ঢাকা, শনিবার 19 May 2018, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরালেই ঠুস’

-ইসমাঈল হোসেন দিনাজী
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন : ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যামসমান।’ কবি জীবনের গান অনেক গাইলেও মরণকে বিস্মৃত হননি। তবে তিনি সহজে মরতে চাননি। পৃথিবীতে বাঁচতে চেয়েছিলেন কবি অনেক দিন। বেঁচেও ছিলেন। অনেক রস আর আস্বাদ উপভোগ করেছেন। কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এ তাঁর ভাগ্য বটে। কিন্তু মৃত্যু তাঁকেও ছেড়ে দেয়নি। ছাড়ে না কাউকেই।
জীবনের প্রতি একান্ত বিতৃষ্ণ না হলে কেউ মৃত্যুকে শ্যামের মতো কারুর কাম্য হতে পারে না। সুখি-সমৃদ্ধ কেউ মরতে চায় না। জীবনের সর্বস্ব অর্জন বিলিয়ে দিয়েও মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চায়। পৃথিবীর রূপ-রসের মজা যারা পেয়েছে তারাতো বাঁচতে চায়ই। অপেক্ষাকৃত কম সুখি মানুষও নিজের জীবন দীর্ঘ করতে পাগলপারা। পৃথিবীর মায়া-মমতার বিরাট আকর্ষণ মানুষ সহজে ভুলতে চায় না। কেবলই তাকে টেনে ধরে। তাইতো মৃত্যুকে শ্যামসুন্দর কল্পনা করেও কবি আবারও বলে ওঠেন :
‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।’
হ্যাঁ, পৃথিবীতে বেঁচে থাকবার চিরন্তন আকুতি বা প্রার্থনাই হচ্ছে এটা। ‘কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মওত’ অর্থাৎ ‘সকল প্রাণিকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’ বা ‘জন্মিলে মরিতে হইবে’ একথা মানুষ ভুলেই যেতে চায় অবলীলায়।
মানবজাতির জন্য একমাত্র পরিপূর্ণ জীবনশৈলী ইসলামে আত্মহনন নিষিদ্ধ। কেবল নিষিদ্ধই নয় অপরাধও। কেউ আত্মহত্যা করতে চাইলে তা দুনিয়াতে যেমন অপরাধ বলে গণ্য হয়, তেমনই তা পরকালেও শাস্তিযোগ্য বলা হয়েছে। ইসলাম ব্যতীত অন্য অনেক সমাজেও আত্মহনন নিষিদ্ধ।
১০৪ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানী ডেভিড গুডাল আত্মহননের জন্য শেষপর্যন্ত দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ড গেলেন। কারণ তাঁর নিজদেশে আত্মহনন নিষিদ্ধ। তাই বিদেশ গিয়ে তিনি জীবনাবসান ঘটালেন।
গত ৯ মে বৃহস্পতিবার একটি লাইফ সার্কেল সুইজ ক্লিনিকে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক প্রাণনাশক ওষুধের সাহায্যে ডেভিড গুডাল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। স্বেচ্ছামৃত্যু অধিকার সংগঠন এক্সিট ইন্টারন্যাশনাল এ খবর দেয়। উল্লেখ্য, গুডাল দীর্ঘদিন এ সংগঠনের মেম্বার ছিলেন। খবর আইএএনএস-এর।
মৃত্যুর আগে গুডালের পরিবারপরিজন এবং স্বেচ্ছামৃত্যু অধিকারের আইনজীবী তাঁকে শেষবারের মতো তাঁর সিদ্ধান্ত ভেবে দেখতে বলেন। গুডালকে মত বদলাতে চাপও দেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু না, তিনি কারুর কোনও কথায় টলেননি।
গুডাল মৃত্যুর প্রবল আগ্রহ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না। এ জীবন শেষ করে দেবার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত।’ অস্ট্রেলিয়ায় স্বেচ্ছামৃত্যুর আইনগত স্বীকৃতি না থাকায় প্রবীণ এ বিজ্ঞানী সুইজারল্যান্ড পাড়ি জমান। উল্লেখ্য, তিনি কোনও অসুখে আক্রান্ত হয়ে মরতে চাননি। তবে মৃত্যুও একরকম অসুখ।  কেবল শুয়ে শুয়ে বেঁচে থাকা, অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করে চলা কিংবা ডাক্তারের পরামর্শ মাফিক ওষুধ সেবন করে দমটাকে আটকে রাখাকে গুডাল হয়তো জীবন মনে করেননি। তাই তিনি হিমশীতল কঠিন মৃত্যুকেই বুকে জড়িয়ে ধরেছেন।
পরিবেশ ও উদ্ভিদবিদ ডেভিড গুডাল অস্ট্রেলিয়ার পার্থে এডিথ কাওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ বছর গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। কিন্তু ১০২ বছর বয়সে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তাঁর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাসায় কাজ করতে অনুমতি দেয়। কিন্তু গুডাল এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নারাজ ছিলেন। তাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই কাজ করতেন।
সত্তুর বছরেরও অধিককালের ক্যারিয়ারে পরিবেশ নিয়ে শতাধিক গবেষণাপত্র লেখেন গুডাল। অবসরে থেকে 'ইকোসিস্টম অব দ্য ওয়ালর্ড' বুক সিরিজের ৩০ টি পা-ুলিপি সম্পাদনা করেন। ২০১৬ সালে গুডাল অস্ট্রেলিয়ার সম্মানজনক পদক 'অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া' লাভ করেন। জন্মসূত্রে বৃটিশ এই বিজ্ঞানী মনে করতেন তাঁর মতো প্রবীণদের নাগরিত্বের পাশাপাশি সরকারি তরফ থেকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারও দেয়া উচিত।
এটা ডেভিড গুডালের জন্য কাম্য হতে পারে। তিনি স্বেচ্ছামৃত্যু কামনা করেন। তবে পৃথিবীর সব মানুষ বিজ্ঞানী গুডাল নয়। কেউ কেউ স্বেচ্ছামৃত্যু কামনা করলেও সবাই মরতে চায় না। পৃথিবীর মায়া কেউ ছাড়তে চায় না। দেহ থেকে প্রাণবায়ু বেরোনোর আগ পর্যন্ত মানুষ পৃথিবী আঁকড়ে থাকতে আগ্রহী। তবে ডেভিড গুডাল ব্যতিক্রম। জীবনের প্রতি গুডাল বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিলেন বলেই তিনি হয়তো বেঁচে থাকতে চাননি।
ডেভিড গুডাল ১০৪ বছর বয়সে শেষতক  স্বেচ্ছামৃত্যুবরণ করলেনই। কেউ তাঁকে থামাতে পারেননি। স্বাভাবিক মৃত্যু হলে হয়তো আরও কয়েক বছর পৃথিবীর আলো-বাতাস উপভোগ করতে পারতেন। তবে তা তিনি নিজেই চাননি। এজন্য নিজদেশ ছেড়ে তাঁকে ভিনদেশ পাড়ি দিতে হয়েছে। সম্ভবত স্বেচ্ছামৃত্যুর সময় তাঁর কোনও আত্মীয়স্বজনও কাছে ছিলেন না। কারণ তাঁরা গুডালের এ মৃত্যু চাননি। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছামৃত্যু সংস্থাই গুডালের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে। তিনি এ সংস্থার সদস্য ছিলেন।
গুডালের চাইতে বেশি বয়সে মানুষ বাঁচেন না, এমন নয়। এ যুগেও ১৩০/১৪০ বছর মানুষ বেঁচে থাকবার নজির স্থাপন করছেন। এইতো কিছুদিন আগে পৃথিবীর দীর্ঘজীবীতম মানুষটি মারা গেলেন। অবশ্য আদিযুগের মানুষ আরও অধিক কাল বেঁচে থেকেছেন। মানুষের কয়েক শ' বছর বেঁচে থাকবার ইতিহাসও আছে। কাজেই গুডাল তাঁর আয়ুর শেষপর্যায়ে পৌঁছেছিলেন এমন নয়।
আত্মহনন বা স্বেচ্ছামৃত্যু আসলে সুস্থমানসিকতার লক্ষণ নয়। অসুখ-বিসুখ মানুষের হয়। মানসিক রোগও থাকতে পারে কারুর কারুর। তাই বলে স্বেচ্ছামৃত্যু বুদ্ধিমান ও বিবেকসম্পন্ন মানুষের কাম্য হতে পারে না। ডেভিড গুডাল যা করেছেন তা আবেগে করেছেন। এজন্য চিকিৎসকরা তাঁকে সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে বারবার অনুরোধ করেছেন। পরিবারের লোকেরাও গুডালের স্বেচ্ছামৃত্যুর বিরুদ্ধে ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় তো আইনতই স্বেচ্ছামৃত্যু নিষিদ্ধ। এজন্য গুডালকে জন্মভূমি ছেড়ে সুইজারল্যান্ড পালাতে হয়। এতেও বোঝা যায় বিজ্ঞানবিদ গুডাল তাঁর মস্তিষ্কের  স্বাভাবিকতা হারিয়েছিলেন। যারা আত্মহত্যা করেন তাঁরা সুস্থ নন। স্বাভাবিক নন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তাঁরা।
গুডালের মতো ২/১ জন বিজ্ঞানী স্বেচ্ছামৃত্যু কামনা করলেও সবমানুষ তেমন মরণ প্রত্যাশা করেন না। কারণ মৃত্যু অনেক ভয়ঙ্কর। মৃত্যু অবধারিত। ছাড় দেবে না কাউকেই। মৃত্যু যখন এসে যাবে তা রোধ করবার ক্ষমতা কারুর থাকবে না। এর হিমশীতল স্পর্শ থেকে রেহাই নেই মানুষের। শুধু মানুষ কেন, কোনও প্রাণিরই রক্ষা নেই এর ছোঁয়া থেকে।
বেঁচে থাকতে মানুষের দাপটের শেষ নেই। আশা-আকাক্সক্ষারও অবধি নেই। হেন করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা। লাঠি মে মুগুর ভরেঙ্গা। কাকে মারবে, কাকে ধরবে এমন অনন্ত ভাবনা মানুষকে পেয়ে বসে। কিন্তু জীবনবায়ু ফুঁস করে বেরুলেই খেল খতম। ওই যে একটা গান আছে না, 'হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরালেই ঠুস।' মানুষের নিঃশ্বাস বেরুলেই সব শেষ। আর কিছু করবার ও ধরবার নেই। সব মামলা ডিসমিস।
তবে এটা সত্য যে, মানুষ স্বেচ্ছামৃত্যুবরণ করুক বা স্বাভাবিক মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করুক যেতেই হবে। ডেভিড গুডাল যেভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন তা অস্বাভাবিক। অমানবিকও। এমন মৃত্যু মানুষের কাম্য নয়। অন্তত বিবেকসম্পন্ন মানুষেরতো নয়ই। গুডাল বিজ্ঞানী ছিলেন। মানুষকে জীবনের সন্ধান দিতেন। বাঁচতে শেখাতেন। কিন্তু তিনি নিজে পরাজিত হলেন। হার মানলেন। তবে এ হার কারুর প্রত্যাশিত ছিল না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ