ঢাকা, রোববার 20 May 2018, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতায় সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের টান পড়েছে। সুদের হার বাড়িয়েও আমানত সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের প্রতি মানুষের এক ধরনের অনাস্থা কাজ করছে। এতে ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে গ্রাহকরা। আবার আর্থিক এ মন্দাবস্থায় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংকের অর্থ সংকটে বিনিয়োগ কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গড়ে উঠছে না নতুন কোনো শিল্প কারখানা। ফলে বাড়ছে বেকারত্বের হার। সবমিলে জনমনে হতাশা নেমে এসেছে। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, প্রতিটি ব্যাংকে শীর্ষ ২০ জন করে খেলাপি গ্রাহকের কাছে আটকা পড়েছে ৩২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। ফলে খেলাপি ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ২০ জন করে খেলাপি গ্রাহকের কাছে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমান ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের দুই হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। এবং বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা।
গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়। এ তথ্য খেলাপির হিসাব নিলে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে। গত ডিসেম্বরে সেখান থেকে কমে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সে হিসাবে কমেছে ছয় হাজার কোটি টাকা। এ তথ্যে নতুন অবলোপনের তথ্য দেয়া হয়নি। তবে এ টাকা খেলাপি ঋণ আদায় নয় বরং পুনঃ তফসিল করে হালনাগাদ হিসাবে দেখানো হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এ কারণে গ্রাহকরা খেলাপি হয়ে পড়ছেন। আর যারা খেলাপি হচ্ছেন তারা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় ব্যাংকগুলো আদায়ে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এমতাবস্থায় গত চার মাসের ব্যবধানে দুইবার সার্কুলার জারি করে খেলাপি ঋণ আদায় ও নতুন করে তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত ২৭ এপ্রিল সব ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের ঋণশৃঙ্খলা জোরদারকরণের লক্ষ্যে সিআইবি ডাটাবেইজে সকল ঋণতথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এর আগে গত ১১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদারের নির্দেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ চিঠিতে বলা হয়, খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এ ঋণের বিপরীতে আদায়ের পরিমাণ খেলাপি ঋণের তুলনায় অপ্রতুল। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর গৃহীত ব্যবস্থা কার্যকরে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য দেখা গেছে, ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে গত মার্চ শেষে ২৮ ব্যাংকের ঋণের সুদহার দুই অঙ্ক ছাড়িয়েছে। বাকি অধিকাংশ ব্যাংকেই এ হার দুই অঙ্ক ছুঁই-ছুঁই। তবে একক ঋণ হিসেবে ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো ব্যাংকের সুদহার সর্বোচ্চ ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছে গেছে। দেশের ব্যাংকগুলোতে ২০১১-১৩ সাল পর্যন্ত ঋণের গড় সুদের হার ছিল ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে। ২০১৭ সালে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর ঋণের সুদহার দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭০ শতাংশে। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর গড় ঋণের হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমানতের তুলনায় ঋণের চাহিদা বেশি। এ কারণে তারল্য সংকট শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংকগুলো। এ কারণেই সুদহার বাড়ছে।
এদিকে আগ্রাসী ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকের তারল্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক অর্থের অভাবে অতিপ্রয়োজনীয় খাতেও ঋণ দিতে পারছে না। শুধু তাই নয়, অনেক ব্যাংক নগদ টাকার অভাবে গ্রাহকের আমানতের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। আবার কোনো কোনো ব্যাংক নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছে।
এমতাবস্থায় সরকার ব্যাংকের তারল্য প্রবাহ বাড়াতে নতুন করে দুইটি উদ্যোগ নেয়। সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ অর্থ বেসরকারি ব্যাংককে রাখা এবং সিআরআর সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশে কমানো হয়েছে। এই দুই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৩০ হাজার কোটি টাকার জোগান পেয়েছে। এটি এ যাবতকালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারের সর্বোচ্চ সুবিধা। এতেও তারল্য সংকটের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তারল্য কমাতে সরকারের এই দুই সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বাড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকের ৯০ শতাংশ টাকা জনগণের। আর বাকি ১০ শতাংশ টাকা ব্যাংক মালিকদের। সুতরাং জনগণের টাকা যেন নষ্ট করতে না পারে, সেজন্যই মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা রাখার বিধান রয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ সরকারি আমানত রাখার বিষয়টি যৌক্তিক নয়। এতে ঝুঁকি বাড়বে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সরকারের এই দুই সিদ্ধান্তে কোনো সুফল আসবে বলে আমি মনে করি না। বরং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও ঋণপ্রবাহ আরো বেড়ে যাবে। ব্যাংকগুলো সিআরআরের টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতায় না রেখে নিজেদের আওতায় রাখল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ যেভাবে বাড়ছে, ব্যাংকে আমানত সেভাবে বাড়ছে না। এ অবস্থায় সাবধান না হলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট আরো প্রকট হবে। ২০১৫ সালের জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৭ শতাংশ আর আমানত প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ঋণের প্রবৃদ্ধি যখন ১৮ দশমিক ১ শতাংশ, তখন আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। এ অবস্থা চলতে থাকলে তারল্য সংকট আরো বাড়বে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে বর্তমানে অ্যাডভান্স ডিপোজিট (এডি) রেশিও ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না হলে ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যে এডি রেশিও ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণ হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। এক বছর পর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ১২২ কোটি টাকা। কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করায় তাদের নগদ টাকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণপ্রবাহ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার কারণে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, ব্যাংকের ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংককে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বর্তমানে ডলারের দাম একটু ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো বিষয়টি নজরদারি করছে। যাতে এটি আর না বাড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, ব্যাংকাররা ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ট্রেজারি ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতার পরিচয় না দিলে পুরো ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে প্রতিবছর দেশের শ্রমবাজারে যে পরিমাণ শ্রমশক্তি প্রবেশ করছে সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ১৪ লাখ শ্রমশক্তি যুক্ত হয়েছে যাদের বয়স ১৫ বছরের ওপরে। কিন্তু এসময় দেশের অভ্যন্তরে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ১৩ লাখ। ফলে বেকার বেড়েছে। সবমিলিয়ে দেশে বেকার রয়েছে ২৬ লাখ ৮০ হাজার। আগের অর্থবছর এই সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ। দেশে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর তরুণ বেকারদের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিতের হার ছিল ১২ দশমিক ১১ ভাগ। ২০১৬-১৭ অর্থবছর এই হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪ ভাগে। সংখ্যার হিসাবে ৩ লাখ ৯০ হাজার তরুণ উচ্চশিক্ষিত বেকার রয়েছে যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে। তাদের মধ্যে ১১ দশমিক ২ ভাগ ২ বছরের বেশি সময় ধরে বেকার রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞানুযায়ী যারা সপ্তাহে অন্তত এক ঘন্টা কর্মে নিয়োজিত থাকবেন তারা আর বেকার নন। বাংলাদেশে সপ্তাহে এক ঘন্টাও কাজ করতে পারেন না এমন বেকারের সংখ্যা বেড়ে ২৬ লাখ ৮০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সপ্তাহে ৪০ ঘন্টার কম কাজ করেন। এর সংখ্যা ১৫ লাখ। অর্থাৎ দেশে প্রকৃত বেকারত্বের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৪১ লাখ ৮০ হাজার। যাদের ওপর তাদের পরিবারের নির্ভর করতে হয়। কিন্তু কাজ না পাওয়ায় তারা সে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। যার প্রভাব পড়ছে সমাজে। ফলে জনমনে হতাশা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিক্ষার্থীরা ভালো চাকরি করার আশায় পড়া-লেখা শেষ করে কর্মস্থানের অভাবে বেকার রয়েছে। পরিবার তাদের এতো কষ্ট করে পড়ালেখা শিখিয়েছে তার কোনো প্রতিদান দিতে পারছে না এ সব শিক্ষিত বেকার যুবক। সরকার কর্মসংস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে এসব শিক্ষিত যুবকদের। এতে করে যে স্বপ্ন নিয়ে পড়া-লেখা শেষ করেছিল তা দু:স্বপ্নে রুপ নিয়েছে। তাদের পিতা-মাতাসহ সমাজের মানুষের মধ্যেও তার প্রভাব পড়ছে। ফলে সবার মধ্যে একধরনের হতাশা কাজ করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ