ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 May 2018, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৩০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার জামিন বহাল

স্টাফ রিপোর্টার: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে দেওয়া হাইকোর্টের জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। আদালত একই সঙ্গে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন।
গতকাল বুধবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে কড়া নিরাপত্তা নেওয়া হয় আদালত প্রাঙ্গণে। হাইকোর্ট গত ১২ মার্চ চার মাসের জামিন দিয়েছিল। এখনই সেই জামিনই বহাল থাকলো। আদেশের স্বাক্ষর করার তারিখ থেকে চারমাস কার্যকর হবে। আদালতের আদেশ নি¤œ আদালতে পৌছঁলে জামিননামা কারাগারে পৌছঁবে। গতকালই নি¤œ আদালতে জামিননামা দাখিল করেছেন তার আইজীবীরা।
তবে বিএনপির চেয়ারপারসনের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন জানিয়েছেন, এই জামিনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন না। তাঁকে আরো কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সেগুলোতেও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে জামিন নিতে হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার মতো একটি বড় মামলায় যেহেতু খালেদা জিয়ার জামিন বহাল রয়েছে, ফলে অন্যান্য মামলায়ও তিনি সহজেই জামিন নিয়ে মুক্তি পাবেন।
কুমিল্লায় ২টি, নড়াইলে ১টি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, ঢাকায় দু’টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের বিরোধিতা করে দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়েই আপিল করেছিল। আপিল বিভাগ দুটি আবেদনই খারিজ করে দিয়েছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাওদুদ আহমদ বলেন, ‘আপিলের আদেশের পরও খালেদা জিয়ার মুক্তি পেতে কিছুটা বিলম্ব হবে। কারণ, সরকার নানা কৌশলে তাঁর মুক্তি বিলম্বিত করার চেষ্টা করবে। নিম্ন আদালতে কতগুলো মামলায় তাঁকে আসামী করা হয়েছে। সেই মামলাগুলোতে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের সে সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমরা চেষ্টা করব এগুলো দ্রুত করার। আপিল বিভাগ যেহেতু এ মামলায় জামিন বহাল রেখেছেন, তাই আমার বিশ্বাস, অন্যান্য মামলায়ও তিনি জামিন পেয়ে শিগগির আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মওদুদ আহমদ বলেন, কুমিল্লায় তিনটি মামলা, ঢাকায় দুটি মামলা এবং নড়াইলে একটি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এসব মামলা ভিত্তিহীন। শুধু তাঁকে আটকে রাখার জন্যই এসব মামলায় আসামী করা হয়েছে।
আদেশে আপিল বিভাগ বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্টে পেপারবুক প্রস্তুত। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চকে দ-াদেশের রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের দ-প্রাপ্ত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গত ১২ মার্চ চার মাসের জামিন দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। পরে ১৪ মার্চ থেকে এই জামিন স্থগিত আছে আপিল বিভাগে। এখন স্থগিতকালীন চার মাসের গণনায় আসবে না। যেদিন হাইকোর্ট (জামিন) দিয়েছিল এবং আপিল বিভাগ যেদিন স্টে (স্থগিত) করেছিল, সেই কয়দিন ধরা হবে। এখন আজকে থেকে ওই দিনগুলোসহ গণনা শুরু হবে। আপিল বিভাগ তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়ায় আপিল শুনানিকে খালেদা জিয়া বিলম্বিত করতে পারবেন না বলেও জানান মাহবুবে আলম।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে হাইকোর্ট যে জামিন দিয়েছিলেন, তা বহাল থাকবে। কিন্তু ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার আপিলটি নিষ্পত্তি করার জন্য আপিল বিভাগ নির্দেশ দিয়েছেন। নিম্ন আদালতে এই মামলা নয় বছর ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। আপিল বিভাগের এই আদেশের ফলে এখানে তিনি বিচারকাজ বিলম্বিত করতে পারবেন না। যেহেতু আপিল বিভাগ ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন, তাই এই আপিল শুনানির ব্যাপারে সর্বাত্মকভাবে আমরা প্রস্তুত হব।
সকালে আদেশ দেওয়ার ঘণ্টা দুই পরে বেলা ১১টার দিকে আপিল বিভাগে সংক্ষিপ্ত কপি চেয়ে আবেদন করেন এ জে মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, ‘আমরা খালেদা জিয়ার জামিনের সংক্ষিপ্ত আদেশ চাচ্ছি। বেল বন্ড দাখিল করার জন্য সংক্ষিপ্ত আদেশ দরকার। আপনাদের আজকের রায় পত্র-পত্রিকায়, টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। হয়তো আপনাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। আমাদের দিতে অসুবিধা নেই।
তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আপত্তি জানিয়ে বলেন, খালেদা জিয়া তো আরো কয়েকটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট আছেন। তা ছাড়া আপিল বিভাগ থেকে এ ধরনের শর্ট অর্ডার দেওয়ার নজির নেই।
তখন বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী বলেন, ‘এ ধরনের শর্ট অর্ডার দেওয়ার নজির নেই।’
তখন প্রধান বিচারপতি খালেদা জিয়ার আইনজীবীকে বলেন, ‘আপনার আবেদন রিফিউজ (নাকচ) করা হলো।’
এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগের রুলসে শর্ট অর্ডার দেওয়ার বিধান আছে।’
বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী প্রশ্ন করেন, ‘হাইকোর্টের বিধান কি আমাদের জন্য মানা বাধ্যতামূলক?’
জবাবে আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি তা বলছি না। আপনারা চাইলে তা দিতে পারেন।’
প্রধান বিচারপতি আবার বলেন, ‘আপনার আবেদন রিফিউজ (নাকচ) করা হলো।’
আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি তো একা এসেছি। দলবল নিয়ে আসেনি।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এটা কেমন কথা? দলবল নিয়ে এলেই কি আমরা আদেশ দিয়ে দিই? দলবল দেখে আমরা আদেশ দিই না।’
তখন বেঞ্চের অপর বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলীর মন্তব্যে উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি গুরুতর আপত্তিকর কথা বলেছেন। আপনি আমাদের ফোর্স করতে পারেন না। আপনারা ভুলে যান যে কোর্টে আপনারা আইনজীবী। অফিসার অব দ্য কোর্ট। কোনো দলের লোক নন।
তখন এ জে মোহাম্মদ আলী তাঁর মন্তব্যের জন্য আদালতের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
একপর্যায়ে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলীকে বলেন, প্রধান বিচারপতি যেখানে নাকচ করে দিয়েছেন, সেখানে আপনি তর্ক করছেন কেন?’
 শেষে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনার আবেদন আমরা বিবেচনা করতে পারলাম না। বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য,গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেন নিম্ন আদালত। এ মামলার অপর আসামী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বাকি পাঁচজনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা জরিমানাও করা হয়।
পরে ১২ মার্চ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চার মাসের অন্তবর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর করে আদেশ দেন।
১৪ মার্চ খালেদা জিয়ার হাইকোটের্র দেওয়া চার মাসের জামিন স্থগিত করে লিভ টু আপিল দায়েরের জন্য দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। ১৫ মার্চ খালেদা জিয়াকে হাইকোটের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে লিভ টু আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশন।
গত ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন ৮ মে পর্যন্ত স্থগিত করেন আপিল বিভাগ। দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকার, দুদক ও আসামীপক্ষকে আপিলের সারসংক্ষেপ দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। খালেদা জিয়ার জামিনের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল গ্রহণ করে এ আদেশ দেওয়া হয়।
গত ৮ ও ৯ মে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের করা আপিল আবেদনের ওপর শুনানি হয়। শুনানি শেষে মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য গত মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ গতকালও শুনানি করেন। পরে আদালত আজ আদেশের জন্য দিন রাখেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ