ঢাকা, সোমবার 21 May 2018, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নারী বিষয়ক দিবস এবং বাস্তব পরিস্থিতি

আশিকুল হামিদ : দিন কয়েক আগে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ‘মা দিবস’ পালিত হলো। এ উপলক্ষে হইচই ও ধুমধামও কম করা হয়নি। পাঠকরা অবাক হতে পারেন, অন্যদিকে সবকিছু দেখেশুনে আমার কিন্তু বারবার ঘুম পাড়ানো গানের কথা মনে পড়েছে। আমাদের মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য এখনো গুনগুন করে নানা ধরনের গান গেয়ে থাকেন। এসব গান শুনতে শুনতেই শিশুরা এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। গানের কথাটা অবশ্য অকারণে মনে পড়েনি। বর্তমান পর্যায়ে আমার কাছে ‘মা’ হিসেবে এসেছে সরকার। শুনে পাঠকরা অবাক হতে পারেন। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন, ধর্ষণ ও ছিনতাই-ডাকাতি থেকে জিনিসপত্রের মূল্য পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়েই সরকার ওই মায়েদের মতো জনগণকে কেবল ঘুম পাড়ানো গানই শুনিয়ে চলেছে। যেমন এই সময়ে সারাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে ধর্ষণের নানা ঘটনা নিয়ে। বলা বাহুল্য, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির প্রশ্ন। আলোচনায় আসছে লাফিয়ে বেড়ে চলা ছিনতাই-ডাকাতির পাশাপাশি র‌্যাব ও পুলিশসহ দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর ভূমিকার প্রশ্নও। অন্যদিকে এসব বাহিনী কিন্তু ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছে, এখন নাকি ‘আগের মতো’ ছিনতাই হয় না! পুলিশেরই অন্য এক কর্মকর্তা আবার একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ছিনতাই এখন ‘হয় না বললেই চলে!’ এ ব্যাপারে সকল কৃতিত্ব যে পুলিশের সেকথাটা স্মরণ করিয়ে দিতেও ভুল হয়নি ওই কর্মকর্তার। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও কথাটার সঙ্গে যথারীতি সুর মিলিয়েছেন।
এ বিষয়ে অল্পকথায় বলা সম্ভব নয় এবং কথায় কথা বাড়তে পারে বলে এখানে বরং একটু ভূমিকা দেয়া দরকার। এর সঙ্গেও অবশ্য আরো এক দিবসের সম্পর্ক রয়েছে। সেদিন, গত ৮ মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ ধরনের দিবস পালন উপলক্ষে আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে সাধারণত যাই না, যাওয়াও হয় না। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটেছিল স্ত্রীর কারণে। তার নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালের পুরুষ চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলেন। স্ত্রীর নামের পাশে লিখেছিলেন ‘সস্বামী’। অর্থাৎ আমাকেও তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে নয়। স্ত্রীর স্বামী হিসেবে! তবু যেতে হয়েছিল। সেখানে নানা বয়সের নারীদের সমাবেশ ঘটেছিল। অনেকের স্বামীকেও দেখা গেছে। কিন্তু অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্বে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন নারীরা। যেমন নারী দিবস উপলক্ষে বাহারী রঙের কেকটি কেটেছেন পুরুষ চেয়ারম্যানের স্ত্রী- যিনি একজন বড় মাপের চিকিৎসক। ছোটখাটো একটি আলোচনা সভাও হয়েছে। সেখানে সব বক্তাই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। কঠোর বক্তব্য রেখেছেন তারা।
এ পর্যন্ত আসার পর আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পাঠকরা বিভ্রান্ত হতে পারেন। না, আমিও সুযোগ পেলেই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখি। সেদিনের সমাবেশে আমাকে সুযোগ দেয়া হয়নি। সুযোগ পেয়েছিলেন আমার স্ত্রী। তার পরিচয় জানাতে গিয়ে উদ্যোক্তারা অবশ্য অনুগ্রহ করে আমার নাম উচ্চারণ করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তারাও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নারী এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ নন। আমার স্ত্রী নিজেও যথেষ্টই বলেছেন। মূলকথায় তিনি ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের অধিকার ও মর্যাদার কথা তুলে ধরেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশে নারীদের ওপর যে নির্যাতন চলছে ইসলাম তাকে সমর্থন করে না। বড় কথা, ইসলামের নির্দেশনার আলোকে চলতে পারলে দেশে নারী নির্যাতনের সুযোগই থাকবে না। আয়োজক হাসপাতালের উদ্যোক্তারা বাম ঘরানার হওয়ায় ইসলামের কথা শুনে খুব বেশি প্রীত হতে পারেননি সত্য, কিন্তু প্রকাশ্যে আমার স্ত্রীর বিরোধিতাও করেননি। করার আসলে উপায় ছিল না। কারণ, তিনি অসত্য কিছুই বলেননি।
এবার বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার দিকে লক্ষ্য করা যাক। আওয়ামী লীগ সরকারের বদৌলতে নারী মুক্তি ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক স্লোগান শুনতে শুনতে মানুষের কান যখন ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে তখনও দেশে নারী নির্যাতন এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বাড়ছেই। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে জানা গেছে, নারীরা ৩৩ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। ধরনগুলোর মধ্যে ধর্ষণ ও গণধর্ষণ তো রয়েছেই, রয়েছে যৌতুকের জন্য হত্যার মতো নিষ্ঠুরতাও। সব ঘটনাই অবশ্য প্রকাশ্যে আসে না। কারণ, লোকলজ্জার ভয়ে এদেশে সাধারণত নারী নির্যাতনের- বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনা গোপন রাখা হয়। 
তা সত্ত্বেও প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করা দরকার। জাতীয় দৈনিকগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ভয়ংকর অপরাধ শুধু বেড়েই চলেছে। যেমন ২০১৬ সালে যেখানে ৪০৭ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল, সেখানে পরের বছর ২০১৭ সালে হয়েছে ৭৯৫ জন। এদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৩২০, অন্যদিকে শিশুর সংখ্যা ৩০০। এদের বাইরে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৭ জন। তাছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮ জনকে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রতিবন্ধীরাও। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যে পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছে সেটা আরো ভীতিকর। সংস্থাটি জানিয়েছে, ৭৯৫ নয়, ২০১৭ সালের প্রথম ১০ মাসেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি। এর মধ্যে গণধর্ষণের সংখ্যা ছিল ১৯৩। সব মিলিয়েই ২০১৭ সালে নারী নির্যাতন ও শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে বছর জুড়েই। চলতি বছর ২০১৮ সালেও নারী নির্যাতন ও শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে শুরু থেকেই। তুলনামূলকভাবে বেড়েছে ধর্ষণ ও শিশু হত্যার অপরাধও। এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে তৃতীয় শ্রেণীর একজন স্কুলছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেছেন স্কুলটির প্রধান শিক্ষক।
এভাবেই প্রতিদিন নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারীরা। কিন্তু ভাষণে-বিবৃতিতে লম্বা কথা বলার এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস ধরনের আনুষ্ঠানিকতা পালনের বাইরে নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিহত করার কোনো চেষ্টা এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্রসঙ্গক্রমে নারী নির্যাতনের অন্য এক ধরন সম্পর্কে সর্বশেষ কিছু তথ্যের উল্লেখ করা দরকার। ৮ মার্চ পালিত আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারীই যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। গবেষণা জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানা গেছে, হয়রানি ও নিপীড়ন যে পুরুষেরা করে তাদের মধ্যে ৬৬ শতাংশের বয়স ৪১ থেকে ৬০ বছর। ষাটোর্ধ পুরুষেরাও পিছিয়ে থাকে না। তারাও সুযোগ পেলে নিপীড়ন করে।
তবে নারীদের জন্য বেশি বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কম বয়সী যুবক ও পুরুষেরা, যাদের বয়স ২৬ থেকে ৪০-এর মধ্যে। সাধারণ বাস বা গণপরিবহনে তো বটেই, নারীরা যৌন হয়রানির বেশি শিকার হয় টেম্পো এবং টেম্পো নামের হিউম্যান হলারে। সে কারণে ৯৬ শতাংশ নারীই এসব টেম্পো এবং হিউম্যান হলারকে সবচেয়ে অনিরাপদ বাহন মনে করে। সাধারণ বাসের পাশাপাশি রিকশা এবং সিএনজির ক্ষেত্রেও নারীদের অভিজ্ঞতা কমবেশি একই রকম। অর্থাৎ সব যানবাহনেই তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়। তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়। যাত্রীদের পাশাপাশি রয়েছে যানবাহনের চালক, কন্ডাক্টর ও হেল্পারসহ অন্যরাও। তারাও নারীদের নির্যাতন ও উত্ত্যক্ত করে থাকে যথেচ্ছভাবে। চলন্ত বাসের ভেতরে নির্যাতন শুধু নয়, ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে মাঝে-মধ্যেই। 
এই নির্যাতন ও নিপীড়নের ধরন সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে ওই গবেষণা রিপোর্টে। ইচ্ছাকৃতভাবে শরীরে স্পর্শ করা ও চিমটি কাটা, শরীর ঘেঁষে বসা বা দাঁড়ানো, কাঁধে হাত রাখা, হাত-বুক বা শরীরের অন্যান্য স্থানে স্পর্শ করা ও চাপ দেয়ার মতো বিভিন্ন তথ্যের উল্লেখ করে রিপোর্টে জানানো হয়েছে, যৌন হয়রানি ও নির্যাতন যারা করে তারা এমনকি বাসে বা হিউম্যান হলারসহ যানবাহনে ওঠার ও নামার সময়ও অশালীন তৎপরতা চালিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বসার বা দাঁড়ানোর স্থান পরিবর্তন করতে গিয়েও নারীরা বেশি নির্যাতিত হয়। ৮১ শতাংশ নারী জানিয়েছে, সব বুঝেও তারা মানসম্মানের স্বার্থে চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়। প্রতিবাদও জানায় অনেকে কিন্তু এতে লাভের চাইতে ক্ষতিই নাকি বেশি হয়। কারণ, অন্য পুরুষ যাত্রীরা বিকৃত আনন্দের হাসি হাসে। ব্যঙ্গ-তামাশা করে। এসব কারণে গবেষণার জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে ২১ শতাংশ গণপরিবহনে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছে। যাতায়াত একেবারে বন্ধও করেছে অনেকে। তাদের বড় একটি অংশ নির্যাতনের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় হিজাব পরতে শুরু করেছে- যাতে সুন্দর চেহারার কারণে অসভ্য পুরুষেরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট না হয়। এতে অবশ্য খুব একটা লাভ হয়নি। কারণ, যৌন হয়রানি যারা করে তাদের দরকার যে কোনো বয়স ও চেহারার নারী।
বলার অপেক্ষা রাখে না, যানবাহনে নির্যাতন ও হয়রানির এই খবর সকল বিচারেই অগ্রহণযোগ্য। গবেষণা রিপোর্টে বেশি বয়স ও শারীরিক কারণে অক্ষমতা, অতৃপ্তি এবং স্ত্রী বা নারী সঙ্গী না থাকার মতো বেশ কিছু কারণের উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমতেরও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টে। কিন্তু বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে আইনের বিষয়টি। বলা হয়েছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দেশে এখনো যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এর ফলে যৌন নিপীড়নসহ নারী নির্যাতন শুধু বেড়েই চলছে না, বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমান সরকারের আমলে নারী নির্যাতনের রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছে। ধর্ষণ ও গণধর্ষণ থেকে হত্যা ও নানামুখী নির্যাতন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে এত বেশি ও ভয়ংকর ধরনের নির্যাতনের শিকার নারীরা অতীতে আর কখনো হয়নি। শিশুরাও যে বাদ যাচ্ছে না বরং তাদের ওপর চালানো নির্যাতনও যে ক্রমান্বয়ে আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে- সে সম্পর্কেও গণমাধ্যমে মাঝে-মধ্যেই রিপোর্ট  প্রকাশিত হচ্ছে। সংক্ষপে বলা যায়, দেশে নারী নির্যাতন আসলে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাস্তবেও পরিস্থিতি যে অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সে সম্পর্কেই ধারণা পাওয়া গেছে বেসরকারি সংস্থার ওই গবেষণা রিপোর্টে।
বলা দরকার, সবই সম্ভব হয়েছে ও হচ্ছে আসলে দেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। মেয়েরা, এমনকি শিশুরা পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে না, তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে, তারা ধর্ষণেরও শিকার হবেÑ এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। শুধু তা-ই নয়, বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো লাঞ্ছিত হতে হবে, তার ওপর নেমে আসবে নির্যাতনের খড়গ এবং তাকে এমনকি গ্রাম ও এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়ারও চেষ্টা চালানো হবেÑ এসবের কোনো একটিও সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়।
বিশ্বের অন্য সব দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও যখন নারী মুক্তি ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে নানা ধরনের আসর জমানো হচ্ছে তখন নারীর ওপর এই সর্বাত্মক নির্যাতন ও সহিংসতার খবর শুধু আশংকাজনক নয়, নিঃসন্দেহে আপত্তিকরও। আপত্তির কারণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যালোচনায় দেখা যাবে, কারণ আসলে সরকারের উদ্যোগহীনতা এবং ক্ষমতাসীনদের শস্তা রাজনীতি। বস্তুত স্বীকার করতেই হবে, সরকার নারীদের নিয়ে শুধু রাজনীতি করছে বলেই দেশে নারী নির্যাতন কমার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। অথচ শস্তা স্লোগানের বাইরে সরকারের যদি সামান্য সদিচ্ছাও থাকতো তাহলেও নারীদের অবস্থা এতটা শোচনীয় হয়ে উঠতো না। সদিচ্ছা না থাকার কারণগুলোও উল্লেখ করা দরকার। একটি প্রধান কারণ হলো, নির্যাতন ও সহিংসতা যারা চালাচ্ছে তাদের বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কারো কারো আবার মন্ত্রী-মিনিস্টারদের সঙ্গেও দহরম-মহরম রয়েছে। ফলে তারা কোনো অপরাধ করলে পুলিশের পক্ষে কোনো ব্যবস্থা নেয়াই সম্ভব হয় না। থানা এমনকি মামলা পর্যন্ত নিতে চায় না। মামলা করতে গিয়ে উল্টো হুমকি-ধামকি খেয়েছে এমন নারী ও তাদের স্বজনদের সংখ্যাও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নিজেও নারীদের ওপর নির্যাতন চালায়। এই তো মাত্র কিছুদিন আগেই একজন আন্দোলনকারী নারীর বক্ষদেশ ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে একজন পুলিশ সদস্য। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়েছে। কিন্তু সরকারকে নড়াচড়া করতে দেখা যায়নি। একই কারণে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে নালিশ জানানোর বা বিচার চাওয়ারও কোনো উপায় নেই দেশে। এভাবে অসংখ্য নারীর জীবন নষ্ট হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে গেছে বহুজনের সাধের সংসার। যৌন নির্যাতনের শিকার কত নারী যে বাধ্য হয়ে বিপথে গেছে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি তারও কোনো হিসাব নেই।
বলা দরকার, ধরন যেমনই হোক, নারীর ওপর নির্যাতনকারীদের কোনোক্রমেই ছাড় দেয়া যায় না। এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা অবশ্যই সরকারকে পালন করতে হবে। নারীদের নিয়ে শস্তা রাজনীতি বন্ধ করে সরকারের উচিত অবিলম্বে এই জঘন্য কর্মকান্ড প্রতিহত করার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠা। নারী নির্যাতন প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে একটি আইনের খসড়ার কথা বহুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। আইনটিকে অবিলম্বে কার্যকর করা দরকার। নির্যাতিত নারীদের জন্য তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার ধরনের প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যাতে নির্যাতিত নারীরা আইনের আশ্রয় নিতে এবং সুবিচার পেতে পারে। অফিস আদালত ও শিল্প-কারখানাসহ কর্মস্থলেও নারীদের জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। কারণ, এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অসংখ্য অপরাধী দিব্যি পার পেয়ে যাচ্ছে। এমনটি চলতে থাকলে এবং পুলিশ ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা না নিতে পারলে নারী নির্যাতন কোনোদিনই প্রতিহত করা বা কমিয়ে আনা যাবে না। ক্ষমতাসীনদের বুঝতে হবে, লাফিয়ে বেড়ে চলা নারী নির্যাতনের ঘটনায় আর যা-ই হোক, সরকারের ভাবমর্যাদা অন্তত বাড়ছে না। বরং প্রধানমন্ত্রী নারী বলে উল্টোটাই ঘটছে। 
এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন তথা নারীর ওপর নির্যাতনের অবসান ঘটাতে হলে নির্যাতনকারী সকলের বিরুদ্ধেই আইনত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। জনগণ এমন অবস্থার নিশ্চয়তা চায়- যাতে আর কোনো নারীকেই যাতায়াতের পথে যৌন হয়রানি ও  নির্যাতনের শিকার হতে না হয়। একথা বুঝতে হবে যে, দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় এবং যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে বলেই এমন ঘটনা ঘটতে পারছে। সুতরাং সবার আগে দরকার যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা- যার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই সরকারের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ