ঢাকা, সোমবার 28 May 2018, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এবারও বাস্তবায়ন অযোগ্যতা ঝুঁকিতে অর্থ ব্যবস্থাপনা

এইচ এম আকতার : বাস্তবায়ন অযোগ্যতায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের কাটছাট হচ্ছে। আয় আর ব্যয়ে সামঞ্জস্য করতে না পেরে বছর শেষে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করা হচ্ছে বাজেট থেকে, যা এ যাবৎকাল সর্বোচ্চ। এর ফলে বাজেট ৪ লাখ কোটি থেকে নতুন আকার নেমে আসছে ৩ লাখ ৭১ হাজার কোটিতে। যা চূড়ান্ত হতে পারে শিগগিরই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছরই বাজেটে এ ধরনের কাটছাঁট ঝুঁকি বাড়ায় আর্থিক শৃঙ্খলার। তাই, সক্ষমতা বিবেচনা করেই আকার আয়তন চূড়ান্ত করা উচিত। আর পরিকল্পনা কমিশন বলছে, আগামী বাজেট থেকে আর সংশোধনের দরকার পড়বে না। শতভাগই বাস্তবায়ন করা যাবে।
বাজেট দেয়ার পর প্রতিবছরই বাস্তবায়ন অদক্ষতায় ছেঁটে ফেলতে হয় বড় অঙ্কের অর্থ। ২০১৩-১৪ থেকে পরের তিন অর্থবছরের বিশ্লেষণ বলছে, প্রস্তাবিত এবং প্রকৃত বাজেটের ব্যবধান বেড়েছে প্রতি বছরই। অর্থাৎ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০০ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে খরচ করা গেছে সাড়ে ৮৪ টাকা। যা ১৫-১৬ তে নেমেছে ৮০ টাকায়। যে পথে হাঁটছে চলতি বাজেটও। এ বছর ৮০ ভাগের বেশি বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
সরকারের সবশেষ তথ্য বলছে, বাস্তবায়ন করতে না পারায় ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার চলতি বাজেট থেকে ছাটাই করা হচ্ছে ২৮,৭৭৬ কোটি। ফলে, বাজেট নতুন আকারে নেমে আসছে ৩,৭১,৪৯০ কোটিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাটা হচ্ছে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে। ২,৪৮,১৯০ কোটি থেকে ২৩,১৯০ কোটি টাকা কমিয়ে নামানো হয়েছে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকায়।
এই কাটছাঁটের বড় কারণ, লক্ষ্য অনুযায়ী এডিপি বাস্তবায়ন করতে না পারা। কেননা, সংশোধিত উন্নয়ন ব্যয় ১,৬৭ হাজার কোটির প্রথম দশ মাসে খরচ করা গেছে অর্ধেকের কিছু বেশি। তবে, আরো বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে চড়া সুদে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঋণ বাড়ানোর প্রবণতা।
কম সুদের বিদেশী ঋণ ছাড় করতে না পারায় সেখানেও লক্ষ্যমাত্রা কমছে বেশ খানিকটা। সেই সাথে আট হাজার কোটি টাকা কমছে ব্যাংক থেকে টাকা নেয়ার লক্ষ্যমাত্রাও।
চলতি অর্থবছরে ৩৪ শতাংশ বেশি আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও প্রথম নয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় কোনো সংস্কার না করে নতুন বাজেটে বড় লক্ষ্য ধরা হবে অযৌক্তিক।
 প্রতিবছর অংকের হিসাবে বাজেটকে যত বড় করে দেখানো হয়, বছর শেষে বাস্তবায়ন অদক্ষতায় তার বেশ খানিকটা ছেটে ফেলা এখন রীতি হয়ে দাড়িয়েছে। এতে করে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে সরকারের জন্য। বাধ্য হয়ে বছর শেষে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হচ্ছে।
বিগত তিন বছর ধরেই এনবিআর তা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না। এ নিয়ে ইমেজ সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ইমেজ উদ্ধারে দিন রাত কাজও করছে এনবিআরের কর্মকর্তারা। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব হওয়ার কারণেই তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এক দিকে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে তারা। অন্যদিকে পুরাতন করদাতাদের সাথেও তাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।
জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে পুরাতন করদাতাদের সাথে কর কর্মকর্তাদের সম্পর্ক খুবই ভাল। কিন্তু সরকারের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে তারা সে সম্পর্ক ধরে রাখতে পারছে না। অথচ সরকারকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বলছেন, করদাতাদের সাথে সম্পর্ক কোনভাবেই খারাপ করা যাবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আদায় বাড়াতে নেয়া হয়নি বড় কোনো সংস্কার পদক্ষেপ। বিশেষ করে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ দুরে এনবিআর। এমন বাস্তবতায় আগামী বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্য ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। যে অংক নিয়েও বিভিন্ন মহলে আছে বিতর্ক।
গত বাজেটে ৩৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আর এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব মিলিয়ে মোট রাজস্বের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বরাবরই আদায়যোগ্য ও বাস্তবসম্মত রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। অর্থমন্ত্রীর এমন প্রস্তাবের পর, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, চলতি বছর রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যামাত্রার চেয়ে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে। সে ঘাটতি ৩০ হাজার কোটি টাকায় দাড়িয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ৩০ শতাংশের উপরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব ও অর্জনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আদায় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২২ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কার্যত অসম্ভব। ফলে অতীতের ন্যায় চলতি অর্থবছরেও শেষদিকে এসে ফের সংশোধন করে কমিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, বাজেটে বড় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাহাবা আদায় করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা জনমনে গুরুত্ব হারাবে।
অর্থবছরের শেষ দিকে এসে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াও মনে করেন, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে না। গতকাল এনবিআরের আওতাধীন বৃহত্ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ভ্যাট) আয়োজিত রাজস্ব হালখাতার সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ২৫ হাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা কমিয়ে আনা হতে পারে।
এদিকে মাত্রাতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়ায় মাঠ পর্যায়ে কর কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের উপর হয়রানি বাড়িয়ে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি খোদ ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এমন অভিযোগ তুলেছে।
এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, জনগণ যাতে বৃহত্ বাজেটের ভার সহ্য করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বড় রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের উপর আইন ও বিধি-বিধানের অপপ্রয়োগ, জুলুম ও হয়রানি বাড়ে। এ সময় মাঠ পর্যায়ে কর বা ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের দ্বারা হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরেন খাতভিত্তিক ব্যবসায়ীরাও।
এনবিআরের প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রাজস্বের তিনটি খাতের মধ্যে আয়কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি অপেক্ষাকৃত বেশি। আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয়কর আদায় কম হয়েছে ৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। একই সময়ে ভ্যাট ও শুল্ক আদায় কম হয়েছে যথাক্রমে ৯ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা ও ৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা।
 দেশব্যাপী আয়কর ও ভ্যাট অফিসগুলোতে আয়োজিত রাজস্ব হালখাতায় করদাতা ও ব্যবসায়ীরা বকেয়া করের প্রায় ৯শ’ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে। গতকাল এলটিইউ’র ওই অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, রাজস্ব হালখাতায় বকেয় করের ৪০৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। ভ্যাট ও শুল্ক মিলিয়ে আরো প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা আদায় হতে পারে।
এ ব্যাপারে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফিজুর রহমান বলেন, বাজেট কাটছাট করা একটা নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। এনিয়ে কোনভাবেই ভালো লক্ষ্যণ নয়। এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা দিতে হবে বাস্তবায়নযোগ্য। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের অদক্ষতা দিন দিন বাড়ছে। বছর শেষে এসে বাজেট কাটছাট করতে হচ্ছে। এতে করে বাজেটে এক ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। আমরা বাস্তব বাজেট তৈরির জন্য বারবার তাগিদ দিলেও সরকার ঘাটতি বাজেট প্রনয়নে বেশি অগ্রহী হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাজেটে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিলেই রাজস্ব আদায়ে লক্ষমাত্রা অর্জন করা সহজ হবে। এতে করদাতাদের ওপর চাপও কমবে। সরকারকে করদাতাদের দিকটাও লক্ষ্য রাখতে হবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ বলেন, রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ১৫/১৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নির্ধারন করা ঠিক না। কোনভাবে এর বেশি প্রবৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান সরকার রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি কিভাবে ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করে আমার  বুঝে আসে না। বড় ধরনের সংস্কার করেই কেবল তা সম্ভব হতে পারে। তা না হলে এই লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব হবে। প্রতি বছরই বাজেট কাটছাট করতে হবে।
এ ব্যাপারে পিআইআর’র চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং লোকবল না নিয়ে এভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার মানে হলে করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এভাবে চাপ সৃষ্টি করলে হিতে বিপরিত হতে পারে।
তিনি বলেন, ১৫-১৬ শতাংশে বেশি রাজস্ব আদায়ে লক্ষমাত্রা অর্জন কোনো দিনই হয়নি। তাহলে কেন এত বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় আমার বুঝে আসে না। আবার বছর শেষে তা কেন কাটছাট করা হয় তাও বুঝা যায় না। এ নিয়ে আগেও কথা বলেছি কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি। বড় ধরনের সংস্কার করতে হবেই। তা না হলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা অর্জন আরও ভেঙ্গে পড়তে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ