ঢাকা, শনিবার 19 May 2018, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মেয়র কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি

খুলনা অফিস : খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। মেয়র পদের প্রার্থীদের জন্য যে পরিমাণ ভোট পড়েছে তার চেয়েও প্রায় সাড়ে ২২ হাজার বেশি ভোট পড়েছে সাধারণ কাউন্সিলর পদের বিপরীতে।
নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী বলছেন, একজন ভোটারের তিনটি করে ভোট দেয়ার কথা এবং তিনটি ভোটই সমান থাকার বিধান রয়েছে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, মেয়র পদে ভোট প্রদানের হার ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ, কাউন্সিলর পদে ৬৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে এই হার ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলীর সই করা মেয়র পদে বেসরকারি প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, এই নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা তিন লাখ ছয় হাজার ৬৩৬। মোট ভোট প্রদানের হার ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল কবির, মো. মাহফুজুর রহমান, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, মো. ওয়ালিউল্লাহ, মো. বজলুল রশিদ, কল্লোল বিশ্বাস, এম মাজাহারুল ইসলাম, মো. হুমায়ুন কবীর, মো. আনিসুর রহমান ও এ টি এম শামীম মাহমুদের সই করা ফলাফল অনুযায়ী ৩১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মোট ভোট পড়েছে তিন লাখ ২৯ হাজার ৯১টি। যা মেয়র পদে গণনা হওয়া মোট ভোটের চেয়ে ২২ হাজার ৪৫৫টি বেশি। এ ক্ষেত্রে ভোট প্রদানের হার ৬৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
ফলে মেয়র পদের চেয়ে কাউন্সিলর পদে এই সাড়ে ২২ হাজার ভোট কিভাবে বেশি পড়ল তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে মো. ইউনুচ আলী বলেন, ভোটকেন্দ্রের সব দায়-দায়িত্ব প্রিজাইডিং অফিসারের। তাঁরা যে তালিকা পাঠিয়েছেন সেগুলো তাঁরাই হিসাব করে পাঠিয়েছেন।
একইভাবে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল কবির, মো. মাহফুজুর রহমান, মো. বজলুলর রশিদ, কল্লোল বিশ্বাস, মো. ওয়ালিউল্লাহ, এম মাজহারুল ইসলাম, মো. হুমায়ুন কবীর, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, খলিলুর রহমান ও এ টি এম শামীম মাহমুদ স্বাক্ষরিত ১০টি সংরিক্ষত ওয়ার্ডের ফলাফল তালিকায় দেখা গেছে, সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের জন্য মোট প্রদত্ত ভোটের যোগফল তিন লাখ পাঁচ হাজার ৬৩৫। ভোট প্রদানের হার ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা সাধারণ কাউন্সিলর ও মেয়র পদে প্রদত্ত ভোটের চেয়ে কম।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া ফলাফলে দেখা যায়, ১০ নং ওয়ার্ডের ৭৩ নং নয়াবাটি হাজি শরীয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ভোটার এক হাজার ৮১৭ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন এক হাজার ৮১৬ জন। অর্থাৎ মাত্র একজন ভোটার ভোট দেননি। ভোটদানের হার ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর মধ্যে মেয়র পদে নৌকা প্রতীক পেয়েছে এক হাজার ১১৪ ভোট, ধানের শীষ পেয়েছে ৩৭৩ ভোট, লাঙল তিন ভোট, কাস্তে তিন ভোট ও হাতপাখা প্রতীক ৭৬টি ভোট পেয়েছে। বাতিল হয়েছে ২৪৭টি ভোট।
এই কেন্দ্রটি পড়েছে খালিশপুরের অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরেই এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। এবার নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী যুবলীগ নেতা তালাত হোসেন কাউট।
জানা গেছে, এই কেন্দ্রের সব ভোটারই নারী। কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের জন্য বুথ ছিল তিনটি। সেই হিসাবে একজন ভোটারের ভোট দিতে যদি তিন থেকে চার মিনিট করেও সময় ব্যয় হয় তাহলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এত ভোটারের ভোট দেয়া সম্ভব নয়।
১০ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও এবারের নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী ফারুখ হিল্টন অভিযোগ করেন, এই কেন্দ্রের মৃত ভোটারদের ভোটও দেয়া হয়েছে। এই কেন্দ্রের ব্যালট পেপারের মুড়ি বইতে কোনো ভোটারের সই বা টিপসইও নেই। একইভাবে ব্যালট পেপারের পেছনে যে গোল সিল প্রয়োজন হয় তাও নেই। তিনি এসব অভিযোগ ভোট গ্রহণের দিন লিখিত আকারে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও দায়িত্বরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। তাঁরা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অভিযোগ জানাতে বলেন। আবার রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্ব প্রিজাইডিং কর্মকর্তার, তিনিই সব করতে পারেন।
একই ধরনের চিত্র ছিল নগরীর ৭৪ নং মাওলানা ভাষানী বিদ্যাপীঠ স্কুল ভবনের দ্বিতীয় তলার পুরুষ ভোট কেন্দ্রে। এখানে এক হাজার ৫০৩ ভোটের মধ্যে এক হাজার ৪৬৭টি ভোট পড়েছে। যার হার ৯৭ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এসব চিত্র দেখিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষরযুক্ত শিট তাঁদের কাছে এসেছে, ওর ভিত্তিতেই তাঁরা ফলাফল করেছেন। প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে বার বার বলে দেয়া হয়েছে একজন ভোটার তিনটি ভোট দেবে এবং তিনটি ব্যালট পেপার বাক্সে ফেলবে। ব্যালট পেপারের মুড়ি বইতে ভোটারের সই বা টিপসই থাকতে হবে। একইভাবে ব্যালট পেপার দেয়ার আগে গোল সিল মারতে হবে। তবে, একটি কেন্দ্রে ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট দেয়া সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এই কর্মকর্তা।
অনিয়মের কারণে কেসিসিতে স্থগিত থাকা তিন কেন্দ্রে ৩০ মে পুনরায় ভোট : খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ ৩১ নং ওয়ার্ড এবং সংরক্ষিত ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি কেন্দ্রের স্থগিত করা ভোট আগামী ৩০ মে গ্রহণ করা হবে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেসিসি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আজ শনিবার নির্বাচন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রিটার্নিং অফিসার মো. ইউনুচ আলী বলেন, গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত কেসিসি নির্বাচন চলাকালে সাধারণ ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইকবাল নগর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (একাডেমিক ভবন-২) এবং ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের লবণচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় কেন্দ্রে অনিয়মের কারণে ভোট গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
বাজেট দেবেন বিদায়ী মেয়র : খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)-এর নতুন পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণে এখনও অন্তত ৪ মাস অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর বর্তমান পর্ষদের ৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এর পরের দিন ২৬ সেপ্টেম্বর দুই পর্ষদের মধ্যে অনুষ্ঠানিক ভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর ও গ্রহণ হবে। তবে বর্তমান দায়িত্বরত পর্ষদ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা করবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনে নতুন পর্ষদ সম্পূরক বাজেট ঘোষণা করতে পারবে।
কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, কেসিসির চতুর্থতম ভোট গ্রহণ গত ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেককে বিপুল ভোটে হারিয়ে বর্তমান মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বিজয়ী হন। তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানসহ বিজয়ী পর্ষদ ২১ জুলাই শপথ গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানিক ভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২৫ সেপ্টেম্বর এবং প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় ২৬ সেপ্টেম্বর। এরপর কর্পোরেশনের নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী ৫ বছর পূর্তির ৪ মাস আগে চলতি বছরের গত ১৫ মে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের তালুকদার আব্দুল খালেক ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ২৫১ ভোট। এ অবস্থায় নির্বাচনে নব-নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের নিয়ে গঠিত নতুন পর্ষদ আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করবে। ওইদিন দুই পর্ষদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে দায়িত্ব গ্রহণ ও হস্তান্তর অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে নব-নির্বাচিত মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কাউন্সিলররা স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রী শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। তবে বর্তমান দায়িত্বরত পর্ষদ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা করবে। পরবর্তী প্রয়োজনে নতুন পর্ষদ সম্পূরক বাজেট ঘোষণা করতে পারবে।
কর্পোরেশনের বাজেট কাম একাউন্ট অফিসার কাজী জাকিরুল হাসান বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। বর্তমান দায়িত্বরত পর্ষদ বাজেট ঘোষণা করবেন। পরবর্তীতে প্রয়োজনে নতুন পর্ষদ সম্পূরক বাজেট ঘোষণা করতে পারবেন।
কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পলাশ কান্তি বালা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর দুই পর্ষদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ ও হস্তান্তর হবে। এরপরে নতুন পর্ষদ তাদের কার্যক্রম শুরু করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ