ঢাকা, শুক্রবার 18 May 2018, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবিতা: অন্তহীন জীবনের গান

আখতার হামিদ খান: কবিতার কথা ভাবতে ভাবতে একটা সিদ্ধান্ত হৃদয়ে দৃঢ় হয়েছে যে কবিতাই সুন্দরের শ্রেষ্ঠ উপমা। কবিতার মত শোভনীয় সুন্দর আর হয় না। এই উচ্চারণ কোন স্থূল ভাবনা থেকে নয়। ধ্যানময় নিবিষ্টতা থেকে এ উচ্চারণ। পথ চলতে চলতে, দেখতে দেখতে অনুভবে প্রতিটি দরোজা-জানালা এ বিশ্বাসে আকন্ঠ হয়েছে। একাগ্র নিমগ্নতা থেকে এ উপলব্ধি বিশ্বাসের অলি-গলিতে সুস্থাপিত হয়েছে। গভীরতা পেয়েছে এ উপলব্ধির শিকড়মূল।

কবিতা সুন্দরের দৃশ্যমান প্রকাশ। কবিতায় প্রকাশিত সুন্দর ছবির মত প্রদিপ্ত। কবিতার সুন্দর আলোকের মত উদ্ভাসিত। কবিতা গোপন সুন্দরে নিবিষ্ট প্রকাশক। কবিতাই পারে সুন্দরের প্রাণময় সৌকর্য উৎকীর্ণ করতে। কবিতার জীবন প্রাণবন্ত মাধুর্যময় জীবন। কবিতার বাঁকে বাঁকে জীবনের প্রতিচ্ছবি গাঁথা। জীবনকে কবিতার মমতায় মেখে নিলে জীবন হয় উন্নত ভালোবাসার নির্ঝরণী। যে জীবনে কবিতা নেই সে জীবন প্রেমের পেলবতা থেকে বঞ্চিত।

কবিতা সত্য শক্তির প্রকাশ। কবিতা জীবন রহস্যের উদঘাটিত উদ্ভাস। কবিতা জীবন প্রেরণার বিজয় ধ্বনি। কবিতা জীবন প্রেরণার বিজয় ধ্বনি। উন্নত জীবনের দিকনির্দেশক হল কবিতা-। কবিতা যে জীবনের কথা বলে সে জীবন পরিমার্জিত, সুসম্পাদিত ও সুশীলিত। কবিতাকে ধারণ করেই জীবন বেড়ে ওঠে সুন্দরের দিকে। কবিতার সুন্দরই জীবন সুন্দর। কবিতা নির্বাক নি:সর্গের সার্থক অনুবাদ। কবিতা প্রকৃতির অব্যক্ত কথনের ভাষাময় শৈলি। কবিতার ভাষাই প্রকৃত পক্ষে নি:সর্গের ভাষা। একটি ফুটন্ত গোলাপের লাল পাপড়ি, মৃদু বাতাসে সে পাপড়ির দুলুনি এবং সেই দুলুনির নান্দনিক দৃশ্যতা কেবল কবিতার অক্ষরেই আঁকা সম্ভব। একটি বর্ণিল প্রজাপতি ফুলের মমতায় যখন নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে দেয় ফুলের ঠোঁটে। সেই সুন্দর নির্মাণ করার ভাষা কবিতা ব্যতীত আর কোন শিল্পে মিলবে। যে মৌমাছি ছুটে যায় অরণ্যের গহীনতায় ফুলের অনুসন্ধানী হয়ে, যে ফুলের বুক থেকে মধু চুষে নেয় মৌমাছিরা সে ফুল সে মৌমাছির পারস্পরিক লেনদেনের পরিভাষা-কবিতারই ভাষা। কবিতার এই শক্তিই কবিতাকে বিজয়ী করেছে। কবিতা হয়েছে দশদিগন্তজয়ী।

কবিতা মানুষের মনে আশার জোয়ার জাগিয়ে তোলে। সে জোয়ারে মানুষ বার্ধক্যের জীর্ণতা ভেঙে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ¯্রােতবাহী হয়। তরুণেরা ভেঙে যায় জীবনের সমস্ত বাধার দেয়াল। যৌবনের প্রতি পদক্ষেপে কবিতা শক্তি যোগায়। কবিতার এ শক্তি একটি জীবনকে মহাজীবনে পরিণত করে দেয়।

কবিতা সমস্ত সম্ভাবনার নয়া দিগন্ত। কবিতা সজিব স্বপ্নের নয়া নীলন্ত। কবিতার ভেতর দিয়ে মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন আঁকে। কবিতার মাধ্যমেই মানুষ আগামী সম্ভাবনার সোনালী আকাশ দেখে। বেদনাক্লিষ্ট হৃদয়ে কবিতাই পারে আরামের সুবাতাস বইয়ে দিতে। যাতনার দু:খময় মুহূর্তকে কবিতার সৌরভে ধুয়ে নেয়া যায়। মুছে নেয়া যায় কষ্টের সমস্ত ক্ষত-গর্ত।

কবিতার আনন্দ অন্যরকম আনন্দ। কবিতার অনুভূতি ব্যতিক্রমী অনুভূতি। কবিতার মুখ অন্য সুখের চেয়ে আলাদা। কবিতার প্রেরণা আর কোন প্রেরণার সাথে মিলে না। কবিতা নি:স্বার্থ জীবনের সরব সঙ্গী। কবিতার মত বন্ধু কেউ নয়। একজন কবি কবিতাকে বুকে চেপে বেঁচে থাকে সুদীর্ঘকাল। কাল থেকে মহাকালে প্রবেশ করে কবি। কবিতাই কবিকে তুলে আনে মহাকালিক জাহাজে।

যে কবি নির্মাণ করেছে কবিতার জাহাজ, তাকে ইতিহাস ডুবিয়ে দিতে পারে না। যে ইতিহাস কবিতার সুগন্ধে হৃদ্ধ হয়েছে যে ইতিহাস কখনো হারায় না। কবিতাই ইতিহাসের উদগাতা। যখন ইতিহাস ছিলো না তখনো কবিতা ছিলো। যখন ইতিহাস থাকবে না তখনো কবিতা ছিলো। যখন ইতিহাস থাকবে না তখনো কবিতা থাকবে। কবিতাই মানব ইতিহাসের রাজপথ।

কবিতা একটি জীবন। কবিতা একটি জাতি। কবিতা একটি দেশ। কবিতাই একটি পৃথিবী। যে জীবনে কবিতা নেই সে জীবন নিরানন্দ-বিতান। যে জাতির কবিতা নেই সে জাতি উন্নত জাতি নয়। যে দেশ কবিতাহীন সে দেশে ভালোবাসা থাকে না। যে পৃথিবী কবিতামুক্ত সে পৃথিবীতে মানুষ বসত করতে পারে না। কবিতার জৌলুস যাকে হৃদ্ধ করেছে সেই প্রকৃত মানুষ।

একজন মানুষের জন্য নিজেকে সাজিয়ে তুলেছে কবিতা। মানুষের জন্যেই প্রাণবন্ত, উচ্ছল কবিতা জান্নাত। কবিতার প্রেমে যে একবার পড়ে যায় তার হৃদয় হয় আকাশোশ্চর্য উদার। সমুদ্র গভীরতা নেমে আসে তার হৃদয় গাঙে।

একটি কবিতা একটি দেশের স্বাধীনতার সৌরভ। একটি কবিতা একটি মুক্ত পতাকার গৌরব। একটি কবিতা একটি জাতির মর্যাদর সংগ্রাম। কবিতার ইস্পাত ঘন ধারে শাণিত হয় স্বাধীনতার সংগ্রাম। 

কবিতার সুবাতাস ওড়াতে পারে সংগ্রামের বিজয়ী পতাকা। যে হৃদয় কবিতার আরামে উষ্ণ হয়েছে সে হৃদয় ভালোবাসে দেশ। দেশের দু:খ-কষ্টে সেই থাকে সঙ্গী-বন্ধু। কবিতার হৃদয় থাকে আদিগন্ত বিস্তৃত। এ হৃদয় প্রেম প্রীতি ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।

যে মানুষ কবিতা ধারণ করে সেই মর্যাদার চূড়া স্পর্শ করে। কবিতার সাহায্যকারীরাও হয় সম্মানীয়। কবিতা নিন্দুকের নিন্দাকে মুছে ফেলতে শেখায়। শত তিরস্কার অতিক্রম করার সৎ সাহস এনে দেয় কবিতা। সমস্ত বাধার দেয়াল ভাঙার হিম্মত যোগাড় করে কবিতা। কবিতাই নিজের গতি নিয়ে আবিষ্কার করে নিজস্ব পথ। কবিতার এ পথ চিরকালীন পথ। কবিতার এ পথ চলা অনবরত ধাবমান। কবিতার গন্তব্যে আদি-অন্ত মিলেমিশে একাকার।

কবিতা কারো মুখাপেক্ষি নয়। কারো কাছে দায়বদ্ধও নয়। কবিতা এগিয়ে চলে কবিতার গতিতে। কবিতার এ গতি রুদ্ধ করার হিম্মত কারো নেই। কবিতা বরবারই আপন ঐশ্বর্যে গতিমান। কবিতা তিরস্কৃত হল নাকি পুরুস্কৃত এ হিসবে মেলায় না কবিতা। কে কবিতার জন্য নিজের হৃদয় খুলে দিলো কিংবা কে রুদ্ধ করে দিলো-সেই অংকও করে না কবিতা। কবিতা নিজের অংকে নিজেই মজবুত।

কবিতা মানুষকে আবেগ সুন্দরে ভাসিয় তোলে। হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে মমতার ঢেউ। কবিতা প্রেমিকেরা প্রকৃতি প্রেমিক। কবিতার প্রেম যাদের হৃদয়কে আলোড়িত করে তারাই সুন্দরের সাধনার পরিশ্রমী হয়। পরিশ্রমী মানুষেরা হয় সৃজনশীল। কবিতা সৃজনশীল শিল্পের শ্রেষ্ঠ আঙিনা। এ আঙিনায় বিচরণশীল মানুষেরা নতুন সমাজের গোড়াপত্তন করে থাকে।

যারা কবিতা ভালোবাসে না- তাদের জন্য কোন শুভেচ্ছা নেই। কেননা তারা ভালোবাসা থেকেই বঞ্চিত। প্রেমহীন মানুষেরাই কবিতার বিরুদ্ধে খাড়া হয়। এর নিন্দুক কবিতার নিন্দুক। কবিতার নিন্দুকেরা পাষাণ মনা। নিজেকে যারা ভালোবাসে না তারাই নিন্দা করে কবিতার। কবিতার নিন্দাকারীরা পরচর্চার দক্ষ। যারা নিজ চর্চা করে না ওরাই পর চর্চায় মগ্ন।

পরচর্চাকারীরা উন্নত মানুষ হতে পারে না। কবিতা উন্নত মানুষদের জন্য।

কবিতা মানুষকে তন্ত্রের জটিলতা থেকে মুক্তি দেয়। পুঁজিবাদি সভ্যতার বুক বিদীর্ন করে কবিতার শেল। পুঁজিবাজারে প্রবেশ করে না কবিতার গাড়ি। পুঁজির বাটখারায় কবিতা ওজন করা চলে না। পুঁজিবাদিরা স্বভাবতই নির্মম। নির্মমতা থেকে কবিতা বরাবরই দূরে। পুঁজিবাদী নির্মমতার প্রতিবাদ করে কবিতা। কালোবাজারী, বর্জোয়া ও সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে কবিতার ক্ষুর। কবিতা কোন অসুন্দরকে প্রশ্রয় দিতে জানে না। জানো বলেই কবিতার শত্রুরা সকল শিল্পের শত্রু। শিল্পের শত্রু মানুষের বন্ধু হতে পারে না।

একটি কবিতা একজন কবির চোখের ঘুম নি:শেস করে দেয়। কবিতার জন্য কবির রাত কেটে যায় নির্ঘুম। চোখের পাতায় রাজ্যের অন্ধকার দলা পাকিয়ে থাকে। তবুও ঘুম নামে না কবির চোখে। অন্ধকারের সমস্ত তীব্রতা ভেদ করে উদ্ভাসিত হয় কবিতার নূর। কবিতা নক্ষত্রের মত জ্বলে। একটি জ্বলন্ত নক্ষত্র থেকে উড়ে যায় হাজার নক্ষত্রেরা। রাতের আকাশে শেষ তারাটি যেমন জেগে থাকেন প্রচ- আত্মনিমগ্নতায় তেমনি জেগে থাকে প্রচণ্ড আত্মনিমগ্নতায় তেমনি জেগে থাকেন একজন প্রকৃত কবি। কবিতার পেম ছাড়া আর কোন প্রেম কবিকে নির্ঘুম করে না। চোখের ওপর দিয়ে গোটা রাত বইয়ে যায় তারপরও কবিতার আকাক্সক্ষা শেষ হয় না । ফুরায় না অপেক্ষার সময়।

কবিতা মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে। জীবনকে বদলে দেয়াই কবিতার কাজ। যে কবিতা চলমান প্রবাহ বদলে দেয়ার হিম্মত রাখে সে কবিতাই সত্যিকারের কবিতা। সময় বদল হয়। জীবনও বদলে যায়। এ বদল যদি হয় কবিতার ভেতর দিয়ে সে বদলই সুন্দর। শীতের শেষ লগ্নে ঝরে পড়ে গাছের পাতারা। বসন্ত এসে আবার সাজিয়ে তোলে পত্র-পল্লব। বসন্ত হলো প্রকৃতির কবিতা।

 

 গাছে গাছে প্রতিটি নতুন পাতা নুতন ফুল একেকটি কবিতার শব্দ-লাইন। বসন্ত কবিতা বদলে দেয় প্রকৃতির চেহারা। কবিতার বসন্ত ও মানুষকে বদলে দিয়ে যায়।

একটি কোকিল যখন গান করে- তার সুরময় ধ্বনির কম্পন নিসর্গকে আনমনা করে তোলে। কোকিলের এ সুর এবং সুরের মাধুরি কম্পনই মধুময় কবিতা- কালো কোকিলের কণ্ঠ থেকে এমন হৃদয়গ্রাহী সুর নেমে আসে এ সুর অনাদিকালের সুর। বাসন্তি বাতাসে যখন এ সুর ঢেউ তোলে তাকে বাণীবদ্ধ করার যাদুজাল হল কবিতা। একটি দোয়েল ভোরের গায়ে হেলান দিয়ে যখন ডুমুর ডালে বসে, যখন আলো আঁধারি রহস্যময় দৃশ্যের ভেতর সুরের দ্যোতনা জাগিয়ে তোলে তখন সেখানে বিরাজমান থাকে কবিতা সুন্দর। যে হলুদ পাতাটি কাঁঠাল তলায় গড়িয়ে গেছে নীরবে, ধুলায় ডুবে গেছে যার দেহ, সেই বিষাদ গাথা নৈশব্দের ভেতর বসত করে কবিতা।

কবিতার জন্য অনুসন্ধানী হতে হয় কবিকে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিকে সারাক্ষণ জাগ্রত রাখতে হয়। সচেতন মন। সজাগ অনুভূতি আর গ্রহণের দারুণ পিপাসা কবিকে কবিতার বাড়ি পৌছে দেয়্ কবিতাকে। আপন করে নেবার সৎ সাহস থাকতে হয় কবির। কবিকে হয় দু:সাহসী যাযাবর। যার ঠিকানা থেকেও থাকবে না। যার নির্দিষ্টতা ডুবে যাবে অনির্দিষ্টের ¯্রােতে। যে স্থানীয় হয়েও আগন্তুক। যার জীবন থেকে মুসাফিরি কখনো ঘুচে না। কবিতার হাতে নিজেকে তুলে দেয়ার হিম্মত থাকে ক’জনের। যে পারে সে হয় প্রকৃত কবি।

কবিতা সময় সময় পরাজিত হয় সম্পদের তোপে। সম্পদ বরাবরই কবিতার কাছে পরাজিত। যে হৃদয় সম্পদকে কবিতার দেহে প্রতিস্থাপন করে যেখানে কবিতার পরাজয় হবেই। কবিতার ভালোবাসার কাছে সম্পদ যদি তুচ্ছ হয়ে যায় সেখানে কবিতার বিজয় কে আর ঠেকাবে। তবে কবিতার পরাজয় বাহ্যিকভাবে মনে হলেও প্রকৃত প্রস্তুাবে পরাজয় কবিতার নয়। সেখানে কবিরই পরাজয় ঘটে। কবিতা নিজেকে বিজয়ের আসনে তুলে নেয়। এভাবে কবিতা নির্মাণ করেছে কবিতামহল।

কবিতা সময়কে ধারণ করে, হোক তা অতীত বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ। এ পরিপ্রেক্ষিতে কবিতা সব সময় আধুিনক কবিতার শরীরে জেগে থাকে বসন্তের সজিবতা। কবিতা হারায় না তার যৌবন তরঙ্গমালা। কবিতা সমুদ্রে জোয়ার জাগে নিরবিচ্ছিন্ন ধারাবহতায়। এই জোয়ারে কবিতাই পাল তোলে মহাকালের। কবিতার এ আধুিনকতা হয়তো সর্বজনীন হয় না। হয় না কারণ কবিতা ভবিষতের কথা বলে। এজন্য কবিরা হন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। সব মানুষ বহমানকাল অর্থাৎ বর্তমানকেও বুঝে উঠতে সক্ষম নন। ভবিষ্যৎ তো আরও দূরের। এই ভবিষ্যতকে বর্তমানের ভেতর প্রবেশ করিয়ে দেয়া কবিতারই কাজ। এ কাজে কবিতা সুদক্ষ।

কবিতা যখন অতীতের কথা বলে তখন শুধু অতীতের কথাই বলে না। যখন বর্তমানের কথা বলে তখনও শুধু বর্তমানকে নয়। একইভাবে ভবিষ্যতের কথাও শুধু ভবিষ্যতের কথা নয়। মূলত: অতীতের ভেতর দিয়ে বর্তমানকে উচ্চারণ করা হয়। বর্তমানের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করে ভবিষ্যৎ। আর ভবিষ্যতেও কালের উদর থেকে নেমে আসে বর্তমানে। এইভাবে ত্রিকাল মিলে কবিতায় হয়ে যায় এককাল-মহাকাল। এ কারণে একশ’ বছর আগের কবিতার দর্পণে চিত্রিত দেখায় বহমান করে মহাকালের সাথী হয়।

যে মুখে কবিতা উচ্চারিত হয়, সে মুখের ভাষা থাকে সুন্দর। কবিতাই সুন্দর করে মানুষের উচ্চারণ। যে উচ্চারণের সাথে কবিতার শব্দ জড়িত হয় সে উচ্চারণ তুলনাহীন। কবিতা মুখের ভাষা কুশ্রী হতে পারে না। যে কবিতা বাহকের ভাষা কুৎসিত, যার শব্দতীর মানুষের হৃদয় বিদ্ধ করে সে অন্তত পরিশুদ্ধ কবি হতে পারে না। কবির ভাষা হবে কবিতার ভাষা। কবির ব্যবহার হবে কবিতার ব্যবহার। কবিতার মত সুন্দর হবে কবির আচরণ। কবিতা সত্যের চেয়ে বড় সত্য। কবিতা উত্তম থেকে মহোত্তম। কবিতা সুন্দরের থেকেও অতি সুন্দর। কবিতা যা বলে তার থেকে বেশি বলে। কবিতা যা বোঝায় তারচেয়ে বেশি বোঝায়। কবিতা ও ফুলের মধ্যে ব্যবধান-কবিতা ফুল হয়, কিন্তু ফুল কবিতা হতে পারে না। কবিতার আবেদন ফুলের আবেদনের মত নয়। কবিতার ভালোবাসা ও ফুলের ভালোবাসা থেকে আলাদা। ফুল ক্ষণিকের জন্য সঙ্গী হয়। কবিতা সঙ্গী হয় সারাজীবনের। জীবন থেকে কবিতা বড়। একটি কবিতা একজীবনে শেষ হয় না। জীবন থেকে মহাজীবনে চলমান থাকে কবিতার ¯্রােত। এই ¯্রােতস্বিনী কবিতাই মানব জাতিকে দান করেছে প্রেমনদী।

বিজ্ঞানের এ উৎকর্ষতার যুগে কবিতার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে কেউ কেউ। বলে থাকেন বিজ্ঞানের কাছে পরাজিত হবে কবিতা। যন্ত্রের কলকব্জার ঘর্ষনের শব্দে ডুবে যাবে কবিতার আওয়াজ। যেহেতু রোবট মানুষদের বিচরণ শুরু হয়েছে পৃথিবীতে। রক্ত-মাংসের মানুষেরাও ক্রমান্বয়ে যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। কবিতার পক্ষে এ দূরাবস্থায় টিকে থাকা সম্ভব হবে। কবিতা কী জেগে থাকবে আপন শক্তির দৃঢ়তায়। এ জিজ্ঞাসায় উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে মন্ত্রমানবেরা। 

পৃথিবী যতদিন থাকবে কবিতাও থাকবে ততোদিন। কবিতার সুবাস ব্যতীত পৃথিবীতে ফুল ফুটবে না। কবিতার বৃষ্টি ছাড়া নদীরা বইবে না। কবিতার গান ছাড়া পাখিরা গাইবে না। কবিতার প্রেম বুকে নিয়ে উড়ে যাবে প্রজাপতি। কবিতার ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে যাবে মৌমাছি। মাছরাঙ্গা ভোর জেগে থাকবে কবিতারই প্রেমে। গ্রীষ্মের নিঝুম দুপুর ঝুলে থাকে কবিতার আশ্বাসে। কবিতার সৌরভে নিষিক্ত হয় শ্রাবণের রাত। শরতের সকাল ভিজে যায় কবিতার শিশিরে। হেমন্তে ধানের মাঠ কবিতা সৌন্দর্যে সোনালী হয়। কবিতার প্রেমে ভিজে যায় শীতের কুয়াশা। 

এইতো আমার কবিতা। এইতো আমার কবিতা সুন্দর। কবিতা বাদ দিলে জীবনে কী আর অবশিষ্ট থাকে। কবিতা ছেড়ে দিলে আর কী আছে ধরার। কবিতা আমার আত্মার আত্মীয়। কবিতার স্বাদ একবার যে পেয়েছে সে কী ভুলে যাবে কবিতার গান। যে কবিতাকে একবার দেখেছে সে কী করে অস্বীকার করে কবিতার মুখ। কবিতা যাকে টানে তার অন্য কোন টান থাকে না-। কবিতা যাকে ডাকে অন্য কোন ডাক তাকে ফেরাতে পারে না। সব কিছুর বিনিময়ে যদি কবিতা পাওয়া যায় এইতো একজন কবির শ্রেষ্ঠ পাওয়া। কবিতার চেয়ে বড় সম্পদ কবির কাছে আর কী হতে পারে।

কবিতা জীবনের প্রতিচ্ছবি। কবিতা জীবনের আয়না। বারবার ফিরে যেতে হয় কবিতার কাছে। ফিরে যায় মানুষ। ফিরে যায় মানুষের হৃদয়-তনু-প্রাণ। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ