ঢাকা, রোববার 27 May 2018, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১০ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জন্ম বার্ষিকীতে জাতীয় কবির প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলা মাদক বিরোধী অভিযানে ১১ দিনেই নিহত ৬৩

আজ শনিবারের পত্রপত্রিকার খবরে প্রকাশ, গত ২৪ ঘন্টায় মাদক বিরোধী অভিযানে আরও ১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এই নিয়ে গত ১১ দিনে এই অভিযানে ৬৩ জনকে হত্যা করা হলো। অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ৬ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এটি একটি লোমহর্ষক খবর। খবরগুলো পড়লে ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যায়। সরকারের এক শ্রেণীর মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের এক শ্রেণীর নেতা বলছেন যে, মাদক বিরোধী অভিযানে জনগণ নাকি খুশি। তাই তারা বলছেন যে, এই অভিযান চলবে এবং যারাই এর সাথে জড়িত তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।
এসব কথা শুনে একটু পেছনে যেতে হয়। বিএনপি আমলে ২০০৩ সালের ১৬ই অক্টোবর থেকে ২০০৪ সালের ৯ই জানুয়ারি দাগি অপরাধীদের নির্মূল/ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য “অপারেশন ক্লিন হার্ট ” নামের একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানে ২ মাস ২৫ দিনে ৫৭ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। অথচ, এবার মাত্র ১১দিনে ৬৩ ব্যক্তি বিচার বহির্ভূত হত্যা কান্ডের শিকার হয়েছে। অপারেশন ক্লিন হার্টে যে ৫৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছে সেই ৫৭ ব্যক্তির মধ্যে একজনও রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। সকলেই ছিল দাগি অপরাধী (Hardened Criminal)। জনগণও এদের নির্মূলে খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, সিপিবি এবং এসব ঘরানার লোকজন এসব হত্যাকান্ড নিয়ে প্রচন্ড শোরগোল তোলেন (Huge outcry)। তাদের যুক্তি ছিল, ওরা অপরাধী হোক আর যাই হোক, বিনা বিচারে এভাবে তাদেরকে হত্যা করা চলবে না। এসব হত্যাকান্ডকেই বলা হয় বিচার বহির্ভূত হত্যা (Extra Judicial Killing)। তারা আরও অভিযোগ করেন যে, এদেরকে হত্যা করার জন্য বন্দুক যুদ্ধ (Gun Fight) বা ক্রস ফায়ারের গল্প সাজানো হচ্ছে। তারা দাবি তোলেন, হত্যা না করে এদের গ্রেফতার করা হোক, তাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হোক। দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হোক এবং নির্দোষ হলে ছেড়ে দেয়া হোক।
সেদিন একমাত্র বিএনপি ছাড়া সমস্ত বিরোধী দল ঐ দাবি সমর্থন করে। অবশেষে তৎকালীন বিরোধী দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ এবং তাদের অনুসারীদের প্রবল চাপে সরকার অপারেশন ক্লিন হার্ট অভিযান ২০০৪ সালের ৯ই জানুয়ারি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
আজ টেবিল উল্টে গেছে। এখন সরকারে আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দলে বিএনপি। সেদিন অভিযান ছিল দাগি অপরাধীদের বিরুদ্ধে, আজ অভিযান মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। সেদিনের মতোই আজও বন্দুক যুদ্ধ, ক্রস ফায়ার ইত্যাদি ঘটনা এবং ১১ দিনে ৬৩ জনের মৃত্যু। সেদিনও বলা হয়েছিল যে জনগণ খুশি। আজও বলা হচ্ছে যে জনগণ খুশি। কিন্তু সেদিন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বলে যে প্রবল সমালোচনা উঠেছিল এবং ক্রস ফায়ারে মারার আগে বিচারের যে দাবি সোচ্চার হয়েছিল আজ এই ৬৩ টি হত্যাকান্ডে বিচারের দাবি তেমন সোচ্চার নয়। আজ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে সমালোচনা তেমন উচ্চকন্ঠ নয়। কারণ সেদিন বিরোধী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ যে শোরগোল তুলতে সমর্থ হয়েছিল আজ বিএনপি বিরোধী দল হিসাবে সেরকম প্রবল প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সেদিনও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছিল, আজও লঙ্ঘিত হচ্ছে। সেদিনও সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হয়েছিল, আজও একই অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সেদিন এই মর্মে সমালোচনা করা হয়েছিল যে, দাগি অপরাধীদের নামে চুনোপুঁটিদের মারা হচ্ছে, কিন্তু রুই কাতলাদের ধরা হচ্ছে না। আজও চুনোপুঁটিরা মারা যাচ্ছে, কিন্তু বদি এমপি এবং আমিন হুদার মতো ইয়াবা সম্রাটরা কখনো জেলে বা কখনো হাসপাতালে আজও আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন। দেশে সব সময় আইনের শাসনের ললিত বাণী উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু প্রতিপদে আইনের শাসন পদদলিত হয়।
তাই আমার দাবি, মাদক ব্যবসায়ে জড়িত রাঘব বোয়ালদেরকেও আইনের আওতায় আনা হোক। বদি বা আমিন হুদারাও যেন আইনের সীমানার আওতায় আসে। তাই বলে তাদের ক্ষেত্রেও আমি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষে নই। আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হোক। তাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হোক। অনুরূপভাবে যেসব চুনোপুঁটি মাঠে আছে এবং বন্দুক যুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছে তাদেরকেও আইন ও বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি করছি।
মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে, এই অভিযান চলতে থাকবে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। কত দিন চলবে সে সম্পর্কে তিনি কোনো টাইম ফ্রেম দেননি। শনিবার রাত পর্যন্ত ৬৩ জন নিহত হয়েছে। এর শেষ কোথায় আমরা কেউ জানি না। তাই আজকে এ সম্পর্কে আর কোনো কথা বলবো না। আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত দেখা যাক, কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আজ বরং নজরুল জয়ন্তী পালন সম্পর্কে দুটো কথা বলা যাক।
॥দুই॥
গত শুক্রবার বিদ্রোহী কবি এবং জাতীয় কবি নজরুলের জন্ম বার্ষিকী পালিত হলো নীরবে, সন্তর্পণে। পশ্চিমে যখন কোনো জাতীয় বীর (ওদের ভাষায় হিরো) অবহেলায় ও অনাদরে নীরবে ও নিঃশব্দে মহাকালের পথে যাত্রা শুরু করেন তখন তাকে ইংরেজিতে বলে Unsung Hero. যিনি আমাদের জাতীয় কবি, যাকে এদেশের ১৬ কোটি লোক মাথার মনি করে রেখেছে তার জন্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী এমন Unsung Hero এর মতো নীরবে নিঃশব্দে আসবে এবং চলে যাবে, সেটা এদেশের মানুষ কোনো দিন কি ভাবতে পেরেছেন? কিন্তু তাও তো আমাদের শুধু ভাবতে পারা নয়, রীতি মতো দেখতেও হলো। আমি কোনো দিন বিখ্যাত ব্যক্তিদের তুলনামূলক মূল্যায়ন করি না। আজও করছি না। বাংলা সাহিত্যের সুনীল আকাশে দুই উজ্জ্বল জোতিষ্ক হলেন রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল। তাদের দুজনের কোনে তুলনা চলে না। রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথই। নজরুল নজরুলই। একটি সময় ছিল যখন এই উভয় কবির জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী সমান মর্যাদায় সমান জাক জমকের সাথে পালন করা হতো। কিন্তু এখন সেদিন বদলে গেছে। আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার সাথে নজরুল জাতীয় কবি হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র জাতীয় ফোকাসটি প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ওপর। রবীন্দ্রনাথকে যেরকম হাইলাইট করা হচ্ছে সেই রকমই মলিন এবং নিষ্প্রভ করে দেয়া হচ্ছে কবি নজরুলকে। অথচ তিনি আমাদের জাতীয় কবি। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তার জন্মদিন সাদামাটাভাবে পালন করা হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস জাতীয় পর্যায়ে পালন করা হয়। রবীন্দ্র জয়ন্তীতে এখন জাতীয় পর্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথকে, আমাদের সংস্কৃতির ‘প্রধান স্তম্ভ’, ‘সংস্কৃতিচর্চার প্রেরণা’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথকে আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে বাঁচিয়ে রাখতে হবে’ ইত্যাকার উক্তি করা হয়। রবীন্দ্র জন্ম বা মৃত্যু বার্ষিকীতে বেছে বেছে আওয়ামী বা সিপিবি ঘরানার বুদ্ধিজীবীগণকে বক্তা হিসাবে দাওয়াত করা হয়। অতীতে গাজীউল হক থেকে শুরু করে সন্তোষ গুপ্তকেও বিশেষ অতিথি বানানো হয়েছে। তাদের মতে ‘রবীন্দ্রনাথ যে বাংলাকে দেখতে চেয়েছেন সেই সোনার বাংলাতেই আমরা বাস করছি। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মতে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের তাত্ত্বিক অধিনায়ক।
রবীন্দ্রনাথকে যেসব বিশেষণে বিভূষিত করা হয় ওগুলো সঠিক হলে জাতীয় কবি হিসেবে নজরুলের প্রয়োজন কি আর থাকে? যিনি চেতনা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, অস্তিত্ব প্রভুতির প্রতিভূ বা প্রতীক তিনিই তো জাতীয় কবি হওয়ার যোগ্য। সেই সাথে আমাদের রাষ্ট্রিক ব্যাপারটিও জড়িত। কারণ, ওরা বলেছেন, যে বাংলাদেশে আমরা বাস করছি, ওটাই নাকি রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা। নজরুলকে জাতীয় কবির সম্মান দিয়ে কোনো ভুল কাজ করা হয়নি। বরং সঠিক কাজটিই করা হয়েছে। তিনি পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ‘পূর্ববঙ্গকে দেখতে পেয়েছিলেন, যা আজ বাংলাদেশ নামে স্বাধীন সত্তায় আবির্ভূত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলার দ্ব্যর্থকতা নয় খন্ডিত বাংলার পূর্বাঞ্চল, পূর্ব বাংলা। এর নমুনা এই নীচের গান:
পদ্মা মেঘনা বুড়িগঙ্গা বিধৌত
পূর্ব দিগন্তে
তরুণ অরুণ বীণা বাজে
তিমির বিভাবরী অন্তে
উর্মিছন্দা শত নদী স্রোতধারায়
নিত্য পবিত্র সিনান শুব্ধ পূরববঙ্গ
ঘন বন কুন্তলা প্রকৃতির বক্ষে
সরণ সৌম্য শক্তি প্রযুদ্ধ পূরববঙ্গ।
কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী রচনায় বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ জন মানুষের কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। ক্ষণজন্মা নজরুলের অমর লেখনীতে আমাদের শুধু অতীতই নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনাও পাওয়া যায়। তাই তিনি জাতীয় কবি হিসেবে আদৃত হয়েছেন।
॥তিন॥
নজরুল তাঁর সাহিত্য জীবনে হিন্দুদের সহযোগিতা তেমন পাননি। তাঁর অধিকাংশ লেখাই মুসলমান মালিকানাধীন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’, মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিনের ‘মাসিক সওগাত’, কবি মোজাম্মেল হকের ‘মোসলেম ভারত’, কবি আব্দুল কাদিরের ‘জয়ন্তী’, শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুক হকের দৈনিক ‘নবযুগ’ প্রভৃতি। এছাড়াও ‘দৈনিক সেবক’, ‘ধুমকেতু’, ‘নওরোজ’, ‘ধুপছায়া’ প্রভৃতি পত্রিকাতেও তার রচনা প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ সালে কবি বাকরুদ্ধ হন। কিন্তু ১৯৫২ সাল অর্থাৎ দশ বছর পর্যন্ত কবির কোন চিকিৎসা হয়নি। কেন হয়নি? অথচ ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয়। পন্ডিত নেহ্রু প্রধানমন্ত্রী হন। তারপরেও ৫ বছর কোনো চিকিৎসা হয়নি কেনো? শুধুই মুসলমান বলে, তাই নয় কি?
তাঁর দুয়ার অবারিত এবং গীত, নাত, গজল, কাওয়ালী ও কাজরীকে আলিঙ্গন করে হয়েছে আরও সমৃদ্ধ আরও অনুরনিত। নাত, গজল, কাওয়ালী, খেয়াল, ঠুমরি, কাজরী এগুলোই হলো আমাদের সংস্কৃতির স্তম্ভ, সংস্কৃতির প্রেরণা এবং আমাদের ঐতিহ্যিক অস্তিত্ব। এগুলোর মশাল বরদার হলেন নজরুল ইসলাম। তাই তিনি আমাদের জাতীয় কবি। নজরুলে পবিরর্তন, ইসলামী গান ও শ্যামাসঙ্গীত থেকে দেখা যায় যে কবি নজরুল, শিল্পী নজরুলের কলমের আঁচড়ে ইসলাম ও হিন্দু উভয় ধর্মই মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এমনি একটি দুটি নয়, ৫৪০টি শ্যামাসঙ্গীতে তিনি হিন্দু ধর্মকে বাঙ্গময় করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে হাজার কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন তার মধ্যে কি অন্তত ৫টি কবিতা, গান বা গল্প আছে যেখানে পবিত্র ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা আছে?
পরিমার্জন ও নতুনের প্রবাহ সতত সঞ্চারমান। বাংলাদেশের সংস্কৃতির অঙ্গনে কয়েকটি পেটেন্ট শব্দ অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। এগুলো হলো ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও মৌলবাদ ইত্যাদি। এই নিরিখে রবীন্দ্রচর্চা হল প্রগতিবাদ অসাম্প্রদায়িক। পক্ষান্তরে নজরুল হলেন সাম্প্রদায়িক। ইতিহাসকে সঠিকভাবে উপস্থাপনের জন্য কয়েকটি রেফারেন্স ও তথ্য দেয়া এখানে আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে যে, নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন মুসলমান। একজন মুসলমান হয়ে এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী তিনি ইসলামী সঙ্গীত রচনা করেছেন মাত্র ১৯৪টি। পক্ষান্তরে নজরুলের শ্যামা সঙ্গীত বা ভক্তিমূলক গানের সংখ্যা ৫৪০টি। অর্থাৎ নিজে মুসলমান হলেও ইসলাম, আল-কোরআন ও রাসুলের প্রশংসা করে লিখেছেন ১৯৪টি গান। আর হিন্দু ধর্ম ও তাদের দেব দেবীদের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে লিখেছেন ৫৪০টি গান। এমন ধর্মীয় উদারতা আর কারো মাঝে দেখা যায় কি? কিন্তু নজরুলের রচনায় আমরা আমাদের নিজস্ব পরিচয় খুঁেজ পাই। এই পরিচয় শুধু ভৌগোলিক নয়, অনেক আদি ও অকৃত্রিম। কোটি বছরের পুরাতন পরিচয়। সৃষ্টির শুরুতে আমাদের যে পরিচয় ছিল সেই পরিচয়, যখন তিনি বলেন :
এক আদমের সন্তান মোরা
নাহি দেশকাল ধর্মভিমান
নাহি ব্যবধান নীচ সুজন,
নিখিলের মাঝে আমরা এক জীবন
শেষের আশীয় আমরা নিয়ন্তার
খুলিতে এসেছি সকল বন্ধ দ্বার।
এই ‘এক আদমের সন্তান’ হয়েই আমরাই দুনিয়াতে আসি। তারপর দুনিয়ায় বংশবৃদ্ধির সাথে সাথে ভৌগোলিক পরিচয় শুরু হয়। কিন্তু ভৌগোলিক পরিচয় আদি পরিচয় মুছতে পারে না। কিন্তু সেই ভৌগোলিক ইতিহাস এবং স্বাধীনতার রবিকে অস্তমিত করাকেও কবি যথার্থ চিহ্নিত করেছেন :
হায় পলাশী
এঁকে দিলি তুই জননীর বুকে
কলঙ্ক কালিমা রাশি
হায় পলাশী !
এসব কারণেই নজরুল যথার্থই বাংলাদেশের জাতীয় কবি। অথচ সেই জাতীয় কবিকে যখন ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা এবং অনাদর করা হয় তখন আমাদের জাতীয় শিকড় এবং জাতীয় সত্বাকেই অনাদর এবং উপেক্ষা করা হয়। যে জাতি তার উৎস এবং অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে সেই জাতি আর যাই হোক, উন্নত জাতি হিসাবে দাবি করতে পারে না।
asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ