ঢাকা, শুক্রবার 25 May 2018, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৮০ শতাংশ পোশাক কারখানা লোকসানে ॥ জিএসপি সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ সরকার

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ২০১৩ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক মুক্ত প্রবেশের সুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করেছিল মার্কিন সরকার। ২০১২ সালের নবেম্বরে আশুলিয়ার পোশাক কারখানা তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকা-ে ১১০ জনের মৃত্যু এবং তারপর মাত্র ৫ মাসের মাথায় ২০১৩ সালের এপ্রিলে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার পর শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তার অভাবের কারণ দেখিয়ে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র তাদের এক বিবৃতিতে জানায় বাংলাদেশে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত থাকবে। এরপর থেকে বন্ধ হতে থাকে একের পর এক পোশাক কারখানা। বেকার হয়ে পড়ে হাজার হাজার শ্রমিক। সে ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আশায় অনেক পোশাক কারখানার মালিক লোকসানে কারখানা চালু রেখেছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে আরও কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে লোকসানে রয়েছে ৮০ শতাংশ কারখানা। জিএসপি সুবিধা স্থগিতের ৫ বছর অতিক্রম করতে চললেও এখনো পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। নতুন কারখানা গড়ে না উঠায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসাবে খ্যাত এ খাতের শৃঙ্খলাও ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

চলতি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কার্যালয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম পোশাক কারখানার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এনবিআরকে জানানো হয়, দেশের ৮০ শতাংশ পোশাক কারখানা লোকসান দিয়ে ব্যবসা করছে। মাত্র ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মুনাফা করছে। কিন্তু সবাইকে ভ্যাট, ট্যাক্স ও উৎসে কর দিতে হচ্ছে। এজন্য লোকসান দিয়ে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকা খুবই কষ্ট হচ্ছে। বায়াররা ন্যায্য মূল্য দিচ্ছে না। এর বাইরে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে কাঁচামালের দাম। এর বাইরে ব্যবসায়ীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। অডিটের নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট সিস্টেম এবং স্থানীয় ও রাজস্ব অধিদপ্তর ব্যবসায়ীদের ব্যাপক হয়রানি করছে। রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস এক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্প প্রতিষ্ঠানকে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ উৎসে কর দিতে হয়। আসন্ন বাজেটে তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা দরকার। বিদেশী বায়াররা নিট পণ্যের ন্যায্য দাম দিচ্ছে না, অন্যদিকে এ শিল্পের কাঁচামালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় এ শিল্পকে রক্ষা করতে হলে উৎসে কর হার কমানোর বিকল্প নেই।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এমনিতেই বর্তমানে পোশাক কারখানা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরপর সরকারের একের পর এক নেতিবাচক সিদ্ধান্তে মালিকদের দূর্ভোগের শেষ নেই। মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আদায়ের নামে হয়রানি করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের কাছে ঘুষ হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। হাতেম বলেন, সম্প্রতি পোশাকশিল্পের মালিকরা ঠিক মতো ভ্যাট দেয় কি-না তা খতিয়ে দেখতে অডিট শুরু করেছে এনবিআর। নিয়ম অনুসারে পরিবহন খরচ, প্যাকেজিংসহ অন্যান্য ব্যয়ের ওপর ভ্যাট দিতে হয়। কিন্তু এখন আবার মিসেলিনিয়াস (অন্যান্য) ব্যয়ের ওপরও ভ্যাট দেয়া হচ্ছে কি-না দেখা হচ্ছে। এর মানে অন্যান্য খরচের মধ্যে বিভিন্ন কার্য সম্পাদনের জন্য যে ঘুষ দেওয়া হয় সেটাও যুক্ত আছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমাদের (গার্মেন্টস মালিক) ঘুষের ওপরও ভ্যাট দিতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আয়করের ওপর ব্যবসায়ী ও সাধারণ পর্যায়ে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু ভ্যাটের বিষয়ে সেই ধরনের গ্রহণযোগ্যতা এখনো সেই পর্যায়ে নেই। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায় কম হয়। এ কারণে আমাদের অডিট প্রক্রিয়ায় যেতে হয় এবং প্রত্যেকটি অডিটে অনাদায়ী ভ্যাট আদায় হতে দেখা যায়। 

জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার পর পোশাক খাত মূল্যায়নে জাতীয় উদ্যোগের আওতায় থাকা একটি কারখানা ঢাকার রামপুরার রূপা সোয়েটার্স (বিডি) লিমিটেড। প্রাথমিক পরিদর্শনে কারখানাটির ত্রুটি শনাক্ত হয়। কারখানাটি সংস্কারে ব্যয়ের আকার অনেক বেশি হওয়ায় বিদ্যমান স্থানে এটি সচল রাখতে অপারগতা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। ফলে বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটি। আবার অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে কার্যাদেশের অভাবে। কার্যাদেশের অভাবে লোকসানে কারখানা চালু রেখে দেনা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে অনেক কারখানা মালিকরা বন্ধ করে দিচ্ছেন। এরমধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এমআর সোয়েটার কম্পোজিট গ্রুপের কারখানা। এভাবে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

৭০-এর দশকের শেষভাগে শ্রমঘন শিল্প হিসেবে দেশে পোশাক খাতের গোড়াপত্তন হয়। গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক কারখানা। তবে এসব কারখানা গড়ে ওঠে মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকে ঘিরে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ শিল্পে বর্তমান সরকারের সময়ে ২০১২ ও ২০১৩ সালে বিপর্যয় নেমে আসে। ঘটে পোশাক শিল্পে তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনা। ঝরে যায় অসংখ্য শ্রমিকের প্রাণ। এরপর খাতটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুরু হয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে মূল্যায়ন কর্মসূচি। জাতীয় উদ্যোগে কর্মসূচির হালনাগাদ তথ্য বলছে, ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ পোশাক কারখানাই এখন বন্ধ।

জাতীয় উদ্যোগে পোশাক শিল্প মূল্যায়ন কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে প্রায় দেড় হাজার কারখানা। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের সব জেলায় এসব কারখানার বিভিন্ন ত্রুটি এরই মধ্যে শনাক্ত হয়েছে। প্রাথমিক পরিদর্শনের পর ঝুঁকির মাত্রাভেদে ১ হাজার ৫৪৯টি কারখানাকে গ্রিন, ইয়েলো, অ্যাম্বার ও রেড শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। গ্রিন শ্রেণীভুক্ত কারখানাগুলো নিরাপদ আর রেড শ্রেণীর কারখানাগুলো অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত প্রায় পাঁচ বছরে রেড শ্রেণীভুক্ত মোট ৫১৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। সূত্রমতে, জাতীয় উদ্যোগের আওতায় ১ হাজার ৫৯৪টি কারখানার মধ্যে ঢাকা বিভাগের মোট কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৩১৯। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৬৪৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৩৯৮ ও গাজীপুরে ৩৭২টি। এদিকে বিগত প্রায় ৫ বছরে বন্ধ ৫১৩টি কারখানার মধ্যে ঢাকার ২৭৬, নারায়ণগঞ্জের ১৯৮ ও গাজীপুরের কারখানা ৮৮টি। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা অঞ্চলের ৩৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ কারখানাই বন্ধ হয়েছে গত ৫ বছরে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় সব ধরনের কারখানাই রয়েছে। কারখানা বন্ধের অনেকগুলো কারণের মধ্যে রয়েছে- তাজরীন ও রানা প্লাজা বিপর্যয়ের পর কার্যাদেশ কমে যাওয়া ও কারখানার মান নিয়ে সতর্কতা। তবে বেশির ভাগই বন্ধ হয়েছে কার্যাদেশ না থাকার পাশাপাশি লোকসানের কারণে। এছাড়া অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে আর্থিক অসচ্ছলতা, ব্যাংকের কাছে দেনা, কর্মপরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়া, গ্যাস সংকট, অগ্নিকান্ড, কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব, কারখানার জমির মালিককে ভাড়া না দেয়া, পুরনো মেশিন ও শ্রমিক অসন্তোষ।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) জানায়, মোট ৫১৩টি কারখানার কয়েকটি তাদের নির্দেশনায় বন্ধ হয়েছে। অনেক কারখানাই শিল্প বিপর্যয়-পরবর্তী প্রেক্ষাপটের প্রভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়েছে। এখন আমাদের উদ্বেগ সেসব কারখানা নিয়ে, যেগুলো ত্রুটি নিয়ে সচল আছে, কিন্তু সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করছে না। যথাযথভাবে সংস্কার সম্পন্ন না করলে এমন প্রায় ৮০০ কারখানা আইন অনুযায়ী বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

এ ব্যাপারে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জাতীয় উদ্যোগের আওতায় থাকা যেসব কারখানা বন্ধ হয়েছে সেগুলো পোশাক খাতের রফতানিতে তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। কারণ এসব কারখানার অনেকগুলোই ক্ষুদ্র ও মাঝারি। বেশির ভাগই পুরনো কারখানা। এ ধরনের প্রতি ১০টি কারখানা বন্ধ হয়ে সমন্বিত উৎপাদন সামর্থ্যের একটি কারখানা অন্যত্র গড়ে উঠেছে। 

শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্পের কারখানাগুলোয় কর্মসংস্থান সংকটে প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে। এসব শ্রমিকের মধ্যে অনেকে গ্রামে ফিরে গেছেন। অনেকে অন্য শিল্প কারখানায় কাজ নিয়েছে। আবার অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তাদের গবেষণায় বলেছে, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হওয়ার পর, ইউরোপের মার্কেটে ডিউটি ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ হওয়ার পর বড় ধরনের ধাক্কা খাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। এ ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে এখনই সতর্ক হতে হবে। তিনি বলেন, ২০২৭ সালের পর ডিউটি ও কোটামুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে বাংলাদেশ বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তবে সুযোগ রয়েছে এসডিজি বাস্তবায়ন করে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের মতো এসডিজি প্লাসের সুবিধা নেয়ার।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্প্রতি বাংলাদেশে শ্রম বাজার এবং দক্ষ মানব সম্পদের ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাত বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে খাতটি আর আগের মতো ভূমিকা রাখতে পারছে না। অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে ২০১৩ সালের পর থেকে। প্রতিবেদনে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাতের অবদান নিয়ে ১৯৯০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ২৫ বছরের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২৫ বছর আগে ১৯৯০ সালে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান হয় ৫ লাখের মতো লোকের। আর ২০১৫ সালে কর্মসংস্থান হয় ৪০ লাখ লোকের, যার বড় অংশই নারী। তবে এই সময়ে একই গতিতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি হয়নি। বলা হয়েছে, ১৯৯০-৯৫ সময়ে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। কিন্তু পরের পাঁচ বছরে অর্থাৎ ১৯৯৫-২০০০ সময়ে প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৯২ শতাংশে। তবে ২০০৫-১০ সময়ে এ প্রবৃদ্ধি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। এই পাঁচ বছরে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০১০ সালের পর থেকে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমে নেমে আসে ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে। 

বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে নতুন কারখানা গড়ে না ওঠাকে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান তৈরির প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, একদিকে পোশাকের বিশ্ব চাহিদা কমে গেছে, অন্যদিকে কমে গেছে দাম। নতুন কারো পক্ষে কারখানা করে এখন মুনাফা অর্জন সত্যিই কঠিন। ফলে কর্মসংস্থান তৈরিতে এ খাতের অবদান কমে গেছে।  

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিনিয়োগের শীর্ষ খাতগুলোর অন্যতম টেক্সটাইল। এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩২ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর কর্মসংস্থান দুই লাখের বেশি মানুষের। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে খাতটি। কোম্পানিগুলোর আয় কমে গেছে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের পেছনে কোম্পানিগুলোকে অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এরপরও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, আগের অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ১২.৮ শতাংশ। এরপর থেকে উৎপাদন হ্রাসের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। 

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকো। এই গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো সিনথেটিকস লিমিটেডে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয় ছিল ৬৭ কোটি ৪৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ৫০ কোটি ২৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকায় নেমে আসে। অর্ধবার্ষিক হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির আয় কমেছে ২৫ শতাংশ। ডেনিম কাপড় উৎপাদনকারী অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান আরগন ডেনিমসের ২০১৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ১০৩ কোটি ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৭ টাকা। ২০১৫ সালের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ৯৮ কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৫ টাকা নেমে আসে। স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান স্কয়ার টেক্সটাইলস লিমিটেড। ২০১৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪২২ কোটি ৬৮ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৯ টাকা। ২০১৫ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়ায় ৪০৩ কোটি ৭১ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৯ টাকায়। গ্যাস বিদ্যুতের অভাবে এভাবে প্রতিবছরই কমছে আয়ের পরিমাণ। 

বিটিএম এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৭৮৭টি। আর সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৪০৭। এ মিলগুলোর স্পিন্ডল রয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ। যদিও বেশির ভাগ সময়ই উৎপাদন ক্ষমতার ২৫ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে মিলগুলোর। এ হিসাবে বন্ধ থাকছে প্রায় ২৬ লাখ স্পিন্ডল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার ও পরিকল্পনার অভাবে এ বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

গ্যাস সংকট নিয়ে বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পোশাক খাত একটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের চাপের ফলে অনেক কারখানা সমস্যার মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। সংকট থাকলেও দফায় দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের। তাই ন্যায্য দামে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির ব্যবস্থা করা না হলে এ খাতে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখন এলএনজিতে ভরসা। দেখা যাক কি হয়। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ