ঢাকা, শুক্রবার 25 May 2018, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গার্মেন্ট শিল্পে ভারতীয় নাগরিক

বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকারের তাৎপর্যপূর্ণ উদাসীনতার পাশাপাশি গার্মেন্ট মালিকদের অর্থলিপ্সার পরিণতিতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প। গার্মেন্ট ব্যবসার লাভের অংশ হুন্ডি ও ভুয়া এলসির মাধ্যমে টাকাকে রুপি ও মার্কিন ডলারে পরিণত করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভারতীয়রা নিজেদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। 

দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানা গেছে, হুন্ডি ও ভুয়া এলসির মাধ্যমে অর্থ নিয়ে যাওয়ার পরিমাণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে গার্মেন্ট মালিকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বিজিএমইএ’র সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বায়িং হাউজের সংখ্যা ৯১১টি। পাশাপাশি রয়েছে বিজিবিএ’র অন্তর্ভুক্ত ১৭৯টি বায়িং হাউজ। এ দুটি সংগঠনের আওতাধীন নয় এমন বায়িং হাউজ রয়েছে আটশ’র বেশি। এগুলোর সঙ্গে দেশে তৈরি পোশাক কেনাবেচায় নিয়োজিত রয়েছে দু’ হাজারের বেশি ছোট-বড় বায়িং হাউজ। সে হিসাবে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বায়িং হাউজের মালিকানাই চলে গেছে ভারতীয়দের দখলে। আর এটাই বাংলাদেশের গার্মেন্টের জন্য প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক এক গবেষণা নিবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর পরিচালক ড. শফিক-উজ জামান বলেছেন, ভারতীয়দের কারণেই বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প বর্তমানে চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

আশংকার অন্য কিছু কারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে বর্তমানে অন্তত ২৫ হাজার ভারতীয় নিয়োজিত রয়েছে। তাই বলে এদের সবারই আইনসম্মত ওয়ার্ক পারমিট নেই। অনেকে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে শুরু করলেও অধিকাংশ ভারতীয় আর রিনিউ করেনি। অর্থাৎ তারা চাকরি করছে সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায়। নিজেদের দেশে বেতনের টাকাও তারা হুন্ডির মতো অবৈধ পন্থায়ই পাঠাচ্ছে। 

ভারতীয়দের গ্রুপিং তথা ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকান্ড রয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ে। দেখা গেছে, ছোট বা বড় যে অবস্থানেই তারা নিয়োজিত থাকুক না কেন, প্রতিটি কারখানায় ভারতীয়রা গোপনে কয়েকটি পর্যন্ত গ্রুপ তৈরি করে এবং বাংলাদেশি সকল মালিককেই তাদের ইচ্ছা মতো চলতে হয়। মালিকরা চাইলেও ভারতীয়দের ওপরে এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বাংলাদেশিকে কোনো পদে বা অবস্থানে বসাতে বা চাকরি দিতে পারেন না। উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা এমনভাবেই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে যে, উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী। বিক্রি ও রফতানির ব্যাপারেও ভারতীয়দের ইচ্ছার কাছেই মালিকদের নতি স্বীকার করতে হয়। ফলে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্যের অর্ডার এলেও বাংলাদেশি মালিকদের পক্ষে তা গ্রহণ বা সে অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। একই কারণে একদিকে বাংলাদেশ প্রচুর অর্ডার হারায়, অন্যদিকে সে অর্ডারগুলো চলে যায় ভারতে। বাংলাদেশি মালিকদের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও হয় যথেষ্ট। 

এভাবে লোকসান গুনতে গুনতে এক পর্যায়ে মালিকরা বিপন্ন হয়ে পড়েন, কারখানার অস্তিত্ব রক্ষা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর ঠিক তেমন অবস্থায়ই গ্রুপিং নিয়ে ব্যস্ত ভারতীয়রা ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা আগে থেকেই ভারতের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে থাকে। কোনো কারখানা অস্তিত্বের সংকটে পড়লেই গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের গার্মেন্টে নিয়োজিত ভারতীয়রা স্বদেশি ব্যবসায়ীদের দিয়ে কারখানার মালিকানা কিনিয়ে নেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিক্রি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশি এজেন্টদের সামনে রাখলেও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভারতীয়রা নিজেরাই মালিকানা দখল করে নেন। এসব ভারতীয় মালিকের অনেকে এমনকি বাংলাদেশে পর্যন্ত আসেন না। ভারতে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্য কোনো দেশে বসেই তারা বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেন। দেশের কাগজেপত্রেও বাংলাদেশি হিসেবেই তাদের পরিচিতি লেখা থাকে। 

 দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মূলত ভারতীয়দের ষড়যন্ত্র ও কার্যক্রমের পরিণতিতেই বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প লোকসানের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। দেশের অনেক কারখানাও এরই মধ্যে হয় বন্ধ হয়ে গেছে নয় তো চলে গেছে ভারতীয়দের দখলে। এদেশের গার্মেন্টের অহংকার হিসেবে পরিচিত অনেক কারখানাও ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন অবস্থা কোনোক্রমেই চলতে দেয়া যায় না। কারণ, বহু বছর ধরে গার্মেন্ট তথা তৈরি পোশাক বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে চলেছে। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে একথা পর্যন্ত জানানো হয়েছে যে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৮০ শতাংশই গার্মেন্ট খাত থেকে এসে থাকে। রেমিট্যান্সের মতো অন্য খাতগুলোর ভূমিকা এখন আর আগের মতো নেই। সুতরাং যে কোনো পন্থায় গার্মেন্ট শিল্পকে বাঁচিয়ে তো রাখতে হবেই, একে লাভজনকও করতে হবে। 

এখানেই ভারতীয়রা এসেছে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে। একই কারণে গার্মেন্ট শিল্পের চাকরি ও কর্তৃত্ব থেকে বিদেশী প্রভাবের অবসান করতে হবে। ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া চাকরিরত সকল ভারতীয়কে দেশ থেকে বহিষ্কার তো করতে হবেই, একই সঙ্গে প্রতিটি কারখানায় ভারতীয়দের গ্রুপিং-এর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা মনে করি, ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করার পাশাপাশি বিদেশী আধিপত্যের অবসান ঘটানো গেলেই বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পকে আগের মতো লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে হবে অনতিবিলম্বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ