ঢাকা, বুধবার 23 May 2018, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাড়ছে ঘাটতি কমছে রিজার্ভ

দেশ বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির কবলে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালেন্স অব পেমেন্টের সর্বশেষ হালনাগাদ রিপোর্টের তথ্য-পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসেই পণ্য বাণিজ্যে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩২০ কোটি ২০ লাখ ডলার। আমদানির চাপে ১৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় ঘাটতির এ পরিমাণ অনেক বেশি। এই ঘাটতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ের প্রায় দ্বিগুণ এবং জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত পুরো অর্থবছরের ঘাটতির চাইতে সাড়ে ১২ শতাংশ বেশি।
বিগত কয়েকটি অর্থবছরের প্রাসঙ্গিক তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এর আগে পর্যন্ত ২০১০-১১ অর্থবছরের ঘাটতিকে সর্বোচ্চ বলে মনে করা হতো। সেবার ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৯৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু তা ছিল পুরো অর্থবছরের ঘাটতি। অন্যদিকে এবার অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই পরিমাণের দিক থেকে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বিগ্ন অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, অবিলম্বে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলে বছরের বাকি তিন মাসে মোট ঘাটতির পরিমাণ কল্পনারও বাইরে চলে যেতে পারে। এদিকে মার্কিন ডলারের দাম এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণও অনেক কমে গেছে। রেকর্ড ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ কমে এসেছে ৩১ বিলিয়ন ডলারে। এর কারণ, চাহিদা মেটানোর জন্য বিগত মাত্র দশ মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংককে দুই বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। ডলারের দামও বেড়ে চলেছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে।
 দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানির ব্যয়বৃদ্ধিকে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আলোচ্য সময়ে পণ্য আমদানির জন্য চার হাজার ৩০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। একই সময়ে রফতানি আয় হয়েছে দুই হাজার ৭০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সে হিসাবে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৩২০ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থবছরের একই সময়ে দেশে বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে- প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে ২২৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ে এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২৩৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
আমদানির চাপে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যেও বড় ধরনের ঘাটতিতে পড়েছে দেশ। লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতির পরিমাণ সাত বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ উন্নয়নশীল দেশকে চলতি হিসাবে সব সময় উদ্বৃত্ত রাখতে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে উদ্বৃত্ত থাকলেও চলতি অর্থবছরে তা ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। ঋণাত্মক এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং অর্থবছরের বাকি তিন মাসে ঘাটতির পরিমাণও অনেক বেড়ে যাবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদেরা। ঘাটতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা বলেছেন, আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রফতানি আয় বাড়েনি, পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। এর সঙ্গে একদিকে সেবাখাতের ঋণাত্মক অবস্থা যুক্ত হয়েছে অন্যদিকে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ এবং মেট্রোরেলসহ আরো কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। এসব কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করতে হচ্ছে। আমদানির বিষয়টি চলবে আরো কয়েক বছর। সে তুলনায় রফতানি বাড়ার যেহেতু সম্ভাবনা নেই সেহেতু দেশের ঘাটতির পরিমাণও বাড়তেই থাকবে।  এভাবে ঘাটতি বাড়তে থাকলে আমদানি-রফতানির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে না এবং প্রচন্ড চাপের মুখে পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তখন স্বাভাবিক নিয়মেই টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতিও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। বাড়বে চাল-ডালসহ প্রতিটি পণ্যের দাম। স্বল্পসময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতিও মারাত্মক সংকটে পড়বে। নাভিশ্বাস উঠবে সাধারণ মানুষের। বাণিজ্য ঘাটতি সংক্রান্ত খবর ও তথ্য-পরিসংখ্যানগুলো যে অত্যন্ত আশংকাজনক সে কথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানা গেছে, বিপুল এই ঘাটতির পেছনে যথারীতি প্রধান ভূমিকা রয়েছে ভারতের। প্রতিবেশি দেশটি থেকে আমদানি লাফিয়ে বাড়লেও নানা ধরনের শুল্ক-অশুল্ক ও আধাশুল্ক বাধার কারণে বাংলাদেশের রফতানি বাড়তে পারছে না। ফলে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট গুণেরও বেশি। এরই পাশাপাশি একদিকে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে আমদানির আড়ালে দেশ থেকে পাচার করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টাসহ অর্থনীতিবিদেরা তাগিদ দিয়ে বলেছেন, খাদ্য ও যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার করা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে সরকারের উচিত কঠোর নজরদারি করা। সেই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ও প্রবাহ বাড়ানো দরকার, যাতে শিল্পায়নের পাশাপাশি চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে রফতানি বাড়ানো যায়।
আমদানির সময়ও লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামালের বাইরে এমন কিছু আমদানির সুযোগ সৃষ্টি না হতে পারে, যার আড়াল নিয়ে বা অজুহাত দেখিয়ে চিহ্নিত কিছু বিশেষ গোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করতে পারবে। অর্থাৎ দেশকে বাণিজ্য ঘাটতির কবল থেকে মুক্ত করতে হলে অর্থের পাচার অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। সেই সাথে শুধু রফতানি আয় বাড়ালে চলবে না, রেমিট্যান্স এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ তথা এফডিআই বাড়ানোর জন্যও সুচিন্তিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই উন্নত করতে হবে। আর এফডিআই বাড়ানোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা অনুযায়ী জমি বরাদ্দের পাশাপাশি স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগসহ সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। এভাবে সব মিলিয়ে ইতিবাচক ব্যবস্থা নেয়া হলেই দেশকে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির কবল থেকে মুক্ত করা এবং সমৃদ্ধির সুষ্ঠু পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব বলে আমরা মনে করি। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা এবং অর্থনীতিবিদসহ দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ