ঢাকা, রোববার 20 May 2018, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনায় জাতীয় পার্টি অস্তিত্ব সংকটে

খুলনা অফিস : খুলনা মহানগরী জাতীয় পার্টি আবারও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। কেসিসি নির্বাচনে চরম হতাশাজনক ফলাফলের পরে নগর কমিটি বিলুপ্ত এবং মেয়র প্রার্থী মুশফিককে দল থেকে অব্যাহতি প্রদানের পর এ সংকটের গৃষ্টি হয়েছে। নগর জাপার হাল ধরার জন্য এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে সদ্য পদত্যাগকারী নেতাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারাও দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছে বলে জানা গেছে। তাই নগর জাপার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই এখন উপায় খুঁজছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি।
দলীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, রব-কাশেম কমিটির পর নগর জাপার হাল ধরেন সাবেক এমপি আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস ও মোল্লা মুজিবর রহমানের নেতৃত্বাধীন কমিটি। গফ্ফার বিশ্বাসের পদত্যাগের পর থেকে সাবেক এমপি মো. আবুল হোসেন-এর নেতৃত্বেই চলছিলো নগর জাপা। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে দলের চেয়ারম্যানের নানান হটকারী সিদ্ধান্তে একের পর এক বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়তে হয় নগর জাপাকে। স্থানীয় রাজনীতিতে ইমেজ সংকটে পড়ে জাপা। হঠাৎ করে জাপার নগর সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মুশফিকুর রহমান গত বছরের ২৮ জানুয়ারি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে খুলনা জাপার তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। বিরোধ চরম রূপ নেয় যখন এই মুশফিককেই কেসিসি’র মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। গেল বছরের ১৪ মার্চ খুলনায় এসে মুশফিককে মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার আগের দিন একযোগে পদত্যাগ করেন নগর জাপার অধিকাংশ নেতা। ওই দিন নগর শাখার সভাপতি শেখ আবুল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম ও যুগ্ম-সম্পাদক অধ্যাপক গাউসুল আজম দল থেকে পদত্যাগ করেন। একই দিন দল থেকে ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন নগর কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক এম এ আল মামুন, সদস্য কাজী শরিফুল ইসলাম, সোনাডাঙ্গা থানা জাতীয় পার্টির সভাপতি সাইফুল আলমসহ অনেক নেতা-কর্মী। এরপরে আর নগরীতে জাতীয় পার্টি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর মধ্যে গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত কেসিসি নির্বাচনে জাপা মনোনীত মেয়র প্রার্থী ১ হাজার ৭২ ভোট পেয়ে লজ্জাজনক হারের পর আবারও এক দফা সংকটে পড়েছে দলটি। নির্বাচনের পরেই গত ১৬ মে কেন্দ্রীয় কমিটির এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দলের মহানগর কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং বৃহস্পতিবার মেয়র প্রার্থী ও বর্তমান কমিটির সদস্য সচিব মো. এসএম শফিকুর রহমান মুশফিককে দল থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। ফলে এখন নগর জাপার হাল ধরবে কে এই প্রশ্ন আসছে বারবার।
খুলনা মহানগর কমিটির সাবেক সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন ‘এরশাদ সাহেব নিজেই খুলনার জাতীয় পার্টির কবর দিয়ে দিয়েছে। একটা খুনি চরিত্রহীনকে খুলনার রাজনীতিতে নিয়ে এসে মেয়র প্রার্থী করেছে। তাই খুলনার মানুষ জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাকে চেয়ারম্যান ও মহাসচিব বলেছে এখন দলের হাল ধরতে কিন্তু আমি তাতে রাজি নই। আমি এখন জাতীয় পার্টির হাল ধরলে আমাকেই মানুষ প্রত্যাখ্যান করবে। এই মুহূর্তে তো দূরে থাক কোনদিন জাতীয় পার্টি করব কিনা সন্দেহ রয়েছে।’
খুলনা মহানগর কমিটির সাবেক সভাপতি আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস বলেন ‘এখন জাতীয় পার্টির সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তবে জাতীয় পার্টি যতদিন আওয়ামী লীগের লেজুর হয়ে থাকবে ততদিন এই দল অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে। স্বাতন্ত্রবোধ নিয়ে মানুষের কল্যাণে একক ভাবে কাজ শুরু করতে পারলেই নেতৃত্ব যেই থাকুক না কেন এই সংকটের উত্তরণ ঘটবে।’
খুলনা জেলা জাপার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব এস এম শফিকুল ইসলাম মধু বলেন, ‘জাতীয় পার্টি একটি বড় রাজনৈতিক দল। দলের প্রয়োজনে কমিটি গঠন করা হয় আবার দলের প্রয়োজনেই কমিটি ভাঙা হয়। অতি শিগগিরই উপযুক্ত ব্যক্তিদের দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।’
এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মহানগর কমিটির আহ্বায়ক সুনীল সুভ রায় বলেন ‘আমি পার্টির খুলনা নগর কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলাম। আমি স্যারকে (দলের চেয়ারম্যান) বলেছি আমি এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাই। তাই আমাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এখন তারাই দলকে আবার পুনর্গঠনের দায়িত্ব পালন করবেন।’
এদিকে খুলনায় জাপা ধ্বংসের মূলে সুনীল শুভ রায় বলে মন্তব্য করেছেন পার্টির মহানগর শাখা সদস্য সচিব (বহিস্কৃত) এস এম শফিকুর রহমান ওরফে মুশফিক। তিনি বলেছেন, সুনীল শুভ রায়কে নগর জাতীয় পার্টির যুগ্ম-আহ্বায়ক খায়রুল শহরের মধ্যে থেকে পাঁচ কাাঁ জমি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার বিনিময়ে খায়রুলকে এখানকার আহ্বায়ক বা সভাপতি বানিয়ে দিবেন। এছাড়া নগদ অর্থও দিয়েছে খায়রুল। সুনীল শুভ রায় বিভিন্ন সময়ে আমার কাছ থেকে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা নিয়েছেন। খুলনায় জাতীয় পার্টি ধ্বংসের মূল কারণ সুনীল শুভ রায়। সারাদেশে জাতীয় পার্টির পদ-পদবী বিক্রি করাই তার মূল কাজ।
এস এম মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের (এরশাদ) নামে প্রকাশিত আটটা বই সুনীল শুভ রায়ের লেখা। এরশাদ স্বৈরাচার যে কথাটা বিলুপ্ত করার জন্যে তার নামে বিভিন্ন বই, পত্র-পত্রিকায় যত কবিতা ও লেখনীয় সব সুনীল শুভ রায়ের লেখা। সাধারণ মানুষ মনে করেন ওইগুলো চেয়ারম্যানের লেখা।
তাকে বহিষ্কারের মূল কারণ দু’টি বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে বহিষ্কারের মূল কারণ হচ্ছে ওই পাঁচ কাঁঠা জমি এবং খুলনায় জাতীয় পার্টিতে চরম সমন্বয়হীন পরিস্থিতির গৃষ্টি করে সুনীল শুভ রায়। এসব অপকর্ম ঢাকতেই আমাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সুনীল শুভ রায় আমাদের সাথে বলে এক ধরনের আর তলে তলে কাজ করেছেন অন্য টাইপের। মূলত, জাতীয় পার্টি কোনো মোরগ পছন্দ করে না, মুরগী পছন্দ করে। মুরগী যেটা সেটাই জাতীয় পার্টি ভালবাসে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমার সাথে কোন শীর্ষ নেতা যোগাযোগও করেননি। নির্বাচনের পরদিন সুনীল শুভ রায় আমাকে কল করে বলেন, আপনি (মুশফিক) অব্যাহতি নেন। আমি বললাম কেন, অব্যাহতি দিতে বাধ্য হবো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এটি কার নির্দেশনা? তিনি বললেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেবের। আমি বললাম অসম্ভব, তিনি হার্ডলাইনের সিদ্ধান্ত নেন না। এটা আপনার বক্তব্য। এ সময় আমি তাকে বলেছিলাম-আপনার চরিত্র কিন্তু আমি উন্মোচন করে দেবো।’
এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায় বলেন, ‘সে এখন জাতীয় পার্টি থেকে বিতাড়িত। তাই সে কি বললো তা নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। তালাক দেয়া বৌ সম্পর্কে তো মন্তব্য করতে নেই।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ