ঢাকা, মঙ্গলবার 29 May 2018, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নির্যাতিত নারীরা দেশে ফিরছেন স্রোতের মত

ইবরাহীম খলিল : সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারীরা দেশে ফিরছে স্রোতের মতো। গত এক সপ্তাহে এসেছেন দেড় শতাধিক। গত রোববারও সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এলেন আরও ৪০ জন নারী শ্রমিক। তারা সবাই সৌদি আরবের সেফ হোম এবং ডিপোর্ট সেন্টারে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। এর আগে গত ১৮ ও ১৯ মে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছিলেন ৮৯ নির্যাতিত বাংলাদেশি নারী কর্মী। দেশে ফেরা নারীরা জানিয়েছেন, ভাল বেতনে কাজের আশায় তারা সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার পর নির্যাতন, নিপীড়ন শুরু হয়। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গিয়েছিলেন, তারা দায়দায়িত্ব নেয়নি। তাই পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় চার হাজার নারী কর্মস্থলে নির্যাতনের শিকার হয়ে গত বছরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফেরেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ফিরেছেন আরো হাজের খানেক মেয়ে। ব্র্যাক অভিবাসনের কর্মকর্তা আলামিন নয়ন জানিয়েছেন, ৪০ নারী কর্মী এক সঙ্গে দেশে ফিরেছেন। তাদের অনেকেই শারিরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার। বেশির ভাগই বেতন পাননি। নির্যাতন সইতে না পেরে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ৪০ নারীর তিনজন ফিরেছেন ব্র্যাকের আবেদনে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ৮৩ হজার ৩৫৪ জন, ২০১৬ সালে ৬৮ হাজার, ২০১৫ সালে ২০ হাজার ৯৫২ জন এবং চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৩০ হাজার ১০২ জন নারী সৌদি আরব গিয়েছিলেন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে।
রোববার দেশে ফিরে আসা মল্লিকা জানান, সৌদি আরবে প্রতিনিয়ত তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাকে আটকে রেখে ইলেকট্রিক শক দেয়ার পাশাপাশি রড গরম করে ছেকা পর্যন্ত দেয়া হয়। দিনাজপুরের মনজুরা বেগম বলেন, আমার পাসপোর্টসহ ইজ্জত সম্মান সব দিয়ে এসেছি। মালিকের নির্যাতন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের দূতাবাসে যাই। দূতাবাস থেকে আমাকে ট্রাভেল পাস দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়। নির্যাতনের শিকার নারী কর্মীরা দল বেঁধে দেশে ফিরছেন কি কারণে, মন্ত্রণালয় কোনো দায়িত্ব নেয় না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, আমরা বিষয়টির প্রতি নজর রাখছি। বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে আমাদের কর্মীরা তৎপর রয়েছেন। ফিরে আসা সব নির্যাতিত নারী কর্মীদের জন্য যা যা করণীয় তার সবই করা হবে বলে জানান তিনি।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, যা মোট অভিবাসন সংখ্যার ১৩ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত একা অভিবাসন প্রত্যাশী নারী শ্রমিককে অভিবাসনে বাধা দেয়া হলেও পরবর্তীতে ২০০৩ এবং ২০০৬ সালে কিছুটা শিথিল করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকের অভিবাসন হার ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশে।
এদিকে ভালো বেতনের আশায় সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে যৌন নিপীড়নসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের দায়িত্ব সরকারকে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে নারীপক্ষ। সংগঠনটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানোর পাশাপাশি বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা এই নারীদেরই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় দোষারোপ করায় ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত বছরও নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন প্রায় ৪ হাজার নারী শ্রমিক। দেশে ফেরা এই নারীদের অভিযোগ, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো তাদের ভালো বেতনে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখানে পাঠালেও তারা কোনও দায় দায়িত্ব নেয়নি। বরং তাদের অনেককে বেচে দিয়েছিল। তাদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনসহ নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বা দোষীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং উল্টো প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই নারীদেরই দোষারোপ করার কথা শোনা যাচ্ছে! সরকারের এমন আচরণে নারীপক্ষ ভীষণ ক্ষুব্ধ, শঙ্কিত।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের করা চুক্তির আওতায় দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এই নারীদের সৌদি আরবে পাঠায়। তাই এর দায় দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। নির্যাতনের শিকার এই নারীদের আর্থিক ও আইনিসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিতে এবং তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনাতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে নারীপক্ষ।
এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সব মহলকে আহ্বান জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
এদিকে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত তিন হাজার ৪০৩ জন বাংলাদেশিসহ ১৭ হাজার ৮৬৯ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করেছে মালয়েশিয়া পুলিশ। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক মোস্তাফার আলী বলেন, আমরা ইন্দোনেশিয়ার ছয় হাজার ৩১৫ জন, বাংলাদেশের তিন হাজার ৪০৩ জন, ফিলিপিন্সের এক হাজার ৯৫৬ জন, মিয়ানমারের এক হাজার ৭৪৮ জন এবং অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের আটক করেছি। অভিবাসন কর্মকর্তারা অবৈধ শ্রমিকদের ধরতে এখনও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিকদের তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
এই অভিযানের সময় প্রায় ৭৪ হাজার জনের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এর ফলে, বিভিন্ন দেশের ১৭ হাজার ৮৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া অবৈধ অভিবাসীদের কাজ দেয়ার জন্য ৪৫৫ নিয়োগকর্তাকেও আটক করা হয়েছে।
দেশটির অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক মোস্তাফার আলী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত অবৈধ অভিবাসীবিরোধী মোট ৬ হাজার ১৯টি অভিযান পরিচালিত হয়। মালয়েশিয়ায় বহু অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে চলতি বছর ৪ লাখ ৮২ হাজার বাংলাদেশি বৈধ হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ