ঢাকা, রোববার 20 May 2018, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকারের বটম লাইন চূড়ান্ত ॥ বেগম জিয়া মুক্তি পাবেন না কারচুপিও চলবে ॥ কি করবে এখন বিএনপি?

গত সপ্তাহে দুটি ঘটনার প্রতি সারা দেশের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। একটি হলো বেগম খালেদা জিয়ার আপিলের রায়। আর একটি হলো খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। দুটি ঘটনাই ঘটে গেছে। আমরা, যারা সব কিছুকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে দেখি, তাদের কাছে ফলাফলটা অপ্রত্যাশিত কিছু ছিল না। আর যারা অতিরিক্ত আশাবাদী তারা হতাশ হয়েছেন। বেগম জিয়ার জামিনের প্রসঙ্গটি দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করবো। কারণ এর সাথে অনেকগুলো প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। তাই প্রথমে খুলনা সিটি কর্পোরেশন বা কেসিসি নির্বাচন।
আমি একাধিক পত্রিকায় রাজনৈতিক ভাষ্য বা কলাম লিখি। নাম মনে নেই, তবে একাধিক পত্রিকায় আমি স্পষ্ট মন্তব্য করেছিলাম যে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনকে এবার আওয়ামী লীগ নিজের কন্ট্রোলে নেবে। ৭ মাস পর দেশের সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগে ঢাকা মহানগরী এবং অন্যান্য মহানগরীর নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগ হাত ছাড়া করতে পারে না। ঢাকা দক্ষিণ তাদের হাতে আছে। ঢাকা উত্তরের ইলেকশন অনেক কায়দা কানুন করে বাঞ্চাল করা হয়েছে। দেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে আর ঢাকা উত্তরের ইলেকশন করা হবে না। এর ফলে ঢাকা উত্তরের নিয়ন্ত্রণও আওয়ামী লীগের হাতেই থাকবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তাদের হাতে আছে। এখন একমাত্র রইলো রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। এটির বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তিনি বিএনপির অন্যতম নেতা। এটি আওয়ামী লীগের অশ্বস্তির কারণ। কিন্তু সম্ভবত ন্যাশনাল ইলেকশনের আগে আওয়ামী লীগের কিছুই করার নাই। তাই সম্ভবত এই তিক্ত বটিকা তাদের গলাধকরণ করতেই হবে। এসব কারণেই তারা জোর-জবরদস্তি করে অথবা পুকুর চুরি করে খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) দখল করেছে।
বোধগম্য কারণেই জনগণের মধ্যে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে। এর আগে আমার ধারণা ছিল যে আওয়ামী লীগ কেসিসি দখল করবে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন জোর করে দখল করার চেষ্টা নাও করতে পারে। আমাকে অনেকেই বলেছেন যে, যেহেতু গাজীপুর ঢাকার উপকন্ঠে, তাই গাজীপুরও তারা ছাড়বে না। এর মধ্যে নতুন করে চক্রান্ত করে মামলার ফাঁদে ফেলে গাজীপুর নির্বাচনও বাঞ্চাল করা হয়। সকলেই জানেন, এর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করা হয়। মামলার ফলশ্রুতিতে আগামী ২৮ জুন গাজীপুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে খুলনা নির্বাচনের দু’তিন সপ্তাহ আগে থেকেই বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদেরকে পুলিশের পাইকারি হারে গ্রেফতার অভিযান, জোর-জবরদস্তি করে তথা বিজয় ছিনিয়ে নেয়া প্রভৃতি কারণে জনগণের মনে একটি প্রবল হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেও বলতে শোনা গেছে যে, কি লাভ হবে এসব ইলেকশন করে। ইলেকশনের রেজাল্ট তো ওরা আগে ভাগেই ঠিক করে রাখে। এই ধরনের একটি হতাশ মানসিকতার ফলে গাজীপুরের নির্বাচনী ফলাফলও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
খুলনার নির্বাচনে সরকারি দল কি কি অপকীর্তি করেছে সেটা সকলেরই জানা। তারপরেও যখন বিএনপি সেগুলোরই জাবর কাটে তখন দুঃখ হয়। তাদের গৎ বাঁধা কথা, এই সরকারের আমলে যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না, সেটি এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো। এই কথাটি কি শুধুমাত্র এই নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হলো? এর আগে হয়নি? ২০১৫ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে পুকুর চুরি হয়নি? তার আগে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে তো আস্ত একটি নির্বাচনকেই হাইজ্যাক করা হয়েছে। তার পরেও কি প্রমাণিত হয়নি যে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়?
শুধু এখনকার কথা বলবো কেন? স্বাধীনতার পর পরই যে নির্বাচন হয় সেই নির্বাচনে বরিশালের ব্যালট বাক্স হাইজ্যাক করে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা আনা হয় এবং ঢাকায় নিজেদের ইচ্ছা মত গণনা করে বিরোধী দলীয় প্রার্থীকে পরাজিত করে আওয়ামী প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এসব কথা কে না জানে? যাদের বয়স কম তারা হয়তো সুদূর অতীতের কথা জানে না। কিন্তু যারা কিছুটা বয়স্ক তারা সব কথাই জানেন। তাই একই কথা কলের গানের ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো বার বার রিপিট না করে এখন বিএনপিকে বলতে হবে, এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তারা কি করবেন? শুনেছি, আজকালের মধ্যে বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের সাথে ইফতার মাহফিলে তারা বসবেন এবং তাদেরকে এসব কথা জানাবেন।
॥দুই॥
বিদেশী রাষ্ট্রদূতদেরকে তারা নতুন করে আর কি জানাবেন? দেশে অন্তত দুটি ইংরেজি পত্রিকা আছে যারা ইতো মধ্যেই অনেক কথা ছেপেছে যেসব কথা বিএনপি এখন বলেনি। প্রতিটি দূতাবাসে প্রেস সেকশন রয়েছে। সেখানে অনুবাদকও রয়েছেন। তারা বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকার রাজনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভৃতি সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ ও বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট অংশ অনুবাদ করেন। সেগুলো দূতাবাস প্রধানকে দেয়া হয়। তিনি যেগুলোকে প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন সেগুলি তার দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেন। বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশীদের তিক্ত অভিমত হলো এই যে, বিদেশীরা শুধু লিফ সার্ভিস দেয়। কাজের কাজ কিছুই করে না। বিদেশীদের কাছে বর্তমান সরকার সুস্পষ্ট ভাষায় ওয়াদা করেছিলেন যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনটি হলো নিয়ম রক্ষার অর্থাৎ সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। এই নির্বাচনটি হয়ে যাক, তার পর সরকার সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশ গ্রহণমূলক নির্বাচন করবে। ৫ বছর পার হতে চললো। সেই নির্বাচন আর হয়নি। এখন আর একটি নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সুতরাং বিএনপি আর কি দেখবে? বিদেশীদেরকে আর নতুন করে কি বোঝাবে?
এই পটভূমিতে বিএনপির সামনে মাত্র দুটি অপশন খোলা রয়েছে। একটি হলো সরাসরি বলে দেয়া যে, তাদের দাবিসমূহ পূরণ না হলে এবারেও তারা নির্বাচন করবে না। এবার শুধু মাত্র নির্বাচন বর্জন করেই তারা ক্ষান্ত হবে না, সেই নির্বাচন তারা সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ করে ছাড়বেন। সেই দাবিগুলো হলো,
(১) প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং সেখানে একটি নিরপেক্ষ অথবা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার গঠন করতে হবে।
(২) বর্তমান জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে হবে।
(৩) নির্বাচনকালে সেনা বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।
অন্যান্য দাবি দাওয়ার কথা আর বললাম না। এই তিনটি দাবি পূরণ হলেই বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট ইলেকশনে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
এটি ছিল এক নম্বর অপশন। দ্বিতীয় অপশন হলো, যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করা। বেগম খালেদা জিয়া জেলের ভেতরেই থাকুন আর বাইরেই থাকুন, নির্বাচনে তারা অংশ গ্রহণ করবে। যদি নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত করা হয় তাহলে তার পাশাপাশি তাদেরকে বক্তৃতা বিবৃতির সাথে সাথে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে শক্ত পাহারা বসাতে হবে। দেখতে হবে পেশিশক্তি দিয়ে বা মাস্তানি করে প্রতিপক্ষ যেন কেন্দ্র দখল করতে না পারে। যদি কেন্দ্র দখল করতে আসে তাহলে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতি কেন্দ্রে ওদেরকে সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।
যে দুটি অপশনের কথা বলা হলো, যে দুটি অপশনের কথা উল্লেখ করা হলো, এগুলোর যে কোনো একটি গ্রহণ করতে হবে। এব্যাপারে কোনো বিলম্ব করা চলবে না। বিলম্ব হলে সেটি শুধুমাত্র বিএনপি নয়, ইসলামী মূল্যবোধ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী সমস্ত মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে। এই ঘরানার সমর্থক লোকজন আশা করেন যে, ঈদের পরে পরেই বিএনপি এব্যাপারে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
॥তিন॥
বেগম খালেদা জিয়ার কারাদন্ড এবং মুক্তির বিষয়টি অতীতে যেমন ছিল পরিষ্কার তেমনি এখনো পরিস্কার। আফসোস, শুধু মাত্র বিএনপির একটি অংশ সেই বিষয়টি বুঝতে বিলম্ব করলো। তবুও ভালো, Better Late than never. এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে, মুক্তির জন্য খালেদা জিয়াকে কারাদন্ড দেয়া হয়নি এবং জেলে ঢুকানো হয়নি। মওদুদ সাহেবরা এতদিন ধরে বলে এসেছেন যে আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে বেগম জিয়াকে মুক্ত করা হবে। যে দেশে আইনের শাসনের কোনো বালাই নেই সেই দেশে আইনের মাধ্যমে তাকে কিভাবে মুক্ত করা হবে? এত সহজ সরল একটি বিষয় তো দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ারই কথা নয়। তাও তো তারা সেটি নিলেন। তেমন একটি সিম্পল মামলায় বেলের আদেশ পেতে তিন মাসেরও বেশি সময় লাগলো। ‘সংগ্রাম’সহ একাধিক পত্রপত্রিকায় আমি লিখেছি যে, সুপ্রিম কোর্ট অরফানেজ মামলায় বেগম জিয়াকে বেল দেবে, কিন্তু তিনি বের হতে পারবেন না। এর আগে আরও তিনটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। তার পর সেটি বেড়ে হলো ৫। তারপর সেটি বেড়ে হলো ৬। এখন সেটির সংখ্যা ৮। এই ৮টি মামলায় জামিন নিতে নিতে কত মাস লাগবে?
ঐ দিকে বেল দিতে গিয়ে আপিল বিভাগ একটি নজিরবিহিন আদেশ দিয়েছেন। বলেছেন, অরফানেজ মামলা সংক্রান্ত আপিল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে হাইকোর্টকে নিষ্পত্তি করতে হবে। যারা নিরপেক্ষ তারা আলোচ্য আদেশের ধরন দেখে বলছেন যে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হবে। সেই নিষ্পত্তিতে বেগম জিয়ার ৫ বছরের সাজা বহাল থাকবে। ফলে তিনি আর নির্বাচন করতে পারবেন না। ঐ দিকে তারেক রহমানের ১০ বছরের সাজাও বহাল থাকবে। সুতরাং তিনিও নির্বাচন করতে পারবেন না। তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বিতর্কে তার পুরো পরিবার অর্থাৎ তার স্ত্রী জুবায়দা রহমান এবং কন্যা জায়মা রহমানের পাসপোর্টও জমা দেওয়া হয়েছে। তাই জুবায়দা রহমানও নির্বাচনের সময় দেশে আসতে পারছেন না। ফলে অবস্থাটা এই রকম দাঁড়াবে যে, জিয়া ফ্যামিলির কেউই আগামী ইলেকশনে অংশ নিতে পারবেন না।
এই পটভূমিতে বিএনপির সামনে দুর্বার গণআন্দোলন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। জেলের বাইরে যারা আছেন তারা যদি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন তাহলে এত ঝক্কিঝামেলা পোহানোর কোনো প্রয়োজন নাই। কিন্তু যদি জনমতকে যথার্থই প্রতিফলিত করতে হয় তাহলে জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথেই সেই মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এতদিন পর মির্জা ফখরুল, মওদুদ আহমেদ এবং খন্দকার মাহবুব হোসেন স্বীকার করেছেন যে, খালেদা জিয়ার মুক্তি নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছার ওপর। তাই সরকারের ইচ্ছার ওপর ভরসা না করে যদি বেগম জিয়ার মুক্তি কামনা করা হয় তাহলে গণতান্ত্রিক পথে রাজপথে নেমে আসতে হবে। এর আর কোনো বিকল্প নাই।
asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ