ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 May 2018, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদকের বিরুদ্ধে অস্ত্রের যুদ্ধ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদক নির্মূলের ঘোষণা দেয়ার পর দেশে মাদক বিরোধী অভিযানের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ধুম পড়ে গেছে। র‌্যাব ও পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত মাত্র চারদিনেই বন্দুকযুদ্ধে ২৫ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে নয় জেলায় মারা গেছে ১১ জন। পুলিশের গুলীতে কুমিল্লা ও নীলফামারীতে দু’জন করে চারজন এবং চুয়াডাঙ্গা, নেত্রকোনা ও দিনাজপুরে একজন করে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ করতে গিয়ে চট্টগ্রাম, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নারায়ণগঞ্জে মারা গেছে আরো চারজন।
এসব ঘটনা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে র‌্যাব ও পুলিশ বলেছে, নিহতদের প্রত্যেকেই ছিল মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের চোরাকারবারী। তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে থানায় মাদক আইনে এক থেকে কয়েকটি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো গ্রেফতার হলেও তারা জামিনে বেরিয়ে এসেছে এবং বাইরে এসেই নতুন পর্যায়ে অবৈধ মাদকের ব্যবসায় নেমে পড়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাদক নির্মূলের বর্তমান অভিযান শুরু হওয়ার পর এসব ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারীকে অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করার এবং নিজেদের সকল মাদক পণ্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে জমা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। র‌্যাবের মহাপরিচালক এমনকি একথা পর্যন্ত বলেছিলেন যে, কেউ চাইলে নিকটস্থ র‌্যাব কার্যালয়ের আশপাশের কোথাও পণ্যগুলো ফেলে আসতে পারে। তেমন ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা বা কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না।
কিন্তু এই আহ্বানে মোটেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তখনই সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তৈরি করা তালিকার নাম ধরে ধরে গ্রেফতারের অভিযান শুরু করা হয়েছে। অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ীরা শুধু পালিয়ে যায়নি, কোথাও কোথাও র‌্যাব ও পুলিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলারও চেষ্টা করেছে। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রেই র‌্যাব ও পুলিশকে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। উভয়পক্ষ বন্দুকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এসব যুদ্ধেই মৃত্যু ঘটেছে অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের। কোনো কোনো বন্দুকযুদ্ধে র‌্যাব ও পুলিশের সদস্যরাও গুলীবিদ্ধ হয়েছেন।
সাধারণভাবে কথিত বন্দুকযুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরার জন্য র‌্যাব ও পুলিশের ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বন্দুকযুদ্ধ এবং সে যুদ্ধের আড়াল নিয়ে কথিত মাদক ব্যবসায়ীদের হত্যাকান্ডের চলমান ঘটনাপ্রবাহে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, কথিত বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে যেভাবে হত্যাকান্ডের অভিযান চালানো হচ্ছে তা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে চলতে পারে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একই প্রতিক্রিয়া ও অভিমত ব্যক্ত করেছে। মূল কথায় সংগঠনগুলো বলেছে, প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই আইন-শৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কিছুটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই বিবরণ ও কাহিনী প্রচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে নিহতদের পরিবার সদস্যরা জানাচ্ছেন বিপরীত ধরনের তথ্য। তারা অভিযোগ করেছেন, প্রত্যেককে আসলে হত্যার উদ্দেশ্যেই ধরে নিয়ে গেছে র‌্যাব ও পুলিশের লোকজন। হত্যার পর বন্দুকযুদ্ধের কাহিনী সাজানো হয়েছে।
আমরা মনে করি, যুক্তি ও ব্যাখ্যাসহ কোনো পক্ষের বক্তব্যকে এক বাক্যে বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ না থাকলেও তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব ও পুলিশের বক্তব্য কোনো মহলের কাছেই প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, অতীতেও এ ধরনের এবং এসবের চাইতেও ভয়ংকর হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এমন ঘটনার উদাহরণও রয়েছে, যেখানে হাতকড়া লাগানো ব্যক্তির বিরুদ্ধেও পুলিশের ওপর গুলী চালানোর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। বর্তমান পর্যায়েও সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সংশয় প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি অভিযোগ করেছে, চলতি বছরের শেষভাগে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তার জোটের পক্ষে যাতে যথাযথ সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব না হয় সে লক্ষ্যেই সরকার মাদক ব্যবসায়ীর আড়ালে বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা করছে। এর ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভীতি-আতংক ছড়িয়ে পড়ছে। তারা দলীয় কর্মকান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পারছেন না। অনেকে এমনকি জীবনের ভয়ে বহু দূরে কোথাও পালিয়েও যাচ্ছেন।
আমরা মনে করি, অন্তরালের প্রকৃত সত্য যা-ই হোক না কেন, চলমান বন্দুকযুদ্ধ এবং হত্যাকান্ডগুলোকে সমর্থনযোগ্য বলা যায় না। কারণ, বিশ্বের সব দেশেই গুম ও গুপ্তহত্যার মতো কথিত বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যাকান্ডকেও বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ড হিসেবেই দেখা হয়। এগুলোকে একই সঙ্গে মারাত্মক অপরাধ হিসেবেই শুধু নয়, দেখা হয় অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গেও। গণতান্ত্রিক কোনো দেশে রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা বা কর্মীকে তো বটেই, মাদক ব্যবসায়ীদেরও গ্রেফতার বা গুম করা হবে এবং পরে এখানে-সেখানে তাদের লাশ পাওয়া যাবে আর বলা হবে তারা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে- এমন অবস্থা কল্পনা করা যায় না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন হয়ে পড়া বাংলাদেশে শুধু গুমই করা হচ্ছে না, অপরাধ নির্মূলের নামে বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যাও করা হচ্ছে।
এ ধরনের কর্মকান্ডকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড না বলে উপায় নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরা তাই বলতে চাই, কোনো ব্যক্তি মাদক ব্যবসা ও মাদকের চোরাচালানসহ যত বড় অপরাধই করে থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা এবং আদালতে সোপর্দ করা যেতে পারে। এখানেই র‌্যাব ও পুলিশের ভূমিকা শেষ হওয়া উচিত। শাস্তি দেয়ার জন্য উচিত আদালতের হাতে বিচারের ভার তুলে দেয়া। আমরা মনে করি, র‌্যাব ও পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনী যদি সততার সঙ্গে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়, তাহলেই দেশ থেকে মাদক নির্মূলের একটা পথ হতে পারে। অবশ্য শুধু আইন ও শাস্তিই শুধু নয়, মাদকের অভিশাপ দূর করতে হলে প্রয়োজন ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করার। কথিত বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড কোনোক্রমেই সমস্যার সমাধান হতে পারে না। বিভিন্ন দেশে মাদক নির্মূলে নিছক ও আইনের যুদ্ধ পরাজয় বরণ করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ