ঢাকা, শুক্রবার 25 May 2018, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘মারি’ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, পাকিস্তান থেকে ফিরে 

[কিস্তি-ছয়]

ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী বলেছেন, পাকিস্তান একটা সুন্দর দেশ, সেখানে যেতে সব সময় ভালো লাগে। নিজের আত্মজীবনী প্রকাশ করার পর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি। সৌরভ গাঙ্গুলী বলেন, পাকিস্তান মনোরম দেশ। একদিকে যেমন সুন্দর, তেমনই আবার রুক্ষ। যেমন কঠোর, তেমনই কোমল। পাকিস্তানের মানুষ যে এত ভালো ব্যবহার করবেন, সেটা ভাবতেই পারিনি। পাকিস্তানের মাটিতে যে রকম খাবার-দাবার, আতিথেয়তা এবং উদারতা পেয়েছি, সেটা দুর্দান্ত। পাকিস্তান অসাধারণ দেশ। পাকিস্তান সফর করার জন্য একটা চমৎকার জায়গা। সৌরভ পাকিস্তানের শহরগুলোর মধ্যে শিয়ালকোট, রাওয়ালপিন্ডি, করাচি ও লাহোর ভ্রমণ করেছেন। প্রতিটি শহরের সৌন্দর্য তাকে আকৃষ্ট করলেও পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের বিশেষ প্রশংসা করেন সৌরভ। তিনি বলেন, ইসলামাবাদ একটা সুন্দর জায়গা। পাকিস্তানের রাজধানী। সেখানে রাস্তায় ড্রাইভ করতে করতে একদিকে দেখা যায় সুন্দর সুন্দর ভবন, অন্যদিকে পাহাড়। অপূর্ব জায়গা।

সৌরভের সুরেই যেন কথা বললেন পাকিস্তানে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিক ডা. মোহাম্মদ আলী।  যিনি দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশী সময় ধরে পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থান করছেন। তিনি পাঞ্জাব ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওলজি হাসাপাতালের একজন কার্ডিওলোজিস্ট। পাঞ্জাব মেডিক্যাল কলেজ থেকেই তিনি এমবিবিএস শেষ করেছেন। এখনো সেখানে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন। তার স্ত্রী ডা. ফৌজিয়া খানও একই মেডিক্যাল থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। তিন সন্তান নিয়ে তারা পাকিস্তানেই আছেন। তবে পড়াশুনা শেষ করে চলতি বছরের মাঝামাঝিতেই তারা দেশে ফিরবেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, পাকিস্তান আসলেই অনেক সুন্দর দেশ। কথা প্রসঙ্গেই তিনি পর্বত উদ্যানের শহর ‘মারি’র কথা টেনে আনেন। তিনি বলেন, মারি পাকিস্তানের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর অন্যতম। এটাকে আজাদ কাশ্মীরের প্রবেশ দ্বারও বলেন তিনি। এই মারি থেকে আজাদ কাশ্মীর দেখা যায়। এটি দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশী পর্যটক সেখানে পাড়ি জমায়। পাহাড়ী ঘেরা এলাকায় কিভাবে একটি পরিকল্পিত বসতি গড়ে উঠেছে সেটি এই মারিতে না গেলে বুঝা যাবেনা। এভাবেই মারি সম্পর্কে বলে গেলেন ডা. আলী। 

পাকিস্তান সফরের পঞ্চম দিনে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ‘মারি’ পরিদর্শনে। ইসলামাবাদের হোটেল থেকে সকাল ১১টার দিকে আমরা মারির উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। ইসলামাবাদ শহরটি এমনিতেই খুব সুন্দর। চারদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা। আমাদের বহনকারী গাড়িটি যতই মারির দিকে যাচ্ছিল ততই যেন নতুন রূপে সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করছি। যেন পাহাড় আর আকাশ মিতালী করে বাস করছে। পাহাড়ের উপর নির্মিত অসাধারণ রাস্তা। রাস্তার নিরাপত্তার তৈরী করা আছে কয়েকস্তরের দেয়াল বেস্টনী। রাস্তা থেকে নীচের তাকাতেই বুকে ‘ধড়পড়’ করে উঠে। পাহাড়ের সাথে মেঘরাশি খেলা করে এখানে। মুহূর্তেই বাংলাদেশের বান্দরবানের কথা মনে হলো। তবে বান্দরবানের রাস্তাগুলো এতোটা উঁচুতে নয় বলে আমার বিশ্বাস। পাহাড়কে না কেটে, তার অস্তিত্বের ক্ষতি না করে কিভাবে একটি বসতি গড়ে উঠেছে তা মারি সফরকালেই দেখলাম। বান্দরবানে পাহাড়ি জনবসতি থাকলেও সেটি অপরিকল্পিতই মনে হয়। কিন্তু এখানে পরিকল্পনা করেই একটি বসতি যুগের পর যুগ পার করছে। দূর থেকে পাহাড়ে অবস্থিত ঘরগুলোকে ছোট্ট্ পাখির বাসার মতই মনে হয়। মাঝে মাঝে ঘরগুলোকে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে দেখা যায়। কি অপরূপ সৌন্দর্য্য। সত্যিই অবাক করার মতো। যতই সামনের দিকে যাচ্ছি ততই যেন নতুন কিছু দেখছিলাম। সমতল থেকে ঘুরে ঘুরে আমাদের গাড়িটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে লাগলো। যেন আমরা একই পাহাড়েই ঘুরপাক খাচ্ছি।

বারবার প্রশ্ন জাগছিল এখানকার জনবসতিরা কিভাবে এই পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত করে। তাদের পানি, জ্বালানী কিভাবে দেয়া হচ্ছে। প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করতেই আমাদের সাথে থাকা দেশটির পিআইডি কর্মকর্তা উজমা আর্জমান্দ জানালেন, পানির ব্যবস্থা শহর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে করা হয়ে থাকে। বড় পানির পাইপ থেকে ছোট ছোট পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। জ্বালানী হিসেবে ‘সিলেন্ডারই’ একমাত্র ভরসা। অতি অল্প দামে এখানে সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যায়। গাড়ি থেকে দেখা না গেলেও এই পাহাড়ি এলাকাতে রয়েছে অসংখ্য রাস্তা। এসব রাস্তা দিয়েই এখানকার জনগণ চলাচল করে থাকেন। তবে খুবই ‘রিস্কি’ পথই তাদের পাড়ি দিতে হয় এটা নিশ্চিত। দূর থেকে ঘরগুলাকে ছোট মনে হলেও অধিকাংশ ঘরই বহুতলা বিশিষ্ট। এদের নির্মাণশৈলীও চমৎকার। এই মারিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি বড়বড় শপিংমল। পাকিস্তানের সাপ্তাহিক বন্ধ ও বিশেষ দিনে এখানে ক্রেতাদের ঢল নামে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘মল’ মার্কেট। পর্যটকরাও এখান থেকে কেনাকাটা করে থাকেন। বিশেষ করে থ্রিপিচ, কাশ্মীরি চাদর, শাল, বিভিন্ন রকমের শুকনো খাবার আইটেম। বন্ধ ছাড়াও প্রতিদিন ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডিসহ আশপাশের মানুষ এই মল মার্কেট থেকে কেনাকাটা করতে আসেন। এখানে দাম যেমন কম তেমনী পণ্যের মানও ভালো বলে জনশ্রুতি আছে।  

মারি শব্দটি উর্দু। যার অর্থ ‘শীর্ষে’। পাহাড়ের মধ্যেই এই জনবসতি বলে এটির নাম মারি বলে অধিক পরিচিত। তবে এর নামকরণে আরও অনেক ইতিহাস রয়েছে। অনেকে বলছে, মারি একটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নাম। কেউ বলছে, মারি এক ইংরেজ মহিলার নাম। তার নামানুসারেই এটির নামকরণ করা হয়েছে। পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি জেলার পীর পাঞ্জাল রেঞ্জের গালাত অঞ্চলে অবস্থিত একটি পর্বত উদ্যানের শহর এটি। এটি ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডি মেট্রোপলিটন এলাকার সীমান্তবর্তী এলাকা এবং ইসলামাবাদের ৫৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র মারি। বলা যায়, কাশ্মীরের হাওয়া  

মারিতেই অনুভব করা যায়। এর গড় উচ্চতা ২,২৯১ মিটার (৭,৫১৬ ফুট)। জানা গেছে, ৯৫টি গ্রাম নিয়ে এই মারি এলাকা গঠিত হয়েছে। এখানে সমতল ভূমি তেমন একটা দেখা যায়না। 

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ সৈন্যদের ছুটি কাটানোর স্থান হিসেবে বেঁচে নেয়া হয়। এই অঞ্চলের সার্বিক সৌন্দর্য্য এতটাই মনোমুগ্ধকর ছিল যে, ব্রিটিশরা এই স্থানটিকেই তাদের সৈন্যদের বিশ্রামের স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৮৫৩ সালে এটিকে শহুরে রূপান্তরিত করা হয়েছে। শহর থেকে মারি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য একটিই প্রধান সড়ক তৈরী করা হয়। এই সড়কটি এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যাতে পাহাড়ের অন্য অংশের রাস্তাটিকে খুবই কাছে মনে হয়। অথচ কাছের সেই রাস্তায় যেতে বেশ সময় লাগে। এক একটি পাহাড়ে কয়েকস্তর বিশিষ্ট রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ের নীচ থেকে উপরে চলমান যানবাহনগুলোকে অসাধারণ মনে হয়। আস্তে আস্তে দেশে-বিদেশে মারি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে থাকে। অনেক ইংরেজ এখানে স্থায়ীভাবে বসতি শুরু করেন। বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত ইংরেজ এখানে জন্ম গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে ব্রুস বেয়ার্নসফাদার, ফ্রান্সিস ইয়েনহুসব্যান্ড এবং রেগনালড ডায়ার অন্যতম। এরা নিজ দেশে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের পর থেকে মারি একটি জনপ্রিয় হিলার স্টেশন হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। শীত ও গ্রীষ্মকালে তার মনোরম সৌন্দর্য্য যেন সকল কিছুকেই চাপিয়ে যায়। মারি যারা পরিদর্শনে যান তাদের বেশিরভাগ পর্যটক ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডি এলাকা হয়েই যান। মারি শহরটি আরেকটি পর্যটন এলাকা আজাদ কাশ্মীর এবং এবোটাবাদ সফরের জন্য একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবেও কাজ করে। পর্যটকদের জন্য আজাদ কাশ্মীর যেতে হলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এনওসি নিতে হয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্র প্রধানসহ দেশটির শীর্ষ কর্তা ব্যক্তিরা এই ‘মারি’তেই প্রায়শ ঘুরতে যান। মারিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১২ তম পদাতিক ডিভিশনের বিভিন্ন সদর দপ্তর রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয় সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। মারি এলাকাটি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে থাকায় এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অনেক কড়াকড়ি।  

জানা গেছে, মারিকে দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে আরো দর্শনীয় করতে এবং তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পাহাড়ী এই এলাকাতে বেশ কিছু রিসোর্ট তৈরী করা হয়। যেগুলো পরবর্তীতে দারুণ জনপ্রিয়তার পায়। এখানে ইংরেজ পরিবারগুলির আবাসস্থলের জন্য নির্মিত ভিলা এবং অন্যান্য ঘরবাড়িগুলো এখনো নিদর্শন হিসেবে পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। এগুলোর প্রতিটিই একটি ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল। এই অঞ্চলের আপেল সারা বিশ্বে বিখ্যাত। 

মারিতে পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানের হোটেল রয়েছে। যাতে সব দেশেরই পছন্দের খাবার পাওয়া যায়। যেমন আল-মায়াদা, ফুসিয়া রেষ্টুরেন্ট, রেড পেঁয়াজ শেফরন, হক পাঞ্চ লাউঞ্জ, কেএফসি, পেসাহারা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে আলোচনায় থাকে পার্ল কন্টিনেন্টাল (পিসি) হোটেল। এটি ফাইভ স্টার মানের হোটেল। ১৯৯২ সালে এই পিসি হোটেলটি চালু করা হয়। পিসি হোটেলে প্রবেশে পূর্ব থেকেই অনুমতি নিতে হয়। এখান থেকে মারির সৌন্দয্য উপভোগ করা যায় দারুণভাবে। 

এছাড়া কয়েক কিলামিটার দূরে অবস্থিত আজাদ কাশ্মীরকে দেখা যায় এই হোটেল থেকে। এখানের সব খাবারই লোভনীয়। স্থানীয়রা দেশী খাবারই পছন্দ করে বেশী। যেমন,নিমকি টিক্কা ও করাহাই, মুরগির করাহী এবং মুরগির মখনি, সালাদ, ফলের জুস ইত্যাদি। পর্যটকদের সব ধরনের খাবারের আয়োজন এখানে থাকে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ