ঢাকা, শনিবার 26 May 2018, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্মৃতির সাগরে ঢেউ জাগে নিরন্তর

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : মানুষ জীবনের অনেক কিছুই ভুলে যায়। বিস্মৃত হয়। কিন্তু সবকিছু ভুলে যায় না। বিস্মৃত হতে পারে না। আমার ক্ষুদ্র জীবনেও অনেক কিছু ঘটেছে। এর সবগুলো অবশ্য মনে নেই। মনে থাকবার কথাও না। তবে কিছু কিছু ঘটনা ভোলা যায় না। স্মৃতির সাগরে ঢেউ হয়ে ভেসে ওঠে মনের মণিকোঠায় নিরন্তর। সেদিন এমনই স্মৃতিময় ঘটনা মনে করিয়ে দিলেন দু’জন।
বিষয়টা আমি প্রায় ৪৯ বছর আগ থেকে অর্থাৎ বিগত ১৯৭০ সাল থেকে ভুলেই ছিলাম। না, এটা এমন ঘটনা যা পুরোপুরি ভুলে যাবার কথা নয়। তবে আমি ইচ্ছে করেই কাজের মধ্যে ডুবে থেকে ওসব ভুলে থাকতে চাই।
যারা আলোর সন্ধান একবার পায় তারা কি আর অন্ধকার গুহায় ফিরে যেতে চায়? চায় না। আমার বিষয়টাও অনেকটা তাই। প্রায় অর্ধশতক বছর আগের কথা ভুলে যাবারই কথা। কিন্তু সুজিত সুচন্দন ও মাজহারুল ইসলাম নামে দুই সুহৃদ পুরনো স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিলেন। ধন্যবাদ তাঁদের দুজনকেই।
প্রথম জন সুজিত জানতে চেয়েছেন, আমি ঢাকায় থাকি কিনা। তিনি আমার চরণধূলি নিতে চান। অনুগ্রহ করে সময় দিলে তিনি তা গ্রহণ করে নিজেকে যেন ধন্য করতে চেয়েছেন। এমনই সবিনয় নিবেদন সুজিতের। দ্বিতীয় জন মাজহার সুজিত সুচন্দনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে জানতে চেয়ে লিখেছেন, ‘স্যার, এখনও কি পদধূলি দেন?’
বেশ। চমৎকার। তাঁরা দুজনই এমনভাবে জানতে না চাইলে হয়তো এ বিষয়টি আজ আমাকে অবতারণা করতে হতো না। তবে জনাব মাজহারের প্রশ্নটা আমার কাছে বেশ তির্যকই মনে হয়েছে।
হ্যাঁ, পদধূলি বা চরণামৃতের সঙ্গে এক সময়তো আমার সম্যক ধারণা ছিলই। কারণ পদধূলি এবং চরণামৃত দুটোই আমার ধর্মবোধ ও বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল সেসময়। এ দুইয়ের সংস্পর্শে না এলে কারুর পূর্ণতাপ্রাপ্তি হয় না। গুরুদেব বা কোনও পূজনীয় ব্যক্তির পদধূলি গৃহে পড়লে সে গৃহের বাসিন্দারা গৌরবান্বিত বোধ করেন। সেজন্যই পায়ের ধূলোর এমন কদর করা হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমাজে। অন্যকথায় একে লক্ষ্মী বললেও অত্যুক্তি হয় না। অবশ্য লক্ষ্মী শব্দটা স্ত্রীবাচক। এ সত্ত্বেও এটি পুরুষ পদের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কেন আমি জানি না।
‘চরণামৃত’ কি জিনিস তা মুসলিমসমাজের সকলের জানবার কথা নয়। তবে সংশ্লিষ্ট সমাজের প্রায় সবাই এ সম্পর্কে সম্যক অবহিত বলে আমি মনে করি। চরণামৃত (চরণ+অমৃত)। অর্থাৎ পাধোয়া জল। বাড়িতে ব্রাহ্মণঠাকুর বা গুরুমহাশয় এলে তাঁর চরণ বা পা ধুয়ে দেয়া হয় যেজল দিয়ে সেজলই চরণামৃত। এ জল ফেলে দেয়া যায় না। এ চরণামৃত অতীব পবিত্র মনে করা হয়। মাটিতে পড়লে পাপ হবে এমন ধারণা মানুষের। গুরুঠাকুর বাড়িতে এলে কাঁসার বড় থালিতে দুধ ও তুলসীপাতা মিশ্রিত জলে তাঁর শ্রীচরণ ধুয়ে দেবার নিয়ম। এরপর নতুন কাপড় বা গামছা দিয়ে ঠাকুরের পদযুগল ধৌত করে নতুন খড়ম পরতে দেয়া হয়। এ পাধোয়া জল বা চরণামৃত বাড়ির সবাই ঠোঁটেমুখে, জিহ্বা ও মাথায় ছুঁইয়ে ঠাকুর বা গুরুভক্তির প্রথা আমি প্রত্যক্ষ করেছি।
অনেকেই জানেন, শৈশবের কিছুকাল আমার মাতুলালয়ে কাটে। সেই মাতুলালয়ে আগের দিনে গুরুঠাকুর আসতো। আর ঠাকুর এলে তাঁর পদধূলি আর চরণামৃতগ্রহণ করতে হতো। বাড়ির সবাই তা গ্রহণ করে। আমি কেন বাদ যাবো? যথারীতি আমার পালা। আমাকেও তা গ্রহণের জন্য বলা হয়। কিন্তু আমি একদা বেঁকে বসি। আমি প্রশ্ন তুলি। কেন মানুষের পদধূলি নিয়ে তা মুখেঠোঁটে, জিহ্বায় আর মাথায় মাখতে হবে? ঠাকুর মানে ভগবান আর আমরা কি গরু-ছাগল নাকি? বড়মামা ভট্টরায় আমাকে বকাঝকা করেন। মারতেও উদ্যত হন একপর্যায়ে। ঠাকুর মহাশয় বলে ওঠেন, ‘ও ছোট মানুষ, থাক না। বুদ্ধি হলে ঠিক হয়ে যাবে।’ বড়মামা বলেন, ‘বড় হলে ঠিক না ছাই হবে। ওটা আমাদের কূলে ছাই দেবে। ডোবাবে সবকে।’
বলতে দ্বিধা নেই, তাদের ভাষায় বড় হয়ে আমি ওদের সত্যি সত্যি ডুবিয়েছি। কূলে কালি দিয়েছি। কেন এমন কথা বলছি, তা যারা জানেন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। তবে আমি কাউকে ডুবাইনি। ডোবাতে চাইওনি। কিন্তু তারা ওমনটি ভাবলে আমার কিছু করবার নেই। হ্যাঁ, আমি নিজেও ডুবিনি। বরং ভেসেছি বলে আমি মনে করি। আলোর সন্ধান পাওয়া মানে ডোবা নয়। ওঠা বা ভাসাই। আমি তাদের ওঠাতে না পারলেও নিজে ওঠবার চেষ্টা করেছি। এখনও করছি। পুরোপুরি ওঠা সম্ভব হবে কিনা জানি না। তবে কাজটি ঢের কঠিন।
কেবল পদধূলি আর চরণামৃতই নয়, ঠাকুর তথা মানুষের পায়ে শির ঝুঁকিয়ে পাছুঁয়ে প্রণাম করাও মানবতার অবমাননা বলে সেই শৈশবেই অনুভব করেছি। এছাড়া ঠাকুর মহাশয়ের পদধূলি অথবা চরণামৃতগ্রহণও সৃষ্টির সেরা মানুষের চরম অমর্যাদা বলেই আমার মনে হয়েছে সেই ছোটকাল থেকেই। তাই আমি বাড়িতে ঠাকুর-পুরোহিত এলে ইচ্ছে করেই সরে থাকতাম বা অজুহাত দেখিয়ে অন্যত্র অবস্থান করতাম। এজন্য অবশ্য আমার কপালে ‘লক্ষ্মীছাড়া’ অভিধা জুটেছিল সে সময় থেকেই। আমি তাই এখনও লক্ষ্মীছাড়া। চিরচঞ্চল। বাউ-ুলে। কেউ কেউ বলেন বেয়াড়া। এতে আমার ভোগান্তিও কম হয়নি। কোনও প্রমোশন হয়নি কর্মক্ষেত্রেও।
পদধূলি বা চরণামৃত যেখানে ছিল সেখানে থাকলে আমার কিছু বলবার আবশ্যক ছিল না আদৌ। আমার পূর্বপুরুষদের মনোকষ্ট হয় এমন কোনওকিছু আমি বলতে বা আলোচনা করতে চাইও না। ওরা ওদের বিশ্বাস-বোধ নিয়ে থাকতে পারেন। এতে কারুর হস্তক্ষেপ বা জোরজবরদস্তি একপ্রকার মানবাধিকারের লঙ্ঘন নিশ্চয়ই। তাই তা আমার কাম্যও নয়।
কিন্তু যে পদধূলি আর চরণামৃত প্রায় পাঁচ দশক আগে আমি ফেলে এসেছি তা যেন আমাকে আবারও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চায়। যে আলোকবর্তিকা আমাকে ঘরছাড়া করেছে, আত্মীয়স্বজনকে অনাত্মীয় বানিয়েছে, সেই আলোকবর্তিকাই যখন আলো-আঁধারিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তখন বিস্ময়ে বিমূঢ় না হয়ে পারি কি?
মনে কিছু নেবেন না। আর নিলেও আমার কিচ্ছু করবার নেই। কারণ নির্দ্বিধায় সত্য বলতেই সবকিছু ফেলে আমি এপথে পা বাড়িয়েছি। হ্যাঁ, বলছিলাম: পদধূলির ঘনঘটা এখন মুসলিমসমাজেও ছড়িয়ে পড়েছে। কদমবুসিতো একশ্রেণির মুসলিম দ্বিধাহীনভাবে করে বসেন। পীরসাহেবদের মধ্যে এটা যেন এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। মাথা নুইয়ে, পাছুঁয়ে সালাম করা আজকাল প্রায়শ চোখে পড়ে। কদমবুসি আর পদধূলিতে ফারাক নেই। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মাত্র। তফাৎ কেবল কথায়। কাজটা একই। কোনও কোনও মুসলমানতো সালাম ছেড়ে কদমবুসিরই প্রাধান্য দিচ্ছেন আজকাল। সালাম যায় যাক। কদমবুসি যাতে বাদ না পড়ে।
কনে দেখতে এসে হবু বউ যদি বরের বাবা-মাকে কদমবুসি না করে কিংবা বর কনের বাবা-মাকে পাছুঁয়ে সালাম না করে তাহলে বিয়ে ভেঙে যাবার ঘটনা ঘটছে অহরহ  মুসলিমসমাজের মধ্যেও। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে আমার জানা নেই। অথচ ইসলামের মূল কেন্দ্রভূমি মক্কা-মদিনাসহ প্রায় দেশে এ কুপ্রথা নেই। রসুলুল্লাহ (স)-এর যুগেও কদমবুসি প্রথা ছিল না। তাহলে কদমবুসির ঘেরাটোপে মুসলিমসমাজ আটকে গেল কবে থেকে?
কদমবুসি করা আর পদধূলি নেয়া একই জিনিস। বলতে পারেন, যেই লাউ সেই কদু। পীরসাহেব আর পুরোহিতঠাকুর যেমন প্রায়ই এক, তেমনই কদমবুসি করা আর পদধূলি নেয়াও একই। পদধূলি-চরণামৃত দেন ঠাকুর-পুরোহিত। গ্রহণ করেন শিষ্যরা। তেমন পদধূলিও দেন পীরসাহেবরা। কদমবুসির মাধ্যমে তা গ্রহণ করেন মুরিদরা।
এছাড়া দুর্গা আর দরগাহর মাঝেও তেমন ফারাক নেই। দুটোই ব্যবসাকেন্দ্র। দুর্গা ঘিরে থাকেন পুরোহিত। আর দরগাহ ঘিরে রাখেন পীর। পীর আর পুরোহিত। পুরোহিত এবং পীর। বেশ মিল। অনুপ্রাসসমৃদ্ধ শব্দবন্ধ। ছন্দময়ও।
পুরোহিতঠাকুররা যেমন পূজোপার্বনের নামে জনগণকে চুষে খান, তেমনই পীরসাহেবরাও মুরিদানের অর্থকড়িতে পকেট ভর্তি করেন। পুরোহিত-ঠাকুররা সাধারণত নিরামিষভোজি হন। কিন্তু পীরসাহেবরা তা নন।
 আমার ধর্ম ছেড়ে দীনাশ্রয়ের পর বেশ কয়েকজন বন্ধু খানকা বা দরগাহ কায়েম করে পীরসাহেব সাজবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এতোদিনে হয়তো গদিনসিন হয়ে থাকতে পারতাম। তাঁরাই সব করতেন। কিন্তু এসবের প্রতি আমার কোনও মোহ বা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি। বরং বিকর্ষণই সৃষ্টি হয়েছে চিরকাল।
ভাগ্যিস, বন্ধুদের পরামর্শে মাযার কায়েম করে বসিনি। এমন করলে নিশ্চয়ই কদমবুসি নিতে নিতে আর পদধূলি বা চরণামৃত দিতে দিতে আমার জীবনটা আরেক তমসায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতো নির্ঘাত। এমন প্রচেষ্টা এখনও কেউ করছেন না তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মনে হয় আমি আবারও বুঝি সেই ফেলে আসা চরণধুলোর মায়ামোহে আটকে যাচ্ছি। তবে যে কালেমা তাইয়েবার শাশ্বত বাণী আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে সেখানে কোনও আলো-আঁধারীর মায়াজাল নেই। নেই কোনও পিছুটান। সেখানে রয়েছে চিরসত্য ও সনাতনের অম্লান অবিনাশী আহ্বান।
যাই হোক, যে সুজিত চন্দন সাক্ষাত প্রার্থনা করে আমার চরণধূলি নিতে চেয়েছিলেন সেই সুজিত এখন পবিত্র কালেমার দাঈ অর্থাৎ সত্য দীনের দাওয়াত প্রদানকারী। মহান দীনের আলো বিলাচ্ছেন অনেকের মাঝে। তাই সুজিতের চাইতে সৌভাগ্যবান আর কে? সম্ভবত সুজিতের বাবাও এখন ওর নিয়ন্ত্রণে। উল্লেখ্য, আমাকে প্রায়শ দাওয়াত দেয়া হয় তাঁর মজলিসে। কিন্তু আমার সে সুযোগ এখনও হয়নি। তবে তাঁকে নিয়ে আমার একটা দুর্ভাবনা আছে। সেটি হচ্ছে সুজিতকে কোনও বিভ্রান্তিতে পেয়ে বসে কিনা কে জানে! আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন ওকে হেফাজত করুন। এই দু’আ আমি সবসময় করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ