ঢাকা, শনিবার 19 May 2018, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাইনাস ফর্মুলার রাজনীতির হালহকিকত

এম. কে. দোলন বিশ্বাস : [দুই]
এছাড়া ষাট বছর দাউরা হাদিস পড়ানো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা হযরত আজিজুল হক আমীনীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারে সূচনাতেই ‘চোর’, ‘ডাকাত’, ‘সন্ত্রাস’ ‘ঠকবাজি’ প্রভৃতি অরুচিপূর্ণ শব্দাবলি দ্বারা আখ্যায়িত করতে দেখা গেছে এদেশের কতিপয় রাজনৈতিক লীডারদের। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে ওই বজুরগো ব্যক্তিকে পুলিশী গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে জেল-হাজতেও রাখা হয়েছে চোর-ডাকাতদের সঙ্গে। এতেও এদেশের রাজনীতিবিদদের তেমন কোনো টনক নড়ার নজির নেই। তবে জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমীর মুফাচ্ছিরে কোরআন আন্তর্জাতিক ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীর বিরুদ্ধে দায়ের করা তথাকতিথ যুদ্ধাপরাধী মামলায় ফাঁসির রায় ঘোষণার পরপরই দেশব্যাপী তওহীদী জনতা গর্জে উঠে রাজপথে নামেন। অনেক মানুষ জীবন বিসর্জনও দিয়েছেন। কিন্তু যা করার তা ক্ষমতাবানরা করায় সবকিছু নীরবে সহ্য করতে হচ্ছে অক্ষমতাবানদেরসহ ভুক্তভোগীদের।
মাইনাস ফর্মুলাটি প্রয়োগ করতে জাসদ নেতারা কাজের কাজি। যেমন হুট করে জাসদ থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে প্লাস বা যোগ হয়ে প্রথমে গণতন্ত্রের হাউজে প্রবেশ। তৎপর মন্ত্রণালয়ে ভাগ বসিয়েছেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু সাহেব। তাও আবার তথ্যমন্ত্রণালয়ে। এটা অবশ্যই বাস্তব যে, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে জাসদ ক্ষমতার বাইরে থেকে সরকারের গঠমূলক সমালোচনা করুক তা দলের নেতাদের কাম্য না থাকায় মন্ত্রণালয়ে ভাগবসানোটা সম্ভব হয়েছে।
জাসদ একটি বিপ্লবী দল বলে দাবি করেন দলটির নেতারা। বিপ্লব মানেই উন্নয়ন। বিপ্লব মানেই পরিবর্তন। এমনটি দাবি জাসদ নেতাদের। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও প্রতিহিংসামূলক নাশকতা উন্নয়নের বিপরীত। যা বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন ইসলামী দলগুলোতে বিরাজমান। এমন নির্লজ্জ বয়ান জাসদ নেতাদের।
দিন বদলে গেলেও ইসিহাস কখনো বদলায় না এমনটি দাবি যেমন ইতিহাসবিদদের। তেমন আমাদেরও। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, ১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাসদ বিপ্লবের জন্য বেছে নিয়েছিল। ওই দিন জাসদ নেতারা তান্ডব চালায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। এতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় থানা, রক্ষীবাহিনী, বিডিআর ক্যাম্প। বাদ যায়নি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলী সাহেবের বাসভবনও। ওইসব স্থাপনায় অতর্কিতভাবে আক্রমণ চালায় বিপ্লবী নামধারী জাসদ ভক্তবৃন্দ। যার দরুন ওইদিন সন্ধ্যার আগেই জনশূন্য হয় রাজধানীর পথ-ঘাট। এদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে মস্কো যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সরকারকে জাসদ কতটুকু অন্তর দৃষ্টিতে দেখে সে বিষয়ে সামান্যতম হলে জেনে রাখা প্রয়োজন। স্বাধীনতার পর জাসদ এবং গণবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গত ৪ জুলাই জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদের দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে ৬জুলাই জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া গণমাধ্যমে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতি উল্লেখ করেন ‘১৯৭৫ সালে যখন সংসদীয় রাজনীতি অনুপস্থিত, তখন প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েই জাসদ গণবাহিনী গঠন করে। গণবাহিনী সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কখনো গোপন ষড়যন্ত্র বা বেঈমানির পথে পা বাড়ায়নি। বরং সে সময় যারা চাটুকারিতার আড়ালে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তারাই খোন্দকার মোশতাক বা কাজী ফিরোজ রশীদের মতো প্রথম সুযোগেই বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের পিঠে ছোবল হানে।’
ওই বিবৃতিতে জাসদ নেতাদ্বয় গণবাহিনীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘গণবাহিনী সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।’ আমরা মনে করি, যে দল অন্য দলকে সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করে পরগাছার ন্যায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগিদার হয় এবং অপরের অকৃত্রিম করুণায় ললাটে মন্ত্রণালয় মিলে। সেই দলের ওপরও জাসদ নেতাদের বিষেধগার করতে কুণ্ঠিতবোধ করতে দেখা যায় না।
জাসদের নোংরামি রাজনীতি সহজেই পরিসমাপ্তি নয়। বরং অনেক দীর্ঘ। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু মার্চে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ওই নির্বাচনেরও জাসদ বিরোধিতা করে। আক্রোশটা মূলত বঙ্গবন্ধুর ওপর ছিল। ওই সময় জানুয়ারি মাসে তৎকালীন জাসদ সভাপতি মেজর এম এ জলিল এক বিবৃতি দেন। এতে বলা হয়- ‘আজ যখন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তখন সত্যই মর্মাহত হতে হয়। হৃদয় নিংড়ায়ে কান্না আসে। কারণ, যেসব বীর সৈনিকেরা সবকিছু বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, আজ তাদের দুঃখের সীমা নেই, তাদের ঘর নেই, খাবার নেই, এমনকি অনেকেই ‘রাজাকার’ বলে ধিক্কার পাচ্ছে। যুদ্ধের সময় শত্রুর ঘরে গ্রেনেড ফাঁটাতে গিয়ে সেই চার্জে আজ তারা অনবরত জেলেও যাচ্ছে। আবার সেদিনের ঘটনা, লে. কর্নেল জিয়াউদ্দিনকে ও লে. কর্নেল তাহেরকে আর্মি থেকে বিনা বিচারে (ডিসমিস) Dismiss করা হয়েছে। অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির একটা সীমা থাকে, বঙ্গবন্ধু। হয়তো এইভাবে ধীরে ধীরে একদিন বাংলার গোটা সামরিক বাহিনী স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু কেন এটা কি তাহলে তোমার ক্ষমতা লোভের প্রকাশ, না কোনো বন্ধু মহলের কুইঙ্গিত।’
আমরা বলতে চাই, সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করতেই মূলত উসকানিমূলক ওই বিবৃতিটি জাসদের পক্ষে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে নির্বাচনের ছয় মাস পরে ১৯৭৩ সালের ১লা সেপ্টেম্বরে এক প্রচারপত্রে জাসদ ঘোষণা করে, ‘ভারতের পঁচাত্তরটি বিড়লা-টাটাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী ও বর্তমান সোভিয়েতের ব্রেজনেভ কোসিগিন প্রতিক্রিয়াশীল চক্রে’র প্রতিনিধি শেখ মুজিবের ‘ফ্যাসিস্ট জাতীয় বিশ্বাসঘাতক সরকারকে উৎখাত করার জন্য, ঘুণে ধরা এই সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন সমাজের ভিৎ রচনা করার জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করবো।’
ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছিল- ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে একপর্যায়ে স্তব্ধ করে দিয়ে বিদেশী শক্তির সহায়তায় বর্তমান ক্ষমতাসীন চক্র যেদিন বাংলার মসনদে উড়ে এসে জুড়ে বসল, সেদিন থেকেই এ দেশের মানুষের আরেক দুঃখের রজনী শুরু হলো। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ নয় মাসের সমস্ত আশা সমস্ত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যেতে দেখল মানুষ।’
সরকারের প্রতি যাতে সাধারণ মানুষের ঘৃণার সৃষ্টি হয় এমন লক্ষকে সামনে রেখেই জাসদ ওই ধরণের হিংসাকক্ত ভাষায় বিবৃতি দিতো। আর ওইরকম বিবৃতিতে রুশ বিপ্লব ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চেয়ে জাসদ অনেকগুণে বড় এমন স্লোগানের বোমা ফাঁটানো হতো। এতে সরল ও বোকা প্রকৃতির মানুষরা মনে করত জাসদের বিপ্লবেই বুঝি মুজিবের পতন অতিআসন্ন। এছাড়া ১৯৭৪ সালে বিপ্লবী নামধারী ওই জাসদ ‘মেহনতী মানুষের সার্বিক মুক্তির’ লক্ষ্যে মুজিব সরকার কে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার’ আখ্যায়িত করে সরকারের উৎখাত দাবি জানিয়েছিল।
আজ সহসায় প্রশ্ন ওঠে, স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধুর সরকারকেই যখন ‘ফ্যাসিস্ট সরকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করার হিম্মত দেখাতে জাসদ বিন্দুমাত্রও কার্পণ্য করেনি। সেজায়গায় বেগম খালেদা জিয়া আর কতটুকুই খাতির বা সম্মান পেতে পারে সমাজবান্ধব রাজনৈতিক দল পরিচয় দানকারী জাসদের নিকট।
তবে সময়ই হয়তো একদিন বলে দিবে বিএনপি’র চেয়ে জাসদের অর্জন কতগুণে কম না বেশী। ওই সু-দিনের অপেক্ষায় হয়তো আরও কিছু দিন সব ধরণের পরিস্থিতি ধৈয্যের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে জাতীয়তাবাদী শক্তি পক্ষে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি’র ভক্তবৃন্দদের। সেই সাথে আমাদেরও এই দিনকে নিয়ে যেতে হবে সেই দিনের কাছে। যে দিনটা হবে সব পক্ষের জন্য মঙ্গলময়। [সমাপ্ত]
লেখক : এম. কে. দোলন বিশ্বাস দৈনিক সংবাদের সাবেক সহ-সম্পাদক
dulonbiswas@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ