ঢাকা, রোববার 27 May 2018, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১০ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভালো ইমেজ গড়ার আশাবাদ ভূ-রাজনীতির নির্মম শিকার পাকিস্তানের

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, পাকিস্তান থেকে ফিরে : [শেষ কিস্তি]
পাকিস্তানের জনবহুল শহর করাচি। দেশটির মোট অর্থনীতির ৫০ শতাংশের বেশি যোগান দেয় এই শহর। বিশ্বের প্রায় সব বর্ণের-জাতের মানুষের নাকি দেখা মেলে করাচির সৈকতে। তাই করাচির জীবন ধারা সমগ্র পাকিস্তান থেকে একটু ভিন্নই বলা চলে। এখানকার সবচেয়ে বড় মার্কেটটিতে রাত তিনটা পর্যন্ত লেগে থাকে মানুষের ভিড়। এককোণে চলে খাবারের দোকানে জমজমাট আড্ডা আর অন্যকোণে মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হলে দর্শকের হর্ষধ্বনি। রাতে কি দিনে সড়কের প্রায় পুরো অংশ জুড়েই থাকে মোটর সাইকেলের রাজত্ব। সকালে অফিস সময়ে হাজার হাজার মোটর সাইকেল দেখা যায়। গাড়ি পার্কিংয়ের বড় অংশ থাকে মোটর সাইকেলের দখলে। এখানকার পোশাক পরিচ্ছদও যেন ভিন্ন রকমের। যে যার মতো পরিধান করছে। এটি নির্দিষ্ট কোনো দিনের চিত্র নয়। বরং করাচির তরুণ-মধ্য বয়সীদের নৈমিত্তিক জীবন ধারার অংশ। এটিই তাদের অহংকার। করাচির ন্যায় পুরো পাকিস্তানই তালেবান সমস্যা কাটিয়ে এখন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের আশা, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান হামলাসহ সব ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা থেকে মুক্তি পাবে পাকিস্তান। সরকারের কাছে পাকিস্তানের জনগণের আশা অনেক। তারা মনে করে, সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনবে। যাতে পাকিস্তানে অস্থিরতা কমে আসবে। বিশ্বে পাকিস্তানের ভালো ইমেজ গড়ে উঠবে। আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে পাকিস্তান।
গত ১৯ মার্চ পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ থেকে দশ সদস্যের একটি সাংবাদিক টিম দেশটিতে যায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ার পর আমাদের প্রথম দেখানো হয় করাচির বিভিন্ন পর্যটন স্পট। করাচি শুধু দেশটির বন্দর নগরীই নয়। এটির সাথে জড়িত আছে পাকিস্তানের ইতিহাস-্ঐতিহ্যও।  এটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী। জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে হোটেলে যাবার পথে ঢাকার সাথে কিছুটা মিল পাওয়া যায় এ্খানে। সেটি হচ্ছে যানজট। তবে সেটির ঢাকার মতো দীর্ঘ নয়। করাচির রাস্তায় আমাদের দেশের লক্কর-ঝক্কর বাস, টেম্পু, বা অন্য যানবাহন দেখা যায়নি। রাস্তাজুড়ে শুধু যেন মোটর বাইকেরই রাজত্ব। মাঝেমাঝে দু একটি বাস দেখা গেলেও সেগুলো বাহারি ফুলের মালা দিয়ে সাজানো। যেন একটি বিয়ে বাড়ির ডেকারেশন। ঢাকার রাস্তার ফুটপাত দখলে থাকলেও করাচিতে তেমনটি দেখা যায়নি। আমাদের গাড়িতে থাকা অন্য সাংবাদিকরাও বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা করেন। সবাই বলেন, করাচি নাকি পাকিস্তানের সবচেয়ে নোংরা শহর। এখানে জনবসতি খুব বেশী। অথচ এটিও অনেক গোছানো।
কয়েকদিনের সফরে দেখেছি, পাকিস্তানের মানুষ খেতে খুব পছন্দ করে। বড় বড় শপিং মল শুধু নয়, মাঝ রাত পর্যন্ত রাস্তার পাশের রেস্তোরাঁগুলোতে লেগে থাকে চোখে পড়ার মতো ভিড়। মুখরোচক খাবারের স্বাদ নিতে পাকিস্তানীরা ঘরমুখো না হয়ে ভিড় করে এসব রেস্তোরাঁয়। এখানকার সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। রাজনৈতিক কোন্দল, মাঝে মাঝে বিকট আওয়াজ তাদের এ জীবনধারাকে ব্যাহত করলেও পাকিস্তানীদের স্বাভাবিক জীবনধারার বাইরে রাখতে পারেনি। নিরাপত্তার জন্য বড় শপিংমল বা রেস্তোরাঁর সামনে অস্ত্র হাতে নিরাপত্তারক্ষীদের অবস্থান সবসময় চোখে পড়লেও জনগণকে দেখলে কখনোই মনে হয় না তাদের মধ্যে উৎকণ্ঠা আছে। আর জনগণের স্বাভাবিক জীবনধারা বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। কিন্তু পরমাণু শক্তিধর দেশে বিদ্যুৎ্ সংকট বেশ। যার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমতে থাকায় দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে দেশটির অর্থনীতি। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি, ঘন ঘন তালেবান হামলা আর মার্কিন ড্রোন হামলার ঘটনায় দেশটির ভবিষ্যত্ নিয়ে প্রায়ই আশঙ্কার কথা বলছে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। যে কারণে বিশ্বের কাছে পাকিস্তান পেয়েছে আরেক নতুন পরিচিতি। সেটা হলো পাকিস্তান এখন ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ! তবে দীর্ঘদিন এমনটি বলার কারণে এখন এই অভিযোগটা হালে পানি পাচ্ছেনা। কয়েক বছর আগেও বিদেশি পর্যটক তেমন দেখা যেতনা। তবে এখন অবস্থা পাল্টাচ্ছে। বিদেশীদের হাঁক-ডাকে আবারো কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠছে পাকিস্তানের পর্যটন এলাকাগুলো। পাকিস্তানের প্রধান জনবহুল প্রদেশ সিন্ধু ও পাঞ্জাব। এই দুই প্রদেশে তালেবান হামলার হুমকি কমই। রাজধানী ইসলামাবাদও নিñিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। অন্যান্য শহরগুলোতে এখন আর আগের অবস্থা নেই। মাঝে মাঝে হামলা হলেও সেগুলো সীমান্ত এলাকায়।
পাকিস্তানের বেশিরভাগ এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও গণমাধ্যমের সৃষ্ট ধারণায় আজ গোটা পাকিস্তানই যেন অনিরাপদ। বলা হচ্ছে, এজন্য ধর্মান্ধতা, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, পশ্চাৎপদতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এসবই দায়ী। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর তৈরি করা ধারণা কি সবটাই সত্যি? পাকিস্তানের অবস্থা সত্যিই কি এতটা শোচনীয়? ২০ কোটি মানুষের দেশটি কি সত্যিই এতটা ঝুঁকিপূর্ণ? নাকি আফগানিস্তানে মার্কিন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকার জন্য পাকিস্তানকে এ মাশুল দিতে হচ্ছে? আবার কারো কারো মতে,ভারতের সাথে দেশটির বৈরীতার কারণই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামান্য বিষয়ে বড় করে নেগেটিভ প্রচারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূ-রাজনীতির নির্মম বাস্তবতার শিকার আজকের পাকিস্তান। পাকিস্তানে তালেবানদের উৎপাত আছে তবে সেটা সীমান্তবর্তী এলাকায়। জনবহুল এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ভালো। অনেকে মনে করেন, বিশ্বে পাকিস্তান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরিতে পশ্চিমা গণমাধ্যমেরই বড় দায় রয়েছে। এ বিষয়ে কি ভাবছে পাকিস্তান সরকার। বাংলাদেশী মিডিয়া টিমের সাথে আলাপচারিতায় ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব তাহমিনা জেনজুয়া বলেন, পাকিস্তানে যা ঘটছে তা প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, তাহলে তাদের গুলো সেভাবে প্রচার হয়না কেন? জানজুয়া বলেন, প্রতিবেশী একটি দেশসহ পশ্চিমা অনেক দেশই পাকিস্তানের উন্নতি সহ্য করতে পারেনা। তারা যেকোনো ভাবে পাকিস্তানকে দমিয়ে রাখতে চায়। এজন্য তারা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মিডিয়াতে খরচ করছে। টাকার বিনিময়ে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামান্য কিছুতে ফলাও করে প্রচারের ব্যবস্থা করে। অথচ যারা এসব করছে তাদের দেশে এর থেকেও বড় হামলার ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন আর এসব বিশ্বাস করেনা। তারা মনে করে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এসব করানো হচ্ছে।
গত ২৩ মার্চ আলাপচারিতায় পাকিস্তান নিয়ে নেগেটিভ প্রচারণাই বেশী হচ্ছে মন্তব্য করে দুনিয়া মিডিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাভিদ কাশিপ বলেন, বর্তমানে পাকিস্তান নেগেটিভ প্রচারণার শিকার হচ্ছে বেশী। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে দমিয়ে রাখতে প্রতিবেশী একটি দেশসহ বেশকিছু দেশ বেশ সোচ্চার রয়েছে। তাদের দেশে হরহামেশা বড়বড় হামলার ঘটনা ঘটলেও সেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। সেগুলো কোথাও প্রচারও হয়না। কিন্তু পাকিস্তানে সামান্য কিছু হলেও সেটিকে নেগেটিভভাবে প্রচার করা হয়। তিনি জানান, পাকিস্তানের জনগণ সবসময়ই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। এখানকার সবাই অনেক বেশী আধুনিক ও শিক্ষিত। পাকিস্তান তার কাংখিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। তার দেশের বিচারবিভাগ এবং মিডিয়া স্বাধীনভাবেই কাজ করছে তিনি জানান।
পাকিস্তান এখন শিক্ষার দিক দিয়েও অনেক এগিয়ে। লাহোর ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে অধ্যায়নরত বাংলাদেশী ছাত্র শিমুল জানান, এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক ভালো। তিনি স্কলারশীপ নিয়ে এখানে পড়তে এসেছেন বলে জানান। ২০১২ সালে তিনি পাকিস্তানের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বলে জানান। দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থাও অনেক এগিয়ে গেছে বলে জানান পাকিস্তানে অবস্থানরত বাংলাদেশী চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, পাকিস্তানের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক আধুনিক এবং স্বল্প ব্যয়ী। এখানকার জনগণ বড়ধরণের সমস্যা না হলে দেশেই চিকিৎসা নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কথা হয় দেশটির তরুণ প্রজন্মের সাথে। তারা বলছে, পাকিস্তান নেগেটিভ প্রচারণার শিকার। তারা এমনটি দেখতে চাননা। তারা চান পাকিস্তানের ইমেজ বৃদ্ধি হোক। বিদেশীরা দেশটিতে আসুক। তারাও সব দেশে যেতে চান। 
আলোচনায় জানা গেছে, পশ্চাৎপদতা নয়, পাকিস্তানেই এখন বিশ্ব মানের শিক্ষাব্যবস্থা আছে। লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। যেখানে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিনা খরচে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে থাকে। আগামী দিনের পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেবে এ রকম আরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবীরা, যারা আধুনিক মনস্ক হয়ে আধুনিক পাকিস্তান গড়বে। পাকিস্তানের নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে সমান তালে। করাচি এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে নারী অফিসার সহজেই চোখে পড়ে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সড়কের টোল উত্তোলন থেকে শুরু করে নানা পেশায় পাকিস্তানি নারীদের বিচরণ লক্ষণীয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ