ঢাকা, শনিবার 19 May 2018, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এমন ইসির অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ সুষ্ঠু হবে না

আবু মুনীর : দুই সিটি নির্বাচন ইংরেজি হলো Two Cities Election. খুলনা ও গাজীপুর দুটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ১৫ মে ২০১৮ খ্রিঃ তারিখে অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে দিন ধার্য্য করা হয়। বাংলাদেশে মোট ১২টি সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। ১২তম সিটি কর্পোরেশন হলো ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন যা বিগত ২ এপ্রিল ২০১৮ খ্রিঃ তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন বাংলাদেশের ১১তম সিটি কর্পোরেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ২০১৩ সালে ৭ জানুয়ারী যা আয়তনে সর্ববৃহৎ সিটি কর্পোরেশন। আয়তন ৩২৯.৫৩ বর্গকিলোমিটার। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত প্রথম মেয়র হলেন অধ্যাপক এম.এ মান্নান। ১৯৮৪ সালে ১০ ডিসেম্বর খুলনা পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে যার আয়তন ৪৫.৬৫ বর্গকিলোমিটার এবং নির্বাচিত প্রথম মেয়র ছিলেন শেখ তৈয়বুর রহমান। দেশে পাঁচস্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে সিটি কর্পোরেশন। কারণ ঢাকা (উত্তর ও দক্ষিণ) সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র দু’জন প্রত্যেকেই পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদা প্রাপ্ত এবং অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়রগণ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা প্রাপ্ত। খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনি কার্যক্রম প্রার্থী এবং জনগণ যখন অতি উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে পরিচালনা করছিল তখনেই গাজীপুর সিটি নির্বাচন ৬ মে একটি রিট পিটিশনের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্থগিত ঘোষণা করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন কেন স্থগিত হয়েছে তিনি তা জানেন না।
টেলিভিশনের খবরে তিনি স্থগিত আদেশের কথা শুনেছেন। নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলাল উদ্দিন বলেছেন, তিনি রিট পিটিশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আদেশের পরে তারা সবাই এ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদার বলেছেন যে, তিনি খবরটি শুনে বিস্মিত হয়েছে এবং জানিয়েছেন যে, তিনিও এর কারণ জানেন না এবং তথাপিও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রির্টানিং অফিসারকে যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
এটা কি নির্বাচন কমিশনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা নয়? দেশের সচেতন জনগণ এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এ ষড়যন্ত্র মূলক কাজের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ দায়ী করেছেন এবং অবিলম্বে এই ব্যর্থ নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবী করেছেন। এক সেমিনারে ডঃ কামাল হোসেন বলেছেন, আওয়ামীলীগ প্রার্থী ১০ শতাংশ ভোটও পাবেনা জেনেই সরকার হাইকোর্টের মাধ্যমে গাজীপুরের নির্বাচন স্থগিত করিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা আরো বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী যে জনগণ দেশের প্রকৃত মালিক সেই জনগণকেই বর্তমান সরকার অসহায় বানিয়ে ফেলেছে। ডঃ কামাল হোসেনও আপিলের মাধ্যমে হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবী জানিয়েছেন।
 ইসি ২৬ জুন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোট গ্রহণের নতুন তারিখ ঘোষণা করেছেন। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশের বাধা কাটার পর কমিশন এক সভায় নির্বাচনের তারিখ চুড়ান্ত করেছেন।
১৫ মে খুলনা সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন হ-য-ব-র-ল- এর মাধ্যমে শেষ হয়েছে। ভোট ডাকাতি, ব্যালট ছিনতাই কেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে কেসিসি নির্বাচন সম্পূর্ণ হয়েছে। নীরব জালিয়াতির মহোৎসবেও তৃপ্ত ইসি। নৌকা মার্কার আওয়ামীলীগ প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক কেসিসির মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।
বর্তমান সরকার ও আজ্ঞাবহ পুতুল ইসির অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করা সম্ভব নয় এটাই প্রমাণিত হলো। ২০০০ সালে ৮ মে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোঃ আবু হেনার পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজে নতুন এক সম্ভবনার সৃষ্টি করেছিল এবং বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতির ক্ষেত্রে এক পারস্পরিক আলোচনার নতুন সুযোগের সৃষ্টি করেছিল। যত দিন তিনি দায়িত্বে ছিলেন, সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনের চিন্তার কোনো সুযোগ ছিল না। ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বরে চার দলীয় ঐক্যজোটের যে ঘোষণা সে দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, কিভাবে আবু হেনার মতো কর্মকর্তার পদত্যাগ নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, ভোটার পরিচয়পত্রের (আইডি কার্ড) মতো বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে দেশের চারটি বৃহৎ বিরোধী দল সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তোলে। হরতাল, মিছিল, বিক্ষোভ প্রদর্শনের কর্মসূচি সারাদেশে উত্তাল হয়ে ওঠে।
এসব আন্দোলনে বেশ ক’টি অমূল্য জীবন ঝরে পড়ে। সেই অবস্থায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়েও অনড় থাকলেন। ভোটারবিহীন পৌরসভা নির্বাচনের মুখেও তিনিও নির্বিকার রইলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রে এক দলীয় নির্বাচন অব্যাহত রইল। মোঃ আবু হেনা কিন্তু তখনো থাকলেন ভাবলেশহীন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী তিনি টিকতে পেরেছিলেন? তুর্কী খেলাফত আমলে আবদুর রহমান কাওয়াকেবী একজন বিশিষ্ট রাজনীতি বিশারদ ব্যক্তি ছিলেন। আবদুর রহমান কাওয়াকেবীর এক গ্রন্থে তিনি ডিক্টেটরশীপ সম্পর্কে তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। এবং তার থেকে অব্যাহতিরও পথ নির্দেশ করেছেন।
বইটির মূল ভাবধারাটি ফরাসি ভাষায় লিখিত একটি গ্রন্থ হতে সংগৃহীত, যা ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে লিখিত হয়েছিল। তাতে তিনটি দফা বর্ণিত হয়েছে, প্রথম দফায় ডিক্টেটরশীপের অপকারিতাসমূহ। দ্বিতীয় দফায় জনগণের উদ্দেশে পরামর্শ, তারা যেন ডিক্টেটররের সহযাত্রীদের প্রতি কখনও বিশ্বাস স্থাপন না করে।
কারণ সহযাত্রীরা মূল নায়কের চাইতেও অধিক একনায়কত্বের মানসিকতার অধিকারী হয়ে থাকে। তৃতীয় দফায় বলা হয়েছে, ডিক্টেটরশীপ থেকে অব্যাহতিকল্পে ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন না করা, কারণ তাতে ডিক্টেটর সরকারই অধিক উপকৃত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ