ঢাকা, বুধবার 23 May 2018, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অস্তিত্ব বিশ্বজুড়ে

আখতার হামিদ খান : মমি শব্দটি উচ্চারণ করলেই মিসরের নাম এসে যায়। এমনকি অভিধানেও মমিদ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়, মমি হলো প্রাচীন মিসরে এক অদ্ভুত উপায়ে সংরক্ষিত মৃহদেহ। আসরে এই মমি কেবল মিসর নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় এটি পাওয়া গেছে। চিলি থেকে চীন এবং কিলাকিটসোফ থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে বিভিন্ন সময়ে আবিষ্কৃত মমি একেক যুগ ও সংস্কৃতির ইতিহাস আমাদের সামনে তুলে ধরে। এসব ইতিহাস খুবই চমকপ্রদ। মমি নিয়ে অনেক আজগবি কথাও প্রচলিত আছে। যাই হোক বিশেষ প্রক্রিয়ায় মগজ ও নাড়িভুঁড়ি বের করে সংরক্ষতি মৃহদেহই হলো মমি। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, একসময় শিল্প হিসেবে এর বিকাশ ঘটে। এ নিয়ে প্রাচীনকালে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলে। সবকিছুর অন্তরালে রয়েছে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা। বিভিন্ন ধাপে মমির ইতিহাস পর্যালোচনায় এ চিত্রই ফুটে ওঠে।
প্রতারণার অন্তরালে
আড়াই হাজার বছরের পুরনো পারস্যের মমি আবিষ্কারের সাম্প্রতিক কাহিনী ভুয়া প্রমাণিত হলেও সাধারণত একথা বিশ্বাস করা হয় যে মমি শব্দটি ফারসি শব্দ ‘মামিয়া’ থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘বিটুমিন’ যা প্রাচীন মিসরের মৃত দেহের কালো অবস্থা বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হতো। শব্দটি এখন প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে সংরক্ষিত নরম কোষ সম্বলিত সকল মানব দেহাবশেষের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশেই মমি তৈরির নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মমি তৈরির প্রক্রিয়াটি একান্তভাবে প্রাচীন মিসরের সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং বহুদিন ধরে ‘মমি’ শব্দটি খোদ মিসরের নামের সমার্থক হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে ১৯ শতকের গোড়ার দিকে মমি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এসব মমির অধিকাংশই ছিল মিসর ভ্রমণকালী ধনাঢ্য পর্যটকদের স্যুভেনির হিসেবে সংগৃহীত মমি। মমি উন্মুক্তকরণ পার্টিগুলোতে ভিক্টোরিয়দের পরিত্রতার ভান ছাড়া খ্রিস্টের জন্মের পূর্বেকার মৃতদেহগুলোর পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করতে বিবেকের কোনও তাড়না অনুভূত হয়নি। বরং উৎসাহই ছিল বেশি। এমনকি এ উপলক্ষে বিশেষভাবে মুদ্রিত আমন্ত্রণপত্রে জানানো হতো। যাতে এরকম লেখা থাকত: ‘লর্ড লনডেসবরো দেশে ফিরেছেন: আড়াইটার সময় থেবম থেকে আনা একটি মমি উন্মুক্ত করা হবে। ব্র্যাম স্টোকার তার জুয়েল অব দ্য সেভেন স্টারস’- এ মিসরীয় রাজকুমারীকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাতে খলচরিত্র হিসেবে মমির একটি স্থায়ী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠাও হয়ে গেছে যেমনটা হলিউডের ছবিতে অসংখ্যবার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। বরিস কার্লফের ১৯৩২ সালে নির্মিত ছবি ‘দ্য মমি’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুন:নির্মিত বিশাল বাজেটের ছবিগুলোর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। এমনকি অপেক্ষাকৃত কম ভাগ্যবান ছিল ওইসব মমি যা কাগজ তৈরি শিল্পে ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা হয়েছিল কিংবা মার্ক টোয়েনের দেয়া খবর অনুযায়ী যেগুলো রেলপথে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হতো।
জনপ্রিয় কাহিনীতে মমিগুলোতে উপস্থাপন করা হয়েছে ব্যান্ডেজে জড়ানো মৃতদেহের চাইতে সামান্য বেশি গুরুত্ব দিয়ে যার বাহুগুলো বাইরে ছড়ানো। যাতে করে অসহায়দের প্রতি কোনও ইঙ্গিত করতে পারে। কল্পকাহিনী ও প্রতারণার আড়ালে ঢাকা পড়া সত্যিকারের ঘটনা হচ্ছে এই যে, এসব মনোমুগ্ধকর, আশ্চর্য ‘শিল্পকর্মসমূহ’ একদা জীবিত মানুষ ছিলেন এবং যতটা সম্ভব জীবন্তরূপে সংরক্ষণ করার মধ্য দিয়ে আত্মার জন্য স্থায়ী আবাসস্থল গড়ার একটি পদ্ধতি হিসেবে এটা বিবেচিত হয়েছে। সেখানে মৃত্যুর নশ্বরাত্মাকে কার্যকরভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে একে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয়েছে।
বর্ধিষ্ণু শিল্প হিসেবে মমি
নিশ্চিতভাবে মিসরে মমি তৈরি ছিল একটি খুবই বর্ধিষ্ণু শিল্প। যেখানে সেবার মাত্রা নির্ভর করত অর্থ ব্যয়ের ওপর উন্নতমানের মমি করতে হলে মৃতদেহের মগজ সাধারণত নাক দিয়ে বের করা হয় এবং ফাঁকা মৃতদেহ লবণ দিয়ে শুকানোর আগে তা থেকে নাড়িভুঁড়ি বের করে নেয়া হয়। তারপর শুকনো চামড়ায় বিভিন্নরকম তেল ও রজনের মিশ্রণ প্রয়োগ করা হতো। সাম্প্রতিকতম বিশ্লেষণী কৌশলে ব্যবহার করে সেই পদ্ধতি নিয়ে এখন গবেষণা চলছে।
ওয়াহ নামে মিসরের এক এস্টেট ম্যানেজারের মৃতদেহ মমি করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। এই মমি তৈরি করতে মৃতদেহটি ৩৭৫ মিটার লিলেন কাপড়ে মোড়ানো হয়। প্রায় জীবন্তরূপ দিতে মৃতদেহটি পরিপাটি করে সাজানো হয়। এ উদ্দেশ্যে কেশ বিন্যাসকারী ও বিউটিশিয়ানদের ডাকা হয়। সুচারুরূপে মৃতদেহটি সাজানো হয়ে গেলে তা লিলেন কাপড়ে মোড়ানো হয়। দফায় দফায় মন্ত্রপুত রক্ষাকবচে আবৃত করে রাখা হয় শবাধারে। মমির মধ্যে আত্মার পুনরাগমন ঘটবে- এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে বিস্তারিত অন্ত্যেষ্ট্রিক্রিয়াদি আয়োজন করা হয়। মমিটিতে এই বাণী উৎকীর্ণ থাকে ‘তুমি পুনরায় বাঁচবে চিরদিনের মতো। ভাবো, তুমি পুনরায় চিরতরুণ হয়ে গেছো।’ মমিটি সমাধিস্ত করার আগে এর সাথে দেয়া হয় পর্যাপ্ত খাদ্য, পানীয় তথা প্রয়োজনীয় সবকিছু যাতে প্রয়াত ব্যক্তির আত্মা পরবর্তী জীবনে আরাম আয়েশের জন্য তা ব্যবহার করতে পারে। মিসরীয়রা তাদের মৃত আত্মীয়-স্বজনকে নীল নদের তীরে চাষাবাদের স্থান থেকে দূরে বিস্তীর্ণ মরুভূমির বুকে সমাহিত করত। কিন্তু ধনীরা কৃত্রিমভাবে মৃতদেহ মমি করে তা বিশেষভাবে নির্মিত স্মৃতি সৌধে রাখত। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মরুভূমির বালুতে নিচে ফাঁপা স্থানে মৃতদেহ সমাহিত করত যা প্রাকৃতিকভাবেই মমিতে পরিণত হতো। উত্তপ্ত শুষ্ক বালুর মধ্যে ক্ষয়িষ্ণু মৃহদেহ থেকে তরল পদার্থ বের হয়ে যেত এবং শুকিয়ে গিয়ে সেসব মৃতদেহের চামড়া, চুল ও নখ সংরক্ষিত থাকত। দুর্ঘটনাবশত এসব মৃতদেহ বেরিয়ে পড়লে সেগুলো গভীর প্রভাব ফেলত তাদের ওপর যারা কয়েক বছর পূর্বে মারা যাওয়া লোকদের চিনতে পারত। তারা আক্ষরিকভাবেই দেখতে পেত জীবন অমরত্ব লাভ করতে বসেছে।
পরীক্ষা নিরীক্ষা
ধনী লোকদের মৃত্যুর পর সমাহিত করার প্রক্রিয়াটি অধিকতর জটিল হওয়ায় যাদের একবার মাটিতে সমাধিস্থ করা হলো তাদেরকে বিশেষভাবে নির্মিত স্মৃতিসৌধে রক্ষার দাবি উঠল যেমনটি তাদের মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এখানে আর তার মালুর সরাসরি সংস্পর্শে থাকল না যার ফলে তাদের মৃতদেহ দ্রুত পঁচতে লাগল। অর্থাৎ মৃতদেহ সংরক্ষণের কৃত্রিম পন্থার প্রয়োজন দেখা দিল এবং তাই শুরু হলো মমি তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর বেশিকিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে ভুলত্রুটি হলো। মিসরীয়রা শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো অপসারণ করে মমি তৈরির পদ্ধতি বের করে। কারণ এখান থেকেই প্রকৃতপক্ষে পচন শুরু হয়। যদিও হিয়ারাকোনপলিস নামক স্থানে সাম্প্রতিক খনন কার্যের ফলে একথা জানা যায় যে, মিসরীয়রা খ্রিস্টপূর্বে ৩৪০০ অব্দ থেকেই মৃতদেহ রঞ্জন বা প্লাস্টার মিশ্রিত লিনেন দিয়ে মুড়িয়ে রাখত। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ নাগাদ দেহরেখা অক্ষুণ্ণ রাখতে তারা মৃতদেহ রজন বা প্লাস্টার ব্যবহার করত। তখনও খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ অব্দ আসেনি যখন মিসরীয়রা মৃতদেহের অভ্যন্তরভাগের প্রত্যঙ্গগুলো অপসারণ করার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত মমি করার কৌশল রপ্ত করে। দেহের অভ্যন্তরভাগের এই প্রত্যঙ্গগুলো থেকে পচনক্রিয়া শুরু হয়। আর পরবর্তী তিন হাজার বছর ধরে তারা মানুষ ও পশুর মৃতদেহ তাজা রাখার কৌশলে পরিশুদ্ধি একে একে পূর্ণতার পর্যায়ে নিয়ে যায়। এভাবে তারা হয়ে উঠেন মমি তৈরির সবচেয়ে বড় কারিগর যা বিশ্ব আর কখনও দেখেনি। তবে সব ধরনের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও মিসরীয়রা মৃতদেহ সংরক্ষণ শিল্পে তুলনামূলকভাবে পরে প্রবেশ করেছে। কেননা মিসরীয়রা মমি তৈরি শুরু করার কয়েক হাজার বছর আগেই দক্ষিণ আমেরিকায় এই শিল্পের প্রচলন ছিল।
বিশ্বের আধুনিকতম সংস্কৃতিমনা মানুষ
চিনকোরো বালকের মমি করা মাথা আবিষ্কৃত হয় উত্তর চিলি ও দক্ষিণ পেরুর আতাকামা মরুভূমির উপকূলীয় এলাকায়। বিশ্বের প্রাচীনতম মমিগুলো তৈরি করেছে চিনকোরো নামে পরিচিত এক ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সম্প্রদায়। কৃষিকাজ, কারুশিল্প, বস্ত্রশিল্প ও স্বাক্ষরতার অভাবে তাদের আদিম পর্যায়ের বলা হলেও মমি তৈরির জটিল কৌশল দেখে আসলে তাদের কাছ থেকে অত্যাধুনিক সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দ থেকে চিনকোরো সম্প্রদায় তাদের মৃত স্বজনদের দেহ ‘পুনর্গঠন’ শুরু করে। দেহ থেকে সাবধানে মাংস আলাদা এবং চামড়া, মস্তিষ্ক ও অভ্যন্তরীণ ভাগের প্রত্যঙ্গসমূহ অপসারণ করা হয়।
সমগ্র বস্তু পুন:সংযোজনের আগে কাঠামো জোরদার করার জন্য ডালপালা ব্যবহার করে তার সাথে নলখাপড়া শক্ত করে বাঁধা হতো। হাড়গুলো গরম ছাই দিয়ে শুকানো হতো। এই কাঠামোর ওপর পুনরায় লাগানো হতো চামড়া। যেখানে প্রয়োজন হতো সেখানে জোড়া দেয়া হতো ‘সি লায়ন’ বা ‘পেলিক্যানের’ চামড়া। ছাইয়ের তৈরি পেস্টের একটি পুরু স্তর কখনও হতো শরীরের ওপর। মাটির তৈরি সুন্দর মুখোম মুখমন্ডল আবৃত করার জন্য ব্যবহার করা হতো। মমিগুলোকে ক্লোনসদৃশ সমরূপবিশিষ্ট চেহারা দিতে এগুলোতে কালো ম্যাঙ্গানিজ বা লাল গিরিমাটি মাখানো হতো।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুখমন্ডল কয়েকবার রঙ করা হয়েছে এবং পায়ের পাতার দিকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখে বোঝা যায় তারা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সম্ভবত শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে মমিগুলোর অবস্থান এমন ছিল। চিনকোরোদের মতো একটি অক্ষরজ্ঞানহীন সমাজের লোকজন কেন মমি তৈরি করত তা সঠিকভাবে জানা কঠিনই বটে। তবে এর মধ্যে দিয়ে নিশ্চিতভাবে তাদের একটি ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়েছে যে, তারা মৃত স্বজনদের তাদের সাথে রাখতে চেয়েছে। কেননা মমিগুলো দেখে মনে হয় না যে, এগুলো তৈরির সাথে সাথে সমাহিত করা হয়েছে।
সমাহিত করার সময় মমিগুলো পারিবারিক গ্রুপে সাজিয়ে রাখা হতো এবং একেবারে প্রথম দিককার চিনকোাে মমিগুলো হচ্ছে শিশু ও ভ্রুণের। সম্ভবত নারীরাই প্রথম মমি তৈরি করেছে। মৃত সন্তানদের সাথে রাখার জন্যই হয়ত তারা এটা করছে।
চিনকোরো সম্প্রদায় যে মমি তৈরি শুরু করে তা প্রাক-হিসপানিক যুগব্যাপী অব্যাহত থাকে এবং বিকশিত লাভ করে নাজকা ও চিরিবায়ার মতো স্থানীয় পেরুভিয়ান সংস্কৃতিতে। চাচাপোয়া সংস্কৃতিতেও মমি তৈরির নিদর্শন পাওয়া গেছে। চাচাপোয়ার ‘মেঘমানবদের’ মমি পাওয়া গেছে আমাজান বনভূমির উঁচু এলাকায়। মৃতদেহগুলো মমি করা হয়েছে রক্ষা অবস্থায় যেখানে হাঁটু রাখা হয়েছে চিবুকের নিচে এবং হাত মুখম-লের কাছে। চোয়াল দু’টি প্রায়ই খোলা থাকত। এডভার্ড মাঞ্চের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য স্কীম’ আঁকা হয়েছে একটি পেরুভিয়ান মমির ওপর ভিত্তি করে যা তিনি প্যারিসের এক জাদুঘরে দেখেছিলেন। খাড়া অবস্থায় থাকায় মৃতদেহ থেকে তরল পদার্থ মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে বেরিয়ে পড়ে। আর দেহটি চকমৎকারভাবে সুসজ্জিত কাপড়ের মধ্যে সংরক্ষিত থাকে।
তুষার মমি
ইনকা যুগ থেকেই মমির প্রচলন রয়েছে। এ সময় পর্বত চূড়ায় মানুষের উৎসর্গ করার অভ্যাস ছিল যা হিমায়িত শুষ্ক করার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ‘তুষার মমি’ তৈরি করেছে। সম্প্রতি আন্দিজ পর্বতের চূড়ায় এরকম একশ’র উপরে মমি পাওয়া গেছে- যার চারপাশে ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্যমূর্তি এবং দেবতাদের সাথে থাকার জন্য ছিল উৎসর্গিত অনেক বস্তু। মমিকৃত এক গুয়াশেঁকে বিশেষজ্ঞরা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বলে চিহ্নিত করেছেন। ইনকারা তাদের স্বজনদের মৃতদেহ কৃত্রিম উপায়েও সংরক্ষণ করত। রাজপরিবারের সদস্যদের মমি করা দেহ খুবই জীবন্ত বলে বিবেচনা করা হতো। এবং গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে তাদের খাওয়ানো, কাপড় পরানো, কুচকাওয়াজ করানো এবং বিপদের সময় তাদের সাথে পরামর্শ করা হতো। যদিও ইনকা রাজাদের মমিসমূহ এতটা অপরিবর্তিত ছিল যে, তাদের চূল বা ভ্রু পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং তাদের পরনের কাপড় চোপড় এমন ছিল যেন জীবিত অবস্থায় এই মাত্র তা পরিধান করা হয়েছে। ১৫৩২ সালে স্প্যানিশ বিজেতারা ইনকাদের এই পদ্ধতি মেনে নিতে পারেনি। মৃতদের ইনকারা যেভাবে জীবিত হিসেবে মর্যাদা দিত এবং তাদের মরণশীল আত্মা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করত তা স্প্যানিশরা পছন্দ করল না। তারা যত মমি খুঁজে পেত এসবগুলোই ধ্বংস করল, খুলে নিল সাথে থাকা সব অলংকার। আবাসভূমির কাছাকাছি স্প্যানিশরা আরও ধ্বংস করল গুয়াুেশঁদের সংস্কৃতি। গুয়াশেঁরা হচ্ছে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের আদি বাসিন্দা এবং নিকটবর্তী উত্তর আফ্রিকার বার্বারদের বংশধর। গুহাবাসী ছাগলের পাল চরানো গুয়াশেঁরা তাদের মৃতদের মমি তৈরি করত এবং স্প্যানিশরা হাতের কাছে পাওয়া তাদের সকল মমি আবার ধ্বংস করলেও সামান্য যে ক’টা রয়ে গেছে তার মধ্যে স্থানীয় সামগ্রীর মাধ্যমে মৃতদেহ সংরক্ষণের অত্যন্ত উঁচুমানের কৌশলের প্রমাণ মিলেছে। সাম্প্রতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে আরও জানা গেছে যে, এদের সাথে প্রাচীন মিসরের মমি তৈরির সম্পকৃ রয়েছে। স্প্যানিশরা ১৫ শতকে যখন আসে তখনও গুয়াশেঁরা মমি তৈরি করছিল এদিক থেকে এই সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। বেশিরভাগ ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান মমিই তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে। যেমনটা হয়েছে ‘আইনম্যন’ বা তুষার মানবদের ক্ষেত্রে। সম্প্রতি অস্ট্রিয়া-ইতালির সীমান্তের কাছে আল্পস পর্বতগাত্রের উঁচু স্থানে ‘আইনম্যান’ এর হিমায়িত দেহের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে ওই স্থানে তার মৃত্যু হয়। গ্রীনল্যান্ডের কিলাকিটসোকে পাওয়া গেছে আরও ৮টি নারী ও শিশুর হিমায়িত দেহ। এসব মৃতদেহের পরিধানে ছিল সীল মাছের চামড়া দৈয়ে তৈরি পোশাক। যদিও গ্রীনল্যান্ডের এসব মমি মাত্র পাঁচশত বছরের পুরনো। আবাসস্থলের কাছেই উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের ‘বগ মমি’ পাওয়া যায়। পিটপূর্ণ জলাভূমিতে এসিড থাকায় পরিবেশগত কারণে মৃতদেহের নরম টিস্যু সংরক্ষণ থেমে গেছে এবং এবং পরিণত হয়েছে গাঢ় বাদামি চামড়ার মতো চেহারা। লৌহযুগের এসব অধিকাংশ কেলটিক মমির মাথার খুলি ভাঙা, ফাঁসির চিহ্ন বর্তমান এবং গলা কাটার প্রমাণ সুস্পষ্ট। তাদের এ ধরনের মৃত্যু থেকে আঁচ কারা যায় যে, তারা সম্ভবত ধর্মীয় বলীর শিকার হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ