ঢাকা, রোববার 27 May 2018, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১০ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সংস্কারের অভাবে মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর উজ্জ্বল এ নিদর্শন হারিয়ে যেতে বসেছে

রানা: মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর উজ্জ্বল নিদর্শন ঐতিহাসিক তেতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ। সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলা সদরের দক্ষিণে তেতুলিয়া গ্রামে প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরাতন মসজিদ এটি। বর্তমানে অযত্ন আর অবহেলায় ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটির সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। শীঘ্রই এর সংস্কার না করলে ঐতিহ্যবাহী  এই মসজিদ কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করছে মুসল্লীরা।
মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন তেঁতুলিয়া মসজিদ। যা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে মিয়ার মসজিদ নামেই পরিচিত। তবে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘খান বাহাদুর কাজী সালামত উল্লাহ জামে মসজিদ’ নামে। যিনি এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন । প্রতিষ্ঠাতা জমিদার কাজী সালামত উল্লাহ মোঘল আমলে (১৮শতকের প্রথমে) এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের সাথেই রয়েছে বিশাল আকারের পুকুর, যার আয়তন প্রায় দুই একর।
মসজিদটিতে সাতটি দরজা রয়েছে। প্রতিটি দরজার উচ্চতা ৯ ফুট এবং প্রস্থ ৪ ফুট। ১০ বর্গফুট বেড় বিশিষ্ট ১২ টি পিলারের উপর মসজিদের ছাদ নির্মিত। চুনসুরকি ও চিটাগুড়ের গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটিতে ১৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ৬ টি বড় গম্বুজ এবং ৮ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ১৪ টি মিনার রয়েছে। ২৫ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট চার কোনে চারটি মিনার। মসজিদের ভিতরে ৫টি সারিতে ৩২৫ জন ও মসজিদের বাইরের চত্বরে ১৭৫ জন মুসল্লী একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। ১৯৮৭ সালে মসজিদটি বাংলাদেশের সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে গ্রহণ করেন। মসজিদের বারান্দায় একেবারে পূর্ব কোণে একটা সিঁড়ি রয়েছে এবং এর মাথায় রয়েছে ছোট একটি চৌকণাকৃতির জায়গা।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে অযত্ন আর অবহেলায় ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটির সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। ৭ টি মিনার ভেঙে পড়ার উপক্রম। মসজিদের বাউন্ডারি এলাকায় বহু অজানা ব্যক্তিদের কবরের চিহ্ন থাকলেও সেগুলো অরক্ষিত। মসজিদটির ফ্লোরে ও পশ্চিম পাশের দেয়ালের উপরের অংশে ফাটল ধরেছে। অতিদ্রুত যদি সংস্কার করা না হয় তবে, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্বাক্ষী তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ (মিয়ার মসজিদটি) কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে। তারা জানান, এই মসজিদটি দেখতে আসার সহজ পথ হলো সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের নোয়াপাড়া বাজারে নেমে ভ্যানযোগে তিন কিলোমিটার পূর্ব দিকে তেতুলিয়া বাজার অথবা সাতক্ষীরা -খুলনা মহাসড়কের আঠারমাইল বাজারে নেমে বাস অথবা ভ্যানে চার কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে ঐতিহাসিক তেতুলিয়া শাহী জামে মসজিদটি। মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর উজ্জ্বল নিদর্শনটি দেখতে অনেকেই আসেন এখানে। আগতদেরকে এলাকার মুসল্লীরা সব ঘুরে ঘুরে দেখান।
স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ রফিকুল ইসলাম জানান, মসজিদের বারান্দায় একেবারে পূর্ব কোণের মাথায় রয়েছে ছোট একটি চৌকণাকৃতির এই স্থানটিতে উঠে আযান দেয়া হত, যখন মাইক ছিলনা। মাইক আসার পর আযানের সেই পদ্ধতি আর নেই। বর্তমানে সেই স্থানটিতে মাইক বসানো হয়েছে।
মসজিদের মুসল্লী মো: তৌফিকুল ইসলাম জানান, মসজিদের পরিচালনা কমিটি থাকলেও মসজিদের সংষ্কার ও অন্য কাজ কার কমিটির এখতিয়ার নাই ফলে উন্নয়নের কাজ ব্যহত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষ দ্রুত সংষ্কার করবে বলে আশা করেন।
অপর মুসুল্লি সৈয়দ ইকরাম হোসেন বলেন, আসন্ন মাহে রমজান ইফতার , তারাবিহ নামাজের স্থান সংকুলন । মসজিদের বাহিরে যে বারান্দা আছে সেখানে সব মুসুল্লি একত্রে ইফতার তারাবিহ’র নামাজ আদায় করতে পারে না। মসজিদের জায়গা থাকতে ও কাজ করছে না কর্তৃপক্ষ । মসজিদের মাত্র ২ টা প্রসাবখানা থাকায় নামাজের সময় মুসুল্লিদের ভিড়ে সেটা সংকুলন হয় না। অজুখানা বাড়ানের পাশাপাশি টাইলস দিয়ে সুন্দর করার প্রয়োজন ।
মসজিদের মুয়াজ্জিন মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, দীর্ঘ দায়িত্ব পালন করছে  জানি সরকার মসজিদটি দায়িত্ব গ্রহন করেছে কিন্তু আমার এ পর্যন্ত কোন বেতন ভাতা পাইনি, সরকারি ভাবে বেতন ভাতা পেলে ভাল হত।  মসজিদ থেকে বাড়ী দুরে হওয়ায় ঝড় বৃষ্টির মধ্যে দায়িত্ব পালন করে থাকি । মসজিদের ভিতরে থাকার আবাস থাকলে ভাল হত। মসজিদের ইমাম মুফতি হাফেজ মাওলানা হারুন অর রশীদ জানান, মসজিদটি বহু পুরাতন সরকার ইতোমধ্যে  প্রতœতত্ম অধিদপ্তর প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে গ্রহণ করেছে, কর্তৃপক্ষের অনেক কর্মকর্তা এসে দেখে গেছেন , সংষ্কারের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান এখন ও পর্যন্ত উন্নয়নের ছোয়া পড়েনি । মসজিদের গুম্বুজ এর কয়েকটে ফাটল দেখা দিয়েছে এ অবস্থায় মুসল্লীরা মসজিদের ভিতরে ইবাদত করে থাকে।  এ ব্যাপারে খুলনা বিভাগীয় প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, আমরা সম্প্রতি মসজিদটি পরিদর্শন করেছি। ইতোপূর্বে মসজিদের সংস্কার সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, মসজিদটির নিয়মিত পরিষ্কার পরিছন্নতা ও দৈনন্দিন পরিচর্যার জন্য একজন দৈনিক শ্রমিককে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এর প্রয়োজনীয় সংস্কার সংরক্ষণ কাজের পরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে তিনি বলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ