ঢাকা, মঙ্গলবার 22 May 2018, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হালাল খাদ্য গ্রহণ সকলের জন্য একটি ফরযি দায়িত্ব

-এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান, এমএম (ডাবল হাদীস, তাফসীর), বিএসএস (সম্মান), এমএসএস (রাষ্ট্র বিজ্ঞান), এলএলবি
[দুই]
এখন দোকানীদের রেখে দেওয়া ড্রেসিং করার লোক নামে পরিচিত লোকজন হাঁস মুরগী জবেহ করে চামড়া ও পালক মুক্ত করে নাড়ী ভুঁড়ি ফেলে দিয়ে পলিথিনের প্যাকেটে করে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেয়। অনেক বছর ধরেই দেখছি এসব জবেহ কারীরা গ্রামের নিরীহ দরিদ্র শ্রেণীর নিরক্ষর মানুষ। এরা কখনই হাঁস মুরগী জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারন করে না। অনেক দাড়ি টুপি পরা লোককেও দেখেছি এদের কাছে হাঁস মুরগি জবেহ করে নিতে। মেয়ের বাড়ীতে আমার পরিবার পরিজনসহ প্রথমবার যাওয়ার আগের দিন রংপুর সিটি বাজারের খাশির মাংস ব্যবসায়ীদের সাথে একটি খাশির সম্পূর্ণ  মাংস কেটে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কথা বলি। তারা আমাকে পরদিন বাদ ফজর সিটি বাজারে ডেকেছিল পরের দিন বাদ ফজর সিটি বাজারে গিয়ে দেখলাম গ্রামের মাঠে কাজ করা মজুর শ্রেনির একজন লোক আল্লাহর নাম ছাড়াই অসংখ্য ভেড়া জবেহ করছে। কিছুক্ষণের ছাল ছড়ায়ে তার মাথায় এবং বিশেষ অঙ্গে কালো রং লাগায়ে খাশিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। আমি অবশ্য নিজ হাতে একটি খাশি জবেহ করে মাংস কিনেছিলাম। ছাত্র জীবনে ঢাকায় থাকা অবস্থায় দেখেছিলাম কিভাবে সেখানে মহিষ এর মাংস গরুর মাংসে রূপ নেয়। যাহোক আজকের আলোচনার প্রসঙ্গ ভিন্ন। বর্তমান কালে বিবাহ, কুলখানী, পিকনিক, বিভিন্ন সম্মেলন, ইফতার সম্মেলন এবং নানা ধরনের ছোট বড় অনুষ্ঠানে খাবারের প্যাকেট সরবরাহের প্রচলন ঘটেছে। খাবার ব্যবসায়ীদের কাছ অর্ডার দিয়ে খাবার প্যাকেট সাপ্লাই নেয়া হচ্ছে। অনেক সময় আয়োজকরা নিজেরাই ভালো মানের রাধুনী সংগ্রহ করে তার দ্বারা রান্না করায়ে থাকেন। এসব প্রগ্রামে খামারের মুরগী রোষ্ট এখন একটি অপরিহার্য্য আইটেম। একসঙ্গে শত শত হাজার মুরগী অর্ডারে সরবরাহ হয়।  এসব মুরগী কি আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়ে থাকে যদি না হয়ে থাকে তাহলে সেটা কিভাবে মুসলমানদের জন্য খাওয়ার উপযোগী বা হালাল হয়। বিশেষতঃ ঐসব ভোজ অনুষ্ঠানে অনেক আলেম, ইমাম দাড়ি টুপিধারী মানুষেরা সন্দেহ ছাড়াই খেতে বসেন এবং খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর নবী (দঃ) এর একটি বাণী মনে পড়লো। তিনি বলেছেন ‘‘হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত দেহ জাহান্নামে যাবে।’’ জীব জগত বা পাখিদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে শরীয়ত সম্মত পন্থায় জবেহ বা শিকার করে  তার মাংস খাওয়াকে ইসলাম বৈধ ঘোষনা করেছে। জীব জগতের তৃণভোজী প্রাণী যেমন উট, দুম্বা, গরু, ভেড়া, ছাগল মহিষ এর মাংস হালাল পদ্ধতিতে জবেহ করে খাওয়াকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে এসব প্রাণীর সাথে সদৃশ্য তৃণভোজী প্রাণীর মাংস হালাল পন্থায় জবেহ বা শিকার করে খাওয়াকে হালাল করা হয়েছে। একইভাবে হাঁস, মুরগী, রাজহাঁস, পাতিহাঁস, বালী হাঁস, কবুতর জাতীয় পাখি জবেহ বা শিকার করে খাওয়াকে ইসলামে হালাল ঘোষনা করা হয়েছে। যেসব পশু তৃণভোজী প্রাণী নখ এবং দাঁত দ্বারা শিকার করে মাংস জাতীয় খাবার খায়, সেসব প্রাণীর মাংস হালাল পন্থায় শিকার বা জবেহ করা হলেও তার মাংস খাওয়াকে  ইসলামে হারাম ঘোষনা করা হয়েছে। যেমন বাঘ, সিংহ, বিড়াল, কুকুর, শেয়াল, ভালুক প্রভৃতি। একইভাবে যেসব পাখি নখ বা ঠোট  দ্বারা শিকার করে কাঁচা মাংস খায় সে সব পাখি হালাল পদ্ধতিতে শিকার বা জবেহ করে তার মাংস খাওয়াকে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে হালাল হারামের নির্দেশনা ঃ এ ব্যাপারে সুরা আল মায়েদার ১ নং আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে যে,‘‘ উহিলাত লাকুম বাহিমাতিল আনয়ামা’’ অর্থাৎ তোমাদের জন্য গৃহ পালিত  ধরনের পশুর মাংস হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ ভাবে আরবী ভাষায় আনয়াম  শব্দ দ্বারা সেসব প্রাণীকে বুঝায় সে সব প্রাণী খাস, গাছের পাতা এবং পানি খেয়ে বেঁচে থাকে। আবার যেসব প্রাণীর স্বভাবে হিংস্র, যারা দাঁত, নখ দ্বারা কোন প্রাণীর জীবন সংহার করে, তার তাজা মাংস হাড় নাড়ী ভুঁড়ি খায় এবং রক্ত পান করে তা আনয়াম এর   অন্তর্ভুক্ত নয়। নবী করিম (দঃ) ষ্পষ্ট ভাষায় এ ধরনের প্রাণীর মাংস খাওয়াকে হারাম বা অবৈধ ঘোষণা করেছেন। অনুরূপভাবে পাখি জগতের বিষয়টি একই ধরনের। মানুষ যেসব পাখিকে গৃহ পালিত হিসাবে পালন করে যারা ঠোঁট দিয়ে মাটি বা গাছ গাছড়া থেকে কোন ফল বা দানা সংগ্রহ করে খেয়ে বা পানি খেয়ে জীবন ধারন করে বা ছোট কীট পতঙ্গ খেয়ে জীবন ধারন করে সে ধরনের পাখির মাংস হালাল পদ্ধতিতে শিকার করে বা জবেহ পদ্ধতির মাধ্যমে মাংস সংগ্রহ করে খাওয়াকে ইসলামে হালাল
ঘোষণা করা হয়েছে। হাঁস, মুরগী বাইরে গৃহ পালিত নয় অথচ গৃহে পালিত সদৃশ পাখি যেমন ঘুঘু, বুনোহাঁস, বক, ডাহুক জাতীয় পাখিও হালাল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন ‘‘নাহা রসুলুুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লাম আন কুলু জিনাবিন মিনাস সাবয়ায়ে ওয়া কুলু জি মুখালাবিন মিনাততাইরি’’ অর্থাৎ সকল ধরনের ধারালো দাঁত বিশিষ্ট হিংস্র প্রাণী নখের দ্বারা শিকার ধরতে অভ্যস্ত সকল পাখির মাংস খেতে রসুলুল্লাহ (দঃ) নিষেধ করেছেন। ইসলামী আইনবীদরা এসব নিষিদ্ধ পাখির একটি তালিকা দিয়েছেন। যার অনেকাংশ আমি উল্লেখ করেছি। তাছাড়াও যেটা বাকি আছে সেটা হল গন্ডার, কাক, চিল, ঈগল, শকুন,গৃহপালিত গাধা, ইদুর জাতীয় প্রাণী। অবশ্য জংগলের তৃণভোজী প্রাণী খরগোশের মাংস খাওয়া ইসলামে বৈধ ঘোষনা করা হয়েছে। পাঁচ ধরনের প্রাণীকে হারাম (মক্কা ও মদিনার বিশেষভাবে ঘোষিত সম্মানীত এলাকা)  এলাকা এবং হারাম এলাকার বাইরে পাইকারী হারে হত্যার হুকুম দেয়া হয়েছে। তা হলো কাক, চিল, ইদুর, হিংস্র কুকুর, সাপ। মুসলমান বলে দাবীদার এক শ্রেণীর মানুষ আছেন তারা কচ্ছপ ও কাকের মাংস খাওয়া হালাল দাবী করেন। আবার মুসলমানদের আর এক অংশ কাঁকড়া, ব্যাঙ, কুচিয়া, সাগরের প্রাণী কটক, হাঙ্গর, কুমির, ডলফিন সহ  সকল জলজ প্রাণী যেমন জলহস্তি সহ সকল জলজ প্রাণীকে শিকার ও খাওয়াকে বৈধ বলে ফতোয়া দেন। শোনা যায় বিভিন্ন দেশে এরা কটক নামক সাগরের প্রাণী খাওয়ার জন্য বা কাকের মাংস খাওয়ার জন্য অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন।  মুসলিম জাতীকে আল্লাহ তায়ালা উম্মাতে ওসাতা বা আদর্শ জাতী হিসাবে পৃথিবীর মানুষের মাঝে পৃথক করে নিয়েছেন। মুসলিম জাতীর মানুষদের কথা বার্তা চালচলন পোশাক পরিচ্ছদ, লেনদেন খাদ্যাভ্যাস হবে রুচি সম্মত। এখন তারা যদি সে দায়িত্ব ভুলে গিয়ে এ ধরনের কুরুচির পরিচয় দিয়ে নিজেদেরকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে তাতে মুসলিম জাতীর সম্মান বিশ্ববাসীর সামনে ভূলুন্ঠিত হয়। পবিত্র কুরআনে আলাহ বলেন ‘‘ইয়া আইয়ুহান্নাসু কুলু ফিল আরদি হালালান তাইয়েবা’’ বাংলা অর্থ হে মানব মন্ডলী পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র খাদ্য সামগ্রী খাও আয়াত নং- ১৬২ সুরা আল বাকারা। সুরা আল বাকারার ১৭২ নং আয়াতে আলাহ বলেন ‘‘ ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানু কুলু মিনাত তাইয়েবাতে’’ বাংলা অর্থ হে ঈমানদারগণ তোমরা পবিত্র খাদ্য সামগ্রী ভক্ষন কর। উদ্ধৃত উদ্ধৃত আয়াত দুটি হুকুম যারা মান্য করেন তারা কি করে মৃত জীবজন্তুর মাংস, নাড়ী, ভুঁড়ি, পায়খানা প্রস্রাব এর জায়গা  আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলার ভাগার থেকে খাদ্য সংগ্রহকারী কাকের মাংস খাওয়াকে হালাল বা বৈধ বলতে পারে। সেই সাথে জঙ্গলে বা পচা ডোবা নালার নোংরা জায়গায় বসবাস বা চলাচলকারী কচ্ছপ, সাপ, গুই সাপকে হালাল ঘোষণা করে তার মাংস খেতে পারে? আল্লাহর পৃথিবীতে কি মানুষের জীবন ধারনের জন্য খাদ্যের এত ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে? আমরা কোন মানুষকেই এমন নোংরা রুচি সম্পন্ন হিসাবে দেখতে চাইনা। বিশেষতঃ পৃথিবীতে যারা শেষ নবী মুহাম্মদ (দঃ) এর উম্মত বলে পরিচয় দেন তাদেরকে।
হালাল হারাম বিষয়ে মুসলমানদের আলেম সমাজের জ্ঞানের স্বল্পতা ও দৈন্যতা ঃ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ এর একটি বিশাল পরিমান মানুষ মুসলমান। এসব দেশে প্রতি শুক্রবার জুম্মার জামাতের শুরুতে পবিত্র রমজানের প্রতি সন্ধ্যায় বা রাতে  এছাড়াও বছরের অনেক সময় জোরে তাবলিগী জামায়াতের লোকজন ইসলামের নানা বিষয়ে বর্ণনা দেন। এসব দেশের আলেমগণ মুসলিম সমাজের নিকট প্রতিনিয়ত ওয়াজ ও বক্তৃতা করে যাচ্ছেন।  এসব বক্তৃতায় খাদ্যের হালাল হারাম বিষয়ে তেমন কোন আলোচনা থাকে না। থাকলেও তত গুরুত্ব দিয়ে তা আলোচনা হয় না। যদি কখনও একটু আধটু আলোচনা হয়ও তা একে বারে হালকাভাবে। এসব আলেম সমাজের বক্তৃতা শুনে মনে হয় যেন এসব দেশের মানুষ যেসব খাদ্য খায় সেসব খাদ্য হালাল  উপায় অবলম্বন করে খাওয়ার উপযোগী প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষতঃ আমাদের দেশে এখন শায়েখ, মুফতী, মুফাচ্ছিরদের ছড়াছড়ি তাদের ও এ বিষয়ে তেমন কোন বক্তৃতা দিতে দেখা যায় না যার ইঙ্গিত আমি আগেই দিয়েছি।
ইসলামে খাদ্যের হালাল হারামের ৩ টি দিক ঃ ১। খাদ্য সংগ্রহের উপায় উপকরণ হালাল হওয়া।
২। খাদ্য প্রস্তুত প্রণালী বা খাবার উপযোগীকরণের বা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া হালাল হওয়া। ৩। খাদ্যবস্তটি মুলগত ভাবে হালাল শ্রেণিভুক্ত হওয়া।
১। খাদ্য সংগ্রহের উপায়, উপকরণ হালাল হওয়া ঃ ইসলামে খাদ্যকে অবাধে হালাল বা হারাম ঘোষণা করা হয় নি। বরং তা শর্তযুক্তভাবে হালাল বা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। একজন মুসলমান যে অর্থ  অর্থদ্বারা খাদ্য ক্রয় করে ঐসব অর্থ বৈধ উপায়ে সংগ্রহ করে থাকলে তা দ্বারা ক্রয়কৃত খাদ্যই হালাল খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হবে। আর যদি খাদ্য সামগ্রীটি কোন ভূমিতে উৎপন্ন করে বা কোন খামারে পালন করে সংগ্রহ করে, উভয় ক্ষেত্রে উৎপাদন এর ভুমির মালিকানা বৈধ হতে হবে। এসব খামারের বিনিয়োগকৃত অর্থও হালাল হতে হবে। প্রকৃতিগত ভাবে খাদ্য সামগ্রীটি হালাল হলেও সংগ্রহের উপায় উপকরণের হারামের কারণে খাদ্যটি হারাম বলে বিবেচিত হয়। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যেমন ইসলামে সুদী কারবার থেকে সংগৃহিত অর্থকে ইসলামে জঘন্যতম পাপ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। হাদিসে রসুল (দঃ) এ  এমনভাবে সুদী কারবারকে অবৈধ উৎপাদনের উপায় বা হারামঘোষণা করা হয়েছে যে, তা জানার পর  কোন মুসলমান সুদী কারবার পরিত্যগ না করে মুসলমান থাকতে পারে না। নবী করিম (দঃ) বলেছেন যে, সুদী কারবারের সর্বনিম্ন পাপ হল নিজের মায়ের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। একইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ বা সম্পদ যাকে আরবিতে গুলুল বলা হয় বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাৎ এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ, চুরি, ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সম্পদ, হারাম পণ্য উৎপাদন বিক্রয় বা ব্যবসা দ্বারা উপার্জিত সম্পদ, ঘুষ চাদাবাজীর দ্বারা প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদ, অন্যের অধিকার নষ্ট করে উপার্জিত সম্পদ বা কোন সম্পদে জাকাত ফরয হয়েছিল তা আলাদা করে বিতরণ করা হয় নাই, ফলে মূল সম্পদের সাথে জাকাত হিসাবে যে অংশটি আলাদা হওয়ার যোগ্য তা মুল সম্পদের সাথে মিশে থাকায়  ঐ সম্পদ অবৈধ সম্পদে রূপ নেয়। যেভাবে কোন একটি বিশুদ্ধ পানির নালার পানি নিষ্কাশনের মুখ যদি বন্ধ করে দেয়া হয় আর যদি ঐ নালায় আবর্জনা ফেলা হয় তখন যেমন ঐ নালার পানির বিশুদ্ধতা নষ্ট হয় সেভাবে যেকোন হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদের সাথে সুদ, ঘুষ বা অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ যখন একত্রে মিলিত হয়।  তখন হালাল বা পবিত্র  অর্থের হালালত্ব বা পবিত্রতা নষ্ট হয়। তখন ঐ অর্থ দ্বারা কোন হালাল খাদ্য সংগ্রহ বা ক্রয় করে খাওয়া হলেও খাদ্যটি হারাম হিসাবে বিবেচিত হয়। পবিত্র কোরআনে বাতিল বা অবৈধ পন্থায় অন্যের সম্পদ আহরণ করা এবং ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি নিজের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত সম্পদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ঘুষ, সুদ, আত্মসাৎ, চুরি ডাকাতি, বেশ্যাবৃত্তি, নারীদেহ ব্যবহার থেকে অর্জিত আয় ওজনে কম দেওয়া মদ উৎপাদন ও বিক্রয়, মুর্তি গড়া ও বিক্রয়, জুুয়া বা ভাগ্য গণনা দ্বারা অর্জিত আয়। সুদী কারবার থেকে অর্জিত আয়,এতিমের অর্থ আত্মসাৎ থেকে অর্জিত আয় ইসলামে হারাম ঘোষিত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ কোন একজন মুসলমান তার সুদী কারবার থেকে লব্ধ অর্থ দ্বারা উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে ম্ক্কা মদিনায় গিয়ে উমরাহ পালন শেষে বাড়ী ফেরার পথে মহানবী (দঃ) এর স্মৃতিধন্য আযওয়া খেজুর ক্রয় করে নিয়ে আসে এবং তার পরিবার পরিজন সহ ঐ খেজুর বিসমিল্লাহ বলে জমজমের পানির সাথে খায়। তারপরেও ঐ খেজুর খাওয়া হারাম বলে গণ্য হবে। আর একটি উদারহণ দেয়া যায়, যেমন একজন মুসলমান ব্যক্তি একশত বিঘা জমি রেখে মারা গেল। তার মৃত্যুর পর এক পুত্র দুই কন্যা ওয়ারিশ হিসাবে জীবিত থাকল। পরবর্তীকালে পুত্র ঐ ব্যক্তির কন্যাদের প্রাপ্য জমি তাদের সম্মতি ছাড়াই ভোগ করতে থাকল এবং তার জবরদস্তি মূলকভাবে ভোগ করা জমিতে ধান, গম, শাকসব্জি, তরিতরকারী বা ফল উৎপাদন করল। উৎপাদিত ফসল খাদ্য হিসাবে মুলগত দিক থেকে হালাল হলেও উপার্জনগত দিক থেকে তা হারাম হওয়ার কারণে ঐ খাদ্যগুলি হারাম খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হবে। একই হুকুম ওজনে কম দিয়ে ব্যবসায় লাভ করার ক্ষেত্রেও। মদ, মুর্তি উৎপাদন ও বিক্রয়, বেশ্যাবৃত্তি, গাজা, আফিম, ভাং, ইয়াবা বা যেকোন মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও বাজারজাত করণ থেকে উপার্জিত অর্থের ব্যাপারেও একই হুকুম প্রযোজ্য হবে। দৃশ্যমানভাবে এ ধরনের উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারা ক্রয়কৃত হালাল খাদ্য সংগ্রহ করা হলেও তা হারাম খাদ্য বলে বিবেচিত হবে।
২। খাদ্য প্রস্তুত প্রণালি বা খাবার গ্রহণ উপযোগী করণের প্রক্রিয়া বা প্রক্রিয়াজাত করণ হালাল হওয়া ঃ  প্রস্তুত প্রণালী ও প্রক্রিয়া জাত করনের কারণে হালাল খাদ্য হারাম হয়ে যায়। যেমন গম, যব খেজুর, আ্ঙ্গুর, খেজুর গাছের মাথার এক অংশ ছেচে ফেলে দেওয়া অংশ থেকে সংগৃহিত মিষ্টি রস, তাল গাছের ফলের ঝোপার নিচের অংশ থেকে সংগৃহিত মিষ্টি রস, পাকা খেজুর ভেজানো পানির বাসি শরবত, আখের মিষ্টি রস প্রক্রিয়াজাত করে মদে রূপান্তর করা হয়। মুলগত ভাবে এ সকল খাদ্য হালাল। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে খাদ্যগুলিকে নেশাদ্রব্যে পরিণত করা হয়। হাদিস শরীফে এসব রূপান্তরিত খাদ্য হারাম হওয়ার যে মুলনীতি ঘোষিত হয়েছে। তা হলো ‘‘মা আসকারা কাসিরুন ফা কালিলুহু হারামুন’’। অর্থাৎ যা বেশি খেলে মানুষ নেশাগ্রস্ত হয়ে পরে সেসব খাদ্যের অল্প পরিমাণ খাওয়াও হারাম। ঘুষ দ্বারা অর্জিত আয় নীতিগত ভাবে পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারার ১৮৮ নং আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ‘‘ অলাতাকুলু আমওয়ালাকুম বাইনাকুম বিল বাতিলি অলা তুদলু বিহা ইলালহুক্কাম লিতাকুলু খারিজাম মিন আমওয়ালিননাস বিল ইসমী ওয়াআনতুম তাআলামুন’’ অর্থাৎ তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ে ফেল না, আর তোমাদের সম্পদের কোন অংশ শাসকদের কাছে তুলে ধরে জনগণের সম্পদ জেনে শুনে আত্মসাৎ করো না। ঘুষ বা উৎকোচ প্রদান সম্পর্কে হাদিসে যে ভাষায় নিষেধাজ্ঞা এসেছে তাহলো ‘‘ আর রাশি ওয়াল মুরতাশি কিলাহুমা ফিননার’’ অর্থাৎ ঘুষ প্রদান কারী এবং ঘুষ গ্রহণকারী উভয়ের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর একটি হাদিসে আছে ‘‘ লাআনালাহু হুররাশি ওয়ালমুরতাশি’’ অর্থাৎ আল্লাহতাআলা ঘুষ গ্রহণকারী এবং ঘুষ প্রদানকারী উভয়ের উপর অভিসম্পাৎ করেছেন। এখানে ঘুষ থেকে লব্ধ আয় বা ঘুষ প্রদানের ফলশ্রুতিতে আয়ের অর্থ হারাম বা নিষিদ্ধ উপার্জন বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদত্ত হয়েছে। সুরা আল ইমরানের ১৬১ নং আয়াতে ‘‘ওমাইয়াগলুল ইয়াতি বিমা গাল্লা ইয়াওমাল কিয়ামাতি সুম্মা তুওয়াফ্ফা কুলু নাফসীন মা কাসাবাত ওহুম লায়ুযলামুন’’ অর্থাৎ আর যে ব্যক্তি আত্মসাৎ করবে (জনগণের সম্পদ) সে কিয়ামতের দিন আত্মসাৎকৃত সম্পদ সংগে নিয়ে আসবে। অতঃপর পরিপূর্ণভাবে পাবে প্রত্যেকে যা সে অর্জন করেছে অর্থাৎ(শাস্তি)। আর তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না।
আয়াতটি দ্বারা জনগণ বা রাষ্ট্রের আত্মসাৎ দ্বার অর্জিত সম্পদ ভোগ করা কে নীতিগতভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুর আল মায়ীদার ৩৮ নং আয়াতে ‘‘আসসারিকু ওয়াসসারিকাতু ফাকতায়ূ আইদিয়াহুমা যাযাআম বিমা কাসাবা নাকালাম মিনালাহি ওলাহু আযিযুল হাকিম’’ অর্থাৎ যে পুরুষ চুরি করে বা যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের শাস্তি হিসাবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারী হিসাবে। আলাহ মহাপরাক্রান্ত এবং মহাবিচারক। আলোচ্য আয়াতে চুরির শাস্তি ঘোষণার মধ্য দিয়ে চুরি থেকে অর্জিত সম্পত্তি ভোগ করাকে নীতিগতভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
সুরা আন নিসার ১০ নং আয়াতে ‘‘ইন্নাললাযিনা ইয়াকুলুনা আমওয়ালাল ইয়াতিমা যুলমান। ইন্নামা ইয়া কুলুনা ফি বুতুনিহিম নারা ওয়া সাইয়াসলাওনা সায়িরা’’ অর্থাৎ যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে খায় তারা নিজে নিজেদের পেট আগুন দ্বারা ভর্তি করেছে। অচিরেই তাদেরকে জাহান্নামের আগুনে পুড়ানোর শাস্তি দেওয়া হবে। এই আয়াত দ্বারা এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করে অর্জিত অর্থ ভোগ করাকে নীতিগতভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ