ঢাকা, শনিবার 19 May 2018, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রমযানের প্রথম দিনেই চকের ইফতার বাজার সরগরম

চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতার। ছবিটি গতকাল শুক্রবার তোলা -সংগ্রাম

মুহাম্মদ নূরে আলম, চকবাজার থেকে ফিরে: এযেন এক উৎসবের নগরী। মেঘ বৃষ্টি রাস্তার কাদামাটি উপেক্ষা করে রাজধানী ঢাকাবাসী মুসলিম ভাই বোনেরা জুমআর নামাজের পর ছুটে চলে পুরান ঢাকার চকবাজারের মোঘল আমলের শাহী ইফতারি কেনার জন্য। চার হাজার বছরের পুরনো এই ঢাকা শহর। নগরের অলি-গলিতে ছড়িয়ে আছে কত ইতিহাস-ঐতিহ্য। তেমনি ঢাকার চকবাজার এলাকার নামটাও যেন ইফতারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ইফতারের ঐতিহ্য এখনও ধারণ করে আছে চকবাজার। রমযান মাস এলেই পুরোদস্তুর ব্যস্ত থাকে এই এলাকা। রমযানের প্রথম দিনেই চকের ইফতার বাজার হয়ে উঠে ব্যাপক সরগরম। বাংলায় ও ভারতে মোঘল শাসন বিলুপ্ত হলেও তাদের শাহী খাওয়া-দাওয়া ঐতিহ্য এখনও রয়ে গেছে। মোঘলদের খাবারের অধিকাংশই এখন ঢাকার ইফতারির আইটেম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। পুরান ঢাকার অধিবাসীরা শাহী মোঘলী ইফতারি দোকান থেকেই কিনতে অভ্যস্ত। অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারাও চকবাজারে আসেন লোভনীয় ইফতারি কিনতে।
জুমার নামাজের পর থেকেই এখানকার অস্থায়ী দোকানগুলোতে বাহারি ইফতারের পসরা নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। সুতি কাবাব, জালি কাবাব, টিক্কাসহ নানা পদে সাজানো হয়েছে টেবিল, নানা স্বাদের মুখরোচক খাবারের মনকাড়া সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই সুবাসকে উসকে দিচ্ছে বিক্রেতার হাঁকডাক ‘বড় বাপের পোলায় খায় ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়’। পুরান ঢাকার চকের ইফতার বাজারের সেই পরিচিত দৃশ্য। এক অন্যরকম আমেজ। কালের বিবর্তনে ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতারির বাজার যেন এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার প্রথম রমজানের দিন হওয়ায় এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পহেলা রমযানের দিন ছিল চকবাজারে ইফতারের উৎসবের মিলনমেলা।
বিক্রেতারা জানান, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা বাড়ির তৈরি ইফতারির চেয়ে দোকানে তৈরি ইফতারি দিয়েই ইফতার করতে অভ্যস্ত। যে কারণে পুরো রমযান জুড়েই চকের ইফতারির বাজার থাকে সরগরম। তবে শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দারাই নন, রাজধানীর অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারাও রমযানে চক বাজার থেকে ইফতার সামগ্রী কিনতে আসেন। এবার নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ইফতার সামগ্রীর দাম বেড়েছে বলে বিক্রেতারা জানান।
এ দিকে গতকাল পহেলা রমযানের দিন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন চকের ইফতার বাজার পরিদর্শনে ইফতারির খাদ্যসামগ্রিতে ভেজাল না মেশানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খাদ্যসামগ্রীর দাম বাড়ানো যাবে না। এবার ইফতারের দাম গত বছরের তুলনায় কম আর দাম বাড়বে না।
ঐতিহাসিক মতে, ১৮৫৭ সালের আগেই চকবাজারের বিখ্যাত ইফতারর বাজার গড়ে ওঠে ।’ নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ আছে, ‘১৮৫৭ সালের আগেই চকবাজার জমজমাট হয়। সে সময়েই চকবাজারে গড়ে ওঠে নানা রকম মুখরোচক খাবারের দোকান। রোজার সময় মোগলাই খাবার এবং রকমারি ইফতার বিক্রি করা হতো এখানে।’ শরবত ব্যবসায়ী আহমেদ হোসাইন দাবি করেন যে, তার দাদার বাবাও এখানে রোজায় শরবতের ব্যবসা করেছেন। তার হিসাবে, দেড়শ বছর ধরে চকবাজারে ব্যবসা করছে তার পরিবার। একই রকম তথ্য দেন চকবাজারের ইফতারর বিক্রেতা আবদুল কাহহার। তার মতে, ছয় পুরুষ ধরে বাজারে ইফতারর ব্যবসা তাদের। মোগল আমলে পুরনো ঢাকার চকবাজারের শাহী মসজিদের সামনে একটি কূপ ছিল। তার চারপাশে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে বিক্রি করা হতো হরেক রকম নবাবী ইফতার সামগ্রী। এখন সেই কূপ নেই, আগের মতোই মসজিদের সামনে রাস্তার উপর চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে বিক্রি করা হয় ইফতার সামগ্রী।
নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ আছে, ‘১৮৫৭ সালের আগেই চকবাজারে গড়ে ওঠে নানা রকম মুখরোচক খাবারের দোকান। রমজানের সময় মোগলাই খাবার এবং রকমারি ইফতারি বিক্রি করা হতো এখানে। এ সব ইফতার সামগ্রী শুধু নামে নয় স্বাদেও অনন্য।
গতকাল পুরনো ঢাকার পাশাপাশি রাজধানীর অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারাও চকবাজারে ছুটে আসেন ইফতার সামগ্রী কিনতে। ধানমন্ডি থেকে চকবাজারে ইফতারি কিনতে আসা বোরহান উদ্দিন  বলেন, এখন ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বাহারি ইফতার বিক্রি হয়। তারপরও প্রথম রমযানে চকবাজারে আসি ইফতার কিনতে। এখানে আসলে আলাদা এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করে, জানান তিনি। একইকথা বললেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আল মামুন। তিনি বলেন, এখানে ইফতার কিনতে না এলে মনে হয় রমযানই শুরু হয়নি। তবে প্রতিদিন তো আর সম্ভব হয় না। সবমিলিয়ে রমযানের ৪/৫ দিন এখান থেকে ইফতার কিনি।
কাবাবের বাইরে আছে ডিম চপ, কোয়েল, কবুতরের রোস্ট। শাহী হালিম, শাহী দইবড়ার পাশাপাশি আলুরচপ, পিয়াজু, বেগুনী, পাকোরা, ভেজিটেবল রোল, চিকেন রোল, বিফ রোল। মোগল বা নবাবী আমলের খাবারের সঙ্গে যোগ হয়েছে বিভিন্ন রকম ফাস্টফুড আইটেম। এখানে ঐতিহ্যবাহী ইফতার পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত খাবার হচ্ছে ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’। পুরান ঢাকার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাবার এটি। এ খাবারটি মোট ৩৬টি আইটেম ও ১৮টি মসলা দিয়ে তৈরি করা হয়। গরুর মগজ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, সুতি কাবাব, মাংসের কিমা, ডিম, আলু, ঘি, বুটের ডালসহ নানা পদের খাবার ও নানা ধরনের মসলার মিশ্রণে খাবারটি তৈরি করা হয়। আর মোট ৩১টি পদ দিয়ে যে মিশ্রণ তৈরি হয়, তারই নাম ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। জনপ্রিয় ইফতার সামগ্রী ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ প্রায় ৭৫ বছরের পুরনো বলে জানা যায়।
প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩’শ থেকে ৪৫০ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য খাবারের মধ্যে খাসির কাবাব প্রতি কেজি ৭০০, গরুর কাবাবের কেজি ৬০০ টাকা। খাসির রানের রোস্ট প্রতি পিস ৪৫০  থেকে ৫০০ টাকা, দেশি ছোট মুরগি রোস্ট ২৫০ থেকে শুরু করে ৩০০ ও ৪৫০ টাকা, কবুতরের রোস্ট ১৫০ টাকা। সুতি কাবাব গরুর ৫০০ টাকা, খাশির সুতি কাবাব ৬০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। জাল ফ্রাই চিকেন ছোট ২৫০ টাকা বড় ৪৫০ টাকা। এ ছাড়া চিকন জিলাপি কেজি ১২০ টাকা, বড় শাহী জিলাপি ২০০ টাকা, দইবড়া কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, চিকেন স্টিক পিস ৭০ থেকে ৯০ টাকা, জালি কাবাব ২০ থেকে ৪৫ টাকা, বিফ স্টিক ৩০ থেকে ৫০ টাকা, কিমা পরোটা ৩০টাকা, ৪০ টাকা, ৫০ টাকা প্রতি পিস, টানা পরোটা ২০ টাকা পিস, হালিম (বাটির আকারভেদে) ৬০ থেকে ৩০০ টাকা,জালি কাবাব ৩০ টাকা। বোরহানি ১২০ টাকা কেজি, ফালুদা বঢ় বাটি ৮০ টাকা এবঙ ছোট বাতি ৪০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ডিম চপ ১৫ টাকা, সমুচা ৫ থেকে ১০ টাকা, পনির সমুচা ৪ টাকা, পিঁয়াজু ৪ টাকা, আলুর চপ ৪টাকা, বেগুনি ৪ টাকা, শাক পিয়াজু ৪টাকায় করে বিক্রি হচ্ছে।রোজাদারের তৃষ্ণা মেটাতে রয়েছে লাবাং, মাঠা। আর সঙ্গে আছে পেশতা শরবত আর লাচ্ছি। মৌসুমি ফলের শরবতেরও রয়েছে বিশাল আয়োজন। ইফতারের আইটেম হিসেবে আরো আছে ফলের সমাহার।
শাহী জিলাপি: রমযানের মাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টির নাম শাহী জিলাপি। সাধারণ জিলাপির মতো হাতের তালুর আকারের না হয়ে, এই জিলাপির আকার হয় ভাত খাবার প্লেটের প্রায়। আমরা সবাই জানি, ময়দা, চিনি আর তেলই হলো জিলাপি তৈরির প্রধান উপকরণ। ময়দার মিশ্রণ তেলে ভেজে চিনির সিরায় ডুবিয়ে তৈরি জিলাপি যে খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তেলে ভাজা প্রচুর ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবারটি সব বয়সের মানুষেরই কালে-ভদ্রে অল্পই খাওয়া উচিৎ।
শাহী হালিম: ইফতারের টেবিলে আরেকটি জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার হলো হালিম। আর চকবাজারে এসে সেই হালিম নাম নিয়েছে শাহী হালিম। এর মূল উপাদান হলো গরু বা খাসির মাংস, পাঁচ রকমের ডাল আর নানা রকমের মশলা। সুস্বাদু এই খাবারটির চল সারা বছর ধরে থাকলেও রোজায় টেবিলে যেন থাকতেই হবে হালিম। মূলত ডাল দিয়ে তৈরি এই খাবারটিতে আছে প্রচুর পরিমাণে আমিষ। কাজেই পেট ভরানোর জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু হয় না। তবে খুব বেশি পরিমাণে না খাওয়াই ভালো।
রেশমি কাবাব: রেশমি কাবাব হতে পারে চিকেন বা বিফের। মুরগি বা গরুর হাড়ছাড়া গোশতে নানা ধরনের মশলা মাখিয়ে তৈরি হয় এই কাবাব। বাড়িতে রাইস ব্র্যান অয়েল বা অলিভ অয়েল ব্যবহার করে কিংবা তেলে না ভেজে গ্রিল করে তৈরি করলে এই খাবারটি বেশ স্বাস্থ্যকরই বলা চলে। তবে চকবাজার থেকে কেনা রেশমি কাবাবের স্বাস্থ্যকর হওয়ার সে সুযোগ নেই। তাই খাবার সময় লোভ একটু সামলাতেই হবে।
জালি কাবাব: শুধু চকবাজারের ইফতারে নয় আজকাল পুরান বা নতুন ঢাকার বিয়েতে খুব জনপ্রিয় খাবার এই জালি কাবাব। গরুর গোশতের কিমা এর মূল উপকরণ আর ভাজার সময় প্রচুর ফেটানো ডিম দিয়ে এর উপরে জালের মতো তৈরি করা হয় বলেই এর নাম জালি কাবাব। বোঝাই যাচ্ছে এই খাবারে কোলেস্টেরল আর ক্যালোরি দুই-ই আছে প্রচুর। তাই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রোগীদেরও এটা অতিরিক্ত খাওয়া উচিৎ নয়।
মসজিদের পাশেই কাবাব বিক্রেতা সুলতান মিয়াকে খোলা খাবার বিক্রি করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাবার ঢেকে রাখলে নষ্ট হবে। তাই খোলা রাখা হয়েছে।
ইফতার সামগ্রীর দাম বাড়তি প্রসঙ্গে বিক্রেতা হোসেন বললেন, এ বছর গরু ও খাসির মাংসের দাম অনেক বেড়েছে। এ ছাড়া ছোলা, চিনিসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়তি। এজন্যই ইফতার পণ্যের দাম বেড়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ