ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 May 2018, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৩০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ছলনাময় এক বহুরূপী সভ্যতায় আমাদের বসবাস

ছলনা ও শঠতার এই সভ্যতায় বড় বড় নেতাদের সুবচন প্রতিদিনই প্রহসনে পরিণত হচ্ছে। ফলে আস্থার সংকটে ভুগছে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা। এর বড় উদাহরণ ফিলিস্তিন। ১৫ মে ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনীরা পালন করেছে ৭০তম নাকবা (মহাবিপর্যয়) দিবস। ইহুদিবাদী ইসরাইল ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং অস্ত্রের মুখে জোর করে সাড়ে সাত লাখ মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়। ধ্বংস করা হয় শতশত ফিলিস্তিনী গ্রাম ও শহর। সে দিনের বিতাড়িত ফিলিস্তিনীরাই পরবর্তীতে শরণার্থীতে পরিণত হন বিভিন্ন দেশে। এ বছর এমন সময় দিবসটি পালিত হচ্ছে, যখন গাজায় ফিলিস্তিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর ইসরাইলী হামলায় অন্তত ৫৮ জন শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই হাজার সাতশ’ জন। ১৫ মে যখন বায়তুল মুকাদ্দাস শহরে মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধন করা হচ্ছিল ঠিক তখনই ফিলিস্তিনীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালায় ইহুদী সেনারা। ন্যক্কারজনক ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখতে আসা ইসরাইলীরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। আর তাদের মুখে শ্লোগান ÑÑবিক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনীদের পুড়িয়ে ফেল, গুলি করে হত্যা কর। ওদের এমন ঔদ্ধত্য একদিনে হয়নি। গত ৭০ বছর ধরে বিশ্ব মোড়লদের মুসলিম বিরোধী মনোভাব ও শঠতাপূর্ণ আচরণের কারণেই এমনটি হতে পারছে। ফলে বর্তমান সভ্যতা এক জালেম সভ্যতায় পরিণত হয়েছে।
ধর্মের নামেও মুসলমানরা এখন নির্যাতিত, নিপীড়িত হচ্ছে। ধর্মতো মানুষকে শুদ্ধি ও সংযমের কথা বলে। ধর্ম ন্যায় ও কল্যাণের কথা বলে। ধর্ম স্বধর্ম পালনে নিষ্ঠার কথা বললেও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি হিংসা কিংবা বিদ্বেষমূলক আচরণ করতে বলে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে অনেকেই ধর্মের নামে এমন অনাকাক্সিক্ষত ও উগ্র আচরণ করে থাকেন, যা ধর্মের বার্তা বা মর্মবাণীর সাথে যায় না। বরং এদের আচরণে প্রকৃত ধার্মিকরা লজ্জিত হন। তাই প্রশ্ন জাগে, এরা কোন ধর্মের অনুসারী, এদের ধর্মগ্রন্থ কিংবা ধর্মগুরুর নাম কী?
যখন খবরের শিরোনাম হয়, ‘ভারতের ৮৮ স্থানে নামায পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা’, তখন প্রশ্ন জাগে, হিন্দু ধর্মের কোন্্ গ্রন্থে লেখা আছে, মুসলমানদের নামায পড়তে দেওয়া যাবে না? ধর্ম কি এমন নির্দেশ দিয়েছে, নাকি উগ্র সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিভ্রান্ত রাজনীতিকদের স্বার্থান্ধ প্ররোচণায় এমন বিদ্বেষমূলক কর্মকা- চলছে? একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন কর্মকা- কেমন করে চলে? ১১ মে এনডিটিভিসহ ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের গুড়গাঁও জেলায় খোলাস্থানে জুমার নামায আদায় হয় এমন ১২৫টি স্থানের মধ্যে মাত্র ৩৭ স্থানে গত শুক্রবার (১১ মে) জুমার নামায আদায়ের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। বাকি ৮৮ স্থানে জুমার নামায আদায়ে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, হিন্দু চরমপন্থী সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে ৩৭টি স্থানে পুলিশ প্রহরায় শুক্রবার জুমার নামায আদায় করা হয়েছে। মুসলমানদের খোলাস্থানে জুমার নামায আদায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে আসছিল স্থানীয় হিন্দু চরমপন্থী সংগঠনগুলো।
নামাযে বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলো ঘটেছে ওয়াজিরাবাদ,  অতুল কাটারিয়া চক, সাইবার পার্ক, বাখতাওয়ার চক ও সাউথ সিটিতে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, জুমার নামায আদায়ে বাধা দিতে দেখা গিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, হিন্দু ক্রান্তি দল, গোরক্ষক দল ও শিব সেনা কর্মীদের। এমন আচরণ তো সমাজ, দেশ ও ধর্মের জন্য কল্যাণকর নয়। ভারতের সমাজ ও সরকার কি করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বড়ই বিচিত্র বর্তমান সভ্যতা, বহুরূপীও বটে! বরাবরের মত এবারও মুসলিম বিশ্ব স্বাগত জানাবে মাহে রমজানকে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, রমজান উপলক্ষে শুধু মুসলিম দেশের নেতৃবৃন্দই নয়, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাও চমৎকার বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এবার ‘মান কি বাত’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রমজান প্রসঙ্গেও কিছু কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, প্রিয় দেশবাসী, আর কিছুদিন পরেই রমজান মাস শুরু হবে। পুরো বিশ্বেই সম্মান আর শ্রদ্ধার সঙ্গে রমজান মাস পালন করা হয়ে থাকে। সামাজিক ও সমষ্টিগত দিক থেকে রোজা হচ্ছে এমন একটি বিষয়, যা একজন ব্যক্তিকে ক্ষুধার্ত থাকার অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করে থাকে। রোজা রাখলে একজন মানুষ অন্যজনের ক্ষুধার্ত অবস্থা বুঝতে পারে। যখন সে তৃষ্ণার্ত থাকে তখন সে অন্যের তৃষ্ণার্ত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারে। হযরত মুহাম্মদ (স.) যে শিক্ষা দিয়েছেন তা স্মরণ করার এটা একটি সুযোগ। আর সমতা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ যে নৈতিকতায় মহানবী জীবন যাপন করেছেন তা অনুসরণ করা আমাদের দায়িত্ব। তিনি আরো বলেন, একবার এক ব্যক্তি মহানবী (স.)কে প্রশ্ন করেছিলেন, ইসলামের সবচেয়ে উত্তম জিনিস কী? তিনি এর জবাবে বললেন, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তকে খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকে সালাম জানানো। মহানবী (স.) দুটি জিনিসের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন, একটি হলো জ্ঞান এবং অপরটি সমবেদনা। তাঁর মধ্যে কখনো এক ফোঁটাও অহংবোধ দেখা যায়নি। তিনি প্রচার করতেন যে, জ্ঞান একাই মানুষের সব ধরনের অহংবোধকে পরাজিত করতে পারে। মহানবী (স.) বিশ্বাস করতেন যে, কারো যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কিছু থাকে তবে তার উচিত অভাবগ্রস্তদের মাঝে সেগুলো বিতরণ করা। তাই রমজান মাসে দান-খয়রাত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মানুষ এই পবিত্র মাসে উদার হস্তে দান করে থাকেন। তিনি বিশ্বাস করতেন বস্তুগত সম্পদ কখনোই মানুষকে সম্পদশালী বানাতে পারে না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মহানবী (স.) সম্পর্কে অনেকগুলো চমৎকার কথা বললেন। তিনি রমজানের তাৎপর্য ব্যাখ্যারও চেষ্টা করেছেন। এমন ইতিবাচক মনোভাবের জন্য আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই। এমন মনোভাবের প্রসার ঘটলে ভারতের সমাজ অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি লক্ষ্য করা যায় না। গো-রক্ষার নামে মুসলমানদের হত্যা করা হয়, নামায পড়তেও বাধা দেয়া হয়, মুসলিম বিরোধী দাঙ্গাও হয় ভারতে। এমন চিত্রের পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির সাফল্য কামনা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ