ঢাকা, শুক্রবার 18 May 2018, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সাড়ে ৪ বছর ধরে এরশাদ সরকারি বিনা গেজেটে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত-টিআইবি 

 

স্টাফ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে প্রধান বিরোধী দলের সভাপতি এরশাদকে ২০১৪ সালে মৌখিক নিয়োগ দেয়া হলেও কোনও দাপ্তরিক আদেশ অথবা গেজেট বা সরকারি কোনো প্রজ্ঞাপণ প্রকশ হয়েছে এমন কোনও তথ্য টিআইবি পায়নি। জাতীয় সংসদের ১৮টি অধিবেশনের ৩২৭ কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূত উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৭৯ কার্যদিবস। বিশেষ দূত হিসেবে এরশাদকে কোনো প্রকার দায়িত্ব পালন করতেও দেখা যায়নি। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সর্ম্পক উন্নয়নের জন্য। তিনি এই পযর্ন্ত কোনো মুসলিম দেশে সরকারি দায়িত্ব নিযে সফর করেননি।  কিন্তু প্রতি মাসে তার পেছনে ৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

গত বছর জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ৩০ মিনিট কোরাম সংকটের কারণে অপচয় হয়েছে। এর প্রতি মিনিটে গড় অর্থমূল্য ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা। এই হিসাবে গত বছর কোরাম সংকটের সময়ের অর্থমূল্য ৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৩৮ টাকা। দশম জাতীয় সংসদে কোরাম সংকটের কারণে ১৫২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট সময় অপচয় হয়েছে। যার অর্থমূল্য ১২৫ কোটি ২০ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৫ টাকা। এরমধ্যে চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ অধিবেশনে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০১৭) মোট এই পাঁচ অধিবেশনে কোরাম সংকটের কারণে প্রতি কার্যদিবসে অপচয় হয়েছে ৩৮ ঘণ্টা তিন মিনিট। অধিবেশন চলাকালে সংসদের ব্যয় অনুযায়ী এই সময়ের অর্থমূল্য দাঁড়ায় ৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৩৮ টাকা।

গতকাল বৃহস্পতিবার  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দশম জাতীয় সংসদের পার্লামেন্ট ওয়াচ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সকাল ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। চলতি সংসদের ১৪তম থেকে ১৮তম অধিবেশন পর্যন্ত (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত অধিবেশন নিয়ে এই গবেষণা করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোরাম সংকট সব সময়ই ছিল। এখন সেটি গড়ে ৩০ মিনিট, যা উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের ভূমিকা পালনে ব্যাপক ঘাটতি দেখা যায়। বিরোধী দল হিসেবে যাদের উপস্থাপন করা হয়েছে, সংসদের শেষ দিকে এসে তাদের নিজেদের আত্মপরিচয়ের সংকট একাধিকবার তাদের নিজেদের মুখেই শোনা গেছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিশেষ দূত হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার দায়িত্ব থাকলেও তিনি তা পালন করেননি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান বিরোধী দলের চেয়ারম্যানকে (এরশাদ) ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তার এই নিয়োগের সরকারি কোনও গেজেট প্রকাশ হয়নি এবং কোনও দাফতরিক নির্দেশনাও পাওয়া যায়নি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, বিশেষ দূত হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল আধুনিক মুসলিমপ্রধান গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ঐতিহ্য বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানির বাজার প্রসারে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করা।

দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ (চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভুটান) সফর করলেও বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালনে ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের অনিয়মিত সদস্যদের তালিকাতেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম অন্যতম বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

 তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদে তিনি সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা খুব একটা না করলেও বাইরে বিশেষ করে দলীয় প্ল্যাটফর্মে কঠোর সমালোচনা করেন। এই সমালোচনা কতটুকু বাস্তব আর রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য সেটাও প্রশ্নের বিষয়।

টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দশম জাতীয় সংসদের মোট ১৮টি অধিবেশনের ৩২৭ কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত উপস্থিত ছিলেন ৭৯ কার্যদিবস। তার উপস্থিতি শতকরা ২৪ ভাগ। তিনি সংসদে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন আলোচনা পর্বে সংসদ সদস্যরা অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন মোট সময়ের ৫ শতাংশে। সদস্যদের ভেতরের প্রতিপক্ষ দল সংসদের বাইরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে ১৯৫ বার অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করেছে। বিশ্বব্যাংক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার হয়েছে ২৩ বার। সরকার ও বিরোধী দলের নেতা ও সংসদের বাইরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে বিভিন্নভাবে কটাক্ষ করা হলেও এ ধরনের আলোচনা বন্ধে স্পিকারের কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি দেখা যায়।

কোরাম সংকটের অর্থমূল্যের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা প্রাক্কলিত আনুমানিক অর্থমূল্য। এটাকে টিআইবি দুর্নীতি বলছে না। একটি ধারণা দেওয়ার জন্য এই অর্থমূল্যের প্রাক্কলন করা হয়েছে। সংসদে ৩৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। কোরাম হলো সংসদ অধিবেশন বসার ন্যূনতম যোগ্যতা। সংসদে ন্যূনতম ৬০ জন সদস্য উপস্থিত থাকলে কোরাম গঠিত হয়। সংসদে ৬০ জন সদস্য উপস্থিত না থাকলে কোরাম সংকট হয়।

টিআইবি তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করতে প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা। দশম সংসদের  চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ অধিবেশনের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০১৭)কোরাম-সংকট অষ্টম ও নবম সংসদের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসময়ে কোরাম-সংকট ছিল ৩৮ ঘণ্টা তিন মিনিট। এর অর্থমূল্য ৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৩৮ টাকা।

দশম সংসদের চতুর্দশ থেকে অষ্টাদম অধিবেশনের মোট ৭৬ কার্যদিবসের উপস্থিতির তথ্য বিশ্লষণ করে টিআইবি জানায়, সার্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের গড় উপস্থিতি প্রতি কার্যদিবসে ৩০৯ জন, যা মোট সদস্যের ৮৮ শতাংশ। এতে সময় ব্যয় হয় ২৬০ ঘণ্টা ৮ মিনিট। কার্যদিবস প্রতি  গড় বৈঠককাল প্রায় ৩ ঘন্টা ২৫ মিনিট। সবচেয়ে বেশি ২৫.৬ শতাংশ বাজেট আলোচনায় ব্যয়িত হয়। অন্যান্য পর্বের মধ্যে আইন প্রণয়নে ৯ শতাংশ, প্রশ্নোত্তর পর্বে মোট ১৪.১ শতাংশ সময়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিরোধী দল সরকারের অংশ হয়ে গেছে একথা আমরা আগেই জানিয়েছি। এটা এখন প্রমাণিত। কারণ বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরাই এখন এটা স্বীকার করছেন। টিআইবি জানায়, সংসদ অধিবেশনে অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। মোট সময়ের ৫ শতাংশ এর পেছনে ব্যয় হয়েছে। যার বিষয়ে রুলিং দেননি স্পিকার।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে প্রধান বিরোধী দলের সভাপতিকে ২০১৪ সালে নিয়োগ দেয়া হলেও কোনও দাপ্তরিক আদেশ অথবা গেজেট প্রকশ হয়েছে এমন কোনও তথ্য টিআইবি পায়নি। বিশেষ দূত হিসেবে তাকে দায়িত্ব পালন করতেও দেখা যায়নি। কিন্তু প্রতি মাসে তার পেছনে ৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

টিআইবির চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইনপ্রনয়ন করা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, এ কাজে মোট সময়ের মাত্র ৯ শতংশ ব্যবহার হয়েছে। আর প্রতি আইন পাসে মাত্র ৩৫ মিনিট সময় আলোচনা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এ উপদেষ্টার মতে, সরকার ও সরকার প্রধানের জনপ্রিয়তা ও প্রশংসায় অনির্ধানিত আলোচনার ১০ শতাংশ সময় ব্যয় হয়। আর প্রতিপক্ষের সমালোচনা ও নিন্দায় ২৬ শতাংশ সময় ব্যয় হয়। অথচ আইন প্রনয়নে মাত্র ৯ শতাংশ সময় ব্যয় হওয়া উদ্বেগজনক। টিআইবির তথ্য মতে, প্রতিবেশি দেশ ভারতে একটি আইন পাসে ২ ঘন্টা ১০ মিনিট আলোচনা হয় সংসদে। 

তিনি বলেন, যাদের জন্য আইন, সেই জনগণ কিন্তু অনেক সময় ভালোভাবে জানেনই না কি আইন পাস হচ্ছে ও বৈদেশিক কী চুক্তি হচ্ছে। এটা কিন্তু জনগণকে জানানো উচিৎ সরকারের। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, ১৯৯০ সালে আমরা মুক্ত নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করেছি। ‘আমার ভোট আমি দিব, যাকে খুশি তাকে দিব’ এটা ছিল আন্দোলনের স্লোগান। কিন্তু এখন দেখা যায় অনেক মানুষ মনেই করছে না তাদের ভোটাধিকার রয়েছে।

গবেষণাটি উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোরশেদা আক্তার, নিহার রঞ্জন রায় ও অ্যাসিসট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার অমিত সরকার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল। 

দশম সংসদের চতুর্দশ থেকে অষ্টাদম অধিবেশনের মোট ৭৬ কার্যদিবসের উপস্থিতির তথ্য বিশ্লষণ করে টিআইবি জানায়, সার্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের গড় উপস্থিতি প্রতি কার্যদিবসে ৩০৯ জন, যা মোট সদস্যের ৮৮ শতাংশ। এতে সময় ব্যয় হয় ২৬০ ঘণ্টা ৮ মিনিট। কার্যদিবস প্রতি  গড় বৈঠককাল প্রায় ৩ ঘন্টা ২৫ মিনিট। সবচেয়ে বেশি ২৫.৬ শতাংশ বাজেট আলোচনায় ব্যায়িত হয়। অন্যান্য পর্বের মধ্যে আইন প্রণয়নে ৯ শতাংশ, প্রশ্নোত্তর পর্বে মোট ১৪.১ শতশাংশ সময়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিরোধী দল সরকারের অংশ হয়ে গেছে একথা আমরা আগেই জানিয়েছি। এটা এখন প্রমাণিত। কারণ বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরাই এখন এটা স্বীকার করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ