ঢাকা, রোববার 13 May 2018, ৩০ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঢাকায় জীবন বিনাশী শব্দদূষণ বেড়েই চলছে

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : শব্দদূষণ একটি মারাত্মক জাতীয় সমস্যা। শব্দ দূষণের এই মাত্রা ক্যান্সারের মতো নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত গায়ে হলুদ, বিয়ে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিশেষ দিবস, মিছিল, নির্বাচনের কাজে মাইকের ব্যবহার, ইটভাঙার মেশিনসহ যে কোনো অজুহাতে উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে হরহামেশায় চলছে শব্দ দূষণ। যারা এই দূষণের নায়ক তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বিবেক বুদ্ধি তো কাজ করছেই না, বরং বাধা দিলে উল্টো প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। নিকট অতীতে উচ্চ শব্দে মাইক বাজানোর প্রতিবাদ করতে গিয়ে ঢাকার ওয়ারিতে একজনের করূণ মৃত্যু হলেও কারো হুঁশ ফিরেনি। মনুষ্যসৃষ্ট এ বিপর্যয়ের হাত থেকে হাসপাতালের রোগী,স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও কোমলমতি শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে শব্দ দূষণ এক নীরব ঘাতকে পরিণত হলেও সংশ্লিষ্টমহলের বিবেক জাগ্রত হচ্ছে না। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে. একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে যখন আইনের সুশাসনে ব্যতয় ঘটে তখন সেখানে অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়ে যায়।
রাজধানী ঢাকা শহরের শব্দদূষণের মাত্রা পৃথিবীর অন্যান্য শহরের তুলনায় অধিক বিপজ্জনক। শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব হলেও সরকার ক্ষতিকর শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে বিরোধী মতালম্বীদের নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে অতি-উৎসাহসী ভূমিকা পালন করছে। একটি দেশের সরকার যখন শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ফন্দি করে  তখন আর দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি চিন্তা করার সুযোগ পায় না। বাহ্যিকভাবে শব্দদূষণ ক্ষতিকর মনে না হলেও  মানুষের জন্য ক্ষতিকর। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শহরের প্রায় সব এলাকাতেই শব্দদূষণের মাত্রা দুই থেকে তিনগুণ বেশি। এ অবস্থা ক্রমাগতভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মানুষ বধিরতায় আক্রান্ত হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল,রাতে ৪৫ ডেসিবেল হওয়া উচিত,বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডেসিবেল,রাতে ৫৫ ডেসিবেল,শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডেসিবেল,রাতে ৬৫ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দমাত্রা থাকা উচিত। আর হাসপাতালে সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০,রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা থাকা উচিত। বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট ঢাকা শহরের ১০টি স্থানের শব্দ পরিমাপ করে দেখেছে, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ঢাকায় নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য মাত্রার পরিমাণ প্রায় দেড় গুণ বেশি। ঢাকায়  যানবাহন ও হর্নের শব্দই শব্দদূষণের মূল কারণ। শব্দদূষণের মাত্রা যে পর্যায়ে যাচ্ছে তাতে শিল্প-কারখানা,পরিবহন এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে শব্দের সুনির্দিষ্ট তীব্রতা সম্পর্কিত স্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কিন্তু পরিবেশ সংশ্লিষ্ট বিশাল অধিদপ্তর,মন্ত্রী,জেলা অফিস,আইন সবই রয়েছে। তারপরেও শব্দদূষণের মাত্রার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিবশে সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালার আওতায় নীরব,আবাসিক,মিশ্র,বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহিৃত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদন্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে এই আইনের তেমন প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে নীরবে শব্দ সন্ত্রাস বেড়েই চলেছে। কিন্তু আইন বিদ্যমান থাকার পরও কেন শব্দদূষণের মাত্রা কমছে না এই বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা প্রয়োজন।
রাজধানীর শব্দদূষণ নিয়ে ২০১৩ সালে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। পবা জরিপ করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানের শব্দের মাত্রা নিরূপণ ও পর্যবেক্ষণ করে যে তথ্য পেয়েছিল,তাতে প্রতিটি জায়গায় শব্দের মাত্রা ছিল সহনীয় মাত্রার চেয়ে দুই গুণ বেশি। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্যমতে শব্দের সহনীয় মাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডেসিবেল। ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি নষ্ট করার জন্যই যথেষ্ট। আর ১০০ ডেসিবেল শব্দে মানুষ চিরতরে হারিয়ে ফেলতে পারে তার শ্রবণশক্তি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা ৭৮,শাহবাগে ৮২, গুলশানে ৯০,ফার্মগেটে ১০০,গাবতলীতে ১০২ ও সায়েদাবাদে ১০৬ ডেসিবেল। রাজধানীর রাস্তায় চলাফেরা করার সময় প্রায়ই দেখা যায় যে গাড়ির চালকগণ হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বিনা প্রয়োজনে হরহামেশাই হর্ন বাজানো হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বা সংরক্ষিত এলাকা যেমন স্কুল, মসজিদ, হাসপাতালের পাশের রাস্তাগুলোতে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ থাকলেও কেউ তা মানছে না। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে মেট্রোপলিটন সিটি,বিভাগীয় শহর,পৌরসভাকে নীরব, আবাসিক, মিশ্র বাণিজ্যিক এবং শিল্প এ পাঁচ এলাকায় ভাগ করে পৃথক মাত্রায় শব্দ ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করা হয়। এ আইনে দিনে ও রাতে নির্ধারিত সহনীয় মাত্রায় শব্দ হচ্ছে নীরব এলাকায় ৪৫ ও ৩৫, আবাসিক এলাকায় ৫০ ও ৪০,মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল। ২০০৬ সালের নবেম্বরে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন পাশ করা হলেও সরকারের অনেক মন্ত্রণালয় পরিবেশ এবং শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করছে। হর্ন বাজানো যেখানে সম্পূর্ণ নিষেধ, সেখানে অনেক গাড়ির চালক সিগনালে বা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন সময়ে অযথা হর্ন বাজাচ্ছে। অথচ এই বিষয়টি দেখার কেউ নেই।
মানুষের কষ্টের কারণ হয় এমনভাবে কোন এবাদত করার ব্যাপারে নবী করীম (সাঃ) এর স্পষ্ট নিষেধ রয়েছে। তাফসীরে মারেফুল কোরআনের অনুবাদক মুফতী শফী (র) এর সুযোগ্য পুত্র আল্লামা মুফতী তকী উসমানী তাঁর ‘ইসলাম ও আমাদের  জীবন’ গ্রন্থে ‘মাইকের অপব্যবহার’শিরোনামে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘‘কারো সম্পত্তি আত্মসাত করা বা কাউকে দৈহিক কষ্ট দেওয়াই শুধু জুলুম নয়,বরং আরবী ভাষায় ‘জুলুমের সংজ্ঞা এই দেওয়া হয়েছে যে,কোনো জিনিস কে অনুপযুক্ত স্থানে ব্যবহার করাই জুলুম। আর যে ব্যবহার দ্বারা অন্যে কষ্ট পায় শরীয়তের বিধানে তা কবীরা গোনাহ। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক কবীরা গোনাহ এত বহুল প্রচলিত যে,এখন তা ’গোনাহ হওয়ার অনুভুতিও আর অবশিষ্ট নেই। কষ্ট দেওয়ার এরূপ অত্যন্ত কষ্টদায়ক একটি পন্থা হল মাইকের অপব্যবহার। নিখাদ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে মাইক বাজিয়ে লোকজনকে শুনতে বাধ্য করা শরীয়তে কোনক্রমেই জায়েয নাই। মাইকযোগে আজানের শব্দ দূরে পৌছানো তো যথাযথ,কিন্তু মসজিদে যে ওয়াজ, বক্তৃতা, যিকির বা তেলাওয়াত মাইকে করা হয় তার শব্দ অনেক দূরে পৌছানো জায়েজ নাই। মাইকের এমন অন্যায় ব্যবহার দাওয়াত ও তাব লীগের মূলনীতির পরিপন্থীই শুধু নয়,বরং এর দ্বারা বিরুপ ফলাফল ও প্রকাশ পেয়ে থাকে। (সূত্র ঃ মাইকের অপব্যবহার, ইসলাম ও আমাদের জীবন ১ম খন্ড, মাকতাবা ই আশরাফিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা) আজকাল সর্বত্র শব্দ দূষণের ক্ষতিকর দিকগুলো আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ,আলসার, মস্তিকের রোগ, কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস, বদমেজাজ বা খিটখিটে মেজাজ, ক্রোধ প্রবণতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, রক্তনালীর সংকোচন এবং হার্টের সমস্যার প্রকট বাড়ছে। যানবাহনের হর্ন ও ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়াও বিভিন্ন নির্মাণকাজের শব্দ, মেশিনে ইট ও পাথর ভাঙার শব্দ, বিল্ডিং ভাঙার শব্দ,কলকারখানা নির্গত শব্দ,গ্রিলের দোকানে হাতুড়ি পেটার শব্দ,জেনারেটের শব্দ,লাউড স্পিকারের শব্দ,অডিও ক্যাসেটের দোকানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর শব্দও নাগরিক জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে,শব্দ দূষণ যেকোন বয়সী মানুষের জন্য অত্যান্ত ক্ষতিকর। তবে কোমলমতি শিশু, ট্রাফিক পুলিশ,রিক্সাচালক,রাস্তার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা শব্দ দূষণের কারণে অধিক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আমেরিকান একাডেমী অব নিউরোলজীর তথ্যমতে যারা প্রতিদিন উচ্চশব্দের মুখোমুখি হয় তাদের ৪২ শতাংশ মানুষ মাইগ্রেনে ভোগেন। অন্যদিকে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় বলা হয় উচ্চশব্দে কাজ করে অভ্যস্ত মানুষেরা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন এবং এদের ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়া, গ্রেটব্রিটেন, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানী, ফ্রান্সসহ বিশ্বের প্রতিটি উন্নত দেশে শব্দদূষণ প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকলেও বাংলাদেশে তার ছিটেফোটাও প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্বাস্থ্য সাময়িকী দ্য ল্যানসেট নিকট অতীতে পরিবেশদূষণ জনিত মৃত্যু নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে,বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর পরিবেশদূষণের কারণে ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর মিছিলে থাকা শীর্ষ ১০টি দেশে হলো বাংলাদেশ, সোমালিয়া, চাদ, নাইজার, ভারত,নেপাল, সাউথ সুদান, ইরিত্রিয়া, মাদাগাস্কার এবং পাকিস্তান। শব্দ দূষণের মারাত্মক ক্ষতিকর ঘাতক থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করার প্রয়াসে সরকারকে এখনই উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ