ঢাকা, মঙ্গলবার 22 May 2018, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সড়ক খাতের বিপর্যয় ও সরকারের অকার্যকারিতা

সম্প্রতি পত্র পত্রিকায় দেশের সড়ক মহাসড়কগুলোর উপর একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগ এই জরিপ পরিচালনা করেছে বলে জানা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সড়ক এই তিন ক্যাটাগরিতে সারা দেশে প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়ক রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের নবেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগ ৩৭৬০.৮ কি. মি জাতীয় মহাসড়ক, ৩৮২১.৮ কি. মি. আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১০,৩৯৩.৭ কি.মি. জেলা সড়কের উপর জরিপ পরিচালনা করে। জরিপ অনুযায়ী সারা দেশে রাস্তার ২৬.৩২ শতাংশের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি রাস্তা চলাচলের অযোগ্য। আবার ১০৭৩ কি. মি. রাস্তার অবস্থা খানা-খন্দকে ভরা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাঙ্গাচোরা সড়ক মেরামত, পুন:নির্মাণ প্রভৃতি বাবত আগামী পাঁচ বছরে প্রয়োজন ২৯,৮৯০ কোটি টাকা। তাদের হিসাব অনুযায়ী বর্তমান অর্থ বছরেই প্রয়োজন ১৫৮১৩ কোটি টাকা, এইচডিএম’র আগের বছরের প্রতিবেদনে এই বছরের জন্য ১২ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের মতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আভ্যন্তরীণ এই জরীপে রাস্তাঘাটের প্রকৃত অবস্থা ফুটে উঠেনি, প্রকৃত অবস্থা আরো খারাপ। সারা সড়কে খানা খন্দক তো আছেই বর্ষাকালে সড়কের মাঝখানে ডোবার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়ক। গত দশ বছর ধরে এই মহাসড়কটি জাতীয় জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী একটি অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। মহাসড়কটি চার লেনে রূপান্তর করতে গিয়ে সরকার যে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে তা নজিরবিহীন। যানজটের অপর নাম এখন এই মহাসড়ক। আট ঘণ্টার রাস্তা পার হতে এখন সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। এতে যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ ছাড়াও সড়ক  যোগাযোগ অচল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থা সারা বাংলাদেশের। ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-দিনাজপুর এমন কোনও মহাসড়ক নেই যেখানে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে না এবং খানা খন্দক নেই।
পাঠকদের হয়ত মনে আছে যে এই সরকারের আমলে সড়ক খাতের দুর্ভোগ নতুন কোনও ঘটনা নয়। সরকারের তিন বছর মেয়াদ পার হবার আগেই ২০১০-১১ অর্থ বছরে সড়ক মেরামত ও সংস্কারের দাবিতে বাস মালিকরা ধর্মঘট ও মানববন্ধন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মহাসড়ক সমূহের দুরবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কসহ উত্তর বঙ্গের ১২টি রুটে টানা ৭/৮ দিন বাস যোগাযোগ বন্ধ ছিল। আবার বৃহত্তর বরিশালের সড়কসমূহের দুরবস্থার প্রেক্ষাপটে উক্ত এলাকায় ১০ মিনিটের জন্য প্রতিকী ধর্মঘট এবং মানববন্ধন পালন করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আরো কিছু ঘটনা ঘটেছে। সড়ক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে রোডস এন্ড হাইওয়েজ এর প্রধান প্রকৌশলী পদত্যাগও করেছিলেন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতায় শুধু বিরোধী দল নয় সরকার সরকারি দলের তরফ থেকে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন এবং এই খাতে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগও উঠেছিল। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী, ও তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী নৌপরিবহন মন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা দুর্নীতি পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সিপিবির সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান অভিযোগ করেছিলেন যে মন্ত্রীদের দুর্নীতির বখরা প্রধানমন্ত্রীর পকেটেও যায়। এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ আদালতের একটি রুলিংও ছিল প্রণিধানযোগ্য। ২০১১ সালে মহামান্য হাইকোর্ট একটি অভূতপূর্ব ও অনন্য রুল জারী করেছিলেন। সড়ক খাতের নৈরাজ্য নিয়ে চার দিকে যখন সমালোচনা চলছিল তখন পাঁচ বছরের সড়ক ও যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন ও মেরামত বাবত অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয় বিবরণী দাখিল করার জন্য এই রুলিং দেয়া হয়। সরকারের নির্বাহী  কর্তৃত্বের উপর  উচ্চ আদালতের এ ধরনের রুল জারী   কিংবা স্বপ্রণোদিত খবরদারী জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণ মানুষের কাছে উপভোগ্য বিবেচিত হলেও তাৎপর্য বিশ্লেষণে এটা ছিল সরকারেরই ব্যর্থতা ও অকার্যকারিতার ইংগিতবহ। যোগাযোগ মন্ত্রী বদলেছেন। এখন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসীন হয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক স্বয়ং। আতি কথনে অভ্যস্ত এই মন্ত্রী যদি তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বটি সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দিতেন তাহলে সড়ক মহাসড়ক খাতে এই সংকট সৃষ্টি হতো না বলে  দেশবাসী মনে করে।
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে প্রতি বছরই যোগাযোগ খাত অর্থ বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। আওয়ামী লীগ গত ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। কিভাবে আছে সেটা অন্য প্রশ্ন। দশ বছরে তারা দশটি বাজেট দিয়েছে এবং এই বাজেটগুলোতে প্রদত্ত বরাদ্দের ভিত্তিতে অর্থ ব্যয় করেছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের চাহিদার ভিত্তিতে এই সব বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। রাস্তাঘাট পুল কালভার্ট প্রভৃতি এই বরাদ্দের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দশ বছরে কখনো আমরা এই অভিযোগ শুনিনি যে যোগাযোগ খাতে ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হয়নি অথবা কম দেয়া হয়েছে। বর্ষাকালে বন্যা বা অন্যকোনও কারণে রাস্তা ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হলে বরং ঝঁঢ়ঢ়ষবসবহঃধৎু ইঁফমবঃ এ অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার কথাও শুনেছি। তাহলে রাস্তাঘাট মেরামত ও সংস্কার খাতে প্রদত্ত হাজার হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়? কেন দেশের সড়ক মহাসড়কগুলোর এত দুরবস্থা? ২০১৭-১৮ সালে সড়ক জনপথ বিভাগ তাদের জরিপে সড়ক মহাসড়কের যে দুরবস্থা তুলে ধরেছে (যদিও তা খ-াংশ) তা শুধু এই বছরে সৃষ্ট একটি অবস্থা নয়, গত ১০ বছরের পুঞ্জিভুত অবস্থা মাত্র। আগের বছরগুলোতে যদি কাজ হতো তাহলে এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। আবার সংসদে যদি গৃহপালিত না হয়ে সত্যিকার একটি বিরোধী দল থাকতো তাহলে এবং সরকার যদি হতো সত্যিকারের নির্বাচিত একটি জবাবদিহিমূলক সরকার, তাহলে  এভাবে সরকারি অর্থ লোপাট হতে পারতো না।
রাস্তা সংস্কার ও অর্থ ব্যয়ের যথার্থতা নিয়ে এখন  প্রশ্ন তোলার কেউ নেই। কিন্তু তথাপিও প্রশ্ন উঠছে। আমার ধারণা অতিমাত্রায় দুর্নীতি, দলীয় লোকদের টেন্ডারবাজী ও পাওয়ার অব এটর্নির নামে কার্যাদেশ বিক্রি, কাজ না করে রানিং বিলের নামে টাকা উত্তোলন, আত্মসাৎ ও কন্ট্রাকটার, সাবকন্ট্রাক্টারদের পলায়ন, মন্ত্রী-কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও তোষামোদ এবং কাজ না করার প্রবণতা এজন্য প্রধানত: দায়ী। এছাড়া মন্ত্রী ও এমপিদের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির মামলাসমূহ দলীয় বিবেচনায় তুলে নেয়ার ফলে তাদের মধ্যে যে বেপরোয়া মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং খাতে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সড়ক খাতের দুরবস্থা তার একটি প্রকৃষ্টি উদাহরণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ