ঢাকা, রোববার 20 May 2018, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বঙ্গোপসাগরে ১ মিটার পানি বাড়লে দেশের ১৬ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হবে

মুহাম্মদ নূরে আলম : বঙ্গোপসাগরে ১ মিটার পানি বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের ১৬ শতাংশ ভূমি  প্লাবিত হবে। যার ফলে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। এতো বিশাল জনগোষ্ঠীকে কোথাও সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব নয়। তাই এখনই  বৈশ্বিক জলবায়ু মোকাবেলা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইউনাইটেড নেশনস এর এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্লানার অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী এস. আই. খান। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি), ঢাকা কেন্দ্রের উদ্যোগে এক পরিচালিত ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ভালনারেবিলিটি অ্যান্ড রেসপন্স অ্যাট ম্যাক্রো অ্যান্ড মাইক্রো লেভেল’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে তিনি এই কথা বলেন।
ইউনাইটেড নেশনস-এর এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্লানার অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী এস. আই. খান বলেন, গ্রিন হাউস গ্যাসগুলো হলো, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, জলীয়বাষ্প,  ওজোন,  সিএফসি (ক্লোরো- ফ্লোরো কার্বন)। পৃথিবীর বায়ুম-লে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেড়ে যাওয়ার কারণগুলো হলো, পৃথিবীতে অধিক হারে লোকসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য জিনিসপত্র এবং বাড়িঘর তৈরির জন্য জমির চাহিদা। সেই চাহিদা পূরণে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে, কলকারখানা ও যানবাহনে কয়লা, কেরোসিন, পেট্রোল পোড়ানো হচ্ছে। এসব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে পরিবেশে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র তৈরি করার জন্য গাছপালা কেটে বন উজাড় করায় বায়ুম-ল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করার মতো পর্যাপ্ত গাছ আর থাকছে না। ফলে বায়ুম-লে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে।
 তিনি তার গবেষণা প্রবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দেশে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চল ও পর্বতের চূড়ার বরফ গলে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এভাবে তাপমাত্রা ও সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। সাগর থেকে নদীতে নোনাজল ঢুকে পড়তে পারে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় ঘন ঘন ঘটতে পারে।
আবহাওয়া অফিসের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা গবেষকের বক্তব্যে একমত হয়ে বলছেন, সমুদ্র পৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে গত একদশক ধরে। গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চল এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ২ থেকে ৩ ফুট বেশি উচ্চতার বায়ু তাড়িত জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রায় দেশে উপকূলীয় এলাকার বিশাল অংশ প্লাবিত হয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাঝে মাঝে সমুদ্রে গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় এবং নিম্নচাপকে কেন্দ্র করে আশেপাশের এলাকার ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া আকারে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সমুদ্রের গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল থাকে। প্রায় জলোচ্ছাসের সময় সমুদ্র পৃষ্ঠের পানির উচ্চতা ২ ফিট পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক  প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, আমরা কেউ ভেবে দেখেছি পাঁচ হাজার বছর পর সারা বাংলাদেশের কী অবস্থা হবে? সম্প্রতি 'ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক' প্রকাশিত এক বৈশ্বিক মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, পাঁচ হাজার বছর পর যখন পৃথিবীর সব বরফ গলে যাবে তখন বাংলাদেশের পুরোটাই চলে যাবে ২১৬ ফুট পানির নিচে। একই সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার স্থানও হবে জলের তলায়।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে মাত্র ১০ শতাংশের মতো বরফের আস্তরণ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে পাঁচ মিলিয়ন কিউবেক মাইল হিমায়িত পানি। যদি এই বরফের পুরোটাই গলে যায়, তাহলে পৃথিবীর সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলো প্রায় ২১৬ ফুট জলের তলায় চলে যাবে। এই পরিস্থিতিকেই দেখানো হয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ওই মানচিত্রে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের মধ্যে পৃথিবীর সব বরফ গলে পানি হয়ে যাবে। আমেরিকার এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) জানিয়েছে, এখনই সমুদ্রের স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে সাত ইঞ্চি বেশি রয়েছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমরা যদি পৃথিবীর সব জীবাশ্ম জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলি সে ক্ষেত্রে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, যা বর্তমান স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের চেয়ে অনেক বেশি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রতি বছর ৬৫ মিলিয়ন টন বরফ গলছে। এই হারে বরফ গলতে থাকলে এবং গ্রিন হাউস গ্যাসের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে পাঁচ হাজার বছর পর পৃথিবীর মানচিত্রই পুরোপুরি বদলে যাবে। এশিয়ায় বাংলাদেশ এবং চীন পুরোপুরি তলিয়ে যাবে। ভারতের উপকূলবর্তী অনেকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী এস আই খান তার গবেষণা প্রবন্ধে বলেন, বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের দুর্যোগ দেখা যায়। কিছু কিছু দুর্যোগ প্রাকৃতিক কারণে যেমন ভূমিকম্প, বন্যা, বজ্রপাত ইত্যাদি। বাংলাদেশ সব কয়টি দুর্যোগ মোকাবেলা করে আসছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হলো মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন।
আমরা জানি যে, মানুষের বিভিন্ন কাজের কারণে বায়ুম-লে গ্যাস বেড়ে যাচ্ছে। গ্যাস বেড়ে যাওয়ার কারণে বায়ুম-লে উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে। যে গ্যাসগুলোর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে তাকে গ্রিন হাউস বলে থাকি। যদিও গ্রিন হাউসের জন্য বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। যাদের ভূমিকা রয়েছে তাদের মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপ তারা ৮০ শতাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস তৈরি করে থাকে। এজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হিমায়িত বরফ গলে যাচ্ছে, যা আমাদের দেশে চলে আসছে। বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
আমরা ধারণা করছি, সমুদ্রের পানি ১ মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী ১৬ শতাংশ স্থান প্লাবিত হবে, যার ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষ আক্রান্ত হবে। আমাদের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে কোথাও সরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তাই বিশ্ব জলবায়ু মোকাবেলা এখনই করতে হবে।
তিনি তাঁর গবেষণা প্রবন্ধে বলেন, আমরা নানাভাবে এই সমস্যা  মোকাবেলা করতে পারি। আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্য বইতে যুক্ত করতে পারি। সেগুলো আমার তুলে ধরতে পারি। এগুলো ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দিতে পারি। ২০১৬ সাল থেকে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরে নিয়েছি। বজ্রপাতের ফলে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। বজ্রপাত মোকাবেলা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার নানা পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে লাখ লাখ তাল গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নদী বন্দরগুলো আছে সেগুলোতে ‘লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর’বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই সেন্সরগুলো বসানোর ফলে ১০ থেকে ৬০ মিনিট আগে বজ্রপাতের সংকেত পাওয়া যাবে। যার ফলে মানুষ সাবধান হতে পারবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পুরোপরিভাবে চালু হলে আগামী ছয় মাস পর থেকে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম আভাস আসবে। পটুয়াখালী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বর্ষার পানি আটকাতে ৬০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৩০ বছর সময়ের মধ্যে জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে জাপানি প্রযুক্তি দ্বারা ‘বে ক্রস ড্যাম’ নির্মাণে তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দেখবে। তিনি গঙ্গা চুক্তির পাশাপাশি তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারত সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। পরে তিনি উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর সব বরফ গলে যাওয়ার ঘটনা ইওসিন যুগে তিন কোটি ৪০ লাখ থেকে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে একবার হয়েছিল। এ সময় পৃথিবীর কোথাও কোনো বরফ ছিল না। বিষুবরেখার অঞ্চলে এবং মেরু অঞ্চলের তাপের মধ্যে কোনো তারতম্যও ছিল না। এ অবস্থায় খুব ধীরে ধীরে মহাসাগরের তলদেশে পলিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড সংবন্ধন ঘটতে শুরু করলে পৃথিবী ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হতে শুরু করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ