ঢাকা, সোমবার 14 May 2018, ৩১ বৈশাখ ১৪২৫, ২৭ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে উত্তর মেরুর সামরিকায়ন

পরাশক্তিগুলো উত্তর মেরুতে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে

১৩ মে, রয়টার্স : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রচণ্ডতায় উত্তর মেরুতে যখন বরফ গলার গতি বাড়ছে, তখন সেখানে লোভাতুর চোখ পড়েছে পরাশক্তিগুলোর। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো পর্যালোচনা করে সেখানে ক্রমাগত সামরিকায়ন বৃদ্ধির খবর মিলেছে। বরফ গলার হার বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত সেখানে জলপথে প্রবেশের সুযোগ বাড়ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তেল ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের লোভে সেখানে হানা দিচ্ছে শীর্ষ সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলো। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী মার্কিন একাধিপত্যের যুগ বাস্তবতা অতিক্রম করে উত্তর মেরুর সামরিকায়নে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে রাশিয়া। থেমে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। তারাও রাশিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। রুশ-মার্কিন সামরিকায়নের বাইরে যুক্তরাজ্য আর নরওয়ের মতো দেশগুলোও পাল্লা দিয়ে সেদিকে ছুটছে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রচণ্ডতায় বরফ গলার হারের বৃদ্ধি ক্রমেই অভিগম্যতা বাড়িয়েছে উত্তর মহাসাগর এলাকার জলপথে। বাণিজ্যিক জাহাজের আসা-যাওয়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের। মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিন তাদের এক প্রতিবেদনে উত্তর মেরুতে প্রায় ১ হাজার কোটি টন তেল ও গ্যাসের মজুত থাকার কথা জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা বলছে, ওই অঞ্চলে সৌদি আরব ও রাশিয়ার চেয়েও তেল ও গ্যাসের মজুত বেশি। সে কারণেই উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর সাম্রাজ্যিক বাসনা জোরালো হচ্ছে দিনকে দিন।উত্তর মেরু অঞ্চলের কাছে মুরমান্সক ওবলাস্টে রয়েছে রাশিয়ার নন্দার্ন ফ্লিটের ঘাঁটি। উত্তর মেরুতে স্থাপিত সামরিক ব্যবস্থাপনায় সেখানে মোতায়েনকৃত রুশ পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডুবোজাহাজ ও যুদ্ধজাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি বিশ্বকে সামরিক শক্তি জানান দেওয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও হাসিল হয়। উত্তর মেরুর সামরিকায়নে রাশিয়ার জোরদার প্রচেষ্টার নেপথ্যে একটি ঐতিহাসিক সূত্রও খুঁজে পেয়েছে টাইম ম্যাগাজিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ৯০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র বেরিং প্রণালিতে দুই দেশের সীমানা নির্ধারণে একমত হয়েছিল। সেখানে চিহ্নিত বেকার-শেভার্ডনাডজে লাইন কার্যকর করার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডোয়ার্ড শেভার্ডনাডজে, যিনি পরবর্তী সময়ে ন্যাটোপন্থী জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ওই চুক্তি মেনে নিতে পারেনি তখনকার কট্টর সোভিয়েতপন্থীরা। পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় জাতীয়তাবাদীরাও চুক্তিটির বিরোধিতা করেছিলেন। রাশিয়ার সংসদে এখনও অনুমোদন পায়নি ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি। খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ এলাকাটিতে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এখনও মরিয়া রুশরা। টাইম ম্যাগাজিনে লেখা হয়েছে, উত্তর মেরুকে নিজেদের দখলে নিতে চাওয়ার পেছনে স্নায়ুযুদ্ধকালীন ওই ইতিহাসের ভূমিকা রয়েছে। এই মেরু অধিগ্রহণ করতে সক্ষম হলে আলাস্কাকে রাশিয়ার চুকোটকা থেকে পৃথক করা বেরিং সাগরের ৪ হাজার ৭০০ কিলোমিটার এলাকায় রুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। উত্তর মেরুর রুশ সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় মূলত নন্দার্ন ফ্লিটের মাধ্যমে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু গত এপ্রিলেই জানিয়েছিলেন, উত্তর মেরুর দিকে থাকা রাশিয়ার নন্দার্ন ফ্লিটের সরঞ্জাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। মেরু সংলগ্ন ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ও নোভোসিবির্স্ক দ্বীপে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘মিলিটারি ভিলেজ’ তৈরির কাজও শেষ হয়েছে। সেখানকার দ্বীপগুলোতে থাকা রুশ ঘাঁটিগুলো ৫ লাখ বর্গমাইল এলাকায় সামরিক আধিপত্য পেতে সহায়ক হয়েছে। একমাত্র তারাই পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার জাহাজের বহর মোতায়েনে সক্ষম। বরফ কেটে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর যাওয়ার পথ তৈরি করে দিতে ওই জাহাজের কোনও বিকল্প নেই। ২০১৮ সালেই নন্দার্ন ফ্লিটে নতুন ‘ইলে মেরোমাত’ আইসব্রেকার জাহাজ যোগ করা হয়েছে।উত্তর মেরুতে ৮০ ডিগ্রি অক্ষাংশে নির্মিত রাশিয়ার ট্রিফয়েল কম্পাউন্ড ঘাঁটিটিই মেরুবিন্দুর সবচেয়ে কাছে অবস্থিত একমাত্র স্থায়ী স্থাপনা। রাশিয়া জানিয়েছে, সেখানে টানা ১৮ মাস ধরে ১৫০ জন ব্যক্তির থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। রুশ ঘাঁটি রয়েছে মেরু সংলগ্ন নোভায়া জেমলিয়ার রোগাচেভো, শেভেরনায়া জেমলিয়ার স্প্রেন্ডি দ্বীপ, র‌্যাংলার দ্বীপ ও কেপ ইশমিটে। এসব ঘাঁটিতে শতাধিক স্থাপনা তৈরির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে দেশটি। ২০১৭ সালে রাশিয়া নতুন দুটি বোরেই-২ শ্রেণির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডুবোজাহাজ যুক্ত করেছে তার নন্দার্ন ফ্লিটে।নন্দার্ন ফ্লিটের জন্য টর-এম-২ ডিটি নামের নতুন বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রস্তুত করেছে রাশিয়া, যা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও সক্রিয় থাকে। বরফ, অগভীর জলপথ ও জলাভূমিতে সচল ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সম্পর্কে রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক বলছে, টর-এম-২ ডিটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা একসঙ্গে ৪০টি লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করতে পারে এবং এর মধ্যে ৪টি স্থানে একসঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। নন্দার্ন ফ্লিটে যুক্ত হওয়ার জন্য টর-এম-২ ডিটি এখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ পুতিনের অনুমতির অপেক্ষায় আছে। এ বছরে মধ্যেই সেগুলো মোতায়েন করার কথা।রাশিয়ার নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী উত্তর মেরু অঞ্চলে নিয়মিত মহড়া দেয়। ২০১৮ সালের এপ্রিলে নরওয়ের সীমান্তের কাছে আর একটি মহড়া করেছে রাশিয়া। দেশটির আর্কটিক ব্রিগেডের হাজারখানেক সৈন্য ও শত শত সামরিক সরঞ্জামসহ চালানো ওই মহড়াটি হয়েছিল পেচেঙ্গা ও কোলা উপদ্বীপ এলাকায়।উত্তর মেরুতে রুশ সামরিকায়নের প্রাবল্যের সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে সেখানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রেরও। তাদের নন্দান কমান্ড (ইউএস নর্থকম), প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্যাসিফিক কমান্ড ও ইউরোপিয়ান কমান্ডের (ইউএস ইউকম) সবক’টিই উত্তর মেরুর সামরিকায়নে সংশ্লিষ্ট। ২০১১ সালে ‘ইউএস নর্থ কমকে’ উত্তর মেরু সংক্রান্ত সামরিক বিষয়গুলো সমন্বয় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আলাস্কায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বহর ‘আলাস্কা কমান্ডের’ অধীনে ১৬ হাজার নিয়মিত সেনা এবং ৩ হাজার ৭০০ ন্যাশনাল গার্ড ও রিজার্ভ সেনা সদস্য রয়েছে।উত্তর মেরুর কাছে অবস্থিত আলাস্কায় দুটি বিমান ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের। একটি ফেয়ার ব্যাংকে ও অন্যটি এলমেনডর্ফে। দুই ঘাঁটিতেই এফ-২২-সহ অন্যান্য বিমান রয়েছে। সেখান থেকে যথেষ্ট সংখ্যক সেনাকে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে পাঠানো সম্ভব। গ্রিনল্যান্ডের থুলে ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ রানওয়ে রয়েছে। সেখানে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র চিহ্নিত করার জন্য রাডারও স্থাপন করেছে দেশটি। তাছাড়া গ্রিনল্যান্ডের কেফলাভিক ঘাঁটিতে পি-৮-এ মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঘাঁটিটির উন্নয়নে ২০১৭ সালের বাজেটে অর্থও বরাদ্দ করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ