ঢাকা, শনিবার 26 May 2018, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যয় মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে সরকার

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রতিবছর সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার সীমা নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রত্যেক বছরই সে সীমা অতিক্রম করছে। প্রতিবছরই বাড়ছে এর পরিমাণ। চাহিদা মেটাতে সরকারকে এ খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে এখাত থেকে ঋণ নেয়ার রেকর্ড অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গেছে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সে রেকর্ডও অতিক্রম করার আভাস মিলছে। কেন না ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই লক্ষমাত্রার ২২ শতাংশ বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার।
সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অভিমত অর্থনীতিবিদদের। একইসাথে এ প্রকল্প সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য চালু হলেও বর্তমানে তা ধনীদের দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে যাদের সুবিধা পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছে না। এতে করে সামাজিক বৈষম্য বেড়েই চলেছে। ফলে সরকারের এখাতটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের অনেক বেশি অর্থ নেওয়ার প্রবণতা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অনেকে এর ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ জন্য সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থায় সংস্কার আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, গরীব ও মধ্যবিত্তদের জন্য আলাদা সেভিংস সার্টিফিকেট চালু করতে হবে। এতে সুদ হার তুলনামূলক একটু বেশি রাখা যেতে পারে। অপর দিকে সেভিংস বন্ড হবে ধনীদের জন্য। এর সুদ হার হতে হবে ব্যাংকের সুদ হারের মতো।
প্রতিবছর বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশি-বিদেশী বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। এরমধ্যে স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকটি উৎস রয়েছে। এ সব উৎসের মধ্যে একটি হলো সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে। আর এ ঋণের পরিমাণ প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে সরকার এ উৎস থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বছর শেষ না হতেই সে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের মেয়াদে প্রতিবছরই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে বেশি ঋণ নেয়া হচ্ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার ঋণ নিয়েছিল ১৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকায়। পরবর্তী অর্থবছর তথা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ঋণ নেয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু সে ঘোষণা খাতাকলমেই রয়ে যায়। বরং তার মাত্রা বেড়ে যায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকার ঋণ নেয় ২৪ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঋণ আরও বেড়ে ৫৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। পরের অর্থবছর তথা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঋণ নেওয়ায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়। সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঋণ নেয় ৭৫ হাজার ১৩৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সে রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রার ২২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এ বছর সরকার নিট ঋণ নেয়ার পরিমাণ ধরেছিল ৩০ হাজার কোটি টাকা। ৯ মাসে তা গিয়ে ঠেকেছে ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকায়। আর চলতি ৯ মাসে মোট ঋণ নিয়েছে মোট ৬০ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। এ নয় মাসে সুদ-আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ৪১৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। চলতি বছরের এখনো তিন মাস বাকি।
এদিকে ঋণ পরিশোধ ও নিট ঋণ নেয়ার পরিমাণে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকার সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করে ১৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। নিট ঋণ ছিল ২ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকার সুদ-আসল পরিশোধ করে ১৮ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। নিট ঋণ ছিল ৪৭৯ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সুদ-আসল পরিশোধ করা হয় ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৭২ কোটি টাকা।
পরবর্তী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে ৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা নিট ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু অর্থবছর শেষে নিট ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এর তিনগুণেরও বেশি ২৮ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটে ১৫ হাজার কোটি লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বছর শেষে সরকার ঋণ নেয় ৩৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত অর্থবছরে মূল বাজেটে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বছর শেষে এ খাত থেকে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। আর চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এই খাত থেকে সরকার নিট ঋণের লক্ষ্য ধরেছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু ৯ মাসে তা ছাড়িয়ে ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে পাওয়া যায় ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ। পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখন ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে, তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, মানুষ ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। নিরাপদ বিনিয়োগ ভেবে সঞ্চয়পত্রই কিনছে। এতেই এ খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।
সরকারের ঋণের বোঝা বেড়ে যাচ্ছে বলে গত বছরের মে মাসে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিন্তু বাজেট অধিবেশনে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ অন্যান্য মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা অর্থমন্ত্রীর ওই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করায় শেষ পর্যন্ত আর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। ফলে অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। এতে সরকারের ঋণও বেড়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলো সমাজের অবহেলিত, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, শারীরিক প্রতিবন্ধী, মহিলা ও শিশু, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার জন্য চালু করা হয়। কিন্তু নানাবিধ কারণে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। অথচ সঞ্চয়পত্র খাত অনেক ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও ধনীদের দখলে চলে যাচ্ছে।
এদিকে সঞ্চয়পত্র সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচি হলেও তার সুফল প্রকৃত সুবিধাভোগীরা না পাওয়ার পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা। সঠিক পর্যবেক্ষণ না থাকায় অনেক প্রাতিষ্ঠানও এখানে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে বলে তারা মনে করেন। তাছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনার যে সীমা নির্ধারণ করা আছে, তাতে কেবল ধনীরাই সুযোগ নিতে পারেন। জাতীয় সঞ্চয় স্কিম প্রবাসীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে বৈদেশিক রেমিট্যান্স সংগ্রহে অনুঘটকের কাজ করে। এ ছাড়া জাতীয় বাজেট অর্থায়ন, মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধ ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এসব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সঞ্চয় স্কিম ও সঞ্চয়পত্রের প্রভাব প্রত্যক্ষ। সরকারের সার্বিক ঋণ ব্যবস্থাপনার গুণগত মানোন্নয়ন, সরকারের প্রতিটি আর্থিক লেনদেনে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, জনগণকে প্রদত্ত আর্থিক সেবা উন্নত ও সহজকরণের লক্ষ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের একটি ওয়েব-ভিত্তিক স্বয়ংসম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সঞ্চয়পত্র সুবিধা যাদের প্রাপ্য, তাদের কাছে এটা পৌঁছে দিতে হলে পুরো প্রক্রিয়াটাই ডিজিটাইজড করতে হবে। এর সঙ্গে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংযুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট আয়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত। যাতে উচ্চ আয়ের মানুষ এটি কিনতে না পারে। আর উচ্চ আয়ের মানুষ চিহ্নিত করতে এনবিআরের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ