ঢাকা, শনিবার 19 May 2018, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এসএসসির ফলাফল ও ভবিষ্যত ভাবনা

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন : এবারকার এসএসসির ফলাফল নিয়ে যে যাই ভাবুন, তবে আমার মনে হয়েছে এ ফলাফলে কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হয়েছে। মেধার ভিত্তিতেই ফলাফল হয়েছে। একশ’ পার্সেন্ট পাশ মানে আমি মনে করি কাগজ পরীক্ষণ না করার সমান। এমন অনেক ছাত্র ছাত্রী আছে যারা এখনো প্রশ্নটা লিখে দেয় উত্তরপত্রে। কিংবা পত্র লিখে দেয়। পরীক্ষণের মধ্যদিয়েই প্রকৃত মেধাবী প্রকাশ পায়।
এক সময় পুরো ইউনিয়নে একটি ছাত্র পাশ করতো আর গ্রামের সবাই তাকে দেখতে যেতো সেই ছাত্রটি সব বিষয়ে পারদর্শী ছিলো। আমার মনে আছে, তখন একজন ভাই এসএসসিতে চতুর্থ স্ট্যান্ড করেছিলেন আর তাঁকে সম্মান সূচক সব কটি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। তারপর অনার্সে এসে দেখলাম আমাদের এক বছর সিনিয়র জসীম ভাই সারাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬ তম হয়েছেন। স্যারগণ তাঁকে হল রুমে সভা করে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ছিলেন।
সম্প্রতি প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারে যত রকম সমস্যা দেখা দিয়েছে তার সবকটি সমস্যা বন্ধ হয়ে গেছে যখন কয়েকজন গ্রেফতার হলো। এভাবে যদি প্রথম থেকেই কড়াকড়ি দেয়া যেতো তাহলে শিক্ষা নিয়ে এতো ঝামেলা হতো না। বিএনপি সরকারের আমলে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে গ্রহনের লক্ষ্যে প্রতি জেলায় পরীক্ষা কেন্দ্র নামে আলাদা ভবন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। সেটি বাস্তবায়ন হলে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগুলো এমনকি সরকারী বা বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ পরীক্ষা গুলো গ্রহনে সুবিধা হতো। এমনকি বিভিন্ন পর্যায়ের ট্রেনিং গুলোও এসব ভবনে করা যেত। এর জন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে এগুলো করতে হতোনা।
যাই হোক এবারের ফলাফলে যারা ভালো করেছে তারা নিতান্তই ভালো। এখন এদের জন্য উচ্চ শিক্ষার দ্বার কতটুকু উন্মুক্ত সেটাই দেখার বিষয়। অনলাইন ভর্তি পদ্ধতিতে মেধা যাচাই করা হয় নাম্বার বা গ্রেডের ভিত্তিতে। আর কোটা প্রথায়। কোটা প্রথায় একটি টু পয়েন্ট পাওয়া স্টুডেন্টও চান্স পেতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে শিক্ষার মানটা রইলো কোথায়? সরকার এখনো সার্কুলার জারি করেননি। এক কথায় শিক্ষায় মান রক্ষা করতে হলে অবশ্যই জ্ঞান বা মেধাকে সর্বাধিক মূল্যায়ন করতে হবে। আর তা হতে হবে সকল ক্ষেত্রেই।
আমি প্রথম থেকেই অবজেক্টিভের ও নাম্বার ভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির পক্ষে নয়। ভর্তিতে পরীক্ষা হলো প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের মাধ্যম। যারা ফোর পয়েন্ট পেয়েছে তারাও ফাইভ পয়েন্টের চেয়ে ভালো করতে পারে। তাছাড়া একেক জনের মেধা একেক দিকে ভালো। কেউ খুব ভালো বলতে, কেউ ভালো লিখতে। কেউ ধীরে ধীরে বুঝে -কেউ ত্বরিত বুঝে। তাই মেধা শক্তির ভিন্নতা আছেই।
আমাদের বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতিতে যেমন একটা লোককে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা হয় তেমনি যদি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তির সময় একই রকম যাচাই করা হতো। তাহলে আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকার থাকতো না। যারা জ্ঞানে কম তারা আগেই ঝরে যেতো। মাস্টার্স পাশের পর বেকার থাকা যে কত যন্ত্রণা তারা তা ভোগ করতে হতোনা। আমার সাফ কথা এভাবে কড়াকড়ি পরীক্ষা হোক যারা ঝরে যাবে তারা আগেই ঝরুক। যারা সোনার ছেলে হবে তারাই টিকে থাকুক। তারা দেশকে যেন কিছু দিতে পারে। সমাজ পরিবার যেন তাদের নিয়ে গর্ব করতে পারে।
এখনো বেশ কিছু অছাত্র পাওয়া যায় যারা জ্ঞানার্জনের নামে বিদেশে ছাত্র ভিসায় যায় আর সেখানে গিয়ে লেবার হয়ে যায় তাদের লজ্জা কোথায় রাখবে?
তাদের জন্য এ ব্যবস্থা যে তারা আগে ভাগেই তাদের কর্ম খুঁজে নিতে পারবে। শুনেছি ওরা বিদেশ গিয়ে ড্রাইভারীও করে। আমাদের দেশে যদি আইন করে এসএসসি পাশ করলেই ড্রাইভিং লাইসেন্স মিলবে ঘোষণা করা হতো তাহলে ওরা আমাদের দেশেরই একটি ভালো মানের পরিবহনের চালক হতে পারবে। আর জনগন অন্তত ভালো সেবা পাওয়ার আশা করতে পারতো। অথবা সরকার যদি নবম দশমে হাতে কলমে ড্রাইভারি ও কম্পিউটার কম্পোজ শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করে তাহলে এরা দেশের সোনার ছেলে হয়ে সম্পদে পরিনত হতে পারে।
আমাদের ছেলেরা যখন অতি কষ্টের সাথে প্রশ্ন করে শিক্ষিত হয়ে কি লাভ? তখন উত্তর যাই দেই না কেন প্রকৃত পক্ষে ভাবতে হয়। আমার সম্পর্কের এক মামাতো ভাই সাইন্সের ছাত্র ছিলো। ক্লাশে রোল এক এবং রেজাল্ট হলো সেকালের তিন নাম্বারের জন্য স্টার পায়নি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লেটার মার্কস মানে আশির উপরে ছিলো। সে কর্ম জীবনে আফ্রিকার দোকানদার। আরেক জন ভাই আশরাফুল ইসলাম গোল্ডেন সব রেজাল্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। বলছিলাম আমাদের কোন ছাত্র ভবিষ্যতে কি হবে কি করবে এমন পরিকল্পিত শিক্ষা যদি না থাকে তাদের অবস্থা এমনই হবে। আমার একটা বিএ পাশ শ্যালককে তারই আচরণে বলেছিলাম- “হরিণ আপনা মাংসে বৈরী” সে বোঝেনি, মনে মনে হাসলাম- এই হলো শিক্ষা।
এখন আর ভাব সম্প্রসারণ নেই, ইংরেজি প্রবাদগুলো মুখস্ত করার দিনও শেষ।
আমরা চাই, পরিকল্পিত ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে মানব সম্পদ তৈরীর কারখানা হোক আমাদের শিক্ষাঙ্গন গুলো। কঠোর হোক শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষাটা যে প্রকৃত পক্ষে কষ্টের বিষয় তা সাধারণের মাথায় আসুক। শিক্ষিত লোকের মান রক্ষা হবে অন্তত। বেকার থাকবে তবে শিক্ষিত বেকার নয়। বদলা দিবে তবে সার্টিফিকেট ধারীরা নয়।
প্রায়ই শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা শুনি। যেমন সৃজনশীলের কথাই ধরুন। কি হলো? ১০৯টি স্কুলের যারা পাশ করেনি দেখুন তারা কি বলে? কোথায় সমস্যা? একটি ক্লাসে এ প্লাসধারী স্টুডেন্ট না থাকতে কিন্তু সবাই ফেল করবে তা মানা যায়না। বইয়ের সাথে প্রশ্নের মিলই নেই। শুধু শুধু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক টাকা অপচয় করার মানে হয়না। জ্ঞান নির্ভর এবং বর্তমান সময়ের কর্মোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকটা ভাবা খুবই প্রয়োজন মনে করি। যারা পাশ করেছে তাদের সাধুবাদ জানাই। তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বলের লক্ষ্যে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন আশা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ