ঢাকা, বুধবার 23 May 2018, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হালাল খাদ্য গ্রহণ সকলের জন্য একটি ফরযি দায়িত্ব

-এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান, এমএম (ডাবল হাদীস, তাফসীর), বিএসএস (সম্মান), এমএসএস (রাষ্ট্র বিজ্ঞান), এলএলবি
[তিন]
সুরা মুতাফাফ্ফিন এর ১-৩ নং আয়াত ‘‘ ওয়লুললিল মুতাফাফফিন। আলাযিনা ইয়াকতুলু আলাননাসি ইয়াস তাওফুন ওইযা ক্কলুহুম আওওয়াজ্জানুহুম ইউখুুুসিরুন অর্থাৎ যারা মাপে কম করে তাদের ধ্বংস, যারা লোকদের কাছ থেকে যখন মেপে নেয় তখন পূর্ণমাত্রায় নেয়। আর যখন লোকদেরকে মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম করে দেয়। উল্লেখিত তিনটি আয়াতে ওজনে বা পরিমাপে কম দিয়ে উপার্জিত অর্থ ভোগ করাকে নীতিগতভাবে হারাম ঘোষনা করা হয়েছে। সুরা আন নুর এর ২, ১৯ ও ৩৩ নং আয়াতে বেশ্যাবৃত্তি, নারীদেহের  ব্যবহারে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টির ব্যবসা এবং মানুষের মাঝে চারিত্রিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করে এমন সকল পেশাকে হারাম ঘোষনা করা হয়েছে। আয়াত নং ২ ‘‘ আযযানীআতু ওয়াযযানী ফাযলীদু কুলাওয়াহিদিম মিনহুমা মিয়াতা যালদা, ওলা তাখুজুহুম রাফফাতিন ফিদীনিলাহি ইনকুনতুম তু’মিনুনা বিলাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরী ওয়াল ইয়াশহাদ আযাবাহুমা তায়িফাতুম মিনাল মুসলিমীন’’ অর্থাৎ ব্যভিচারিনী নারী ও ব্যাভিচারী পুরুষ তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করো। আলাহর বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের ব্যপারে যেন তোমাদের দয়ার উদ্রেক না হয়।  যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। আয়াত নং-১৯ ‘‘ ইন্নাললাযিনা ইউহিব্বুনা আনতাশিয়াল ফাহিসাতু বিলাযিনা আমানু লাহুম আযাবুন আলিমুন ফিদদুনিয়া ওয়াল আখিরাতি ওয়ালাহু ইয়াআলামু ওয়ানতুম লাতাআলামুন অর্থাৎ যারা এটা পছন্দ করে যে, ইমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার ও অশ্লীলতার প্রসার ঘটুক তাদের জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ সবকিছু জানেন তোমরা জানো না। আয়াত নং-৩৩ ‘‘ ওয়ালা তুকরিহু ফাতাইয়াতিকুম আলালবিগায়ি ইনআরাদনা তাহাসুন্নালিতাবতাগু আরাদা হায়াতিত দুনিয়া’’ অর্থাৎ তোমাদের দাসীরা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করতে চাইলে তোমরা প্রার্থীব জীবনের সম্পদের লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না। আলোচ্য আয়াত তিনটিতে নারী দেহের রূপ সৌন্দর্য্য ও কমনীয়তার ব্যবহার যেমন নাচ, অভিনয়, অশ্লীল অঙ্গিভঙ্গি বা বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত আয় ভোগ করা নীতিগত ভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুরা আল মায়ীদার ৯০ নং আয়াতে মদ বা মাদকদ্রব্য উৎপাদন, মদ পরিহন, মদের ব্যবসা বা জুয়া এবং সামান্য কোন ঘটনা চক্রে এক দল লোকের সম্পদ অন্য ব্যক্তি বা দলের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া, মুর্তিযুক্ত উপাসনালয়ের সেবা থেকে প্রাপ্ত আয় ভাগ্য গণনা বা জ্যোতিষীদের ভবিষ্যত বাণীর ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত আয় নীতিগতভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আয়াতটির আরবি উচ্চারণ এরুপ ‘‘ ইয়া আইয়ুহালাযীনা আমানু ইন্নামাল খামরু ওয়াল মাইসারু ওয়াল আনসাবু, ওয়াল আযলামু, বিসসুয়িও আমালিস শাইতানী ফানতাহু’’ অর্থাৎ হে ইমানদারগণ মদ, জুয়া, পূজার বেদি, ভাগ্য নির্ধারক শর সমূহ সমস্তই হচ্ছে ঘৃণ্য ও শয়তানী কার্যকলাপ এসব দুঃষ্কর্ম থেকে বিরত হও। নিশ্চয়ই তোমরা সফলতা লাভ করবে। এ প্রসঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা)  এর মাধ্যমে রসুলুল্লাহ (দঃ) এর একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে রসুলুল্লাহ  (দঃ) বলেছেন আল্লাহ অভিশম্পাৎ বর্ষণ করেছেন ১। মদের উপর, ২। মদ পানকারীর উপর, ৩। মদ পরিবেশনকারীর উপর ৪। মদ বিক্রেতার উপর, ৫। মদ ক্রয়কারীর উপর, ৬। মদ উৎপাদন ও শোধনকারীর উপর, ৭। মদ উৎপাদন ও শোধনকারীর ব্যবস্থাপকের উপর, ৮। মদ পরিবহণকারীর উপর, ৯। মদ যার কাছে পরিবেশন করে নিয়ে যাওয়া হয় তার উপর। সুদ বা সুদযুক্ত কারবার থেকে আয় পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারার ২৭৫, ২৭৮, ২৭৯ নং আয়াতে এবং সুরা আল ইমরানের ১৩০ নং আয়াতে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আয়াত নং- ২৭৫। আল্লাযিনা ইয়া কুলুনাররিবা ইয়াকুমুনা ইলা কামা ইয়াকুমুল লাজিনা ইয়াতা খাব্বাতুহুশ শাইতনু মিনাল মাস্ছি। যালিকা বি-আন্নাহুম ক্বলু ইন্নামাল বাইয়ু মিসলাররিবা। ওয়া আহালালাহুল বাইয়া ওয়া হাররামাররিবা’’ ‘‘অর্থাৎ  কিন্তু যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা ঠিক সেই লোকটির মত যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে (অর্থাৎ জিনে ধরেছে) তাদের এ অবস্থায় উপনিত হওয়ার কারণ হলো তারা বলে ব্যবসা তো সুদের মতো, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। আয়াত নম্বর ২৭৮ এর বাংলা অর্থ এরূপ ‘‘হে ঈমানদারগন আল্লাহকে ভয় কর এবং লোকদের কাছে তোমাদের সুদের যে পাওনা রয়ে গেছে তার দাবী ছেড়ে দাও। প্রকৃতপক্ষে যদি তোমরা ঈমানদার হও’’। আয়াত নং- ২৮৯ এর অর্থ এরূপ ‘‘কিন্তু যদি তোমরা এমনটি না কর তাহলে যেনে রেখ এটা আলাহ ও তার রসুলের বিরুদ্ধে তোমাদের পক্ষ হতে যুদ্ধ ঘোষণা। এখনই তওবা করে নাও  এবং (সুদের দাবী ছেড়ে দাও) তাহলে তোমরা আসল মূল ধনের অধিকারী হবে। তোমরা জুলুম করবে না তোমাদের উপরেও জুলুম করা  হবে না’’।  সূরা আল ইমরানের আয়াত নম্বর ১৩০ এ আল্লাহ বলেন ‘‘ইয়া আইয়ুহালাজিনা আমানু লাতাকুলুর রিবা  আদায়াফান মুদ্য়াফা ওয়া ওয়াততা কুলালাহা লা আলাকুম তুফলিহুম অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ গ্রহন বন্ধ কর এবং আলাহকে ভয় কর নিশ্চয় তোমরা সফলকাম হবে।
৩। খাদ্য বস্তুটি মুলগত বা প্রকৃতিগতভাবে হালাল হওয়া : হালাল খাদ্য যেমন জমি থেকে উৎপাদিত ফসল ধান, যব এবং সদৃশ ফসল যেমন ধান, ভুট্টা, কাউন বা সমজাতীয় ফসল এবং তরিতরকারী এবং ফল যেমন খেজুর,আঙ্গুর, আপেল বা সদৃশ সমজাতীয় ফল যেমন আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কলা ইত্যাদি হালাল প্রাণী, গরু, ছাগল, উট, দুম্বা,ভেড়া, মহিষ বা সমজাতীয় প্রাণীর মাংস এবং পাখি হাঁস মুরগি, কবুতর বা সমজাতীয় বনজ ও গৃহপালিত পাখির মাংস এবং মাছ খাদ্য পণ্য হিসাবে মুলগত দিক থেকে হালাল বা পবিত্র হিসাবে বিবেচিত।
পশু পাখির মাংস হালাল ও হারাম হওয়া প্রসঙ্গে কোরআন হাদিসের বিশেষ নির্দেশনা : এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারার নির্দেশনা এরূপ ‘‘ইন্নামা হাররামা আলাইকুমুল মাইতাতা, ওয়াদ্দাম্মা ওলাহ মাল খিন্জিরি ওমা উহিলা বিহি লিগাইরিলাহ্ ফামানিদ তুরা গাইরা বাগিন ওলা আদিন, ফালা ইসমা আলাইহি, ইন্নালাহা গাফুরুর রাহিম অর্থাৎ তোমাদের উপর যদি কোন নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকে (খাওয়ার ব্যপারে) তা হচ্ছে এই যে, মৃত দেহ রক্ত শুকরের মাংস এবং আলাহ ব্যতিত অন্যের নাম উচ্চরণে যে প্রাণী জবেহ করা হয়েছে। তবে যদি ঐ নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণে তোমরা একান্তভাবে বাধ্য হও, সেক্ষেত্রে সীমাতিক্রম না করে প্রয়োজন পরিমাণ খেতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমশীল এবং দয়ালূ। সুরা আন নাহালের ১১৫ নং আয়াতে এ বিষয়ে হুবহু উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা আল আনআমের ১১৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন ‘‘ ফাকুলু মিম্মা যুকিরাসমুলাহি আলাইহি ইনকুনতুম বিআয়াাতিহি মুমিনুন’’ অর্থাৎ এখন যদি তোমরা আল্লাহর আয়াত সমূহে বিশ্বাসী হও তাহলে যে পশুর উপর আলাহর নাম নেওয়া হয়েছে তার মাংস খাও।
সুরা আল আন আমের ১২১ নং আয়াতের নির্দেশনা এরূপ ‘‘ওয়ালা তাকুলু মিম্মালাম ইয়াযকুরিসমালাহি আলাইহি ওয়া ইন্নাহু লা ফাসিকুন’’ অর্থাৎ জবেহ করা কালে আল্লাহর নাম উচ্চারন করা হয় নি তোমরা তা খেও না (ঐ প্রাণীর মাংস খেও না)। উদ্ধৃত আয়াতগুলি পবিত্র কোরআনের মুহকাম বা শক্তিশালী অদ্ব্যর্থবোধক আয়াত। মুতাশাহবি বা দ্ব্যর্থবোধক আয়াত নয়। আয়াতগুলি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সুষ্পষ্ট। শরীয়তের দলিল হওয়ার ক্ষেত্রে উদ্ভুত আয়াতগুলি কোন ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ