ঢাকা, শুক্রবার 25 May 2018, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

 চুয়াডাঙ্গায় নজরুল ও তাঁর আটচালাঘর

আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ :

“বাবুদের তাল-পুকুরে

হাবুদের ডাল-কুকুরে

সে কি বাস করলে তাড়া,

বলি থাম একটু দাঁড়া”।

এ ছড়াংশটি কার লেখা তা আর বলা লাগেনা! ছেলে-বুড়ো সবার কাছে সমান জনপ্রিয় এটি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লিচু চোর কবিতার। কিন্তু এই ছড়াটি যে চুয়াডাঙ্গার মাটিতে বসেই কবি লিখেছিলেন বলে অনেকে মত দিয়েছেন। এর ভাষা/ঢং দেখে বিশেষজ্ঞগণ এ মতামত দেন। আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বেশ কয়েকবার চুয়াডাঙ্গায় এসেছিলেন তা অনেকেই জানেন না! তাঁর স্বৃতিবিজড়িত “আটচালা” ঘরটি এখনো স্বৃতি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে কার্পাসডাঙ্গায়। যা আগে নাম ছিল নিশ্চিন্তপুর।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালের দিকে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায়/নিশ্চিন্তপুর অবস্থান করেন। এখানে তিনি লিচুচোর ও পদ্মগোখরাসহ বিভিন্ন গল্প, কবিতা রচনা করেন। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঘরটিতে একটানা দুই মাস ছিলেন। দুই মাস ঘুমিয়ে, নাওয়া, খাওয়া করে সেই আটচালা ঘরে কাটিয়েছেন জীবনের একটি বিশেষ সময়। সেই আটচালা ঘরে বসে লিখেছেন উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধা, কবিতা লিচু চোর সহ অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস যা এখন নজরুল সাহিত্য তো বটেই, বাঙলা সাহিত্যের অমূল্য স¤পদ। কার্পাসডাঙ্গার আটচালা ঘরে একটানা দুই মাস থেকেছেন, আরো দু-তিন বার যাতায়াত করেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর উপস্থিতি ও বসবাসের অসাধারণ স্মৃতিতে মহামূল্যবান স¤পদে পরিণত হয়েছে ঘরটি।

আটচালা ঘরের বইারে বসানো আছে কবি নজরুল ও তার আটচালা ঘর স¤পর্কিত একটি ফলক, যা ২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম উদ্বোধন করেছেন। বাংলা ও ইংরেজীতে লেখা সেই ফলকের শুরুতেই আছে কবি নজরুলের মানুষ কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন- 

“ গাহি সাম্যের গান-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি

সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি”..

ফলকের মাঝের অংশে “কবি নজরুল ইসলাম” শিরোনামে তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য রয়েছে। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় অগ্রণী বাঙালী কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ্যযোগ্য। ফলকের তৃতীয় প্যারায় “নজরুল স্মৃতিময় আটচালা ঘর” শিরোনামে একটি অংশ আছে। এই প্যারায় আটচালা ঘর সম্পর্কে সামান্য বৃত্তান্ত উল্লেখ্য করে লেখা হয়েছে; “১৯২৬ সালে কার্পাসডাঙ্গার মিশনপাড়ার সন্তান কলকাতা প্রবাসী মহিম সরকারের আমন্ত্রণে কবি সপরিবারে তাঁর বাড়িতে আসেন এবং দুই মাস কাল অবস্থান করেন। বাঙালী খৃষ্টান শিক্ষক, স্বদেশী ও কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা শ্রী হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বাস্তুভিটায় প্রতিষ্ঠিত এ আকর্ষণীয় আটচালা ঘরটি ছিল তখনকার রাজনৈতিক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র ও বিশ্রামাগার। কবি এ আটচালা ঘরে বহু রজনী কাটিয়েছেন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করেছেন। 

চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলাধীন কার্পাসডাঙ্গার এই পাড়াটা মিশনপাড়া নামে পরিচিতি। আটচালা ঘরের পেছনে সামান্য দূরত্বেই রয়েছে খৃষ্টানদের গীর্জা বা চার্চ যা মূল রাস্তা থেকেও দেখা যায়। সেই চার্চ তখন থেকেই রয়েছে। প্রকৃতি বিশ্বাস (৫৬) খৃষ্টান। তার বাবা, দাদা সবাই খৃষ্টান। ঘরের উপরে ছাউনি হিসেবে আছে খড়ের দুই স্তরের চালা। প্রথম স্তরের চতুর্দিকে ৪টি চালা, ২য় স্তরের চতুর্দিকে ৪টি চালা। সব মিলিয়ে দুই স্তরে ৮টি চালা। তাই এটি আটচালা ঘর হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে খড়ের তৈরী এই ধরণের আটচালা ঘর প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু সেই ঘরগুলো আলোচিত নয়। আলোচিত এই ঘর, কারণ এখানে ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং দুই বাংলার দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। 

আমাদের জাতীয় কবি নজরুল তরুণ বয়সে অনেক  ক’বার এসেছেন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদ কার্পাসডাঙ্গায়। স্মৃতি বিজড়িত খড়ের আটচালা ঘরটি এখনও সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে তৎকালীন দামুড়হুদা উপজেলার ভৈরব নদের তীরবর্তী কার্পাসডাঙ্গা মিশনপাড়ার সরকার পরিবার ছিলো জ্ঞান-গরিমায় বেশ সম্ভ্রান্ত। এই পরিবারের সন্তান শ্রী মহিম সরকার চাকরির সুবাদে থাকতেন কোলকাতায়। কোলকতা আমহার্স্ট স্ট্রিটে তিনি সপরিবারে বসবাস করতেন। মহিম সরকারের সাথে কবি কাজী নজরুল ইসলামের খুবই সখ্যতা ছিলো। তার বাড়িতে কবির আসা-যাওয়া ছিলো আপনজনের মতো। তার দুই মেয়ে আভা রাণী সরকার ও শিউলী রাণী সরকার নজরুল গীতি চর্চা করতেন। তাদের গানের তালিম দিতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজে। পরবর্তীতে আভা রাণী সরকারের গানের রেকর্ডও বের হয়। প্রখ্যাত লেখক ড. আশরাফ সিদ্দিকী অনুসন্ধান করে নজরুলের কথা ও সুরে আভা রাণী সরকারের ছয়টি গানের রেকর্ড-তথ্য পান। একাধিক তথ্যসূত্রে জানা যায়, মহিম সরকারের পারিবারিক আমন্ত্রণে একাধিকবার কবি নজরুল কার্পাসডাঙ্গায় এসেছেন। তবে ১৯২৬ সালে ২৭ বছর বয়সে কবি সপরিবারে এখানে বেড়াতে আসেন। এ সময় প্রায় দুই মাস কার্পাসডাঙ্গায় অবস্থান করেন । তার সাথে এসেছিলেন শাশুড়ি গিরিবালা, স্ত্রী প্রমীলা ও বড় ছেলে বুলবুল। তারা কোলকাতা থেকে ট্রেনযোগে দর্শনায় নেমে ৬ মাইল গরুর গাড়িতে করে কার্পাসডাঙ্গায় আসেন।কাজী নজরুল ইসলাম কার্পাসডাঙ্গার পার্শ্ববর্তী কুড়–লগাছির গাক্সগুলী ও মজুমদার বাড়িতেও কয়েকবার এসেছেন বলেও জানা যায়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম কার্পাসডাঙ্গায় অবস্থানকালে একটি আটচালা ঘরে তার থাকার জায়গা হয়। যে খাটে তিনি ঘুমোতেন, যে আলমারিটা তিনি ব্যবহার করতেন তা আজও অক্ষত অবস্থায় আছে। কবির গুরুত্ব অনুভব করে তার স্মৃতি লালন করে আসছেন বংশ পরম্পরায় প্রকৃতি বিশ্বাস। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এখানে মহিম সরকারের আমন্ত্রণে আসার পর এখানকার কংগ্রেস নেতা শিক্ষক হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের সাথে ভাব জমে তার। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস ছিলেন বর্তমান ভারতের শিমুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ফলে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের সঙ্গে কবির বেশ খাতির জমে ওঠে। সেই সুবাদে আটচালা ঘরেই কবির থাকার জায়গা হয়।  ১৯২৬ সাল হতে ১৯২৮ সালের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম কয়েক দফায় এখানে এসেছেন। যখন বৃটিশ সরকার হুলিয়া জারি করেছে, তিনি এখানে পালিয়ে এসে আত্মগোপন করেছেন। একবার পরিবার পরিজন নিয়ে দুই মাস এই ঘরে থেকেছেন। সাথে স্ত্রী প্রমীলা, ছেলে বুলবুল ও অনিরুদ্ধ ছিলেন। প্রকৃতির দাদু হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের পিতা সার্থক বিশ্বাস ছিলেন পুরোহিত। কিন্তু দাদু ছিলেন শিক্ষক। তিনি বিএ পাস এবং নিকটবর্তী শিমলে হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। স্কুলটি ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে নদীয়া জেলায় পড়েছে, যার অবস্থান এই বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই-তিন কিলোমিটার দূরে। দাদু শিক্ষকতার সাথে সাথে নদীয়া জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এবং স্বদেশী ছিলেন। বৃটিশ হঠাও আন্দোলন করতে গিয়ে তাঁর সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হলে দাদুর আগ্রহে নজরুল এই বাড়িতে আসতেন। নজরুল গবেষক এস এন ইব্রাহিম ১৯৮৫ সালে আটচালা ঘরের স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ নেন। সরকারি উদ্যোগে ২০১৬ সালের ২৮-৩০ ফালগুন এই বাড়ির সামনের আম বাগানে ৩দিন ব্যাপী জাতীয় নজরুল সম্মেলন হয়েছে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ