ঢাকা, সোমবার 21 May 2018, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রমযানসহ সকল মাসে মুসলমানদের জন্য পবিত্র হালাল খাদ্য গ্রহণ একটি ফরযি দায়িত্ব

-এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান, এমএম (ডাবল হাদীস, তাফসীর), বিএসএস (সম্মান), এমএসএস (রাষ্ট্র বিজ্ঞান), এলএলবি

ভূমিকা : মহান স্রষ্টা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত মানবজাতীর জন্য সর্বশেষ বিধান আল কুরআন এবং তার প্রেরিত সর্বশেষ বার্তাবাহক মুহাম্মাদুর রসুলুলাহ (দঃ) আনীত জীবন বিধান আমাদের বসবাসের এই পৃথিবী নামক গ্রহের সকল মানব সদস্যদেরকে উপহার দিয়েছে এক কালজয়ী ইনসাফ ও ভারসাম্য পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মানব জাতির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের যতগুলো অধ্যায় রয়েছে ততটি অধ্যায়ের জন্য এক পরিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা বা সমাধানের বিধান দ্বারা ইসলামী আদর্শ পরিপূর্ণ হয়ে আছে। কিন্তু ইবলিশ শয়তান মানব জাতির পিছনে লেগে থেকে তাকে আল্লাহর প্রেরিত জীবন ব্যবস্থা থেকে সরায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এর দুনিয়াতে আসার সময়েই আল্লাহর সামনে যে প্রতিজ্ঞা বা অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিল বা আল্লাহর কাছে অবকাশ চেয়ে নিয়েছিল। ইবলিশ নিরন্তরভাবে মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সে কারণে মানবজাতির বিরাট একটি অংশ তার স্রষ্টা আল্লাহ আর তার প্রেরিত আদর্শ নেতা মুহাম্মদ (দঃ) এবং সকল নবী (আঃ) গণ বা আল্লাহর প্রেরিত কিতাব বা বিধানের নির্দেশনা থেকে বার বার সরে গেছে তারা নিজেরাই অনেক অনেক বিধান তৈরি করেছে। যার সাথে আল্লাহর প্রেরিত বিধানের দূরতম কোন সম্পর্ক নাই। সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (দঃ) তার সাথী সাহাবীগণ এবং তাদের ছাত্র তাবেয়ীগণ বা তাবেয়ীগণের ছাত্র তাবেয় তাবেয়ীগণ অতিক্রান্ত হয়েছেন অনেক আগেই। মহানবী (দঃ) এর এখন থেকে ১৫৪৭ বছর আগে  পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া আদর্শের কতভাগ আমরা মুসলমানরা ধারন করে আছি তার কোন হিসাব আমাদের কাছেতো নেইই বরং নবীগণের ওয়ারিশ বলে খ্যাত  আলেম সমাজের কাছেও তার কোন পরিসংখ্যান নেই। যাহোক আমি আজকের লেখায় এ বিষয়ে বেশি গভীরে না গিয়ে শুধুমাত্র ইসলামী আদর্শ মানবজাতি তথা মুসলমান জাতিকে খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে যে দিক নির্দেশনা দিয়েছে সে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ কর্তৃক উপস্থাপিত বিধিবিধানের বিষয়ে সামান্য একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবো। এতে যদি মুসলিম জাতি যদি সামান্য কিছু দিক নির্দেশনা পেয়ে জান্নাতে যাওয়ার পূর্ব শর্ত হালাল খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে সঠিক পথ খুঁজে নেয় সেটাই হবে এই নিবন্ধের বড় সাফল্য।
হালাল বা বৈধ খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদীস বা সুন্নাহর দিক নির্দেশনা ঃ পবিত্র কোরআন এবং হাদীসে রসুল (দঃ) এর মধ্যে খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে বিশাল পরিমাণ নির্দেশনা বিদ্যমান। ঐ নির্দেশনা গুলো মান্যকরা মুসলমানদের জন্য ফরয বা অপরিহার্য্য কর্তব্য। কোন মুসলমান ব্যক্তি বা মুসলমান হবার দাবীদার ব্যক্তি ঐ নির্দেশনা গুলোকে অস্বীকার করলে বা সে গুলোকে ভুল মনে করলে বা নির্দেশনাগুলোকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য বা অবহেলা করলে সে মুশরীক, ফাসিকে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি আলাহর দ্বীনের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে। কোন মুসলমান হবার দাবীদার ব্যক্তি যদি কোন খাদ্য হারাম বা নিষিদ্ধ হবার বিষয়টি ভালভাবে জানা থাকা স্বত্বেও ইচ্ছাপূর্বক কোন হারাম খাদ্য ভক্ষণ বা গ্রহণ করে বা কোন মুসলমান ব্যক্তি তার পরিবার পরিজনকে ঐ হারাম খাদ্য পরিবেশন করে, তবে ঐ ব্যক্তি মুশরীক বা ফাসিক বলে গণ্য হয়। তাকে অমুসলিম বলে আখ্যায়িত করা না গেলেও কবিরা গুনাহকারী মুজরিম বা ফাসিক বলা যাবে অবশ্যই। বর্তমান সময়কালে বাংলাদেশসহ গোটা মুসলিম জাহান বা এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করতে থাকা মুসলমানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যারা নিজেদের আধুনিক মনা মুসলমান হবার দাবীদার, তারা ইসলামের খাদ্য গ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্বহীন বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে মুসলমানদের ধর্মীয় নেতা হিসাবে বিবেচিত আলিম সমাজ, মসজিদের ইমাম, পীর মাশায়েখ ও তাদের অনুসারীরা, ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর দাবীদার ওয়ায়েজরা, যারা প্রতিদিন বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টকশোয় এবং ইউটিউবে তাদের বক্তৃতার অংশ বিশেষ প্রচার করে নিজেদের ওয়াজের ব্যবসা সচল রেখেছেন তারা এবং  তাবলীগ জামায়াতের অনুসারী ভাইয়েরা, সেই সাথে বিভিন্ন কাওমী মাদ্রাসা ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এর ইসলামী শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক ডক্টরেট ডিগ্রীধারীরা ও ছাত্ররা মুসলমানদের জন্য হালাল হারাম এর সঠিক  নির্দেশনা না জানিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। মুসলমানদের ক্ষুদ্র একটি অংশ দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। তারা কখনও মসজিদে আদায় করেন। আবার কখনো ঘরে বসে আদায় করেন। অনেকে এক বা একাধিকবার হজব্রত পালন করেছেন। তারাও এ বিষয়ে রহস্যজনক ভাবে নীরব রয়েছেন। আমার মনে হয় বাংলাদেশের ওয়াজ ব্যবসায়ীরা ইসলাম প্রচারের ব্যবসা থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ জনগণের পকেট থেকে হাতিয়ে নিয়ে অনেক অর্থবিত্ত্বের মালিক হচ্ছেন। সম্ভবত সেকারণেই তারা হালাল হারামের বিষয়ে বেশি মুখ খোলেন না। কারণ তারা নিজেরাও জানেন যে তাদের রোজগার একটি হারাম রোজগার তাদের আচরণে মনে হয় ইসলামে হালাল হারাম বলে কোন বিষয় নেই। মনে পড়ে আমরা যখন ছোট ছিলাম সে সময়ে আমাদের গ্রামের পার্শ্বের মাদ্রাসা/খানকা শরীফে প্রতি বছর ইফতার সম্মেলন হত ২৭ শে রমজান সন্ধ্যায়। আমার মরহুমা মা সহ এলাকার মা বোনরা বাড়ীতে খৈ মুড়ি ভেজে গরম গুড়ে মাখায়ে আমাদের মতো বাচ্চাদের মাধ্যমে ইফতার সম্মেলনে পাঠাতেন এলাকার মানুষদের সম্মিলিত দানে খানকা শরীফের সামনে নাস্তার স্তুপ হয়ে যেত। খানকা শরীফের পক্ষে এলাকার মুসলমানদের দানের টাকায় মাংস পোলাও রান্না হত। পোলাও এবং মিষ্টি গুড় মাখানো খৈ মুড়ি ইফতার হিসাবে সরবরাহ হত। সে সময়ের ইফতার ছিল অনাড়ম্বর। তবে তা অনুষ্ঠিত হতো পবিত্র এক মহিমাময় পরিবেশে। সেখানে হারাম খাদ্য পরিবেশন ছাড়াই মাহফিল শেষ হত। বর্তমান সময় কালে ইফতার অনুষ্ঠান একটি সামাজিক বা রাজনৈতিক রূপ লাভ করেছে। এটা এখন আধুনিকতা বা ফ্যাসানেও পরিণত হয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে একজন আইনজীবী হিসাবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর কয়েকটি শাখার প্যানেল ল ইয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। প্রতি বছর স্থানীয় ইসলামী ব্যাংক শাখা গুলোতে বেশ জাঁকজমকের সাথে ইফতার সম্মেলন হচ্ছে। ব্যাংকের প্যানেল ল ইয়ার হওয়ার সুবাদে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক বা শাখা প্রধানদের আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াতে ইফতার সম্মেলন গুলোতে অংশ নিয়ে আসছি। এখনকার ইফতার সম্মেলনে আগের মতো কোন নাস্তার আইটেম নেই। এখন প্যাকেটে মুরগীর ভুনা মাংস সহ বিরিয়ানী সাথে কিছু খেজুর, বোতলজাত পানি পরিবেশিত হচ্ছে। বিগত রমজানে ইসলামী ব্যাংক রংপুর শাখার ইফতার সম্মেলনে অংশ নিয়ে আসছি। ইফতার ও মাগরিব এর নামাজ শেষে শাখা প্রধান মহোদয়ের চেম্বারে প্রধান আলোচক স্থানীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ জামে মসজিদের খতিব সাহেব সহ চা পর্ব চলছিল। কৌতুহল বশতঃ শাখা প্রধান মহোদয়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, প্যাকেট বিরিয়ানীর মুরগী গুলো হালাল পন্থায় জবেহ হয়েছিল কি না? তিনি হেসেছেন, উত্তর দেন নাই। তিনি অত্যন্ত সজ্জন আর ভদ্র মানুষ ছিলেন। সম্প্রতি তিনি বদলী হয়ে ঢাকা চলে গেছেন। আমি প্রধান আলোচকসহ উপস্থিত সবার সামনে বলেছিলাম যে সব হোটেলে এসব ইফতারির প্যাকেটের অর্ডার দেয়া হয় তারা হালাল উপায়ে মুরগী জবেহ করে না। তার পরেও রমজান মাসে আমরা কেন এই সন্দেহ জনক মাংস দ্বারা রোজা ভঙ্গ করছি। এ ব্যাপারে আমরা কেন চুপ করে আছি? দেখলাম প্রধান আলোচক, মাওলানা সাহেবসহ সবাই মুচকী হাসলেন। মনে হলো বিষয়টি শরীয়তের দিকে থেকে একেবারেই  একটি গুরুত্বহীন বিষয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে হালাল মাংস পেতে তেমন বেগ পেতে হয় না। কারণ গ্রামে এখনও মানুষ মুরগী, গরু, ভেড়া, ছাগল নিজেরাই আল্লাহর নামে জবেহ করেন বা গ্রামের ধর্মপ্রাণ কোন ঈমানদার মানুষের কাছে নিয়ে তা জবেহ করে নেন। গ্রামে যারা জবেহ করেন তারা আল্লাহর নামেই পশু পাখি জবেহ করে থাকেন। বর্তমানে সপ্তাহের বেশ খানিকটা সময় কয়েকদিন শহরেই থাকি। সেই সুবাদে শহরের কাঁচা বাজারে বাজার করতে যাই। হাস,মুরগীর দোকান থেকে এখন আর কেউ জীবন্ত হাঁস মুরগী নিয়ে বাড়ীতে ফেরেন না। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ