ঢাকা, শুক্রবার 18 May 2018, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্বপ্ন আমার সফল হবে 

আহসান হাবিব বুলবুল: শিশুদের জন্য ‘সাংবাদিকতা’- এ বিষয়ে দু’ একটি রিপোর্ট পড়েছে ফাহিম খবরের কাগজে। সেই থেকে ওর ইচ্ছা এ ধরনের কাজের সাথে জড়াতে। বেশ সৃজনশীল কাজ। প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা যায়। আবার সম্মানও পাওয়া যায়। এমনটা হলে ভালোই হতো। মামা-মামানীর সামনে এসে দাঁড়ানো যেত। কাজিনরাও হিসাবে রাখতো’-এভাবেই ভাবতে থাকে ফাহিম।

সেদিন সন্ধ্যায় টেলিভিশনে ছোটদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। একটি শিশু সংগঠনের ছেলে-মেয়েরা পারফর্ম করছে। একটি কিশোর তাদের সংগঠনের খবর পাঠ করে শুনালো। অন্য একজন কিশোরী শিশু শ্রম বিষয়ে একজন শিল্প মালিককে ইন্টারভিউ করলো। ফাহিম টিভি স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারছে না। এমন সময় মামাতো বোন মেহরিন এসে রিমোর্ট টিপে চ্যানেল পরিবর্তন করলো।

: আপু, এ কী করলে! আমি তো মনোযোগ দিয়ে অনুষ্ঠানটি দেখছি।

: ওসব দেখতে হবে না। এখন আমরা কার্টুন দেখবো। ‘ডোরেমন’। বেশ ইন্টারেস্টিং। তুমিও দেখো। মডার্ন হও।

: কেন আমি কী এখনো গেয়োটি রয়ে গেছি! প্রায় এক বছর হলো শহরে এসেছি। তোমাদের সাথে থাকছি। তারপরও?

: কি মন খারাপ করলে? অর্কো দেখবে, ডোরেমন অর্কোর খুব প্রিয়।

: অর্কো দেখলে কোনো কথা নেই। ওকে আমি খুব লাইক করি। ‘ও’ তোমার মতো এত হিংসুটে নয়।

: কী বললে, আমি হিংসুটে! বেশ আজ আব্বু আসুক সব বলবো।

ফাহিম কিছুক্ষণ ডোরেমন দেখলো। হিন্দি সংলাপের মাথামু-ু কিছুই বুঝলো না। ও উঠে নিজের পড়ার ঘরে চলে গেল। শিশুতোষ অনুষ্ঠানটি দেখতে না পেরে ফাহিমের মনটা খুব খারাপ।

পড়াশুনায় মন বসছে না। রাতে ঘুমাবার আগে ও ভাবে, একটি শিশু সংগঠনে যোগ দেবে। ওদের কর্মী হবে। একসাথে কাজ করবে। তারপর যদি একদিন টেলিভিশনে পারফর্ম করার সুযোগ এসে যায়, সেদিন মামাতো ভাই-বোনদের দেখিয়ে দিবে-সে গেয়োটি নয়।

ফাহিম গ্রামের ছেলে। বছর দুই আগে ওর মা মারা গেছে। ওর ছোট একটি বোন আছে। মা মারা যাবার পর ওরা নানাবাড়িতে বড় হচ্ছিল। এক বছর আগে মামা ওকে ঢাকা নিয়ে এসেছেন, নিজের কাছে। একটি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। ও এবার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। ফাহিম যখন প্রথম ঢাকাতে এলো মামার বাসায়, তখন ওর কিছুই ভালো লাগতো না। সব সময় গ্রামের কথা মনে পড়তো। নানা-নানুর কথা, ছোট বোনের কথা। খুব করে মনে পড়তো বাবাকে। ওদের বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছেন। তারপরও তিনি ছেলে-মেয়ের খোঁজ-খবর রাখেন। টাকা-পয়সা দেন। ছেলে-মেয়েকে কাছে নিয়ে রাখতে চান। কিন্তু সৎমায়ের ঘরে ওরাই যেতে চায় না। ফাহিমের এখন অনেক কিছুই সয়ে গেছে। কিন্তু মায়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারে না। মায়ের কথা মনে পড়লেই ও এলবাম খুলে ছবি দেখে। রংতুলিতে মায়ের ছবি আঁকে। নীরবে কাঁদে। কোনো উপলক্ষে স্কুল ছুটি হলেই ও গ্রামে চলে যায়। বোনকে নিয়ে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়ায়। বাবাকে দেখে আসে। স্মৃতি যত বেদনারই হোক তা খুঁজে ফেরা বুঝি সুখের। ও স্মৃতির মেঠো পথে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যায়। ওর দু’চোখ জুড়ে ঘুম আসে।

মামা আরিফুজ্জামান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সারাদিন তার কর্মস্থলেই কেটে যায়। রাতে ঘরে ফিরে সবার খোঁজ-খবর নেন। তা থেকে ফাহিমও বাদ যায় না। মেহরিন ফাহিমের নামে একগাদা অভিযোগ করে বসে। ফাহিম কোনো প্রতিউত্তর করে না। জামান সাহেব বলেন, ছোটোর বিরুদ্ধে বড়োর অভিযোগ বেমানান। বড়রা ছোটকে পথ দেখাবে, ভুল শুধরে দেবে। তিনি বুঝতে পারেন এ হচ্ছে ভাই-বোনের খুনসুটি। রাগ-অনুরাগ।

ফাহিম বলে, মামা! ভাবছি পড়াশুনার পাশাপাশি কিছু একটা করবো।

: কী করবে?

: কেন! অনেকের অনেক রকম শখ থাকে না। যেমন কেউ গান শেখে। কেউ গিটার বাজায়। কেউ ফটোগ্রাফী করে।

: বেশ তো, তুমি কী করবে?

: লেখালেখি করবো ভাবছি।

: খুব ভালো কথা। সে তো তোমার পত্র-পত্রিকা পড়ার ঝোঁক দেখেই বুঝতে পারি।

এই বাড়িতে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক আসে। খুব ভোরে হকার এসে দিয়ে যায়। জামান সাহেব অফিস যাবার আগে চা’র টেবিলে পত্রিকা পড়েন। মামা অফিসে চলে গেলে ফাহিম পত্রিকা নিয়ে বসে। কাগজের আদ্যপ্রান্ত পড়ে। বিশেষ করে ছোটদের পাতা, খেলার খবর, জ্ঞান-বিজ্ঞান তার বড় আকর্ষণ।

সেদিন চোখ আটকে যায় একটি প্রতিবেদনের শিরোনামের ওপর। -“ডোরেমন জ্বর” ফাহিম এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলে। আবেগটা ধরে রাখতে না পেরে বলে, আপু! আজকের পত্রিকা পড়েছো? তোমার ডোরেমনের ওপর একটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। পড়বে, পড়ে দেখো। ফাহিম খবরের কাগজটি বোনের দিকে এগিয়ে দেয়।

: আমার পড়ার এত সময় নেই। তুই জানিস না, আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী। আমার এখন অনেক পড়া। বরং তুই পড়ে শোনা।

ফাহিম পড়ে-রিপোর্টটি করেছেন জিন্নাতুন নূর।

রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী দীপ্ত। মুখে তার অনর্গল হিন্দি ভাষা। তার স্কুল ব্যাগ, টিফিন বক্স, রাবার, পেনসিল, পড়ার টেবিল, গায়ের টি-শার্ট থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কিছুতেই একটি নির্দিষ্ট বিদেশি কার্টুন চরিত্রের ছবি-তার নাম ‘ডোরেমন’। স্কুল থেকে বাসায় ফিরেই ইউনিফর্ম না বদলে দীপ্ত স্যাটেলাইট টেলিভিশনে হিন্দি ভাষায় প্রচারিত ‘ডোরেমন’ কার্টুন দেখতে বসে পড়ে। কার্টুনটি দেখতে দেখতেই সে তার খাবার খায়। স্কুলের পড়া শেষ করে। কার্টুনটি দেখার জন্য ঘরের অন্য সদস্যদের সে টিভির ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয় না। ‘ডোরেমন’ দেখে দীপ্ত এখন মিথ্যাচার করতে শিখেছে। শিশু বয়সেই তার সমবয়সী মেয়ে শিশুদের মেয়ে বান্ধবী (গার্লফ্রেন্ড) বলে সম্বোধন করছে। বাস্তব জগতের বাইরে গিয়ে দীপ্ত এখন কার্টুন জগতকেই সত্যি বলে মনে করছে। আর দীপ্তের মতো একই অবস্থা দেশে অধিকাংশ শিশু-কিশোরের। ঘরে ঘরে শিশুরা এখন ‘ডোরেমন জ্বরে আক্রান্ত। হিন্দি ভাষায় প্রচারিত এ কার্টুনটি দেখে সারাদিন তারা মাতৃভাষা বাংলার বদলে হিন্দির চর্চা করছে। একই সঙ্গে তাদের মূল্যবোধেরও অবক্ষয় ঘটছে। শিশু-কিশোররা মিথ্যাচার শিখছে। সন্তানদের এ অবস্থা দেখে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এ প্রতিবেদককে তাদের উদ্বেগের কথা জানান। বাধ্য হয়ে তাদের অনেকেই বাসার স্যাটেলাইট সংযোগটি বন্ধ করে দিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার মনোচিকিৎসকদের কাছে ডোরেমন জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরাও এরই মধ্যে আসতে শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের হিন্দি ভাষার ব্যবহার অভিভাবকদের আতঙ্কের কারণ। তাছাড়া মিথ্যা কথা বলা, পরীক্ষার খারাপ ফলাফল করেও ডোরেমনের গেজেট ব্যবহার করে ফল ভালো করার ভুল চিন্তা করাসহ বিভিন্ন উপসর্গ শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। এ ব্যাপারে কথা হলে মনোচিকিৎসক ডা. মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের এ প্রতিনিধিকে জানান, এ কার্টুনটি দেখার ফলে শিশুরা হিন্দি ভাষা শিখছে। এছাড়া মিথ্যা কথা বলাসহ তাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। তিনি জানান, দেশে সুষ্ঠু বিনোদনের অভাব থাকায় শিশুরা বিদেশি এ কার্টুনে আসক্ত হচ্ছে ... ।

: থাক থাক আর পড়তে হবে না। বোঝা শেষ। কথায় বলে না “যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা।” ও বেটা সাংবাদিক তোর মতন কার্টুন-ফাটুন পছন্দ করে না। তাই দু’ কলম লিখে ঝাল মিটিয়েছে।

ফাহিম বড় বোনের কথার জবাব দেয় না। ভাবে এ মুহূর্তে নীরব থাকাই শ্রেয়। যে জেগে থেকে ঘুমায় তাকে জাগাবে কে? ও আবার পত্রিকায় চোখ রাখে। ও মতামতের কলাম খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে এ কলামে ব্যক্তি তার মত, দৃষ্টিভঙ্গির কথা সাজিয়ে গুছিয়ে লেখে। লেখকের পরিচয়ও ছাপা হয়। শুরুতে লোগোর নিচে লেখা থাকে, মতামাতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

বেশ তো দায়-দায়িত্ব লেখকের। তাহলে সে তো এ কলামে লিখতে পারে। এভাবেই ভাবনার ঢেউ তোলে ফাহিম।

ফাহিম একটা বিষয় নিয়ে ভাবছে। এ বিষয়ে লেখা যায়। বেশ আনকমন। তাছাড়া শিশু-কিশোরদের সচেতন করতে এ বিষয়ে লেখা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু কিভাবে শুরু করবে, কিভাবে লিখবে! তার লেখা কি পত্রিকার সম্পাদক ছাপাবে?

অনেক চিন্তার ঝড় তুলে ফাহিম। শেষ পর্যন্ত কলম ধরে। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ঘষামাজা করে সযতনে ও একটা লেখা দাঁড় করায়। ও ভাবে, লেখাটি কি কাউকে পড়াবে। না থাক। কে কি মন্তব্য করবে, পরে মন খারাপ হয়ে যাবে। মামাকে পড়ানো যায়। কিন্তু তাতে আর সারপ্রাইস দেয়া হয় না। তার চেয়ে সরাসরি পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দেই।’ ফাহিম তাই করে। যে দৈনিক কাগজটি ওদের বাসায় আসে, সেটির সম্পাদক বরাবরে ও লেখাটি পাঠিয়ে দেয় ডাকযোগে।

ফাহিম অধীর আগ্রহে অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে। কবে ছাপা হবে তার লেখা! ও প্রতিদিন পত্রিকায় চোখ রাখে। না, ছাপা হয়নি। ও হতাশ হয়। আবার আশায় বুক বাধে, অনেক লেখকই তো লেখা পাঠায়। নিয়ম অনুযায়ী দেরি তো একটু হতেই পারে।

মেহরিনের মা আফিফা খাতুন। একজন আদর্শ গৃহবধূ। তিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন তার এই সংসার। মধ্যবিত্তের টানাপড়েনের এই পরিবারে তিনি স্বামীর পাশে একজন সংগ্রামী সহযাত্রী। তিনি স্বপ্ন দেখেন ছেলে-মেয়েদের মানুষ করবেন। রাজধানী শহরে তাদের একদিন বাড়ি হবে। অন্যদের জন্য কিছু করবেন।

আফিফা খাতুন সেদিন ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে একটু অবসরে ড্রয়িং রুমে টিভি দেখার ফাঁকে পত্রিকা পড়ছিলেন। হঠাৎ একটি শিরোনামে চোখ আটকে যায় তার। “শিক্ষার্থীদের খাতায় ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের ছবি।” শিরোনামের আকর্ষণে তিনি প্রতিবেদনটি পড়েন। শেষে দেখেন, লেখকের পরিচয়। একী এ যে দেখি আমাদেরই ফাহিম!

হ্যাঁ। সেদিন তো ফাহিম ওর মামার সাথে লেখালেখি নিয়েই কথা বলছিল। সাবাস বেটা! তুই পেরেছিস। -পরক্ষণেই তিনি একটু দমে যান। ফাহিমকে যেদিন প্রথম ওর মামা এ বাড়িতে নিয়ে আসে সেদিন তিনি মন খারাপ করেছিলেন। টানাপড়েনের সংসারে বাড়তি ঝামেলা নিতে চাননি। কিন্তু স্বামীর খুশির কথা ভেবে সব মেনে নেন। সেদিন ফাহিম কি কিছু বুঝতে পেরেছে, কিছু মনে রেখেছে!

ফাহিম সকালেই কাগজে তার লেখা পড়েছে। আনন্দ আর উচ্ছ্বাস চেপে গেছে। সংকোচে কাউকে কিছু বলেনি। স্কুলে গিয়ে ঠিকই ধরা খেয়েছে বন্ধুদের কাছে। সবাই জেনে গেছে ফাহিমের লেখা ছাপা হয়েছে। সবাই ধরেছে, দোস্ত! খাওয়াতে হবে। ফাহিম সাধ্যমতো বন্ধুদের কিছু খাওয়ায়ে তবে রক্ষা পেয়েছে। বিকেলে বাসায় ফিরে ফাহিম আনন্দ আর লজ্জায় মাখামাখি একটা অবস্থায় আছে। না জানি কখন কে কোন মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়! মেহরিনকে বেশি ভয় পাচ্ছে।

মামা আজ সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরেছেন। মামানী সন্ধ্যায় সবাইকে বাসায় থাকতে বলেছেন। ওদিকে রান্নাঘরে বেশ আয়োজন চলছে। হয়ত কোনো মেহমান আসবেন।

সন্ধ্যায় চা’র টেবিলে সবাইকে ডাকেন আফিফা খাতুন।

: কী ব্যাপার এত আয়োজন দেখছি!

: কেন তুমি জানো না! আজ আমাদের ফাহিমের লেখা ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। আমরা সেলিব্রেট করবো ওকে।

: তাই নাকি! আমার চোখে তো পড়েনি। কই পত্রিকা দাও; আগে পড়ি।

ফাহিম মাথা নিচু করে বসে আছে। ওর দু’ ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। মেহরিন এবার মুখ খোলে। -এ্যই দুষ্টুটা আগে বলিসনি কেন? তাহলে আমি আগে তোকে উইশ করতাম।

: খুব সুন্দর হয়েছে। চমৎকার!

সময়োপযোগী একটা লেখা। আগে যেখানে বাচ্চাদের খাতার মলাটে শহীদ মিনার, বাংলাদেশের মানচিত্র, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রাম বাংলার চিরায়ত দৃশ্য এবং কবি-সাহিত্যিকদের ছবি থাকতো; যা দেখে নতুন প্রজন্ম দেশ সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে চাইতো। এখন একশ্রেণীর অধিক মুনাফালোভী খাতা প্রস্তুতকারী জেনে বুঝেই শিক্ষা উপকরণেও আপত্তিকর সব সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের বড় বড় ছবি দিয়ে খাতার মলাট বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে। যা দেখে আজকের শিক্ষার্থীরা দেশের কবি-সাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ ভুলে যেতে বসেছে। নতুন প্রজন্ম সিরিয়ালের অসুস্থ বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে হিংসা, পরশ্রীকাতরতা শিখছে। এসব খাতা প্রস্তুতকারী ও পাইকারি বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। ফাহিম তোমার লেখায় এ বিষয়টিই ফুটে উঠেছে। তুমি অনেক বড় একটা কাজ করেছো। তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি লেখালেখি চালিয়ে যাও। সেইসাথে পড়াশুনাতেও ভালো করতে হবে কিন্তু। কই ফাহিমকে আগে মিষ্টি দাও।’

-এ সময় অর্কো হাততালি দিয়ে ওঠে। মেহরিন নিজ হাতে মিষ্টি খাইয়ে দেয় ফাহিমকে। মামার এই আশাবাদে ফাহিম আজ গর্বিত। কিন্তু ও আজ মামাীকে নতুন করে দেখছে, নতুন করে চিনছে, নতুন করে জানছে। মামীর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ওর হৃদয় আপ্লুত। এই মুহূর্তে ওর খুব করে মায়ের কথা মনে পড়ছে। ওর দু’চোখের কোণ ভিজে ওঠে। মেহরিন বলে, মা দেখেছো ফাহিম কাঁদছে। মামানী ফাহিমের কাছে গিয়ে দাঁড়ান। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

দেখতে দেখতে দু’টি বছর চলে যায়। ফাহিম ভালো রেজাল্ট করে এবার দশম শ্রেণীতে উঠেছে। এ বছর ও জাতীয় শিশু সংগঠন শিশু মেলার সদস্য হয়েছে। ও শিশু মেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যায়। তাদের নানান কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে।

প্রতি মাসেই ফাহিমের দু’ একটি লেখা ছাপা হয় পত্রিকায়। ও মতামতের কলামে স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে। ছোটদের পাতায় গল্প-কবিতা লেখে। নিজেদের স্কুলের সমস্যার ওপর ফাহিমের লেখা পত্রিকায় ছাপা হবার পর থেকে ও স্কুলে সবার কাছে খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা ওকে খুব আদর করে। বন্ধুরা ওকে সাংবাদিক বলে ডাকে। ও এ ধরনের সম্বোধন পছন্দ করে না। ও বলে, আমি লেখালেখির চর্চা করছি মাত্র। তোরাও লিখতে পারিস।

ফাহিম তার ছাপা হওয়া লেখাগুলো কাটিং করে একটা ফাইল করেছে। ও ভাবে, একদিন পত্রিকার সম্পাদকের সাথে দেখা করবে, পরিচিত হবে। কিন্তু তাকে পত্রিকা অফিসে ঢুকতে দিবে! ছোট বলে ছাত্র বলে যদি অনুমতি না দেয়! তবু যাবে। সে তার লেখার কাটিং দেখাবে; নিশ্চয়ই ঢুকতে দিবে; সম্পাদক সাহেবের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চাইবে।

সত্যি সত্যি একদিন ফাহিম পত্রিকা অফিসে গিয়ে হাজির হয়। ও সম্পাদক সাহেবের সাথে দেখা করে। সম্পাদক সাহেব ওর এত অল্প বয়সে লেখালেখির আগ্রহ দেখে উচ্ছ্বসিত হন। তিনি ফাহিমের লেখার প্রশংসা করেন।

ফাহিম পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক হবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। সম্পাদক সাহেব বলেন, ‘তুমি কেবল স্কুল ছাত্র। তোমার এখন ক্যারিয়ার বিল্ডাপের সময়। তুমি ভালো করে লেখাপড়া করো। ভালো রেজাল্ট করো। অবসর সময়ে লেখালেখি চালিয়ে যাও। তুমি যদি নিজেকে তৈরি করতে পারো, ভবিষ্যতে সাংবাদিক হবার অনেক সুযোগ পাবে।’

সম্পাদক সাহেব ফাহিমকে তাঁর লেখা একটি বই উপহার দেন।

ফাহিম খুব খুশি। আজ নিজেকে গর্বিত মনে করছে। তার পরিশ্রম চেষ্টা কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে। সম্পাদক সাহেবের পরামর্শগুলো ওর খুব ভালো লেগেছে। ফাহিম নিজের লেখা কবিতার দু’টি লাইন স্বগতোক্তি করে, ‘স্বপ্ন আমার সফল হবে, ব্যর্থ হতে দেব নাকো’ .... ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ