ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 May 2018, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৩০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চট্টগ্রামে পদদলিত হয়ে মানুষের মৃত্যু

ইফতার সামগ্রী ও জাকাতের অর্থ আনতে গিয়ে চট্টগ্রামে পদদলিত হয়ে শিশুসহ ১০ জন নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। একই ঘটনায় আহত হয়েছে ৫০ জনের বেশি নারী-পুরুষ, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশংকাজনক। দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, গত সোমবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নে অবস্থিত একটি মাদরাসা ও এতিমখানার মাঠে কবির স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (কেএসআরএম) নামের এক প্রতিষ্ঠানের মালিক ইফতার সামগ্রী ও জাকাতের অর্থ বিতরণের আয়োজন করেছিলেন। মাঠটিতে হাজার হাজার যাকাত প্রত্যাশী নারী-পুরুষের সমাবেশ ঘটেছিল। কিন্তু বিতরণ ব্যবস্থাপনায় শৃংখলা ও সমন্বয় না থাকায় মাঠের গেট খুলে দেয়া মাত্র সকলেই ঢুকে পড়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি এবং ধাক্কাধাক্কি। অমন অবস্থায় বিশেষ করে বেশি বয়সের নারীরা মাটিতে পড়ে যায়। অন্যদিকে তাদের মাড়িয়েই মাঠে ঢুকতে থাকে যাকাত প্রত্যাশীরা। এর ফলেই পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটার এবং মানুষের হুড়োহুড়ি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর আয়োজক প্রতিষ্ঠানটি বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে ১০ জন নারী ও শিশুর মৃত্যু ঘটে। আহতরাও পড়ে থাকে মাটিতে। পরে পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনী অনেক কষ্টে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। মাঠের সবখানে তখন হতাহতদের জুতা-স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এত বড় একটি সমাবেশ ও আয়োজনের ব্যাপারেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক প্রশাসনকে অবহিত করেননি। অথচ এ ধরনের যে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য আগে থেকে সরকারের অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অনুমতি নেয়া দূরে থাকুক, প্রশাসনকে জানানো পর্যন্ত হয়নি। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, সরকারের অনুমতি নেয়া হলে এবং আগে থেকে জানানো হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হতো। ঘটনাস্থলে অবশ্যই পুলিশ উপস্থিত থাকতো। ফলে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারতো না।
সাংবাদিকদের অনুসন্ধানেও একই ধরনের অভিযোগ প্রাধান্যে এসেছে। প্রশাসন তথা পুলিশকে অবহিত করার পরিবর্তে শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির মালিক তার নিরাপত্তা রক্ষীদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে আরো দুইশ’র মতো যুবককে যুক্ত রাখা হয়েছিল। এসব যুবক নাকি হুড়োহুড়ি বন্ধ করার জন্য জাকাতপ্রত্যাশীদের ঢালাওভাবে লাঠিপেটা করেছে এবং তার ফলেই নাকি পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য একশজন পুলিশ নিয়োজিত ছিল বলে দাবি জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে পদদলনের বিষয়টি এড়িয়ে আরো বলা হয়েছে, মৃত্যু নাকি ঘটেছে হিটস্ট্রোকের কারণে! নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথাও ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে নিহতদের পক্ষে কেএসআরএম-এর মালিক পক্ষকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চারজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, যাকাত ও ইফতার সামগ্রী বিতরণের নামে এভাবে শিশু ও নারী-পুরুষের অপমৃত্যু ঘটানোর কর্মকান্ড কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা দরকার, ২০০৫ সালের অক্টোবরেও একই এলাকায় একই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকের যাকাত বিতরণের সময় পদদলিত হয়ে নয়জন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। মাঝখানে এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির মালিক পক্ষ অতীতের ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষা নেননি বলেই সোমবার একই ধরনের অপমৃত্যুর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পেরেছে।
আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা এবং মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এটা দরকার এ কারণে যে, পবিত্র রমযান মাস এসে গেছে। এই মাসে দেশের প্রায় সবস্থানেই এক শ্রেণীর ধনি ও বিত্তবান মানুষের পক্ষ থেকে যাকাত সামগ্রী বিতরণের নামে অর্থবিত্তের প্রদর্শনী করা হয়ে থাকে। বড় কথা, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যাকাতপ্রত্যাশীদের ধাক্কাধাকি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
সে কারণে সরকারের উচিত এমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে আর কোনো মানুষকে যাকাতের জন্য অন্তত পদদলিত হয়ে মারা যেতে না হয়। যারা যাকাত দিতে চান, তাদের উচিত স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং সম্ভব হলে তাদের যুক্ত করে যাকাত দেয়ার উদ্যোগ নেয়া। আমরা এ বিষয়ে ইসলামের বিধান ও নির্দেশনা জেনে নেয়ার এবং অনুসরণ করার আহ্বান জানাই। লক্ষ্য রাখতে হবে, যাকাত দেয়ার বিষয়টি যেন লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না হয় এবং যাকাত আনতে গিয়ে যেন কোনো মানুষকেই অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ না করতে হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ