ঢাকা, বুধবার 16 May 2018, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৯ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বছরে কোটি টাকার উপরে বেতন পান দেশের ৪০ ব্যাংকের এমডি

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : দেশের ব্যাংকিং খাতে সরকারি ও বেসরকারি মিলে ৪৮টি ব্যাংকের মধ্যে বছরে কোটি টাকার উপরে বেতন পান ৪০টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা। দেড় কোটি টাকার বেশি বেতন পান ৯টি ব্যাংকের এমডি। ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মধ্যে সর্বোচ্চ বেতন পান ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলী রেজা ইফতেখার। তিনি ২০০৭ সাল থেকে এ ব্যাংকে এমডির দায়িত্বে আছেন। ২০১৭ সালে বেতন-ভাতা বাবদ বেসরকারি এই ব্যাংকটির কাছ থেকে তিনি নিয়েছেন ২ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ হিসাবে তিনি ব্যাংকটি থেকে প্রতি মাসে পেয়েছেন গড়ে ১৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। বেতনÑভাতার দিক দিয়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছেন।  
ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে দেশের সরকারি ও বেসরকরি খাতের প্রায় সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা পেয়েছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও সিইও আনিস এ খান। বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকটি তাকে পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৮২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ১৫ লাখ ২৩ হাজার টাকার আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন। তৃতীয় সর্বোচ্চ বেতন পেয়েছেন দ্য সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও সোহেল আরকে হোসেন। গত বছর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকটি পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এ হিসাবে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকটি থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। এরপর চতুর্থ পর্যায়ে আছেন এনআরবি ব্যাংকের এমডি মো. মেহমুদ হোসেন। বিদায়ী বছর তিনি পেয়েছেন ১ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে বেতন-ভাতা বাবদ এনআরবি ব্যাংক তাকে পরিশোধ করেছে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। বেতন-ভাতা পাওয়ার দিক দিয়ে এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া রয়েছেন পঞ্চম সর্বোচ্চ অবস্থানে। গত বছর বেতন-ভাতা বাবদ তিনি ব্যাংকটি থেকে পেয়েছেন ১ কোটি ৬২ লাখ ১ হাজার টাকা। এ হিসাবে প্রতি মাসে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে ব্যাংকটি। তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে আছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের এমডি কাজী মসিহুর রহমান। ২০১৭ সালে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকটি থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ মার্কেন্টাইল ব্যাংকটির প্রতি মাসে পরিশোধ করতে হয়েছে ১৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। গতবছর সপ্তম অবস্থানে ছিলেন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী মো. হাবিবুর রহমান। বেতন-ভাতা বাবদ তিনি পেয়েছেন ১ কোটি ৫৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে ১৩ লাখ ১৯ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পেয়েছেন। তালিকায় অষ্টম স্থানে আছে আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি ও সিইও এম শাহ আলম সারওয়ার। বেতন-ভাতা বাবদ তিনি ২০১৭ সালে ব্যাংকটি থেকে পেয়েছেন ১ কোটি ৫১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ হিসাবে প্রতি মাসে তিনি পেয়েছেন ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। যমুনা ব্যাংকের এমডি শফিকুল আলম গতবছর ব্যাংকটি থেকে বেতন-ভাতা বাবদ নিয়েছেন ১ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ১২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পেয়েছেন। এ তালিকায় তিনি আছেন নবম স্থানে। তালিকায় দশম স্থানে আছেন ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফখরুল আলম। তিনি ২০১৭ সালে ব্যাংকটি থেকে মোট বেতন-ভাতা পেয়েছেন ১ কোটি ৪২ লাখ ২০ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে ব্যাংকটি থেকে তিনি পেয়েছেন ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাক। এরপরের অবস্থানে রয়েছেন শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ফরমান আর চৌধুরী। বেতন-ভাতা বাবদ গত বছর পেয়েছেন ১ কোটি ৪২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। সে হিসাবে গড়ে প্রতি মাসে পেয়েছেন ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ২০১৭ সালে বেতন-ভাতা বাবদ পেয়েছেন ১ কোটি ৪০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। প্রতি মাসে পেয়েছেন ১১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। তিনি এবিবি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।
এর পরের অবস্থানে মিডল্যান্ড ব্যাংকের এমডি মো. আহসান-উজ জামান। গত বছর বেতন-ভাতা বাবদ তিনি পেয়েছেন ১ কোটি ৪০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে পেয়েছেন ১১ লাখ ৭৩ হাজার টাক। ব্যাংক এশিয়ার এমডি মো. আরফান আলী পেয়েছেন ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
বাকি অন্যান্য ব্যাংকের এমডিদের মধ্যে ২০১৭ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম আরএফ হোসেন বেতন-ভাতা বাবদ নিয়েছেন ১ কোটি ৩৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। উত্তরা ব্যাংকের এমডি মো. রবিউল হোসেন নিয়েছেন ১ কোটি ৩১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। সাউথইস্ট ব্যাংকের এমডি কামাল হোসেন নিয়েছেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এমডি সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী নিয়েছেন ১ কোটি ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি প্রশান্ত কুমার হালদার নিয়েছেন ১ কোটি ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি মামুন-উর রাশিদ নিয়েছেন ১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পূবালী ব্যাংকের এমডি মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী নিয়েছেন ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এমডি আবুল কাশেম মো. শিরিন নিয়েছেন ৯৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এবি ব্যাংকের এমডি মশিউর রহমান চৌধুরী নিয়েছেন ৯৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা। মধুমতি ব্যাংকের এমডি মো. সফিউল আজম নিয়েছেন ৯৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ নিয়েছেন ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি ওমর ফারুকী নিয়েছেন ৮০ লাখ ১৩ হাজার এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের এমডি এ.ই আব্দুল মুহাইমেন নিয়েছেন ৮০ লাখ ২৬ হাজার টাকা।
এ ছাড়া ২০১৭ সালের শেষের দিকে বেশ কয়েক জন এমডি বিদায় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি দেওয়ান মুজিবুর রহমান বেতন-ভাতা বাবদ নিয়েছেন ১ কোটি ৩৮ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী নিয়েছেন ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের খন্দকার ফজলে রশিদ নিয়েছেন ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের আবদুল হামিদ মিয়া নিয়েছেন ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের মো. রফিকুল ইসলাম নিয়েছেন ১ কোটি ২২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের সহিদ হোসেন নিয়েছেন ১ কোটি ৮ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। প্রাইম ব্যাংকের আহমেদ কামাল খান চৌধুরী নিয়েছেন ১ কোটি ১৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এনসিসি ব্যাংকের গোলাম হাফিজ আহমেদ নিয়েছেন ৯৪ লাখ ৯ হাজার এবং মেঘনা ব্যাংকের মোহাম্মদ নূরুল আমিন নিয়েছেন ৮৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের এমডি জানান, প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বেতন-ভাতা কম-বেশি হয়। সারা পৃথিবীতে একই সিস্টেম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকেই দেশীয় ব্যাংকগুলো প্রধান নির্বাহীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়।
এ ব্যাপারে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, দেশে ব্যাংকের সংখ্যার তুলনায় যোগ্য শীর্ষ নির্বাহীর সংকট রয়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো কাউকে যোগ্য মনে করলে তাকে অন্য ব্যাংক থেকে হলেও একটু বেশি বেতন দিয়ে নিয়ে আসে। ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতার বিষয়ে দেশে কোনো নীতিমালা নেই। অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ