ঢাকা, মঙ্গলবার 15 May 2018, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মালয়েশিয়ার পরিবর্তন : অন্তরে আনোয়ার বাইরে মাহাথির

একটি দেশের বিনিয়োগ তহবিলের অর্থ যদি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্ট ও তার বাসভবনের স্টোর রুমে আবিস্কার হয়, তার স্ত্রী যদি পরিধান করেন ৭০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অলঙ্কার এবং দুর্নীতির অঢেল অর্থ যায় স্বজন ও দলীয় লোকদের পকেটে তাহলে দেশটির অধঃপতন সুনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শুধু কি তাই? এই দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজ ছিল বাছাই করে করে বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে কারণে অকারণে মামলা দেয়া ও তাদের শাস্তির আওতায় আনা। বিচার বিভাগ হয়ে পড়েছিল সরকারের গৃহপালিত এবং নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীনদের বশংবদ। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। তারা জানতেন না এই অবস্থা থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। কিন্তু আল্লাহর অশেষ কৃপায় পরিত্রাণ মিলেছে।
আমি মালয়েশিয়ার কথা বলছিলাম, মালয়েশিয়ার জনসাধারণ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন। তারা এ জন্য বিশ্বব্যাপী নন্দিত হয়েছেন। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে তারা ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান জোটকে ২২২ আসনের পার্লামেন্টে ১২২ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে এবং এ প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার রাজার আমন্ত্রণে মাহাথির মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করেছেন। মাহাথির ক্ষমতাসীন দল ও জোটের প্রতিনিধি হিসাবে (Umno-Basisan Nasional) ২২ বছর দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন এবং রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তাকে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার বলা হয়। মালয়েশিয়ার বর্তমান অবস্থায় তিনি স্থির থাকতে পারেননি। তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং তার এক সময়ের মন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী, যাকে তিনি ইঙ্গ-মার্কিন-ইহুদী ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্যায়ভাবে জেলে পুরেছিলেন, জনাব আনোয়ার ইব্রাহিমের শরণাপন্ন হন, প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এবং তার জোটে শরিক হয়ে সরকার পরিবর্তন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আনোয়ার ইব্রাহিম জেল খানায় থেকে এই আন্দোলনকে অনুপ্রেরণা দেন। তার স্ত্রী ও মেয়ে বিরোধী দলীয় আন্দোলনকে শাণিত করেন। উল্লেখ্য যে তার স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল দীর্ঘদিন ধরে পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন, আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি হিসাবে সরকার পরিবর্তনের এই আন্দোলনে মাহাথিরের যোগদান এবং আনোয়ারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা আনোয়ারের জনপ্রিয়তাকে আরো বাড়িয়ে দেয় এবং নাজিব সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে। ক্ষমতাসীন জোট Umno-Basisan Nasional এর ষাট বছরের ক্ষমতাকে তছনছ করে দেয়। জোটের শর্ত এবং মাহাথিরের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজকীয় ক্ষমার মাধ্যমে মাহাথির জনাব আনোয়ার ইব্রাহিমকে কারামুক্ত করবেন এবং দু’বছরের মধ্যে তার হাতে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিবেন। এর আগে সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলকে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিবেন। গত শুক্রবার নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির ঘোষণা করেছেন যে তিনি আনোয়ারের জন্য রাজকীয় ক্ষমা আদায় করেছেন। এই ক্ষমা বলে সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলে তিনি হয়ত আজকের মধ্যেই মুক্তি পেতে পারেন।
আজিজাহকে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কারামুক্ত হবার পর প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য জনাব আনোয়ার ইব্রাহিমকে একটি উপ-নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করে সংসদ সদস্য হতে হবে। রাজকীয় ক্ষমার আনুষ্ঠানিকতা এবং উপনির্বাচন দু’টো মিলিয়ে এতে সর্বোচ্চ দু’বছর সময় লাগতে পারে। এই সময়টিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথিরই দেশ শাসন করবেন। তাকে অনেক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে একটি কথা বলা দরকার যে মালয়েশিয়ার এই অসাধ্য সাধনের পেছনে বাহ্যত: মাহাথির মোহাম্মদকে দেখা গেলেও কার্যত: আনোয়ার ইব্রাহিমই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু কে এই আনোয়ার ইব্রাহিম? আমাদের যুব সমাজের কাছে তার পরিচয় দেয়া দরকার।
ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেরই জানার কথা যে ষাটের দশকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দু’জন ছাত্রনেতা বিশ্বব্যাপী ছাত্র ইসলামী আন্দোলনে বিরাট প্রাণসঞ্চালনে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের জ্ঞান দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক প্রতিভা সর্বত্র নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। এই দুই যুব নেতার একজন ছিলেন মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম, আরেক জন ফিলিপাইনের মিন্দানাও রাজ্যের নূর মিসৌরী। নূর মিসৌরী মিন্দানাও এর একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীও ছিলেন। নব্বই এর দশকের শেষের দিকে তৎকালীন ফিলিপাইন সরকার স্বায়ত্ত শাসিত মিন্দানাও এর নাটক করে জনাব নূর মিসৌরীকে তার দায়িত্ব অর্পণ করেন। সাথে সাথে ইহুদী খ্রিস্টানদের নতুন ষড়যন্ত্রও শুরু হয় এবং তাকে ফাঁদে ফেলে তার বিরুদ্ধে অজ¯্র মামলা দিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয়। তার অপরাধ তিনি ইসলামী ঐক্য ও মিন্দানাও এর স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র তিনি মোকাবিলা করতে পারেননি এবং শেষ পর্যন্ত দৃশ্যপট থেকে অনেকটা হারিয়ে গেছেন। ইসলামী আন্দোলন ও মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে আনোয়ার ইব্রাহিম টিকে যান, শীর্ষ পৌঁছেন কিন্তু বৈরী শক্তি তাকে ধ্বংস করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। তিনি আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে পরম সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। তার আজকের সাফল্য তারই ফসল।
ডাটুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট মালয়েশিয়ার একটি গ্রামে। তিনি মালয়েশিয়ার পিপলস জাস্টিস পার্টি তথা Party Keadilan Rakyat PKR-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। উমনো পার্টির সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ মিথ্যা অজুহাতে তাকে পদচ্যুত করেন এবং জেলে প্রেরণ করেন। তার বিরুদ্ধে পায়ূকামিতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। আসল কথা ছিল দক্ষতা এবং যোগ্যতার দিক থেকে তিনি মাহাথিরকেও অতিক্রম করছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি মুক্তি পান এবং বিরোধী জোট পাকাতান রাকিয়াত প্রতিষ্ঠা করেন। এই জোট ২০০৮ এবং ২০১৩ সালে সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। নাজিব সরকার এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং পুনরায় তার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে তাকে ২০১৫ সালে পাঁচ বছরের জন্য জেলে প্রেরণ করেন। বর্তমানে তিনি সেই জেলই খাটছেন। বলাবাহুল্য, আনোয়ার সব সময়ই তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অবিশ্বাসযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই সরকারী নির্দেশে আদালত তাকে জেলে পাঠিয়েছে বলে একাধিক তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আনোয়ার ইব্রাহিম ছাত্রাবস্থায় National Union of Malaysian Muslim Students এর সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি University of Malaya Malay Language Society’রও সভাপতি ছিলেন। (PBMUM) ১৯৭১ সালে তিনি Muslim Youth Movement of Malaysia প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে তাকে Malaysia Youth Council বা মজলিস বেলিয়া মালয়েশিয়ার প্রধান নির্বাচিত করা হয়। ১৯৭৪ সালে পল্লী এলাকায় ক্ষুধা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়।
১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ওয়ামীর (World Assembly of Muslim Youth) প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে International Institute of Islamic Thought (IIIT) প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। টিপল আইটিএর তিনি একজন ট্রাস্টিও। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত তিনি কুয়ালালামপুরের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ছিলেন। ২০১১ সালে বিপুলসংখ্যক ভক্ত-অনুরক্ত এবং ইখওয়ান সদস্য নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ইসলামিক ফোরামের প্রথম সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি মাহাথির মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তিনি সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (১৯৮৩), কৃষি (১৯৮৪), শিক্ষা (১৯৮৬) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের (১৯৯১) বিশাল দায়িত্ব পালন করেন। মালয়েশিয়ার অর্থনীতির যে সমৃদ্ধি তার বেশির ভাগ আনোয়ার ইব্রাহিমের অবদান। শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে আনোয়ার National School Curriculum-এ বিরাট সংস্কার এনেছিলেন এবং শিক্ষার ইসলামীকরণে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার নতুন দায়িত্ব সহজ ও সফল হোক, অভিজ্ঞজনরা এটাই কামনা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ