সমাজ ব্যবস্থার ন্যায় ইসলামী গণতন্ত্র চালু করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এক্ষেত্রে ঙওঈ-র ভূমিকা আরো মজবুত ও সময় উপযোগী হতে হবে। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক শিক্ষানীতি, বিচার ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যা হবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রচিত। আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। ইসলাম  থেকে রাজনীতি পৃথক করার পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলামী রাজনীতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মুসলিম উম্মাহর নারী সমাজ আজ অবহেলিত। কোথাও পাশ্চাত্যের নগ্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির চর্চা করে মুসলিম নারীরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাই নারী সমাজকে শিক্ষিত করে তাদের চারিত্রিক মান উন্নয়ন করে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের প্রস্তুত করতে হবে।
আজকে পাশ্চাত্য বিশ্ব হাজার হাজার কোটি ডলার পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খরচ করছে এবং তাদেরকে পাশ্চাত্যের সেবা দাসে পরিণত করছে। ভোগের সামগ্রী ত্যাগ করে এসব সাদা মানুষেরা নিভৃত গ্রামে চলে যাচ্ছে ঝড়-বৃষ্টি কাদা-মাটি উপেক্ষা করে। অথচ আল্লাহ পাক তায়ালা মুসলিম বিশ্বকেও অফুরন্ত নেয়ামত দান করেছেন। এ ভান্ডার থেকে দরিদ্র মুসলমানদের প্রদান করলে তাদের ঈমান বিক্রি করে পাশ্চাত্যের সেবাদাসে পরিণত হতো না। অতএব মুসলিম বিশ্বের সম্পদের ভান্ডার সমগ্র বিশ্ব মুসলিমের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে, এজন্য সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এ কাজে আমরা ব্যর্থ হলে ইরাকের ন্যায় আমাদের সম্পদ ও হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। তখন অসহায় দৃষ্টিতে এ করুণ পরিণতি অবলোকন করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা। আমেরিকা পরমানু শক্তিধর ভারতকে আরো পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহে চুক্তি করেছে-কিন্তু পাকিস্তানকে এ প্রযুক্তি দিতে না রাজ। ইসরাঈলের নিকট অসংখ্য পারমাণবিক বোমা রয়েছে স্বয়ং ইসরাঈল এটা স্বীকার করেছে। এ বোমা পাশ্চাত্য থেকেই আমদানী হয়েছে। পাশ্চাত্যের সহযোগিতায়ই তারা বিশাল পারমাণবিক বোমার সম্ভার মওজুদ করেছে। অথচ পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা জংগীদের হাতে চলে যেতে পারে এই ভয়ে তারা হৈচৈ শুরু করেছে। পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ একমাত্র আমেরিকাই ঘটিয়েছে মানব সভ্যতার উপর। সুতরাং তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ও শক্তিকে সর্বাগ্রে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
ইরান এখন ও পারমাণবিক বোমা তৈরী করেনি কিংবা বোমা তৈরীর কর্মসূচী গ্রহণ করেনি। জাতিসংঘ পারমাণবিক সংস্থা থেকে বিশ্ববাসীকে ইরানের ব্যাপারে আশস্ত করার পর ও আমেরিকা ও তার দোসররা ইরানে পারমাণবিক বোমা বানানোর চেষ্টা করছে এই মিথ্যা ও অপ্রমাণিত অভিযোগের অজুহাতে ইরানকে বিশ্ব থেকে একঘরে করে রাখা হয়েছে এবং ইরানে আগ্রাসন চালানোর পাঁয়তারা হচ্ছে।
সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করা এখনকার সময়ের দাবী এজন্য সর্বপ্রথম ইসরাঈলের পারমানবিক অস্ত্র ভান্ডার নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরী। মানবতার স্বার্থেই সমগ্র বিশ্ব থেকে পারমাণবিক বোমা স্থাপনা ও গণবিধ্বংসী মওজুদ অস্ত্র নির্মূল করা প্রয়োজন। নতুবা এ পৃথিবী ও সভ্যতাকে রক্ষা করা যাবে না। মানুষের মূল্য অস্ত্রধারীদের নিকট ইতরপ্রাণীর চেয়েও নগণ্য হয়ে যায়। এসব গণ বিধ্বংসী অস্ত্র ও পারমাণবিক বোমার সম্ভার পাশ্চাত্যের নিকটই সিংহভাগ মওজুদ রয়েছে। সর্বাগ্রে তাদের এসব অস্ত্র সমূহ নিয়ন্ত্রণ করে বিশ^ শান্তির জন্য চেষ্টা করতে হবে। নতুবা বিশ^ শান্তির শ্লোগান হবে প্রহসন মাত্র।
পরিশেষে বলতে চাই যে, আধুনিক বিশ্বের শাসন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে মনে হচ্ছে রাসূল-এর ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে বর্তমান বিশ্বে চলছে জুলুমতন্ত্র। যার কারণে জনগণ আজ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার। কোথাও কোন আইনের শাসন নেই। জোর যার মুলুক তার নীতিতে পৃথিবী পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইসলাম ও মুসলমানদের উপর চরম নির্যাতন চলছে। এমতাবস্থায় আল্লাহর উপর নির্ভরশীল থেকে বৈরী পরিবেশে ও দীনের উপর অটল ও অবিচল থাকার চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য। মূসা (আ.) এর ইতিহাস এ কথারই প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা’আলা ইচ্ছা করলে বৈরী পরিবেশে ও শত্রুর ঘরেই আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ লালিত-পালিত হতে পারেন। তাই জুলুমতন্ত্রকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।
বর্তমান পৃথিবীর যেসব দেশে মুসলমানেরা নির্যাতিত হচ্ছে সেসব দেশে সবসময় একই অবস্থা থাকবেনা, ইনশা আল্লাহ। রাসূল (সা.) এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সময়ের আবর্তনে যেমনি রাতের গভীরতার পর সোবহি সাদেকের আলোকরশ্মি দেখা দেয়, অনুরূপ ভাবে ইমাম মাহদীর আগমন ও ঈসা (আ.)-এর অবতরণের মধ্য দিয়ে যালিমদের অবশ্যই পতন ঘটবে। আর মযলুম মানবতা খুঁজে পাবে ন্যায় ও ইনসাফের সৌধের উপার প্রতিষ্ঠিত একটি সুন্দর সমাজ। এ জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, হিকমত ও সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। জাগতিক উপায় উপকরণের সাথে সাথে আল্লাহর উপর ভরসা করে পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় প্রচেষ্টা চালানো। সর্বদা হকের উপর অটল ও অবিচল থাকা এবং শত উস্কানি ও বাড়াবাড়ি সত্ত্বে ও সীমালঙ্ঘন না করা। যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন-“তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (মানুষদের) কল্যাণের দিকে ডাকবে, সত্য ও ন্যায়ের আদেশ দেবে, আর অসত্য ও অন্যায় কাজ থেকে (তাদের) বিরত রাখবে। (সত্যিকার অর্থে) এরাই হচ্ছে সফলকাম। আল্লাহ তায়ালা আমাদের কবুল করুন, আমিন।” (সমাপ্ত)
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অধ্যক্ষ সিলেট আইডিয়াল মাদরাসা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ