ঢাকা, সোমবার 14 May 2018, ৩১ বৈশাখ ১৪২৫, ২৭ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রক্তের সাগরে ভাসছে সিরিয়া

মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন : উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। কবির কবিতার এই লাইনগুলো বাংলাদেশের জনগণের জন্য যতটা না প্রযোজ্য তার চেয়ে হাজার গুণ প্রযোজ্য সিরিয়াবাসীর জন্য। কারণ তারা জালিমের বিরুদ্ধে মানবতার পক্ষে লড়াই করছে। সত্যের আলোকে দুনিয়ার বুকে উড্ডীন করতে কত মহাপুরুষের রক্তে ভিজে গেছে পৃথিবীর বুক, সৃষ্টি হয়েছে ইতিহাসের ভয়াবহ সংকট, বিপন্ন হয়েছে মানবতা তার কোন ইয়াত্তা নেই। বিশ্বব্যাপী এই সংকট তৈরি হওয়ার পেছনে মুল কারণ হল স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া। মানুষ যদি স্রষ্টার আদেশ-নিষেধগুলো ব্যক্তি,পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতো, তাহলে পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে শান্তির সুবাতাস বইতো।
সৃষ্টার সাথে তার আদি অঙ্গীকারের কথা বেমালুম ভুলে গেছে বলেই জুলুম-নির্যাতনের ধারা এখনো চলছে। যার বাস্তব উদাহরণ সিরিয়া। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও আক্রান্ত মানবতার প্রতীক সিরিয়াকে চিনে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মেলা ভার। সিরিয়ার অসহায় নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা যে কোনো যুদ্ধের চেয়ে মর্মান্তিক রূপ নিয়েছে। সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের ঘাঁটি পূর্ব গৌতা এখন নরকে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ঘোষিত হলেও ন্যক্কারজনক হামলা কার্যত এখনও বন্ধ হয়নি। রক্তে ভেজা সিরিয়ার মাটিতে,বাতাসে বারুদের গন্ধ ভাসছে। ধুঁকে ধুঁকে মরছে অসহায় মানুষ। এ পর্যন্ত ৪ লক্ষ ৭০ হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়েছে। তবু বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হচ্ছে না। অপরাজনীতির দাবা খেলার শিকার হয়ে নৃশংসভাবে লাখো মানুষ মৃত্যু বরণ করছে। অথচ তাদের দেখার কেউ নেই। এমনকি মুসলিম নামধারী শাসকদের মুখ থেকেও একটু টুশব্দ উচ্চারিত হচ্ছে না। আরকান,আসামের পর সিরিয়া আজ মানবতার মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।
পৃথিবীতে যত ধর্মের মানুষ রয়েছে, তার ভেতর সবচেয়ে বেশি নিগৃহিত নির্যাতিত নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হচ্ছে মুসলমান। এমন একটি দেশও খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে মুসলমানেরা হত্যাযজ্ঞের শিকার না হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধন চললেও বিশ্ব মানবতা হাসছে। সভ্যতার এই যুগে সিরিয়াতে যে হত্যাযজ্ঞ চলছে তার ইতিহাস হাজার পৃষ্ঠা লিখলেও সমাপ্তি টানা যাবে না। সাত বছর পূর্ণ হয়ে অষ্টম বছরে গড়িয়েছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে যা দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে এ যুদ্ধের সুত্রপাত। ২০১১ সালে সমগ্র আরব ভূখন্ডে আরব বসন্তের ছোয়া লাগলেও ক্ষমতালোভী স্বৈরশাসকের কাছে গণতান্ত্রিক  সরকার পরাজয়বরণ করেছে। তা থেকে বাদ যায়নি সিরিয়া। বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির মুক্তিকামী তরুণরা আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু সে আন্দোলনকে স্তিমিত করার প্রয়াসে আসাদ সরকার জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ২০১১ সালে গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে যে আন্দোলন শুরু করেছিল সিরিয়ার সাধারণ নাগরিকগণ,তার পুরো দায় এখন তারা  জীবন দিয়ে শোধ করছে। জনগণের যৌক্তিক দাবিকে ভুন্ডল করার জন্যে আবাসিক এলাকাগুলোতে বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস ছোড়া হচ্ছে। রক্তপাত ছাড়াই নীরবে নির্ভৃতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবার পথও বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। নির্বিচারে হাসপাতালগুলোতে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। গত এক মাসে ২৯টির মতো হাসপাতালে বিমান থেকে বোমা ফেলা হয়েছে। ক্ষমতার লোভে নাগরিকদের হত্যার এই মহোৎসবের পৃষ্ঠপোষকতা করছে রাশিয়া ও ইরান।
কোনো যুদ্ধের ইতিহাস লেখা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। তবে যুদ্ধের কারণে একটি দেশের মানুষের জীবনে কি নির্মমতা নেমে আসে সে বিষয়টি তুলে ধরাই নিবন্ধনের মুল উদ্দেশ্য। বিশ্ব সভ্যতার চরম উন্নতি ও অগ্রগতির যুগেও পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষ সেখানে পশুর মতই ঘাস, লতাপাতা, এমনকি পোষা কুকুর ও বিড়ালের মাংস খেয়ে বেঁচে আছে! হ্যা এ ধরনের ঘটনা অবিশ্বাস্য কারও কারও মনে হতে পারে। কিন্তু সিরিয়াতে তাই ঘটেছে। চারদিকে শুধু হাহাকার আর অর্ধাহার কংকালসার মানুষের কান্নার আওয়াজ কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসছে। ঘরে- বাইরে পথে প্রান্তরে শুধু সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষের গলিত অর্ধগলিত লাশ মিলছে। এক মুঠো খাবার নেই, পানি নেই,নেই জীবন রক্ষার ন্যূনতম ওষুধ। অনেকের শরীরে এক তোলা পরিমাণ মাংসও যেন নেই। তাদের কংকালসার চেহেরার ছবিগুলো দেখলে মনের অজান্তে চোখের কোনে পানি এসে জমে যায়। আর সদ্যোজাত সন্তানদের দিকে তো চোখ ফেরানোই ভার।‘ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’- কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যরে এই উক্তির দেখা মিলছে সিরিয়ায় মাটিতে। ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করছে জীবিত মানুষগুলো। শুধু কি তাই! মায়ের কাছে নিজ কলিজার টুকরা সন্তান ও যেন নিরাপদ নয়। পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয়েছে মাত্র দু’কেজি চালের আশায় বুকের সন্তানকে বেঁচে দিতে চেয়েছেন এক মা। কিন্ত কিনবে কে? ক্রেতা তো নেই।
দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশ সিরিয়ার একটি কংকালসার কিশোরের কন্ঠ থেকে ভেসে আসলো এমন আর্তি ‘কত দিন মানুষ না খেয়ে থাকতে পারে বলুন? আমি সাত দিন ধরে কিছুই খাইনি। আল্লাহর কছম, আমি খুবই ক্ষুধার্ত।’ পত্রিকার পাতায় যখন সে সব অনাহারক্লিষ্ট শিশুদের ছবি দেখেছি তখনই দ্রুত পাতা উল্টিয়ে দিয়েছি। কারণ আমার চার বছরের মেয়ের কান্নার আওয়াজই আমি সহ্য করতে পারি না,সেখানে অভুক্ত অনাহারক্লিষ্ট শিশুদের কান্নার আওয়াজ কি করে সিরিয়ার মায়েরা মেনে নেয়,আল্লাহ তা ভালো জানেন। পৃথিবীর মানুষগুলো কেন এত পাষাণ হয়ে গেল? সে প্রশ্নের উত্তর আজ অজানা। তবে যুদ্ধের আগে সিরিয়াবাসীর অবস্থা এত নাজুক ছিল না। তারা ছিল এক সমৃদ্ধ দেশের গর্বিত নাগরিক। কোথাও তাদের কোন অভাব তাড়িয়ে বেড়াত না। সপ্তম বড় শহর ডেয়ার এজর। তেল উৎপাদনে প্রথম সারিতে ছিল যে শহর, এখন সেখানে শুধুই হাহাকার আর ক্ষুধার আহাজারি শোনা যায়।
আরব রাষ্ট্রগুলোর অতীত ইতিহাস তো এমন ছিল না, তাহলে কেন আজ গৃহযুদ্ধে ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে নাগরিক জীবন। সে বিষয়টিও মুসলমানদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা যে সময়ে আমাদের কলিজার টুকরা সন্তানের হাজারো বায়না বা আবদার রাখতে ব্যস্ত ঠিক সেই সময়ে সিরিয়ার লাখো শিশুরা কাঁদতেও ভুলে গেছে। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মাঝে যেসব শিশুরা এখনোও বেঁচে আছে তাদেরকেও মৃত্যুর বিভীষিকা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। শিশু ওমরান দাকনিশের হৃদয়বিদারক ছবিটি আলেপ্লোকে সবার মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞের স্তুপ থেকে বের করে আনা অশ্রহীন ওমরানের নীরবতাই ছিল সবচেয়ে দুঃসহ।
হাত দিয়ে গালের রক্ত দেখে নির্বিকারভাবে চেয়ারে মুছে ফেলা শিশু ওমরানের নীরব ধিক্কার সবাইকে হতবিহবল করলেও ক্ষমতালোভী শাসকগোষ্ঠী নিশ্চুপ। সবচেয়ে বেশি অসহায় আজ সিরিয়ার শিশুরা।
তাদের নিষ্পাপ মুখে ভর করে আছে যন্ত্রণা আর বেদনার ছাপ। শিশু ওমরানের এই ছবিটি সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সিরিয়ার পূর্ব গৌতা এলাকার বাসিন্দা এ শিশুটি আল্লাহতায়ালার অশেষ মেহেরবানীতে বেঁচে গেছে সরকারি বাহিনীর বর্বর হামলা থেকে। সিরিয়া গৌতা এলাকার আরেক বাসিন্দা বায়ান রেহান। তিনি একজন সামাজিক ও মানবাধিকার কর্মী। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পর স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন একটি ভূগর্ভস্থ আশ্রয় কেন্দ্রে। বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচতে এখানে তার মতো আরো অনেক পরিবার এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তার এক লেখায় ফুটে উঠেছে সিরিয়ার গৌতা এলাকার ভয়াবহতার কথা। তাঁর লেখার শিরোনাম সিরিয়ার মানবিক সংকটের বিষয়গুলো বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে। আমাদের মারতে চাইলে দ্রুত মারো,মৃত্যুর প্রহর গুনতে ক্লান্ত আমরা।
আন্তর্জাতিক একটি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে,১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে অদ্যাবধি পর্যন্ত পূর্ব গৌতায় প্রায় ৬৪০ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে নিষ্পাপ শিশুও রয়েছে। এ পরিস্থিতিকে নরকের সাথে তুলনা করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, স্থানীয় লোকজন পৃথিবীর নরকে বসবাস করছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে সিরিয়ায় ত্রাণ দেবার সময় স্থানীয় লোকেরা সেখানকার নারীদের যৌন কাজে ব্যবহার করছে বলে বিবিসি জানতে পেরেছে। ত্রাণকর্মীদের ভাষ্যমতে,খাদ্য সাহায্য এবং তাদের গাড়িতে করে কোথাও পৌঁছে দেবার বিনিময়ে ওই লোকেরা যৌন সুবিধা নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি (আইআরসি) নামে দুটি মানবিক সংস্থা ২০১৫ সালেই যৌন নির্যাতনের ব্যাপারে সর্তক করে দিয়েছিল। কিন্তু গত বছরেও ইউএনএফপিএর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে যে দক্ষিণ সিরিয়ায় ত্রাণের বিনিময়ে যৌন সুবিধা নেয়া অব্যাহত রয়েছে। ভাবা কি যায়! এক বেলার খাবারের জন্য সিরিয়ার নারী ও মেয়েরা অল্প কিছু সময়ের জন্য কর্মকর্তাদের বিয়ে করে যৌন সেবা দিয়েছে।
আরাকান থেকে ইয়েমেন, ফিলিস্তিন থেকে সিরিয়ায় শিশুহত্যার মহোৎসব চলছে। সিরীয় শিশুরা যখন শরণার্থী নৌকায় পানিতে ডুবে মরছিল তখন ইয়েমেনের শিশুরা মরছিল সৌদি-মার্কিনীদের বোমায়। তবে আমেরিকা যদি সিরিয়াকে সিরিয়ার মতো থাকতে দেয় তাহলে এই যুদ্ধ কালই থেমে যাবে। মিয়ানমার, কাশ্মির, ফিলিস্তিন, ইরাক,লিবিয়া ও মিসরের ক্ষমতাসীন শাসকেরা পশ্চিমাদের পছন্দের। এটা কারো অজানা নয়! যে কারণে সাদ্দমা,গাদ্দাফিদের বিচার হলেও নেতানিয়াহু,সিসি,অং সান সুচিরা অপরাধ করেও নিরাপদ। জাতিসংঘ মানবাধিকারের কথা ততটুকু বলে যতটুকু  ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর পছন্দ। ইরাক, আফগানিস্তান, মিশর, লেবানন, সিরিয়া, লিবিয়া, ভিয়েতমান, মিয়ানমার ও কাশ্মিরে প্রতি মুর্হুতে মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত হলেও জাতিসংঘ নিশ্চুপ। ৭০ বছর আগে হাজার হাজার ইহুদি ইউরোপ থেকে পালিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে। আজ হাজার হাজার মুসলমান মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে পালাচ্ছে। কিন্তু কেন? মহান আরশের মালিকের কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন বিপন্ন মানবতাকে জালিমের হাত থেকে রক্ষা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ